ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গোলাম আযম কেন জামায়াতের শোক প্রস্তাবের তালিকায় নেই
‘জামায়াত হয়তো নিউ জেনারেশন পলিটিক্স করতে চাচ্ছে’ - গোলাম আযমের ছেলে। ‘গোলাম আযম সাহেবের ব্যাপারে হয়তো কোনো বাধা ছিল, তার অনেক কিছুই হয়তো খারাপ ছিল’ - দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএমআপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
জামায়াতে ইসলামীর পোস্টারবয় গোলাম আযমকে নিয়ে সংসদে শোক প্রস্তাব আনেনি খোদ জামায়াত।
গোলাম আযম ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৯২ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন।
সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় ২০১৪ সালে হাসপাতালের প্রিজন সেলেই মৃত্যু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন প্রধান নেতা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে দলটির প্রথম আমীর গোলাম আযমের।
জামায়াত মনে করে রাজনৈতিক দমনপীড়নের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা তাদের প্রধান প্রধান নেতাদের ধরে ধরে তাদের ভাষায় এক ‘ক্যাঙারু কোর্টে’ নিয়ে হয় ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে নয়তো সারাজীবনের জন্য জেলে পুরেছে।
সদ্য শুরু হওয়া নতুন সংসদে এমন সাজা পাওয়া বা ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া কয়েকজন নেতার নামে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু শোরগোল চলছে।
কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরুদ্ধাচারণ করা দল জামায়াত ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দলের আসন অলঙ্কৃত করলেও দলটি বাংলাদেশে তাদের ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নেতার নামেই শোক প্রস্তাব আনলো না।
অথচ সংসদে শোক প্রস্তাব উঠেছে হাসিনার আমলে ফাঁসী কার্যকর হওয়া জামায়াতের সাবেক আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামেও।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার সর্বোচ্চ প্রতীকে পরিণত হওয়া গোলাম আযমকে কি জামায়াত সচেতনভাবে অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এটি কি জামায়াতের নতুন রাজনৈতিক কৌশল?
শোক প্রস্তাব নিয়ে কী ঘটেছে:
বৃহস্পতিবার অধিবেশনে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ মারিও এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয় জাতীয় সংসদে।
এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের প্রতি শোক প্রস্তাব আনা হয়।
পরে স্পিকার বিএনপির সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ শাসনামলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসীর দণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ চারজনের নাম যোগ করেন।
এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর তার আসন থেকে ইশারা করলে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ থেমে যান। তখন প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন চিফ হুইপের সঙ্গে।
তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলার পর, চিফ হুইপ শোক প্রস্তাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর নাম যোগ করার প্রস্তাব করেন। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মশিউর রহমানের নাম যুক্ত করারও প্রস্তাব করেন। স্পিকার তা অনুমোদন করেন।
এরপর জামায়াতের আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, “আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম, আরও কিছু সংসদ সদস্য এবং জাতীয় ব্যক্তিত্ব, যারা নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, সেই নামগুলো প্রস্তাব করার জন্য আমি বিরোধী দলের উপনেতা জনাব ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে অনুরোধ করছি। আপনি মেহেরবানী করে তাকে একটু ফ্লোর দিবেন।”
এরপর ডা. তাহের ফ্লোর নিয়ে আরও কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান বিন হাদি এবং শাপলা চত্বরে নিহত ব্যক্তিদের নামও যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
ড. তাহের শোক প্রস্তাবে সংশোধনের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, শাপলা চত্বরে নিহতদের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য বলা হয়েছিল, তা হবে হেফাজতে ইসলামের।
তিনি বলেন, “আবু সাঈদ, মীর মুক্ত, শহীদ ওয়াসিম এগুলো আপনি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া জুলাই এর গণ আন্দোলন শাহাদাত বরণকারী প্রায় ২ হাজার শহীদ এবং শহীদ ওসমান হাদির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক তাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব প্রকাশ করছি।”
এরপর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বক্তব্য দেন। তিনি শরিফ ওসমান বিন হাদি, আবরার ফাহাদ ও ফেলানী খাতুনকে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদ আখ্যা দিয়ে; এ পরিচয়ে শোক প্রস্তাবে নাম যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
এরপর সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, গৌতম চক্রবর্তী, মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
পরে সংসদ প্রস্তাবটি সর্বসস্মতিক্রমে অনুমোদন করে।
গোলাম আযম প্রসঙ্গ
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম সম্পর্কে দলটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তিনি একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষা আন্দোলনের নেতা, ডাকসুর সাবেক জিএস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার।
গোলাম আযম প্রথম জামায়াতের আমীর হয়েছিলেন ১৯৬৯ সালে। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশিদের ওপর গণহত্যা চালাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিলেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়, ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯২ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে কারাগারেই মারা যান তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ২২এ নভেম্বর ঢাকা ছেড়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান গোলাম আযম। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে ঢাকায় আসেন অসুস্থ মাকে দেখার কথা বলে। তারপর থেকে তিনি বাংলাদেশেই আছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ১৯৯৪ সালে আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ফিরে পান
স্বাধীন বাংলাদেশে গোলাম আযম ১৯৮১ সালে প্রথম জনসমক্ষে আসেন। এক দশক পর ১৯৯১ সালের ২৯শে ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতের আমীর ঘোষণা করা হয়।
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ এর নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন ছিল, আর সমর্থনের বিনিময়ে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে এক অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হয় বলে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
৯১ বছর বয়সে এসে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের মুখোমুখি হয়ে ২০১২ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি গ্রেপ্তার হন। তাকে ৯২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ২৩ই অক্টোবর কারাগারেই মারা যান তিনি।
বাংলাদেশে জামায়াতের ইতিহাসের বড় অংশজুড়ে ছিলেন গোলাম আযম। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর ফাঁসি হওয়া মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নাম শোক প্রস্তাবে যুক্ত করা হয়। দণ্ডিত হয়ে কারাগারে মারা যাওয়া দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর নামও যুক্ত করা হয়। তবে গোলাম আযমের নাম সেখানে ছিল না।
“এটা পার্টির রাইট টু ডিসাইড”
গোলাম আযমের ছেলে সালমান আল আজমি বলেন, শোক প্রস্তাবে বাবার নাম থাকলে তিনি অনেক খুশি হতেন।
আলাপকে তিনি বলেন, “জুডিশিয়াল ইনজাস্টিস আমার বাবার ওপর হয়েছে হানড্রেড পারসেন্ট। তার নাম থাকলে তাই ভালো হতো।”
তিনি বলেন, “সাঈদী সাহেব তো এমপি ছিলেন, আমার আব্বা এমপি ছিলেন না। সেটা কারণ হতে পারে। তারা অবশ্য আব্বাকে অনেক রেসপেক্ট করে।
“কেন তার নাম বলা হয়নি তা তো আমি বলতে পারবো না। এটা ইন্টারনাল ব্যাপার। জামায়াত হয়তো নিউ জেনারেশন পলিটিক্স করতে চাচ্ছে।”
সালমান আল আজমি বলেন, “আব্বাকে তারা অনেক রেসপেক্ট করে ইন্টারনালি। বাট দিস কুড বি অ্যা স্ট্র্যাটেজি। আর পলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি দিয়েই চলে।”
“এটা পার্টির রাইট টু ডিসাইড”
তবে দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মনে করেন ঘটনাটি অন্যরকম। আলাপকে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় গোলাম আযম সাহেবের নাম যুক্ত করা হয়েছিল, সরকার বা অন্য কারও পক্ষ থেকে এডিট করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ গোলাম আযম সাহেবের ব্যাপারে হয়তো কোনো বাধা ছিল, তার অনেক কিছুই হয়তো খারাপ ছিল। লেটস ফরগেট এন্ড গো ফর অ্যা নিউ বিগিনিং।”
জামায়াত নতুন ধারার রাজনীতি করতে চায় বলে এই ‘এডিট’ মেনে নিয়েছে বলেও মনে করেন বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক।
তবে এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গোলাম আযম কেন জামায়াতের শোক প্রস্তাবের তালিকায় নেই
‘জামায়াত হয়তো নিউ জেনারেশন পলিটিক্স করতে চাচ্ছে’ - গোলাম আযমের ছেলে। ‘গোলাম আযম সাহেবের ব্যাপারে হয়তো কোনো বাধা ছিল, তার অনেক কিছুই হয়তো খারাপ ছিল’ - দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক।
জামায়াতে ইসলামীর পোস্টারবয় গোলাম আযমকে নিয়ে সংসদে শোক প্রস্তাব আনেনি খোদ জামায়াত।
গোলাম আযম ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৯২ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন।
সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় ২০১৪ সালে হাসপাতালের প্রিজন সেলেই মৃত্যু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন প্রধান নেতা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে দলটির প্রথম আমীর গোলাম আযমের।
জামায়াত মনে করে রাজনৈতিক দমনপীড়নের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা তাদের প্রধান প্রধান নেতাদের ধরে ধরে তাদের ভাষায় এক ‘ক্যাঙারু কোর্টে’ নিয়ে হয় ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে নয়তো সারাজীবনের জন্য জেলে পুরেছে।
সদ্য শুরু হওয়া নতুন সংসদে এমন সাজা পাওয়া বা ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া কয়েকজন নেতার নামে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু শোরগোল চলছে।
কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরুদ্ধাচারণ করা দল জামায়াত ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দলের আসন অলঙ্কৃত করলেও দলটি বাংলাদেশে তাদের ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নেতার নামেই শোক প্রস্তাব আনলো না।
অথচ সংসদে শোক প্রস্তাব উঠেছে হাসিনার আমলে ফাঁসী কার্যকর হওয়া জামায়াতের সাবেক আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামেও।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার সর্বোচ্চ প্রতীকে পরিণত হওয়া গোলাম আযমকে কি জামায়াত সচেতনভাবে অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এটি কি জামায়াতের নতুন রাজনৈতিক কৌশল?
শোক প্রস্তাব নিয়ে কী ঘটেছে:
বৃহস্পতিবার অধিবেশনে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ মারিও এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয় জাতীয় সংসদে।
এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের প্রতি শোক প্রস্তাব আনা হয়।
পরে স্পিকার বিএনপির সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ শাসনামলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসীর দণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ চারজনের নাম যোগ করেন।
এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর তার আসন থেকে ইশারা করলে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ থেমে যান। তখন প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন চিফ হুইপের সঙ্গে।
তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলার পর, চিফ হুইপ শোক প্রস্তাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর নাম যোগ করার প্রস্তাব করেন। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মশিউর রহমানের নাম যুক্ত করারও প্রস্তাব করেন। স্পিকার তা অনুমোদন করেন।
এরপর জামায়াতের আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, “আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম, আরও কিছু সংসদ সদস্য এবং জাতীয় ব্যক্তিত্ব, যারা নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, সেই নামগুলো প্রস্তাব করার জন্য আমি বিরোধী দলের উপনেতা জনাব ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে অনুরোধ করছি। আপনি মেহেরবানী করে তাকে একটু ফ্লোর দিবেন।”
এরপর ডা. তাহের ফ্লোর নিয়ে আরও কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান বিন হাদি এবং শাপলা চত্বরে নিহত ব্যক্তিদের নামও যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
ড. তাহের শোক প্রস্তাবে সংশোধনের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, শাপলা চত্বরে নিহতদের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য বলা হয়েছিল, তা হবে হেফাজতে ইসলামের।
তিনি বলেন, “আবু সাঈদ, মীর মুক্ত, শহীদ ওয়াসিম এগুলো আপনি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া জুলাই এর গণ আন্দোলন শাহাদাত বরণকারী প্রায় ২ হাজার শহীদ এবং শহীদ ওসমান হাদির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক তাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব প্রকাশ করছি।”
এরপর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বক্তব্য দেন। তিনি শরিফ ওসমান বিন হাদি, আবরার ফাহাদ ও ফেলানী খাতুনকে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদ আখ্যা দিয়ে; এ পরিচয়ে শোক প্রস্তাবে নাম যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
এরপর সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, গৌতম চক্রবর্তী, মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
পরে সংসদ প্রস্তাবটি সর্বসস্মতিক্রমে অনুমোদন করে।
গোলাম আযম প্রসঙ্গ
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম সম্পর্কে দলটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তিনি একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষা আন্দোলনের নেতা, ডাকসুর সাবেক জিএস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার।
গোলাম আযম প্রথম জামায়াতের আমীর হয়েছিলেন ১৯৬৯ সালে। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশিদের ওপর গণহত্যা চালাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিলেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়, ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯২ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে কারাগারেই মারা যান তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ২২এ নভেম্বর ঢাকা ছেড়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান গোলাম আযম। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে ঢাকায় আসেন অসুস্থ মাকে দেখার কথা বলে। তারপর থেকে তিনি বাংলাদেশেই আছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ১৯৯৪ সালে আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ফিরে পান
স্বাধীন বাংলাদেশে গোলাম আযম ১৯৮১ সালে প্রথম জনসমক্ষে আসেন। এক দশক পর ১৯৯১ সালের ২৯শে ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতের আমীর ঘোষণা করা হয়।
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ এর নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন ছিল, আর সমর্থনের বিনিময়ে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে এক অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হয় বলে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
৯১ বছর বয়সে এসে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের মুখোমুখি হয়ে ২০১২ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি গ্রেপ্তার হন। তাকে ৯২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ২৩ই অক্টোবর কারাগারেই মারা যান তিনি।
বাংলাদেশে জামায়াতের ইতিহাসের বড় অংশজুড়ে ছিলেন গোলাম আযম। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর ফাঁসি হওয়া মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নাম শোক প্রস্তাবে যুক্ত করা হয়। দণ্ডিত হয়ে কারাগারে মারা যাওয়া দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর নামও যুক্ত করা হয়। তবে গোলাম আযমের নাম সেখানে ছিল না।
“এটা পার্টির রাইট টু ডিসাইড”
গোলাম আযমের ছেলে সালমান আল আজমি বলেন, শোক প্রস্তাবে বাবার নাম থাকলে তিনি অনেক খুশি হতেন।
আলাপকে তিনি বলেন, “জুডিশিয়াল ইনজাস্টিস আমার বাবার ওপর হয়েছে হানড্রেড পারসেন্ট। তার নাম থাকলে তাই ভালো হতো।”
তিনি বলেন, “সাঈদী সাহেব তো এমপি ছিলেন, আমার আব্বা এমপি ছিলেন না। সেটা কারণ হতে পারে। তারা অবশ্য আব্বাকে অনেক রেসপেক্ট করে।
“কেন তার নাম বলা হয়নি তা তো আমি বলতে পারবো না। এটা ইন্টারনাল ব্যাপার। জামায়াত হয়তো নিউ জেনারেশন পলিটিক্স করতে চাচ্ছে।”
সালমান আল আজমি বলেন, “আব্বাকে তারা অনেক রেসপেক্ট করে ইন্টারনালি। বাট দিস কুড বি অ্যা স্ট্র্যাটেজি। আর পলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি দিয়েই চলে।”
“এটা পার্টির রাইট টু ডিসাইড”
তবে দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মনে করেন ঘটনাটি অন্যরকম। আলাপকে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় গোলাম আযম সাহেবের নাম যুক্ত করা হয়েছিল, সরকার বা অন্য কারও পক্ষ থেকে এডিট করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ গোলাম আযম সাহেবের ব্যাপারে হয়তো কোনো বাধা ছিল, তার অনেক কিছুই হয়তো খারাপ ছিল। লেটস ফরগেট এন্ড গো ফর অ্যা নিউ বিগিনিং।”
জামায়াত নতুন ধারার রাজনীতি করতে চায় বলে এই ‘এডিট’ মেনে নিয়েছে বলেও মনে করেন বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক।
তবে এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিষয়: