পেট্রোল-অকটেনের উৎপাদন বাংলাদেশেই, তবু হুজুগে হাহাকার

পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। মজুতের ঘাটতি নেই। তবুও অতিরিক্ত কেনার প্রবণতায় শেষ হয়ে যাচ্ছে পাম্পের দৈনিক রিজার্ভ। সাপ্তাহিক ছুটিতে ডিপো বন্ধ থাকায় বিক্রেতারাও বিপাকে।

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে পেট্রোল ও অকটেন কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গ্রাহকরা। এতে ফিলিং স্টেশনগুলোর নিয়মিত মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির কারণে ডিপো বন্ধ থাকায় সরবরাহ বন্ধ আছে। এতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে কিছু ফিলিং স্টেশন।

যদিও তথ্য বলছে দেশে পেট্রোল-অকটেনের কোনো সংকট নেই। বরং আতঙ্কে বাড়তি জ্বালানি কেনাই পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।

দেশেই হয় পেট্রোল-অকটেন

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করেই মূলত পেট্রোল ও অকটেন তৈরি হয়।

কনডেনসেট হলো প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় উপজাত (বাই প্রোডাক্ট) হিসেবে পাওয়া এক ধরণের হালকা, বর্ণহীন বা কিছুটা হলুদ তরল হাইড্রোকার্বন। এটি রিফাইনারিতে পরিশোধন করে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিন উৎপাদন করা হয়।

সিলেটের বিবিয়ানা, জালালাবাদ, বিয়ানীবাজার, কৈলাশটিলা ও রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত এই কনডেনসেট পাইপলাইনের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পাঠানো হয়।

আশুগঞ্জ কনডেনসেট হ্যান্ডেলিংয়ে স্থাপনায় এসব কনডেনসেট সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হয়। স্থাপনাটিতে প্রায় ১৫ হাজার ২০০ ব্যারেল ধারণক্ষমতার ২২টি স্টোরেজ ট্যাংক রয়েছে।

পরে এসব কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ও কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি।

এই রিফাইনারিগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন, যা দেশের মোট পেট্রোল-অকটেন চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেশে অকটেন বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন। আর পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন। তার মানে মোট চাহিদা ছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার টন।

অন্যদিকে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর গত নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বাংলাদেশে কনডেনসেট হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন।

অর্থাৎ পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। দেশে উৎপাদিত পেট্রোলের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকায় পেট্রোলের চাহিদার শতভাগই দেশ থেকে মেটানো হয়।

তবে বাংলাদেশে বিক্রিত অকটেনের মান আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম হওয়ায় অনেক সময় আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে বিক্রয়যোগ্য অকটেন তৈরি হয়।

পেট্রোল-অকটেনের মাত্র ২০ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়। তাই এই দুই জ্বালানিতে সংকট হওয়ার বাস্তব কারণ নেই বলে জানান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক।

আলাপ-কে তিনি বলেন, “আগামী এক মাসের মধ্যে পেট্রোল-অকটেনের সংকট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে যথেষ্ট মজুত আছে এবং এগুলো লোকালিই উৎপাদন হয়।”

ডিজেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে, কারণ এটি আমদানিনির্ভর বলে জানান তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

তিনি বলেন, “আসলে আমাদের তেলের কোনো অভাব নাই, সংকট নেই। শুধু তাই না, আমি জানাতে চাই, আগামী ৯ তারিখে আরো দুইটা ভেসেল আসছে। সুতরাং তেলের কোনো সমস্যা নাই।”

সরকার নিয়মিতভাবে পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ করছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, বলেন জ্বালানিমন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, “পেট্রোল পাম্পে আমরা তেল দিচ্ছি এবং চলবে এটা। এটার জন্য লাইন দিয়ে সারা রাত জাগার কোনো প্রয়োজন নাই।”

বন্ধ পাম্প, অপেক্ষা ও ব্যক্তিগত রিজার্ভ

শনিবার ছুটির দিন সকাল সাড়ে ৮টা। ততক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি পৌঁছে গেছে বিএএফ শাহীন কলেজের সামনের ওভার ব্রিজ পর্যন্ত। সঙ্গে আছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন।

দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা হাসান ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে ঠিক একই চিত্র।

মোটরসাইকেল নিয়ে ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন কয়েক লাইনে। পাশাপাশি রয়েছে প্রাইভেট কারের সারি, যা আরও দীর্ঘ।

অপেক্ষায় থাকা এক মোটরসাইকেল চালক জানালেন, গত দুইদিন পাম্পের ভয়াবহ অবস্থা দেখে তেল নেননি তিনি। ভেবেছিলেন চাপ কমবে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি।

“দিন যত যাচ্ছে বিভিন্ন পাম্পে তেল নেই বলে বন্ধ করে দেওয়ার কথা শুনছি। আজ গাড়িতে তেল না নিলে গাড়ি ঠেলে নিয়ে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে এত বড় সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছি।”

রাইড শেয়ার মোটরাসাইকেল চালান মাহাদি। তিনি আলাপকে বলেন, “শুক্রবার নীলক্ষেতের দুইটি পাম্পে গিয়ে তেল পাইনি। পরে একটি ট্রিপ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে যাওয়ায় সেখান থেকে পেট্রোল নিয়েছি।” এ জন্যও তাকে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদপুর আসাদ গেট সংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা জোবায়ের শিহাব জানালেন, “মানুষ আতঙ্কিত হয়ে তেল কিনতে আসছে কিন্তু প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে অনেকেই হোম রিজার্ভ শুরু করেছেন।”

“সরকারের পক্ষ থেকে তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়ার পর আতঙ্ক আরও বেড়েছে। আসার সময় দেখলাম বিভিন্ন মেকানিকের দোকানে দাঁড়িয়ে অনেকেই তেল বের করে বোতলে রিজার্ভ করছেন। এরপর আবার এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।”

অকটেন ও পেট্রোল যদি দেশেই উৎপাদন হয় তাহলে ১৫ দিন ২০ দিন বা এক মাসের হিসাব না দিয়ে বিষয়টি সরকার কেন পরিষ্কার করছে না এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তাহলে “প্যানিক বাই” কমে আসত বলেও মনে করেন তিনি।

ছুটির ফাঁদে ডিপো

মানুষ প্যানিকড হয়ে ভিড় করে তেল কিনছে যার ফলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক।

তিনি বলেন, “আমার পাম্পে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার লিটার তেল বিক্রি হয় মোটরসাইকেলে, আর ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার প্রাইভেট কারে। গতকাল শুধু মোটরসাইকেলেই ৩৫ হাজার লিটার তেল বিক্রি হয়েছে। আর মোট বিক্রি ছিল প্রায় ৫২ হাজার লিটার। শেষ হয়ে গেছে সব।”

এদিকে বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনগুলোর মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ডিপো থেকে তেল আনতে ট্যাংক লরির লাইন পড়ছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় মালিকরা ডিপোতে যোগাযোগ করেও তেল ব্যবস্থা করতে পারেননি।

“শুক্র ও শনিবার সাধারণত ডিপো বন্ধ থাকে। কিন্তু যে অবস্থা তাতে আমি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা করেছি যাতে ডিপো খোলা রাখা হয়। কিন্তু তেল আনা যায়নি,” বলেছেন নাজমুল হক।

একদিকে ফিলিং স্টেশনগুলোর মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং শুক্র ও শনিবার তেলের ডিপো বন্ধ থাকায় অনেক পাম্প বন্ধ করে দিয়েছে। এতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

এর ফলে আগামী কয়েকদিন এর প্রভাব দেখা যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন এই ব্যবসায়ী।

তবে এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, “আমরা তো নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দিচ্ছি । এখন কোনো পাম্প যদি শেষ করে ফেলে, তারপর তো পাবে না।”

এ জন্য মনিটরিং বাড়াতে রবিবার থেকে মোবাইল কোর্ট নামবে বলেও জানিয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।