সময় টিভির নিয়ন্ত্রণ ঘিরে উত্তেজনা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

সাংবাদিক নেতা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, গণমাধ্যমে এ ধরনের দখল-পুনর্দখল বা নিয়ন্ত্রণ বদলের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সংবাদকর্মীদের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আপডেট : ১১ মে ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

সময় টিভির মালিকানা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনাকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন না গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা। 

রবিবার সন্ধ্যায় চ্যানেলটির কার্যালয়ে পরিচালক আহমেদ জোবায়েরের প্রবেশ, সিইও জুবায়ের বাবুকে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেওয়াকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বদল ও দখল-পুনর্দখলের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের অভিযোগ, সময় টিভির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতেই সক্রিয় দুই পক্ষ। এ ঘটনায় কার্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, পুলিশও মোতায়েন করা হয়। 

যদিও এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, তবে গণমাধ্যমের ভেতরে এ ধরনের অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত সংবাদকর্মীদের রুটি-রুজি ও পেশাগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে বলে সতর্ক করেছেন সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা।

কী হয়েছিল

রবিবার সন্ধ্যার পর বেসরকারি এই টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয়ে পরিচালক আহমেদ জোবায়েরের প্রবেশ এবং সিইও পরিবর্তনসংক্রান্ত একটি চিঠি দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাংবাদকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চ্যানেলটির একাধিক সংবাদকর্মী জানান, রবিবার সন্ধ্যার পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আহমেদ জোবায়ের কার্যালয়ে যান এবং বর্তমান সিইও জুবায়ের বাবুকে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেন।  জুবায়ের বাবু ওই চিঠিকে অবৈধ দাবি করে তা গ্রহণ করেননি। পরে তিনি অফিসে অবস্থান নেন। এ সময় তার সমর্থক সাংবাদিককর্মীরাও কার্যালয়ে অবস্থান করেন। বাইরে থেকেও লোকজন আসার খবর পাওয়া যায়।

ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর সময় টিভির কার্যালয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয় বলেও জানা গেছে। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

 

বিষয়টি নিয়ে সময় টিভির কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে চাননি। আহমেদ জোবায়ের ও জুবায়ের বাবুর সঙ্গে ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি।

সংশ্লিষ্টসূত্রগুলোর দাবি, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও জুবায়ের বাবুকে চাকরিচ্যুত করার চিঠি কেন্দ্র করেই সময় টিভির ভেতরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সময় টিভিতেও প্রশাসনিক পরিবর্তন হয়।  পরিচালক পদ থেকে বাদ দেওয়া হয় আহমেদ জোবায়েরকে। জুবায়ের বাবুকে সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।  কিন্তু সম্প্রতি আদালতের রায়ে আহমেদ জোবায়ের পরিচালক পদ ফিরে পান। এরপরই কার্যত নিয়ন্ত্রণ রাখার পক্ষ-বিপক্ষ।

টেলিভিশনটির একাধিক কর্মী জানান, দুই পক্ষের রেশারেশির চেষ্টার খবর ছড়িয়ে পড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা দেখা দেয়। অফিসের এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সরিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।

সময় টিভির একজন সংবাদকর্মী নিশ্চিত করেছেন, জুবায়ের বাবুকে দেওয়া চাকরিচ্যুতির চিঠিটি তিনি অবৈধ উল্লেখ করে গ্রহণ করেননি। এ ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য অফিসে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। 

তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মী।  

দখল-পুনর্দখলের সংস্কৃতি 

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যমে দখল-পুনর্দখলের যে প্রবণতা দেখা গেছে, সময় টিভির ঘটনাকেও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী।

তিনি বলেন, “৫ই আগস্টের পর গণমাধ্যমে দখল-পুনর্দখলের যে চর্চা শুরু হয়েছে, সময় টিভির ঘটনাও অনেকটা তারই পুনরাবৃত্তি। আগের সময়ে ভাঙচুরের ঘটনা দেখা যেত, এখানে হয়তো ভাঙচুর হয়নি-এটাই কিছুটা পার্থক্য। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা গণমাধ্যমের জন্য উদ্বেগজনক।”

সাইফুল আলম চৌধুরীর মতে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নতুন কোনো ঘটনা নয়। 

“যতদিন যে পক্ষ ক্ষমতায় থাকে, ততদিন তারা মনে করে গণমাধ্যমও তাদের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। চ্যানেল হোক বা পত্রিকা, সব জায়গাতেই দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দেখা যায়।”

 

আলাপ-কে তিনি আরও বলেন, এই প্রবণতা শুধু গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য খাতেও একই ধরনের দখল বা প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি দেখা যায়। 

উদাহরণ হিসেবে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই সংস্কৃতি খুব সহজে বদলাবে বলে মনে হয় না।”

সময় টিভির ঘটনাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজ সময় টিভিতে যা হচ্ছে, কাল অন্য জায়গায়ও তা হতে পারে। ৫ই আগস্টের পর থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানেই নিয়ন্ত্রণ বদলের চেষ্টা দেখা গেছে। যারা দখলে আছে, তারাই এখন মালিকের পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত করছে।”

ঝুঁকিতে গণমাধ্যমকর্মীরাই

গণমাধ্যমে অস্থিরতা তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরাই, বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সালেহ আকন। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, “একজন মালিক যখন গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করেন, তিনি কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। আমরা সেখানে চাকরি করি। তাই বৈধ মালিকপক্ষ যেই হোক, তাদের সহযোগিতা করা উচিত। কোনো গণমাধ্যমে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি সাংবাদিক-কর্মীদের ওপর পড়ে।”

একজন মালিক তার নিজস্ব বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে না পারলে সেটি শিল্পের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন সাইফুল আলম চৌধুরী। 

সাংবাদিকতার এই শিক্ষক বলেন, “একজন মালিক যদি তার নিজের প্রতিষ্ঠানে নিজের পছন্দমতো কর্মী দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে না পারেন, তাহলে তিনি প্রতিষ্ঠান চালাবেন কেন? এটি শুধু গণমাধ্যমের জন্য নয়, যেকোনো শিল্পের জন্যই খারাপ।”

তার মতে, গণমাধ্যম খাতে এ ধরনের অস্থিরতার প্রভাব তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান। “অন্যান্য শিল্পে সমস্যা হলে মালিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারেন। কিন্তু গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সেটি সহজ নয়, অনেক সময় মালিকরাও তা করতে চান না। ফলে অস্থিরতা চলতেই থাকে।”

আর সালেহ আকন বলছেন, কোনো ধরনের অস্থিরতার কারণে যদি একটি গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়, অথবা এর আয় বন্ধ কিংবা বিলম্বিত হয়, তাহলে সেটির প্রভাব সাংবাদিকদের রুটি-রুজির ওপর পড়ে। এ কারণে গণমাধ্যমকর্মীদের সব সময় সতর্ক থাকা দরকার। একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে সাংবাদিক সমাজ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

“আমরা কেউই ধোয়া তুলসিপাতা নই,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতি, অনিয়ম বা অন্য কোনো অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা দেখার জন্য সরকারি সংস্থা আছে, সাংবাদিক সংগঠন আছে। প্রয়োজনে মালিকপক্ষ সেসব জায়গায় যেতে পারে।