মন্তব্য প্রতিবেদন

চব্বিশের পর কতটা প্রস্তুত পুলিশ?

২০২৬-এর পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর এই ফেরাটা যতটা না উৎসবের, তার চেয়ে বেশি টিকে থাকার লড়াই। বাংলাদেশের পুলিশের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে বর্তমান ও পরবর্তী সরকারগুলোর সদিচ্ছার ওপর।

আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহের প্রথম সকালে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যখন কুচকাওয়াজ শুরু হলো, তখন শুধু প্যারেডের বুটের শব্দ নয়, বরং চারপাশের গুমোট বাতাসে একটি বড় প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো—বিগত দেড় বছরের চরম বিশৃঙ্খলা আর আস্থার সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ কি সত্যিই পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত?

এবারের স্লোগান,“আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” জনমনে হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার এক মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

তবে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের সেই নজিরবিহীন ধস এবং পরবর্তী ‘পুলিশহীন’ দিনগুলোর ক্ষত এখনো এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মনে দগদগে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুলিশ বাহিনীকে বারবার জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বদলে সরকার রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

রক্তাক্ত আগস্ট ও পুলিশের ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ট্রমা

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনী কেবল কাঠামোগতভাবে নয়, মানসিকভাবেও পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলো।

কয়েক দশক ধরে বাহিনীকে যেভাবে রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো, তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিলো সেই প্রবল জনরোষ। 

শত শত থানা পুড়িয়ে দেওয়া এবং সহকর্মীদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য প্রাণের ভয়ে ইউনিফর্ম পুড়িয়ে সিভিল পোশাকে আত্মগোপনে চলে যান।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিলো এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বিপর্যয়, যেখানে কয়েক দিনের জন্য পুরো রাষ্ট্র ছিল কার্যত পুলিশহীন।

এই বিপর্যয়ের পেছনে কেবল রাজনৈতিক পতন নয়, বরং জড়িয়ে আছে একেকজন ব্যক্তির চরম অনিশ্চয়তা আর বিভীষিকার গল্প। 

আমার ভার্সিটির এক জুনিয়র অনেক স্বপ্ন নিয়ে পুলিশে যোগ দিয়েছিলো। পাঁচই অগাস্টের সেই বিকেলে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচতে সে তার পরিচয়পত্র আর ইউনিফর্ম পুড়িয়ে ফেলে দেয়াল টপকে পালিয়েছিলো। 

এক সপ্তাহ আত্মীয়ের বাসার স্টোর রুমে আলো-বাতাসহীন অবস্থায় লুকিয়ে থাকার যে ট্রমা, তা তাকে আজও তাড়া করে ফেরে। সেদিন বলছিল, “ভাই, ডিউটিতে থাকলে মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারি না!”

একই অবস্থা আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর, যে একটি জেলার শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছিলো। সে যখন মাসখানেক আত্মগোপনে থাকার পর ডিউটিতে ফিরলো, তখন তার ছোট ছেলেটি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, ইন্টারনেটে সবাই তোমাদের খুনি বলছে কেন?” 

এই যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং নিজের পরিবারের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, এটাই এখন পুলিশের বড় অংশের দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত।

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়কাল পর্যন্ত, ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রবণতা এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি: একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুলিশ বাহিনীকে বারবার ‘পাবলিক সার্ভিস’ বা জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বদলে একটি ‘রেজিম প্রটেকশন ফোর্স’ বা সরকার রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়কাল পর্যন্ত, ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার এই প্রবণতা এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

যখনই কোনো সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা পুলিশকে ব্যবহার করেছে বিরোধী মত দমন এবং রাজপথ নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে অপরাধের প্রতিকার পাওয়ার ভরসাস্থল হওয়ার বদলে ভয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত এবং ভয়াবহ রূপ আমরা দেখলাম ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে গিয়ে পুরো বাহিনীকে যেভাবে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার মাশুল এখনো দিতে হচ্ছে প্রতিটি সৎ পুলিশ সদস্যকে। 

পাঁচই অগাস্টের সেই নজিরবিহীন পতন আসলে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, জনগণের সম্মতি ছাড়া কেবল পুলিশি শক্তি দিয়ে কোনো ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা সম্ভব নয়।

২০২৬ সালে এসে পুলিশ কাঠামোগতভাবে দাঁড়িয়ে গেলেও তাদের মনোবল এখনো ভঙ্গুর। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের Crisis of Authority বা কর্তৃত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। তারা ভয় পাচ্ছেন, কোনো অপরাধীকে ধরতে গিয়ে কঠোর হলে তাকে আবার ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে কি না। এই দ্বিধা অনেক সময় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরণের স্থবিরতা তৈরি করছে, যার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্র।

পুলিশের মনোবল ফেরানোর জন্য কেবল বড় বড় বাজেট বা ভালো অস্ত্র যথেষ্ট নয়; তাদের প্রয়োজন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।

ব্যক্তিগত ট্রমা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ

আমার ভার্সিটির বন্ধুরা বা জুনিয়ররা, যারা পুলিশে কাজ করছে, তারা এক ধরনের ‘গিল্ট’ বা অপরাধবোধে ভোগে। বন্ধুদের আড্ডায় তারা যখন জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনের গল্প শোনে, তখন তারা চুপ করে থাকে। তারা জানে না তারা তখন ঠিক কার পক্ষে ছিলো বা তাদের কী করা উচিত ছিলো। 

এই যে নিজের সামাজিক বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, এটা তাদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে।

পুলিশের মনোবল ফেরানোর জন্য কেবল বড় বড় বাজেট বা ভালো অস্ত্র যথেষ্ট নয়; তাদের প্রয়োজন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। আমার বন্ধুরা আর জুনিয়ররা আজ যখন মাঠে কাজ করছেন, তারা আসলে একটা হারানো সম্মান ফিরে পাওয়ার যুদ্ধে নেমেছেন। তারা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তারা মানুষের সাথে কেমন আচরণ করছেন তার ওপর।

যখনই কোনো সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা পুলিশকে ব্যবহার করেছে বিরোধী মত দমন এবং রাজপথ নিয়ন্ত্রণে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর এই ফেরাটা যতটা না উৎসবের, তার চেয়ে বেশি টিকে থাকার লড়াই। বাংলাদেশের পুলিশের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে বর্তমান ও পরবর্তী সরকারগুলোর সদিচ্ছার ওপর।

তারা কি পুলিশকে আবার নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি একটি স্বাধীন ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠতে দেবে?

পুলিশ তখনই সফল হবে, যখন একজন সাধারণ মানুষ থানায় যেতে ভয় পাবে না এবং একজন পুলিশ সদস্য গর্বের সাথে বলতে পারবে যে, সে কোনো দলের রাজনীতি করছে না।

পাঁচই আগস্টের সেই আগুনের ছাই মাড়িয়ে তারা একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় আছে, যেখানে পুলিশ হবে কেবলই আইনের সেবক, কোনো বিশেষ শাসনের রক্ষক নয়।

এই রূপান্তরই বলে দেবে ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহটি কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল, নাকি বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা।