‘জেনারেল’ থেকে ‘রাজনীতিবিদ’ জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠার গল্প

জিয়াউর রহমান ‘সামরিক’ পরিচয় ছেড়ে ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করতেন। নানান উন্নয়ন কর্মসূচির প্রচারণা করতে হাজির হতেন প্রত্যন্ত গ্রামে। মার্কাস ফ্রানডা তার গবেষণা প্রবন্ধে বলেছেন, জিয়াউর রহমান মাসের ১৫ দিনই ঢাকার বাইরে সফর করতেন। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করতেন জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই শিথিলতার উদ্দেশ্য ছিলো বেসামরিক রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা। 

আপডেট : ৩০ মে ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক ছিল, চট্টগ্রামে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিল মাত্র ১৫ জন ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। আর তাদের কেউই সাধারণ পিস্তল কিংবা রাইফেলের চেয়ে উন্নত কোনো অস্ত্রে সজ্জিত ছিলো না।

শুধু যে ১৫ জন দেহরক্ষী তা নয়, সেখানে উপস্থিত নিরাপত্তা রক্ষায় বাকি সদস্যদের হাতেও ছিলো না ভারী কোনো অস্ত্র। ১৯৮১ সালের ৩০ মে নিয়ে নিজ গবেষণায় এমনটাই মন্তব্য করেছেন মার্কাস ফ্রানডা।  

ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির ১৯৮১ সালের অগাস্ট সংখ্যায় ‘বাংলাদেশ আফটার জিয়া: আ রেট্রোস্পেক্ট অ্যান্ড প্রস্পেক্ট' শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে ফ্রানডা বলেছেন, “জিয়ার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্য ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই তাকে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গোয়েন্দা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জিয়া যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শিথিল করতেই পছন্দ করতেন। বিদেশি সাংবাদিক, কূটনীতিক বা সরকারি কর্মকর্তাদের জিয়ার বাড়ি, কার্যালয়, বিমানবন্দরের লাউঞ্জ কিংবা বিমানে প্রবেশের সময়ও খুব একটা তল্লাশি করা হতো না। অনেক সময় একেবারেই তল্লাশি হতো না।”

ফ্রানডা বলছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তা কমানোর প্রবণতাকে ভিন্ন চোখে দেখতেন। তাদের মতে, এটি ছিলো নিজেকে বেসামরিক রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরার এক চেষ্টা।

জিয়াউর রহমানের শৈশব কিংবা বেড়ে ওঠা দেখে মনেই হবে না, তিনি হতে চলেছেন ভবিষ্যত রাজনীতিবিদ। যার নেতৃত্বে তৈরি হবে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কীভাবে কিংবা কোন প্রক্রিয়ায় রাজনীতিবিদ হয়ে উঠলেন জিয়াউর রহমান? এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেনাশাসক জিয়াউর রহমান কীভাবে একটি দলকে জনমানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুললেন এবং নিজেও রাজনীতিবিদ হয়ে উঠলেন।

নিরাপত্তা শিথিল ও সামরিক পোশাক ছেড়ে দেওয়া

জিয়াউর রহমান সামরিক পরিচয় ছেড়ে রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করতেন, বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্যক্তিগত সফর। নানান উন্নয়ন কর্মসূচির প্রচারণা করতে হাজির হতেন প্রত্যন্ত গ্রামে।

ফ্রানডা তার গবেষণা প্রবন্ধে বলেছেন, জিয়াউর রহমান মাসের ১৫ দিনই ঢাকার বাইরে সফর করতেন। সাধারণত ভোরে নাশতা সেরে হেলিকপ্টারে চড়ে তিনি বিভিন্ন এলাকায় যেতেন। আর সন্ধ্যা নাগাদ ফিরতেন ঢাকায়।

শুধু হেলিকপ্টার নয়; কখনো কখনো জিপ, ভ্যান বা গাড়িতেও তিনি ভ্রমণ করেছেন। আবার যেখানে গাড়ি পৌঁছাতে সক্ষম নয়, সেখানে পৌঁছে গেছেন পায়ে হেঁটে।

এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আনা হয়েছিল শিথিলতা। জিয়াউর রহমান যখন হেলিকপ্টারে চড়তেন তখন শুধুমাত্র একটি হেলিকপ্টারে তাকে এসকর্ট করতো।

ফ্রানডা তার গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করতেন নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই শিথিলতার উদ্দেশ্য ছিল বেসামরিক রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা। 

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের রাজনৈতিক সমীকরণে জিয়া একজন জেনারেল হিসেবে কঠোর সামরিক আইন প্রশাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। এইভাবে তিনি প্রায় ১৮ মাস দেশের শাসন ব্যবস্থার প্রধান ছিলেন। এরপর ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণের মাধ্যমে বেসামরিক শাসনের দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করেন।

১৯৭৮ সালের জুনে তিনি পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তার নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৬টি আসনে বিজয়ী হয়।

ফ্রানডা তার প্রবন্ধে বলেছেন, জিয়াউর রহমান জনসমক্ষে সামরিক ইউনিফর্ম পরা কমিয়ে দিয়েছিলেন। নিজেকে 'জেনারেল জিয়া' নয়, বরং 'প্রেসিডেন্ট জিয়া' হিসেবে তুলে ধরার দিকে মনোযোগী হন।

আর সে লক্ষ্যেই তিনি প্রত্যন্ত গ্রামে ছুটে গেছেন স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। যেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তার কাছে আসতে পারেন। কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে আবদ্ধ ছিলেন না বলেই যেতে পেরেছেন জনমানুষের কাতারে।

তবে বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবীর খানের মতে, জিয়াউর রহমানের দুটা বিষয় ছিলো। প্রথমত দেশপ্রেম এবং দ্বিতীয়ত ছিলো সততা। এই দুটি বিশেষ গুণ অর্জন করেছেন তার পেশাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। 

“উনি দীর্ঘ সময় গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করেছেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানে যখন এসেছেন, তখনও উনি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কাজ করেছেন। এই কাজে যুক্ত থেকে পাকিস্তানের দুই অংশের রাজনৈতিক নেতাদের উনি খুব ভালোভাবে দেখছেন, স্টাডি করছেন”, আলাপ-কে বলেন শায়রুল।  

তার মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন সূত্রপাত, যুদ্ধ এবং বিজয় অর্জন; অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়া জিয়াউর রহমান দেখেছেন এবং যুদ্ধে অংশও নিয়েছেন। এই অধ্যায়গুলো তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। "তারপর স্বাধীন দেশে জিয়াউর রহমান প্রথম সিনিয়র অফিসার হিসেবে সেনাপ্রধান হওয়ার কথা। সেটা না করে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্বে রাখা হলো। অর্থাৎ তিনি রাজনীতিবিদদের অবস্থান দেখলেন। অভিজ্ঞতায় দেখেছেন কোথায় সুবিধা পেয়েছেন, কোথায় বঞ্চিত হয়েছেন।"

সেসব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেশ পরিচালনা করেছেন বলে মনে করেন শায়রুল কবীর খান।

জিয়াউর রহমান

জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ায় সম্পৃক্ত করা

মার্কাস ফ্রানডা তার ‘জিয়াউর রহমান অ্যান্ড বাংলাদেশ ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, জিয়াউর রহমান তার সামরিক শৃঙ্খলার প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। আর এই বিশ্বাসের মাধ্যমেই তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন গড়ে ওঠে। এছাড়াও তিনি ইতিবাচক চিন্তা ও কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাস করতেন।

“জিয়া বলতেন, বাংলাদেশের মানুষ সময় নষ্ট করেছে...তাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সময়কে কাজে লাগতে হবে।”

মার্কাসের মতে এই ভাবনার উপর ভর করেই তিনি জনগণকে বিভিন্ন ধরনের কাজে যুক্ত করেন। যার মধ্যে ছিলো মাটি কাটার কাজ, বাঁধ নির্মাণ, খাল খনন ও পুনঃখনন, এবং রাস্তা তৈরি ও মেরামতের কাজ।

এসব কাজে তখন হাজার হাজার মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে অংশ নিতো। যদিও কিছু কাজ 'কাজের বিনিময়ে খাদ্য' কর্মসূচির মাধ্যমে হতো, আবার কিছু কাজের জন্য নগদ অর্থও দেওয়া হতো।

“তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন, কাজের মাধ্যমে এই মানুষগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষে পরিণত হচ্ছে।…তারা এখন বুঝতে শিখছে নিজের কাজ তারা নিজেরাই করে ফেলতে পারে।” 

মার্কাস তার প্রবন্ধে বলেছেন, জিয়াউর রহমান নিজেই বারবার বলেছেন, তিনি নতুন কিছু গ্রামীণ সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। এসব সংগঠন যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল, তবুও এগুলো ছিলো নতুন ধরনের গ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান।

তিনি যে নতুন গ্রামভিত্তিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে ছিল গ্রাম সরকার, ভিলেজ ডিফেন্স ফোর্স এবং স্থানীয় বিএনপি দলীয় ইউনিট।

অধিকাংশ গ্রাম সরকার গঠিত হতো গ্রামের বৈঠকে তৈরি হওয়া ঐকমত্যের ভিত্তিতে। তবে সেই ঐকমত্য গঠনে থানা সার্কেল অফিসাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। যারা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতেন।

খাল খনন কর্মসূচি

বাংলা স্ট্রিমে প্রকাশিত ‘যে কারণে খাল খনন শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান’ প্রবন্ধে লেখক খাদিজা আক্তার লিখেছেন, “১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হয়েছিল খাল খনন কর্মসূচি। তিনি যশোরের উলাশীর খাল থেকে শুরু করেছিলেন এই কর্মসূচি। উলাশী খাল খনন ছিল সে সময়কার একটি পাইলট প্রকল্প। এটি ছিল উলাশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি খাল। স্থানীয়রা একে শ্রদ্ধাভরে ‘জিয়া খাল’ নামে ডাকেন।”

এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি ব্যবহার করে সেচের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, যাতে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে এই কর্মসূচি গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছরের (সম্ভবত ১৯৭৯–১৯৮০) মধ্যে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করা হয়, যা সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

নদী গবেষক শেখ রোকনের মতে, জিয়াউর রহমানের শাসনামলজুড়ে ‘খাল খনন কর্মসূচি’ ইতিহাসে বিশেষ স্থান পাবে।

জিয়াউর রহমানের উপপ্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের পরবর্তী সময়ের একটি লেখার কথা উল্লেখ করে শেখ রোকন বলেন, ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে জিয়া দেশব্যাপী এক খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন। এটা ছিল ক্ষেত-খামারের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তার একটা বৈপ্লবিক কর্মসূচির অংশ।

"তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সফর করে খাল খনন বা পুনর্খননের কাজে অংশ নেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজেই কোদাল হাতে করে কাজে নেমে যান। অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খননে অংশ নেয়া নিছক একটা প্রচারণা বলে মনে হলেও এই পরিকল্পনা হাজার হাজার গ্রামবাসীকে গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে এবং জিয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও ভূমিকায় জনমনে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে," আলাপ-কে বলেছেন শেখ রোকন।

নিম গাছ থেকে সার্ক: গড়ে তোলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সৌদি বাদশাহ খালিন বিন আবদুল আজিজের আমন্ত্রণে সে দেশটিতে সফরে যান। সেখানে তিনি বাদশাহকে উপহার হিসেবে দেন নিম গাছের চারা। সে সময় জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘‘গরিব মানুষের পক্ষ থেকে আপনার জন্য এ সামান্য উপহার।’’

সম্প্রতি বিএনপি’র অফিশিয়াল ফেইসবুক পেইজ থেকে দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছে, “সৌদি বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেখা করতে গিয়েছেন। সঙ্গে নিয়ে গেছেন প্লেনের কার্গোভর্তি নিমগাছের চারা, আরাফাতের ময়দানে লাগাবেন বলে। বাদশাহর সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পরপরই জিয়াউর রহমান বললেন, “তোমার দেশে যা নেই, আমার দেশে তা আছে। আবার আমার দেশে যা নেই, তা তোমার দেশে আছে।”

সৌদি বাদশাহ থতমত খেলেন। গরিব একটি দেশের এই নাতিদীর্ঘ প্রেসিডেন্ট কী বলছেন! জিয়াউর রহমান আবারও বললেন, “আমার দেশে অনেক পরিশ্রমী মানুষ আছে। তারা অনেক কাজ করতে পারে। আর তোমার দেশে যেমন কাজ আছে, তেমনি টাকাও আছে।” একইভাবে তিনি আর্জি নিয়ে গেলেন মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবগুলো দেশে। বাংলাদেশের মূল্যবান জনশক্তি প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে বিদেশে রপ্তানি শুরু হলো। বিদেশে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের বেতন বেশি হওয়ার কারণে তিনি দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে বাংলাদেশের বেকার যুবকদের দ্রুত প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা করলেন।

প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে আজ সৌদি আরবে তিরিশ লাখ বাংলাদেশি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এগারো লাখ, কুয়েতে আড়াই লাখ, ওমানে সোয়া দুই লাখ, কাতারে প্রায় পৌনে দুই লাখ এবং বাহরাইনে প্রায় এক লাখ মানুষ বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন।

গণমাধ্যমে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বিষয়ে একবার মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চিন্তা করলেন ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে ধু ধু মরুভূমি। গাছ না থাকায় হজ মৌসুমে হাজিদের ছায়ার অভাবে কষ্ট হচ্ছে। সেই চিন্তা থেকেই সৌদি সফরকালে সৌদি বাদশাকে নিম গাছ উপহার এবং আরাফাতের ময়দানে নিম গাছ রোপণের প্রস্তাব দেন। সৌদি সরকার তার প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার নিম গাছ পাঠানো হয়।“

অন্যদিকে মার্কাস ফ্রানডার প্রবন্ধে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমান নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক মানুষ হিসেবে এবং নিজের দেশকে বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে আন্তঃনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন।

তার শাসনের সময়ে মরক্কো ইসলামিক কনফারেন্সের সভায় অংশ নিয়েছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, টোকিও, জাকার্তা, সিঙ্গাপুর ও বেইজিংয়ে বাণিজ্য আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, প্যারিসে গিসকার দ’এস্তাঁর সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তি নিয়েও আলোচনা করেছেন।

এমনকি নয়াদিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেল ও অর্থের জন্য দরকষাকষি করেছেন।

১৯৮০ সালের ২৬ অগাস্ট জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহাইমের সঙ্গে বৈঠকে জিয়াউর রহমান, (ছবি: জাতিসংঘের ফটো আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত)

বিশ্বের প্রতি তার প্রধান আবেদন ছিল, বিশাল পরিমাণ সাহায্য। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দাতা দেশ থেকে, পাশাপাশি ওপেক ও সমাজতান্ত্রিক ব্লক থেকেও তিনি সাহায্যের আবেদন করেছেন। এর কারণ ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন আরও অবনতি থেকে রক্ষা পায়। একইসঙ্গে এমন একটি উন্নয়ন ও বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তোলা যেন বাংলাদেশ নিজ শক্তিতে চলা শুরু করতে পারে।

এসব উদ্যোগেই বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের ধারণা আংশিকভাবে জনগণের মধ্যে ইতিবাচকভাবে জনপ্রিয় হওয়া শুরু করেছিল।

বিদেশি দাতাদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন জিয়া, বলে জানান মার্কাস। কারণ তিনি তাদের ভাষা বুঝতেন, তাদের মতো করেই তিনি উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে জানতেন। 

জিয়াউর রহমান তাদের বলতেন, “আমরা নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে চাই—কোনো বিদেশি প্রভাব ছাড়া।”

তবে শুধু  অর্থ নয়; প্রযুক্তি, পরামর্শ ও পরিকল্পনার সাহায্যও চাইতেন। পশ্চিমারা অর্থ ও প্রযুক্তি দেবে, আর বাংলাদেশ দেবে সংগঠন ও শ্রম—এই ছিল জিয়াউর রহমানের দর্শন।

“বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি প্রসঙ্গে তিনি (জিয়াউর রহমান) প্রায়ই বলতেন উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এর মাঝে আমি,” আলাপ-কে বলেন শায়রুল।

বাংলাদেশের এই ভৌগলিক অবস্থানের শক্তিকে কাজে লাগানোর বিবেচনা থেকে জিয়াউর রহমান সার্ক তৈরি করেছিলেন, বলে মনে করেন তিনি। “কারণ আমরা ছোট দেশ। আমাদের সর্বোচ্চ রক্ষা করার জন্য সার্ক হবে সবচেয়ে সহায়ক শক্তি।”

অংশগ্রহণমূলক উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর প্রধান বিরোধী নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সকল রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

মার্কাস ফ্রানডা তার প্রবন্ধে বলেছেন, “সে সময় প্রধান বিরোধী দল ছিল আওয়ামী লীগ। যার নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগের একটি ছোট বিচ্ছিন্ন অংশের নেতৃত্বে ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি শেখ মুজিবের বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে মিজানুরপন্থি আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা জিয়ার দল বিএনপিতে যোগ দেন।“

সংসদে আরেকটি দল মুসলিম লীগ, যারা ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) জোটের অংশ হিসেবে অংশগ্রহণ করে। আইডিএল'র সাংগঠনিক ভিত্তি ছিলো জামায়াতে ইসলামী, যদিও তারা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

মাওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) দলগতভাবে বিএনপিতে যোগ দেয়। সঙ্গে আরও কিছু ছোট বামপন্থী দলও। অন্যদিকে সংসদে আট সদস্যবিশিষ্ট সবচেয়ে বড় বামপন্থী দল জাসদ ১৯৮০ সালের নভেম্বরে বিভক্ত হয়ে যায়।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয় তখন অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পরিবেশ তৈরির প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে শায়রুল কবীর খান আলাপ-কে বলেন, “আমি বলছি রাজনৈতিক শূন্যতা স্বাধীনতার আগেও ছিলো। স্বাধীনতার পরেও ছিলো। এখনো আছে।”

শায়রুল যোগ করেন, “উনি তো আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন। উনি ডান-বামের মাঝামাঝি একটা অবস্থান নিয়েছিলেন। মধ্যপন্থি একটা রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার নাম ‘উদার গণতন্ত্র’। বাংলাদেশের মানুষ কোনো কট্টর রাজনীতি পছন্দ করে না। তারা মধ্যপন্থির রাজনীতি পছন্দ করে।”

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা শিথিল করে জিয়াউর রহমানের জনমানুষের কাছে যাওয়ার প্রবণতা যেমন তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি সামরিক খোলস ছেড়ে তার বেসামরিক রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত। তৃণমূলের উন্নয়ন কর্মসূচি, বৈদেশিক শ্রমবাজারের সূচনা এবং মধ্যপন্থি উদার কূটনীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী কাঠামো দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও তার এই রূপান্তর এক বড় আলোচনার খোরাক।