ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষকে কখনো একমাত্রিকভাবে দেখেননি। বিশেষ করে নারীদের। বাংলা ও ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় যেখানে নারী চরিত্রকে প্রায়ই পুরুষ প্রোটাগনিস্ট আবেগের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হতো, সেখানে ঋতুপর্ণ নারীদের তুলে ধরেছেন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে।
নাবিয়া নাভেলী হোসেন
প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ১০:৩০ এএমআপডেট : ৩০ মে ২০২৬, ১০:৩০ এএম
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে খুব কম মানুষই আছেন, যাদের কাজ শুধু চলচ্চিত্র না, যেন একেকটা অনুভূতির অভিধান। ঋতুপর্ণ ঘোষ ঠিক তেমনই একজন। পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও উপস্থাপক, প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অসাধারণ সংবেদনশীল এক শিল্পী।
কখনো কখনো সত্যিই মনে হয়, ‘উইম্যানহুড’কে ঋতুপর্ণের মতো খুব কম মানুষই অনুভব করতে পেরেছেন। নারীর নীরবতা, ক্ষত, আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতা, অভিমান এত সূক্ষ্ম, এত নির্মম অথচ এত মমতায় খুব কম পরিচালকই পর্দায় ধরতে পেরেছেন।
বাংলা সিনেমায় যেখানে অনেকেই নিরাপদ গল্প বেছে নিয়েছেন, সেখানে ঋতুপর্ণ মানুষের ভেতরের অস্বস্তি, একাকিত্ব, সম্পর্কের ভাঙাচোরা বাস্তবতাকে এমন সাহস নিয়ে দেখিয়েছেন, যা তখন কেউই করার সাহস পায়নি।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষকে কখনো একমাত্রিকভাবে দেখেননি। বিশেষ করে নারীদের। বাংলা ও ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় যেখানে নারী চরিত্রকে প্রায়ই পুরুষ প্রোটাগনিস্ট আবেগের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হতো, সেখানে ঋতুপর্ণ নারীদের তুলে ধরেছেন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে। তাদের ইচ্ছা, দহন, আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব, অপূর্ণতা, ক্ষোভ আর আত্মসম্মানকে তিনি গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তার সিনেমায় ফেমিনিজম কখনো স্লোগানের মতো আসেনি, এসেছে নিঃশব্দ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে।
তার চলচ্চিত্রগুলো ‘মিডল ক্লাস’ বাঙালি ‘সোসাইটির ইমোশনাল ল্যান্ডস্ক্যাপকে’ এমন সূক্ষ্মভাবে ধরেছিল, যা বাংলা সিনেমায় খুব কমই দেখা গেছে। ড্রইং রুমের নীরবতা, ডিনার টেবিলের অস্বস্তি, একই বাড়িতে থেকেও একে-অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষ, ঋতুপর্ণ বারবার সেই ‘ইমোশনাল লোনলিনেস’ সামনে এনেছেন। তার সিনেমায় ভালোবাসা কখনো শুধু রোমান্টিক ছিলো না। ছিলো ঝুঁকি, অপরাধবোধ, নীরবতা আর না-বলা কথার এক জটিল মিশ্রণ।
তার নির্মিত ‘উনিশে এপ্রিল’ শুধু মা-মেয়ের সম্পর্কের গল্প নয়, বরং না-বলা অভিমান আর মানসিক দূরত্বের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। ‘তিতলি’ সিনেমাতেও তিনি মা-মেয়ের সম্পর্ককে এক ভীষণ মানবিক, জটিল আর কোমল দৃষ্টিতে দেখিয়েছিলেন। এক কিশোরীর প্রথম প্রেম, তার মায়ের অতীত, আর একই মানুষকে ঘিরে দুই প্রজন্মের আবেগ, এই অদ্ভুত অনুভূতি ঋতুপর্ণ এমন সংবেদনশীলতার সাথে স্ক্রিনে তুলে ধরেছিলেন, যা বাংলা সিনেমায় আজও বিরল।
‘রেইনকোট’ সিনেমায় তিনি ভালোবাসার অপূর্ণতাকে এমন নীরব বিষণ্নতায় দেখিয়েছেন, যা আজও দর্শকের মনে থেকে যায়। চোখের বালিতে রবীন্দ্রনাথের চরিত্রগুলোর ভেতরের আকাঙ্ক্ষা ও দহনকে নতুনভাবে জীবন্ত করেছিলেন তিনি। আর নৌকাডুবিতে সম্পর্ক, পরিচয় আর নিয়তির জটিলতাকে তুলে ধরেছিলেন নিজস্ব ভঙ্গিতে।
একইভাবে আবহমান ছিল শিল্পীসত্তা, সম্পর্কের ভাঙন ও ব্যক্তি সংকট নিয়ে নির্মিত এক গভীর আত্মদর্শী চলচ্চিত্র। ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ সিনেমায় ঋতুপর্ণ যেন শিল্প আর জীবনের মধ্যকার অস্পষ্ট সীমারেখাটাকেই প্রশ্ন করেছিলেন।
বৃদ্ধ অভিনেতা হরিশ মিশ্রের চরিত্রের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন, মঞ্চের করতালির বাইরে একজন শিল্পী কতটা নিঃসঙ্গ, কতটা ভঙ্গুর হতে পারেন।
‘দোসর’ সম্ভবত ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে ‘ইমোশনালি কমপ্লেক্স’ কাজগুলোর একটি। সাদা-কালো ফ্রেমে নির্মিত এই সিনেমায় তিনি ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধবোধ আর ক্ষমার মধ্যে অস্পষ্ট সীমারেখাগুলোকে এমনভাবে দেখিয়েছেন, যেখানে কেউ পুরোপুরি নির্দোষ না, আবার পুরোপুরি দোষীও না। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও কেন মানুষ থেকে যায়, কেন আঘাত পাওয়ার পরও ভালোবাসা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না, সেই কঠিন, অস্বস্তিকর সত্যগুলোকে তিনি অসাধারণ সংযমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, পুরো সিনেমাজুড়ে একবারের জন্যও রঙের অনুপস্থিতি অনুভব হয় না। বরং সেই সাদা-কালোই চরিত্রগুলোর নিঃসঙ্গতা, দূরত্ব আর আবেগের ভারকে গভীর করে তোলে।
‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ ছিলো ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে কাব্যিক আর আত্মঅনুসন্ধানী কাজগুলোর একটি। ভালোবাসা, বিয়ে, একাকিত্ব আর একজন শিল্পীর সঙ্গে জীবন কাটানোর জটিল মানসিক ক্লান্তিকে তিনি এখানে অসাধারণ সূক্ষ্মতায় তুলে ধরেছিলেন। কবিতা আর বাস্তবতার সীমারেখা বারবার মিশে যায় এই সিনেমায়, যেন স্মৃতি, অভিমান আর না-বলা কথাগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের ভেতর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো, এখানে সম্পর্ককে কখনও সরলভাবে দেখানো হয় না। একজন মানুষকে বোঝা কত কঠিন, এমনকি ভালোবেসেও কত কিছু অধরা থেকে যায়, সেই নিঃশব্দ শূন্যতাই সিনেমাজুড়ে থেকে যায়।
‘বাড়িওয়ালি’তে তিনি বনলতা নামের এক নিঃসঙ্গ, অবিবাহিত জমিদারবাড়ির মালকিনের গল্প বলেছিলেন। যিনি নিজের বিশাল অথচ ফাঁকা বাড়ির মতোই ধীরে ধীরে ভেতর থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার আরেকটি অসাধারণ দিক ছিল তার সংলাপ, কবিতা আর সঙ্গীতের ব্যবহার। তার ছবিতে গান বা কবিতা কখনও শুধুই ‘এস্থেটিক এলিমেন্ট’ হয়ে থাকেনি। বরং চরিত্রগুলোর না-বলা আবেগের বর্ধিত অংশ। রবীন্দ্রসংগীত, আবৃত্তি, কিংবা নিঃশব্দ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর- সবকিছুই তিনি এমন সংযম আর অনুভূতি দিয়ে ব্যবহার করতেন, যেন প্রতিটি শব্দ চরিত্রগুলোর ভেতরের নীরবতাকে আরও গভীর করে তোলে। সংলাপগুলোও যেন সত্যিই বাস্তব। মনে হয় যেন মানুষ সত্যিই এভাবেই ভালোবাসে, আঘাত পায়, বা চুপ করে থাকে।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা শুধু দেখা হয় না, অনুভব করা যায়। তার তৈরি চরিত্রগুলো কখনো নিখুঁত ছিল না। তারা ছিলো অসম্পূর্ণ, বিশৃঙ্খল, দ্বিধাগ্রস্ত, অনেক ভুলে ভরা, আর ঠিক সেই কারণেই এত মানবিক, এত রিলেটেবল। তিনি মানুষের সেই দিকগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন, যেগুলো আমরা বাস্তবে প্রায়ই লুকিয়ে রাখি। বিচার হওয়ার ভয়ে, ভুল বোঝার ভয়ে। তার চরিত্ররা ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতো, কিন্তু সবসময় সফল হতো না। আর সেই ব্যর্থতাগুলোই তাদের এত সত্যি করে তুলেছিল। তিনি শুধু গল্প বলেননি, মানুষের ভেতরের নীরবতাকে ভাষা দিয়েছেন।
২০১৩ সালের ৩০এ মে, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে থেমে যায় ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবন। তবে তার সৃষ্টি করা চরিত্রগুলো, না-বলা অনুভূতি আর অসম্পূর্ণ ভালোবাসাগুলো আজও বেঁচে থাকে মানসপটে। প্রয়াণের এত বছর পরেও, ঋতুপর্ণ ঘোষ বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও সাহসী কণ্ঠগুলোর একটি হয়ে রয়ে গেছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষ: কাল্পনিক চরিত্রের ভেতর বাস্তবতার খোঁজে
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষকে কখনো একমাত্রিকভাবে দেখেননি। বিশেষ করে নারীদের। বাংলা ও ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় যেখানে নারী চরিত্রকে প্রায়ই পুরুষ প্রোটাগনিস্ট আবেগের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হতো, সেখানে ঋতুপর্ণ নারীদের তুলে ধরেছেন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে খুব কম মানুষই আছেন, যাদের কাজ শুধু চলচ্চিত্র না, যেন একেকটা অনুভূতির অভিধান। ঋতুপর্ণ ঘোষ ঠিক তেমনই একজন। পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও উপস্থাপক, প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অসাধারণ সংবেদনশীল এক শিল্পী।
কখনো কখনো সত্যিই মনে হয়, ‘উইম্যানহুড’কে ঋতুপর্ণের মতো খুব কম মানুষই অনুভব করতে পেরেছেন। নারীর নীরবতা, ক্ষত, আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতা, অভিমান এত সূক্ষ্ম, এত নির্মম অথচ এত মমতায় খুব কম পরিচালকই পর্দায় ধরতে পেরেছেন।
বাংলা সিনেমায় যেখানে অনেকেই নিরাপদ গল্প বেছে নিয়েছেন, সেখানে ঋতুপর্ণ মানুষের ভেতরের অস্বস্তি, একাকিত্ব, সম্পর্কের ভাঙাচোরা বাস্তবতাকে এমন সাহস নিয়ে দেখিয়েছেন, যা তখন কেউই করার সাহস পায়নি।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষকে কখনো একমাত্রিকভাবে দেখেননি। বিশেষ করে নারীদের। বাংলা ও ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় যেখানে নারী চরিত্রকে প্রায়ই পুরুষ প্রোটাগনিস্ট আবেগের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হতো, সেখানে ঋতুপর্ণ নারীদের তুলে ধরেছেন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে। তাদের ইচ্ছা, দহন, আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব, অপূর্ণতা, ক্ষোভ আর আত্মসম্মানকে তিনি গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তার সিনেমায় ফেমিনিজম কখনো স্লোগানের মতো আসেনি, এসেছে নিঃশব্দ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে।
তার চলচ্চিত্রগুলো ‘মিডল ক্লাস’ বাঙালি ‘সোসাইটির ইমোশনাল ল্যান্ডস্ক্যাপকে’ এমন সূক্ষ্মভাবে ধরেছিল, যা বাংলা সিনেমায় খুব কমই দেখা গেছে। ড্রইং রুমের নীরবতা, ডিনার টেবিলের অস্বস্তি, একই বাড়িতে থেকেও একে-অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষ, ঋতুপর্ণ বারবার সেই ‘ইমোশনাল লোনলিনেস’ সামনে এনেছেন। তার সিনেমায় ভালোবাসা কখনো শুধু রোমান্টিক ছিলো না। ছিলো ঝুঁকি, অপরাধবোধ, নীরবতা আর না-বলা কথার এক জটিল মিশ্রণ।
তার নির্মিত ‘উনিশে এপ্রিল’ শুধু মা-মেয়ের সম্পর্কের গল্প নয়, বরং না-বলা অভিমান আর মানসিক দূরত্বের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। ‘তিতলি’ সিনেমাতেও তিনি মা-মেয়ের সম্পর্ককে এক ভীষণ মানবিক, জটিল আর কোমল দৃষ্টিতে দেখিয়েছিলেন। এক কিশোরীর প্রথম প্রেম, তার মায়ের অতীত, আর একই মানুষকে ঘিরে দুই প্রজন্মের আবেগ, এই অদ্ভুত অনুভূতি ঋতুপর্ণ এমন সংবেদনশীলতার সাথে স্ক্রিনে তুলে ধরেছিলেন, যা বাংলা সিনেমায় আজও বিরল।
‘রেইনকোট’ সিনেমায় তিনি ভালোবাসার অপূর্ণতাকে এমন নীরব বিষণ্নতায় দেখিয়েছেন, যা আজও দর্শকের মনে থেকে যায়। চোখের বালিতে রবীন্দ্রনাথের চরিত্রগুলোর ভেতরের আকাঙ্ক্ষা ও দহনকে নতুনভাবে জীবন্ত করেছিলেন তিনি। আর নৌকাডুবিতে সম্পর্ক, পরিচয় আর নিয়তির জটিলতাকে তুলে ধরেছিলেন নিজস্ব ভঙ্গিতে।
একইভাবে আবহমান ছিল শিল্পীসত্তা, সম্পর্কের ভাঙন ও ব্যক্তি সংকট নিয়ে নির্মিত এক গভীর আত্মদর্শী চলচ্চিত্র। ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ সিনেমায় ঋতুপর্ণ যেন শিল্প আর জীবনের মধ্যকার অস্পষ্ট সীমারেখাটাকেই প্রশ্ন করেছিলেন।
বৃদ্ধ অভিনেতা হরিশ মিশ্রের চরিত্রের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন, মঞ্চের করতালির বাইরে একজন শিল্পী কতটা নিঃসঙ্গ, কতটা ভঙ্গুর হতে পারেন।
‘দোসর’ সম্ভবত ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে ‘ইমোশনালি কমপ্লেক্স’ কাজগুলোর একটি। সাদা-কালো ফ্রেমে নির্মিত এই সিনেমায় তিনি ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধবোধ আর ক্ষমার মধ্যে অস্পষ্ট সীমারেখাগুলোকে এমনভাবে দেখিয়েছেন, যেখানে কেউ পুরোপুরি নির্দোষ না, আবার পুরোপুরি দোষীও না। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও কেন মানুষ থেকে যায়, কেন আঘাত পাওয়ার পরও ভালোবাসা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না, সেই কঠিন, অস্বস্তিকর সত্যগুলোকে তিনি অসাধারণ সংযমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, পুরো সিনেমাজুড়ে একবারের জন্যও রঙের অনুপস্থিতি অনুভব হয় না। বরং সেই সাদা-কালোই চরিত্রগুলোর নিঃসঙ্গতা, দূরত্ব আর আবেগের ভারকে গভীর করে তোলে।
‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ ছিলো ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে কাব্যিক আর আত্মঅনুসন্ধানী কাজগুলোর একটি। ভালোবাসা, বিয়ে, একাকিত্ব আর একজন শিল্পীর সঙ্গে জীবন কাটানোর জটিল মানসিক ক্লান্তিকে তিনি এখানে অসাধারণ সূক্ষ্মতায় তুলে ধরেছিলেন। কবিতা আর বাস্তবতার সীমারেখা বারবার মিশে যায় এই সিনেমায়, যেন স্মৃতি, অভিমান আর না-বলা কথাগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের ভেতর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো, এখানে সম্পর্ককে কখনও সরলভাবে দেখানো হয় না। একজন মানুষকে বোঝা কত কঠিন, এমনকি ভালোবেসেও কত কিছু অধরা থেকে যায়, সেই নিঃশব্দ শূন্যতাই সিনেমাজুড়ে থেকে যায়।
‘বাড়িওয়ালি’তে তিনি বনলতা নামের এক নিঃসঙ্গ, অবিবাহিত জমিদারবাড়ির মালকিনের গল্প বলেছিলেন। যিনি নিজের বিশাল অথচ ফাঁকা বাড়ির মতোই ধীরে ধীরে ভেতর থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার আরেকটি অসাধারণ দিক ছিল তার সংলাপ, কবিতা আর সঙ্গীতের ব্যবহার। তার ছবিতে গান বা কবিতা কখনও শুধুই ‘এস্থেটিক এলিমেন্ট’ হয়ে থাকেনি। বরং চরিত্রগুলোর না-বলা আবেগের বর্ধিত অংশ। রবীন্দ্রসংগীত, আবৃত্তি, কিংবা নিঃশব্দ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর- সবকিছুই তিনি এমন সংযম আর অনুভূতি দিয়ে ব্যবহার করতেন, যেন প্রতিটি শব্দ চরিত্রগুলোর ভেতরের নীরবতাকে আরও গভীর করে তোলে। সংলাপগুলোও যেন সত্যিই বাস্তব। মনে হয় যেন মানুষ সত্যিই এভাবেই ভালোবাসে, আঘাত পায়, বা চুপ করে থাকে।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা শুধু দেখা হয় না, অনুভব করা যায়। তার তৈরি চরিত্রগুলো কখনো নিখুঁত ছিল না। তারা ছিলো অসম্পূর্ণ, বিশৃঙ্খল, দ্বিধাগ্রস্ত, অনেক ভুলে ভরা, আর ঠিক সেই কারণেই এত মানবিক, এত রিলেটেবল। তিনি মানুষের সেই দিকগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন, যেগুলো আমরা বাস্তবে প্রায়ই লুকিয়ে রাখি। বিচার হওয়ার ভয়ে, ভুল বোঝার ভয়ে। তার চরিত্ররা ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতো, কিন্তু সবসময় সফল হতো না। আর সেই ব্যর্থতাগুলোই তাদের এত সত্যি করে তুলেছিল। তিনি শুধু গল্প বলেননি, মানুষের ভেতরের নীরবতাকে ভাষা দিয়েছেন।
২০১৩ সালের ৩০এ মে, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে থেমে যায় ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবন। তবে তার সৃষ্টি করা চরিত্রগুলো, না-বলা অনুভূতি আর অসম্পূর্ণ ভালোবাসাগুলো আজও বেঁচে থাকে মানসপটে। প্রয়াণের এত বছর পরেও, ঋতুপর্ণ ঘোষ বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও সাহসী কণ্ঠগুলোর একটি হয়ে রয়ে গেছেন।