রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশি হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই
'ভাই আমি তো কথা দিয়ে ফেলেছি। তারা টিকিট দিয়েছে, এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে সেনাবাহিনীর দুইটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে।'
ফাতিন নূর অবনি
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ০৭:০৯ পিএমআপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম
নিহত রিয়াদের সাথে তার পরিবারের সদস্যদের শেষবার কথা হয়েছে গত ২৮এ এপ্রিল।
“সেদিন তো আর বুঝি নাই, এটাই শেষ কথা,” ইউক্রেনে নিহত ছোট ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ কথা বলেন মামুনুর রশিদ।
মামুনের ছোট ভাই রিয়াদ রশিদ ইউক্রেনের রণাঙ্গনে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন, যিনি ছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্য।
গত ২রা মে রাশিয়ান সীমান্তে নিহত হন রিয়াদ। পরিবারের কাছে খবর পৌঁছায় সপ্তাহখানেক পর ৮ই মে।
মামুনুর রশিদ বলছেন, তার ভাই রিয়াদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন আরও এক বাংলাদেশি। তারা রাশিয়ায় চাকরি করার সময় একই রুমে বসবাস করতেন।
এর আগেও রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে গিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর এসেছে।
রাশিয়ায় চাকরি করতে গিয়ে রিয়াদ কীভাবে যুদ্ধে জড়ালেন এবং রাশিয়ার থাকা অন্যান্য বাংলাদেশিরাও একই পথে কীভাবে যাচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ড্রোন হামলার কবলে তিন বাংলাদেশি
নিহত রিয়াদের ভাই মামুনুর রশিদ আলাপ-কে বলেন, “নিহত আরেকজন বাংলাদেশি হলেন আব্দুর রহিম। বাড়ি রাজবাড়ীতে। তিনি রিয়াদের সাথেই ছিলেন এবং তারা দুজনই প্রথমে একই কোম্পানিতে চাকরি করতেন।”
“রহিমের সাথে তার পরিবারের বেশ কয়েক মাস কোনো যোগাযোগ না থাকায়, পরিবারকে তার মৃত্যুর খবর জানানো সম্ভব হয়নি।”
মামুন বলেন, তাকে এসব খবর জানিয়েছেন রাশিয়াতে থাকা আরেকজন বাংলাদেশি।
সেদিনের ড্রোন হামলায় আহত লিমন দত্ত, যিনিও ছিলেন রিয়াদ রশিদের বন্ধু। একই ক্যাম্পে সেনাসদস্য হিসেবে ছিলেন তারা।
ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে পা হারিয়েছেন লিমন।
যেভাবে বিদায় নিলেন রিয়াদ
নিহত রিয়াদের সাথে তার পরিবারের সদস্যদের শেষবার কথা হয়েছে গত ২৮এ এপ্রিল। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে বড় ভাই মামুনুরকে ফোন করেন রিয়াদ।
কথার শেষ দিকে রিয়াদ তার ভাইকে বলেন, তিনি এক জায়গায় যেতে পারেন যেখানে ফোনের নেটওয়ার্ক থাকবে না। তাই পরিবারের সাথে ৫ থেকে ৭ দিন যোগাযোগ করতে পারবেন না।
রিয়াদ তার ভাইকে আরও বলেছিলেন, নেটওয়ার্ক পাওয়ার সাথে সাথেই তাদের কল করবেন। আর যদি যোগাযোগ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে খোঁজ নেওয়ার জন্য তার কিছু বন্ধুবান্ধবের নাম্বারও ভাইকে দিয়ে রাখে।
বেশ কয়েকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় রিয়াদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
মামুনুর বলেন, “শুক্রবার মনের মধ্যে বেশি অস্থিরতা শুরু হয়। আর সহ্য হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাদের বলি, রিয়াদ ভালোমন্দ যাই আছে, আপনি আমারে বলেন।”
সোয়েব নামে রিয়াদের এক বন্ধু, আহত লিমন দত্তের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে তার পরিবারকে জানায় যে, ২রা মের এক মিশনে মারা গেছেন রিয়াদ।
এরপর লিমন দত্তের সাথে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ হয় মামুনুরের।
তখন লিমন বলেন, “২রা মে দুইটা গাড়িতে ৬ই জন মিশনে যান। সামনের গাড়িতে ছিলেন রিয়াদ, রহিমসহ তিন জন। পেছনের গাড়িতে লিমন ও বাকিরা। সামনের গাড়িতেই ড্রোন হামলা হয় এবং সবাই মারা যায়।”
মামুনুর আরও বলেন, পেছনের গাড়ির সবাই গুরুতর আহত হন। আহত থাকার কারণেই এতদিন রিয়াদের মৃত্যুর খবর পরিবারকে দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন লিমন দত্ত।
রিয়াদ যেভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে
রিয়াদের পরিবার থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদীর একটি ট্রেইনিং সেন্টার থেকে রাশিয়ান একজন প্রতিনিধির কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে রাশিয়ায় যান তিনি। কাজ শুরু করেন ব্ল্যাগোভিয়েশ্চেন্সক শহরে ‘চায়না সিনোম্যাক’ নামে এক কোম্পানিতে।
২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি ওই কোম্পানিতেই চাকরি করছিলেন। লিমন দত্ত ও আব্দুর রহিমও কাজ করতেন একই কোম্পানিতে। তিনজন থাকতেনও একই রুমে। এরপর তিনজন একসাথেই যোগ দেন সেনাবাহিনীতে।
মামুনুর রশিদ বলছেন, ২৮এ মার্চ রিয়াদ ফোন দিয়ে বলেন, তিনি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং সেনাবাহিনী থেকে তাকে মস্কোতে যাওয়ার জন্য টিকেট দিয়েছে।
বড় ভাই তার এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানালে রিয়াদ তার ভাইকে বলছিলেন, “ভাই আমি তো কথা দিয়ে ফেলেছি। তারা টিকিট দিয়েছে, এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে সেনাবাহিনীর দুইটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে।”
৭ই এপ্রিল রিয়াদ রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। সেখানে তার কাজ কী হবে, জানতে চেয়েছিলেন বড় ভাই মামুনুর।
রিয়াদ বলেন, “অফিসারদের দেখাশোনা, আর কোনো কাজ নেই…এই ক্যাম্পের মধ্যে শুধু পাহারা দিতে হবে…৮ ঘণ্টা ডিউটি।”
২৮এ এপ্রিল ক্যাম্পের বাইরে কোথাও যাওয়ার কথা পরিবারকে জানায় রিয়াদ।
রিয়াদের বড় ভাই অভিযোগ করেন, রিয়াদ ও রহিমকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য লিমনই প্ররোচিত করেছিলেন।
“রিয়াদের মৃত্যুর পর আগের কর্মস্থলে রিয়াদের অন্যান্য বন্ধুরা বলেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে রিয়াদকে অনেকবারই বারণ করেছিলেন তারা। কিন্তু লিমন দত্তই তাকে চাকরি ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য বোঝাতে থাকে।”
রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিরা
ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্তত ৩৬জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে মানবপাচার চক্র বাংলাদেশিদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশিদের কীভাবে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, তাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ঠেলে দেওয়া হয়।
আলাপ-কে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নিহত রিয়াদের ভাই মামুনুর। তিনি বলছেন, তার ভাইকে ক্যাম্পে সহযোগিতার কথা বলে নিয়ে রাশিয়ার সীমান্তে যুদ্ধ মিশনে পাঠানো হয়।
যৌথ গবেষণায় বেশ কয়েকজনের কথা উঠে এসেছে, যারা দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের জোর করে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাথে চুক্তিতে সই করানো হয়।
ট্রুথ হাউন্ডস-এর গবেষক মারিয়া তোমাক বলেন, “এই গবেষণার জন্য যতগুলো ঘটনা নিয়ে কাজ করা হয়েছে, সবক্ষেত্রেই রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাথে বুঝে বা না বুঝে চুক্তি সই করেছে যুদ্ধে যোগ দেওয়া বিদেশি নাগরিকরা।”
“তারা শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যুদ্ধের একদম সম্মুখ সারিতে গিয়ে পৌঁছায়। চুক্তির একটি শব্দও তারা বুঝতে পারেনি কারণ সেটি রুশ ভাষায় লেখা ছিলো। এরপর তাদের বারবার যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তাদের মূলত মরণফাঁদে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো। যারা অনেক বেশি ভাগ্যবান ছিলো, তারা কেবল যুদ্ধবন্দি হয়ে কার্যত বেঁচে গিয়েছিলো।”
এই পাচার চক্রের মাধ্যমে মূলত বিদেশি দরিদ্র মানুষদের “বলির পাঁঠা” হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
কীভাবে ঠেকানো সম্ভব অবৈধ অভিবাসন
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, মানব পাচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কিছু চক্র জড়িত হওয়ায় এমন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে বহুজাতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে।
“বিশেষ করে রাশিয়ার ক্ষেত্রে চাইনিজ কোনো পার্টিকুলার কোম্পানি আছে, যারা বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মানুষকে যে কোনো অফিস বা ডেস্ক জবের কথা বলে হায়ার করে। অথবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য কোনো কাজ হতে পারে- এমন বলেও হায়ার করা হয়।”
তিনি বলেন, “যেসব কোম্পানি তাদের হায়ার করার ব্যবস্থা করছে, সেগুলো সম্পর্কে যদি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তারপর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কিছু প্রচার হয়, সেগুলো রিপোর্ট করা যেতে পারে।”
এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে রাশিয়ান সরকারের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে বলেও মনে করেন আসিফ মুনির।
তিনি বলেন, “এখানে একটা ডিনায়েলের সংস্কৃতি থাকতে পারে। রাশিয়া বলতে পারে, অফিশিয়ালি এরকম কিছু হচ্ছে বলে তো আমরা জানি না। এবং বাংলাদেশের উপরই চাপাতে পারে যে, যারা যাচ্ছে তারা কেন যাচ্ছে এবং জেনেশুনেই হয়তো যাচ্ছে।”
“এই সমস্যা ঠেকাতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ান সরকার মিলে দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হলেও কোনো ব্লেইম গেইম না খেলে আলোচনা করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের দূতাবাসের একটা প্রোঅ্যাক্টিভ রোল থাকতে পারে। …রাশিয়ার ডিফেন্স মিনিস্ট্রি বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারে যে, তারা যখনই বাংলাদেশিদের ব্যাপারে এমন কিছু জানতে পারে, যাতে সাথে সাথে আমাদের দূতাবাসকে রিপোর্ট করে।”
আইওএম বা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন এজেন্সির মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা চাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন আসিফ মুনির।
রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশি হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই
'ভাই আমি তো কথা দিয়ে ফেলেছি। তারা টিকিট দিয়েছে, এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে সেনাবাহিনীর দুইটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে।'
“সেদিন তো আর বুঝি নাই, এটাই শেষ কথা,” ইউক্রেনে নিহত ছোট ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ কথা বলেন মামুনুর রশিদ।
মামুনের ছোট ভাই রিয়াদ রশিদ ইউক্রেনের রণাঙ্গনে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন, যিনি ছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্য।
গত ২রা মে রাশিয়ান সীমান্তে নিহত হন রিয়াদ। পরিবারের কাছে খবর পৌঁছায় সপ্তাহখানেক পর ৮ই মে।
মামুনুর রশিদ বলছেন, তার ভাই রিয়াদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন আরও এক বাংলাদেশি। তারা রাশিয়ায় চাকরি করার সময় একই রুমে বসবাস করতেন।
এর আগেও রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে গিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর এসেছে।
রাশিয়ায় চাকরি করতে গিয়ে রিয়াদ কীভাবে যুদ্ধে জড়ালেন এবং রাশিয়ার থাকা অন্যান্য বাংলাদেশিরাও একই পথে কীভাবে যাচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ড্রোন হামলার কবলে তিন বাংলাদেশি
নিহত রিয়াদের ভাই মামুনুর রশিদ আলাপ-কে বলেন, “নিহত আরেকজন বাংলাদেশি হলেন আব্দুর রহিম। বাড়ি রাজবাড়ীতে। তিনি রিয়াদের সাথেই ছিলেন এবং তারা দুজনই প্রথমে একই কোম্পানিতে চাকরি করতেন।”
“রহিমের সাথে তার পরিবারের বেশ কয়েক মাস কোনো যোগাযোগ না থাকায়, পরিবারকে তার মৃত্যুর খবর জানানো সম্ভব হয়নি।”
মামুন বলেন, তাকে এসব খবর জানিয়েছেন রাশিয়াতে থাকা আরেকজন বাংলাদেশি।
সেদিনের ড্রোন হামলায় আহত লিমন দত্ত, যিনিও ছিলেন রিয়াদ রশিদের বন্ধু। একই ক্যাম্পে সেনাসদস্য হিসেবে ছিলেন তারা।
ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে পা হারিয়েছেন লিমন।
যেভাবে বিদায় নিলেন রিয়াদ
নিহত রিয়াদের সাথে তার পরিবারের সদস্যদের শেষবার কথা হয়েছে গত ২৮এ এপ্রিল। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে বড় ভাই মামুনুরকে ফোন করেন রিয়াদ।
কথার শেষ দিকে রিয়াদ তার ভাইকে বলেন, তিনি এক জায়গায় যেতে পারেন যেখানে ফোনের নেটওয়ার্ক থাকবে না। তাই পরিবারের সাথে ৫ থেকে ৭ দিন যোগাযোগ করতে পারবেন না।
রিয়াদ তার ভাইকে আরও বলেছিলেন, নেটওয়ার্ক পাওয়ার সাথে সাথেই তাদের কল করবেন। আর যদি যোগাযোগ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে খোঁজ নেওয়ার জন্য তার কিছু বন্ধুবান্ধবের নাম্বারও ভাইকে দিয়ে রাখে।
বেশ কয়েকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় রিয়াদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
মামুনুর বলেন, “শুক্রবার মনের মধ্যে বেশি অস্থিরতা শুরু হয়। আর সহ্য হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাদের বলি, রিয়াদ ভালোমন্দ যাই আছে, আপনি আমারে বলেন।”
সোয়েব নামে রিয়াদের এক বন্ধু, আহত লিমন দত্তের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে তার পরিবারকে জানায় যে, ২রা মের এক মিশনে মারা গেছেন রিয়াদ।
এরপর লিমন দত্তের সাথে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ হয় মামুনুরের।
তখন লিমন বলেন, “২রা মে দুইটা গাড়িতে ৬ই জন মিশনে যান। সামনের গাড়িতে ছিলেন রিয়াদ, রহিমসহ তিন জন। পেছনের গাড়িতে লিমন ও বাকিরা। সামনের গাড়িতেই ড্রোন হামলা হয় এবং সবাই মারা যায়।”
মামুনুর আরও বলেন, পেছনের গাড়ির সবাই গুরুতর আহত হন। আহত থাকার কারণেই এতদিন রিয়াদের মৃত্যুর খবর পরিবারকে দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন লিমন দত্ত।
রিয়াদ যেভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে
রিয়াদের পরিবার থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদীর একটি ট্রেইনিং সেন্টার থেকে রাশিয়ান একজন প্রতিনিধির কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে রাশিয়ায় যান তিনি। কাজ শুরু করেন ব্ল্যাগোভিয়েশ্চেন্সক শহরে ‘চায়না সিনোম্যাক’ নামে এক কোম্পানিতে।
২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি ওই কোম্পানিতেই চাকরি করছিলেন। লিমন দত্ত ও আব্দুর রহিমও কাজ করতেন একই কোম্পানিতে। তিনজন থাকতেনও একই রুমে। এরপর তিনজন একসাথেই যোগ দেন সেনাবাহিনীতে।
মামুনুর রশিদ বলছেন, ২৮এ মার্চ রিয়াদ ফোন দিয়ে বলেন, তিনি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং সেনাবাহিনী থেকে তাকে মস্কোতে যাওয়ার জন্য টিকেট দিয়েছে।
বড় ভাই তার এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানালে রিয়াদ তার ভাইকে বলছিলেন, “ভাই আমি তো কথা দিয়ে ফেলেছি। তারা টিকিট দিয়েছে, এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে সেনাবাহিনীর দুইটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে।”
৭ই এপ্রিল রিয়াদ রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। সেখানে তার কাজ কী হবে, জানতে চেয়েছিলেন বড় ভাই মামুনুর।
রিয়াদ বলেন, “অফিসারদের দেখাশোনা, আর কোনো কাজ নেই…এই ক্যাম্পের মধ্যে শুধু পাহারা দিতে হবে…৮ ঘণ্টা ডিউটি।”
২৮এ এপ্রিল ক্যাম্পের বাইরে কোথাও যাওয়ার কথা পরিবারকে জানায় রিয়াদ।
রিয়াদের বড় ভাই অভিযোগ করেন, রিয়াদ ও রহিমকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য লিমনই প্ররোচিত করেছিলেন।
“রিয়াদের মৃত্যুর পর আগের কর্মস্থলে রিয়াদের অন্যান্য বন্ধুরা বলেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে রিয়াদকে অনেকবারই বারণ করেছিলেন তারা। কিন্তু লিমন দত্তই তাকে চাকরি ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য বোঝাতে থাকে।”
রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিরা
ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্তত ৩৬জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে মানবপাচার চক্র বাংলাদেশিদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশিদের কীভাবে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, তাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ঠেলে দেওয়া হয়।
আলাপ-কে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নিহত রিয়াদের ভাই মামুনুর। তিনি বলছেন, তার ভাইকে ক্যাম্পে সহযোগিতার কথা বলে নিয়ে রাশিয়ার সীমান্তে যুদ্ধ মিশনে পাঠানো হয়।
যৌথ গবেষণায় বেশ কয়েকজনের কথা উঠে এসেছে, যারা দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের জোর করে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাথে চুক্তিতে সই করানো হয়।
ট্রুথ হাউন্ডস-এর গবেষক মারিয়া তোমাক বলেন, “এই গবেষণার জন্য যতগুলো ঘটনা নিয়ে কাজ করা হয়েছে, সবক্ষেত্রেই রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাথে বুঝে বা না বুঝে চুক্তি সই করেছে যুদ্ধে যোগ দেওয়া বিদেশি নাগরিকরা।”
“তারা শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যুদ্ধের একদম সম্মুখ সারিতে গিয়ে পৌঁছায়। চুক্তির একটি শব্দও তারা বুঝতে পারেনি কারণ সেটি রুশ ভাষায় লেখা ছিলো। এরপর তাদের বারবার যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তাদের মূলত মরণফাঁদে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো। যারা অনেক বেশি ভাগ্যবান ছিলো, তারা কেবল যুদ্ধবন্দি হয়ে কার্যত বেঁচে গিয়েছিলো।”
এই পাচার চক্রের মাধ্যমে মূলত বিদেশি দরিদ্র মানুষদের “বলির পাঁঠা” হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
কীভাবে ঠেকানো সম্ভব অবৈধ অভিবাসন
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, মানব পাচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কিছু চক্র জড়িত হওয়ায় এমন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে বহুজাতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে।
“বিশেষ করে রাশিয়ার ক্ষেত্রে চাইনিজ কোনো পার্টিকুলার কোম্পানি আছে, যারা বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মানুষকে যে কোনো অফিস বা ডেস্ক জবের কথা বলে হায়ার করে। অথবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য কোনো কাজ হতে পারে- এমন বলেও হায়ার করা হয়।”
তিনি বলেন, “যেসব কোম্পানি তাদের হায়ার করার ব্যবস্থা করছে, সেগুলো সম্পর্কে যদি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তারপর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কিছু প্রচার হয়, সেগুলো রিপোর্ট করা যেতে পারে।”
এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে রাশিয়ান সরকারের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে বলেও মনে করেন আসিফ মুনির।
“তবে এটা খুব একটা কার্যকরী নাও হতে পারে।”
তিনি বলেন, “এখানে একটা ডিনায়েলের সংস্কৃতি থাকতে পারে। রাশিয়া বলতে পারে, অফিশিয়ালি এরকম কিছু হচ্ছে বলে তো আমরা জানি না। এবং বাংলাদেশের উপরই চাপাতে পারে যে, যারা যাচ্ছে তারা কেন যাচ্ছে এবং জেনেশুনেই হয়তো যাচ্ছে।”
“এই সমস্যা ঠেকাতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ান সরকার মিলে দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হলেও কোনো ব্লেইম গেইম না খেলে আলোচনা করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের দূতাবাসের একটা প্রোঅ্যাক্টিভ রোল থাকতে পারে। …রাশিয়ার ডিফেন্স মিনিস্ট্রি বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারে যে, তারা যখনই বাংলাদেশিদের ব্যাপারে এমন কিছু জানতে পারে, যাতে সাথে সাথে আমাদের দূতাবাসকে রিপোর্ট করে।”
আইওএম বা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন এজেন্সির মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা চাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন আসিফ মুনির।
বিষয়: