ভোটের প্রচারণায় যতটা উত্তপ্ত রাজপথ, তার চেয়েও বেশি সক্রিয় ভার্চুয়াল অঙ্গন। মাঠের প্রচারণা শেষ হয়ে গেলেও অব্যাহত রয়েছে ডিজিটাল প্রচারণা।
আর সেই ডিজিটাল ময়দানে ডলার খরচের দৌড়ে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
তথ্য বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণায় শফিকুর রহমানের বিনিয়োগ তারেক রহমানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
স্পনসরড কনটেন্ট, টার্গেটেড বিজ্ঞাপন এবং ব্র্যান্ডেড রাজনৈতিক বার্তা- সব মিলিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিপুল অর্থ ঢেলেছে জামায়াত।
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রচারণা দৃশ্যমান হলেও ব্যয়ের অঙ্ক তুলনামূলকভাবে জামায়াত আমীরের চেয়ে অনেক কম।
শুধু ব্যক্তি নন, দলীয় প্ল্যাটফর্ম থেকেও চলছে সমান তালে অর্থব্যয়।
ভোটের মাঠের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী- দুই রাজনৈতিক শক্তিই ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে অর্থ ব্যয় করেছে দেদার।
ডিজিটাল প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক।
রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এখন ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম।
তবে প্রশ্ন উঠছে, ডিজিটাল প্রচারণায় ব্যয় আইনসংগত হলেও তা নীতিমালা মেনে হচ্ছে কিনা?
প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী আলাপ-কে বলেন, “ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচার চালানো প্রার্থীর অধিকার।”
“কিন্তু দেখার বিষয় হলো- এই প্রচারের ব্যয় অতিরিক্ত কিনা এবং নির্বাচন বিষয়ক কমিউনিটি নীতিমালা মেনে কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে কিনা।”
তারেক রহমান ও শফিকুর রহমানের ব্যয়
মেটার অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য ঘেটে দেখা গেছে, গত ২১এ জানুয়ারি থেকে ১১ই ফেব্রুয়ারি জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমানের ফেইসবুক থেকে মেটায় বিজ্ঞাপনী পোস্ট দেওয়া হয়েছে ৪৩টি। এসবের ক্যাটাগরি ছিল ‘ইলেকশন ও পলিটিক্স‘।
বিজ্ঞাপন বাবদ শফিকুর রহমান খরচ করেছেন ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার ৪৮০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৯ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ টাকা।
শফিকুর রহমান মেটায় পেমেন্ট দিয়েছেন ডলারে, তারেক রহমান দিয়েছেন টাকায়।
একই সময়ে তারেক রহমানের পেইজ থেকে মেটায় ১২টি বিজ্ঞাপনী কনটেন্টে খরচ করা হয়েছে ৭৬ হাজার থেকে ৯৬ হাজার টাকা।
শফিকুর রহমানের নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, কিন্তু তারেক রহমানের বিজ্ঞাপন দিয়েছে বিএনপি।
এদিকে দলীয় অর্থ খরচের দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ২১ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ছয়টি নির্বাচনি স্পন্সরড কনটেন্ট প্রকাশ করেছে, যাতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৯৭ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
একই সময়ে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি-বিএনপি পেইজ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩টি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, যেখানে খরচ করা হয়েছে ৬০ হাজার ৭০০ থেকে ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা।
কী ধরনের কনটেন্টের প্রচার চালানো হচ্ছে
দুইটি রাজনৈতিক দল ও তাদের দলীয় প্রধানদের পেইজ থেকে নির্বাচনি প্রচারণা যেসব কনটেন্ট বিজ্ঞাপন স্পন্সরড করা হয়েছে, সেসবের মধ্যে রয়েছে প্রমোশনাল লাইভ বক্তৃতা ও ভিডিও। আবার রয়েছে ছবি ও টেক্সট।
শফিকুর রহমানের পেইজ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢালা হয়ে দুইটি কনটেন্ট। এর মধ্যে একটি ছিল ফেইসবুক স্ট্যাটাস।
নারীদের বাইরে বের হওয়া ও কর্মস্থলে যাওয়া নিয়ে শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেলের একটি পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায় এবং বিতর্ক হয়ে যায়। জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছিল।
সেই ঘটনার ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে জামায়াত আমীরের ফেইসবুকের একটি স্ট্যাটাস বুস্ট করা হয়। ৩১শে জানুয়ারি থেকে চৌঠা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালানো ওই ক্যাম্পেইনে ৮৫ হাজার ৬০০ থেকে ৯৭ হাজার ৭০০ টাকা খরচ করা হয়েছে বলে মেটা অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য।
একই সময়ে নারীদের নিয়ে আরেকটি পোস্টে সমপরিমাণ অর্থ খরচ করে শফিকুর রহমানের ফেইসবুক থেকে প্রচারণা চালানো হয়েছে। ‘মায়ের তুলনা মা’ শিরোনামে ওই ভিডিও পোস্টের প্রমোশন চলে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে চৌঠা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
এই সময়ে তারেক রহমানের পেইজ থেকে সবচেয়ে বেশি খরচ করা হয়েছে ‘ভোট উৎসব’ শীর্ষক গানের জন্য। এই কনেটেন্টর প্রচারণায় ব্যয় করা হয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।
“নাগরিকদের তথ্য ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষায় জনগণ ও দেশি-বিদেশি স্টেক হোল্ডারদের সাথে নিয়ে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা ও আইন করতে চায় বিএনপি” শিরোনামের একটি ভিডিও কনটেন্ট পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে প্রচার চলছে। এতে ব্যয় করা হচ্ছে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন আরেকটি কনটেন্টের প্রচারে। “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নির্বাচনি বক্তব্য” শিরোনামের প্রচারণা ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়।
খরচের বিষয়টা কীভাবে আমলে আসবে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল প্রচারণা চালানো প্রার্থীদের অধিকারের মধ্যে পড়েলেও তা হতে হবে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারণা অনলাইনে চলতে পারে। এতে আচরণবিধি ভঙ্গ হবে না।
কিন্তু কত টাকা খরচ হচ্ছে এবং তা নীতিমালা ভাঙছে কিনা সে বিষয়ে ইসির নজরদারি প্রয়োজনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রার্থীরা কত খরচ করছেন, তা সাধারণত ভোটের পরে ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসেবে দেখানো হয়।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, “প্রার্থীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে ডিজিটাল বা ম্যানুয়াল যেভাবেই প্রচার চালান না কেন, পুরো খরচটা নির্বাচনি ব্যয়সীমার মধ্যে থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এটা তদারকি করার কথা। কারণ প্রার্থীরা ভোটের পর যখন নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেবেন, তখন সেটা মিলিয়ে দেখতে হবে যে, ঠিক আছে কিনা।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একটি আসনে একজন প্রার্থী ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। তবে কোনো আসনের ভোটার আড়াই লাখের বেশি হলে জনপ্রতি ১০ টাকা করে ব্যয় করা যাবে।
ঢাকা ১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন তারেক রহমান। হলফনামায় দুই আসনেই ভোটের ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ টাকা করে।
দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ঢাকা ১৫ আসনে ভোট করছেন শফিকুর রহমান, নির্বাচনি ব্যয় ধরেছেন ৩৫ লাখ টাকা।
(প্রতি ডলারের মূল্য ধরা হয়েছে ১২২ টাকা ৩৯ পয়সা।)


তারেক রহমান ‘দ্য লোনলি ক্যাপ্টেন’
জামায়াতের উত্থান: ইতিহাস সেরা আমীর কি ডা. শফিক
