স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যু: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা ও অনলাইনে গড়ে ওঠা ভিন্ন এক বয়ান
সুইসাইড নোটে মায়ের প্রতি অভিমান, পুলিশের মতে অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি; দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অভিযোগ, প্রচার, টার্গেটেড অনলাইন ক্যাম্পেইন ও তার পরিণতি।
আলাপ রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএমআপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস পর পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি হত্যাকাণ্ড নয়, আত্মহত্যা। তদন্তকারী কর্মকর্তা পোস্টমর্টেম, রক্ত ও ভিসেরার রাসায়নিক বিশ্লেষণ, সুরতহাল, জব্দ করা আলামত এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা নোট পর্যালোচনা করে মত দিয়েছেন যে স্বর্ণময়ীর মৃত্যু হয়েছে ফাঁসের কারণে শ্বাসরোধে এবং তার প্রকৃতি আত্মহত্যামূলক।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় অন্য কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ করার মতো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে এই মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে যে বয়ান তৈরি হয়েছিল, তা ছিল একেবারেই ভিন্ন। সেখানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিমের কর্মী আলতাফ শাহনেওয়াজকে স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়, এমনকি তাকে নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগও ছড়ানো হয়।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান বলছে, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর তার কর্মক্ষেত্রের একটি পুরোনো অভিযোগকে সামনে এনে ধীরে ধীরে এমন এক সংঘবদ্ধ অনলাইন ক্যাম্পেইন তৈরি হয়, যা শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ নন, তার স্ত্রী ফাতেমা আবেদিন নাজলা এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এন’স কিচেনকেও টার্গেট করে।
পুলিশের প্রতিবেদনে কী আছে
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নিহতের নাম স্বর্ণময়ী বিশ্বাস, বয়স ৩৫, পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার বলে উল্লেখ আছে। তিনি ঢাকা স্ট্রিম নামে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করতেন। ঢাকায় বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন পরিবারের সদস্যরা দরজা ভেঙে তাকে নিজের কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফরেনসিক মতামত। সেখানে বলা হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে “asphyxia resulting from hanging”, অর্থাৎ ফাঁসের কারণে শ্বাসরোধে; এবং সেটি “suicidal in nature”।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে লিখেছেন, আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকেও এ মৃত্যু নিয়ে কোনো সন্দেহ উত্থাপন করা হয়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একটি নোটবুকের পাতায় স্বর্ণময়ীর নিজের হাতে লেখা বলে মনে করা একটি নোটের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সেই নোটে তিনি জীবনের প্রতি ক্লান্তি, ভরসা ভেঙে যাওয়ার কথা এবং বিশেষ করে মায়ের প্রতি গভীর অভিমানের কথা লিখেছেন।
দ্য ডিসেন্টও তাদের রিপোর্টে ওই নোটের অংশ উদ্ধৃত করেছে, যেখানে স্বর্ণময়ী লিখেছেন যে মাথার মধ্যে শুধু অভিমান, অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই, আর তার মায়ের জগতে তিনি কখনোই কেন্দ্রীয় কেউ ছিলেন না, ছিলেন শুধু দায়িত্ব।
অনলাইনে কেন তৈরি হলো অন্য গল্প
স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর পরপরই তার কর্মক্ষেত্র ঢাকা স্ট্রিমের একটি পুরোনো অভিযোগ সামনে আসে। দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মৃত্যুর তিন মাস আগে ১৩ জুলাই স্বর্ণময়ীসহ সাত নারী সহকর্মী আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
সেখানে নয় ধরনের আচরণগত অভিযোগ ছিল, যেমন অনুপযুক্ত আচরণ, ফ্লার্টেশন, বুলিং, ব্যক্তিগত যৌন ইতিহাস জানতে চাওয়া, রাত করে ফোন করা, অপ্রীতিকর মন্তব্য, নিউজরুমে ঝামেলা তৈরি করা ও প্রোফাইলিং। তবে দ্য ডিসেন্ট বলছে, ওই অভিযোগপত্রে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ছিল না।
এরপর স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পরে সামাজিক মাধ্যমে এই অভিযোগগুলোকেই নতুন ফ্রেমে হাজির করা হয়। দ্য ডিসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, “স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর জন্য আলতাফ দায়ী” এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে কয়েকটি ফেসবুক পেজ, ব্যক্তি অ্যাকাউন্ট, এমনকি কিছু রাজনৈতিক কর্মীও সক্রিয় ভূমিকা নেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, “ঢাকা ওপেরা” ও “মজদুর” নামের দুটি পেজ থেকে প্রথমে এ ধরনের পোস্ট ছড়ানো হয়, পরে তাতে যুক্ত হন আরও অনেকে। একইসঙ্গে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনও এই বয়ানকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে বলে রিপোর্টে উল্লেখ আছে।
অভিযোগের লক্ষ্য শুধু একজন ছিলেন না
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানের বড় আরেকটি দিক ছিলো, আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ ছিলেন না। তার স্ত্রী ফাতেমা আবেদিন নাজলা ও তার পরিচালিত এন’স কিচেনও ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের মুখে পড়ে।
রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, নাজলার ফেসবুক পোস্ট, তার ক্যাটারিং ব্যবসার পেজ, এমনকি তার খাবার নিয়ে অন্যের ইতিবাচক পোস্টের কমেন্ট বক্সেও বারবার স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়। অনেক মন্তব্যে নাজলার স্বামীকে দায়ী করা হয়, তাকেও পরোক্ষভাবে আক্রমণ করা হয়।
দ্য ডিসেন্টকে নাজলা বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় গত ছয় মাস ধরে তিনি নিয়মিত এই ধরনের মন্তব্য মুছেছেন, কিন্তু তবু তা বন্ধ হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক সাইবার বুলিং তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। ব্যবসায়িক ক্ষতির কথাও তিনি বলেছেন।
তার দাবি, এই পরিস্থিতিতে এন’স কিচেনের অর্ডার প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়, এবং ধানমন্ডির রেস্টুরেন্টে হামলার পর সেটি বন্ধ করে দিতে হয়।
পরিবার কী বলছে
দ্য ডিসেন্টকে স্বর্ণময়ীর ভাই সৌরভ বিশ্বাস বলেছেন, তারা আলতাফ শাহনেওয়াজকে আত্মহত্যার জন্য দায়ী মনে করেন না। তার ভাষায়, পরিবার তখনও কোনো অভিযোগ করেনি, এখনো করে না; আর স্বর্ণময়ী খুব ওপেন ছিলেন।
আলতাফের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে যে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তিনি কখনো পরিবারের সঙ্গে কিছু বলেননি।
স্বর্ণময়ীর মামাতো ভাই পার্থ ধরও বলেন, আত্মহত্যার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, কিন্তু আলতাফ বা অফিসের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে তারা নির্দিষ্ট কিছু জানেন না।
এই পারিবারিক অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুলিশের প্রতিবেদনের সঙ্গেও এটি মিলে যাচ্ছে। অপমৃত্যুর মামলায় পরিবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেনি, আর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, আত্মীয়-স্বজনেরও কোনো সন্দেহ ছিল না।
অভিযোগকারীরা এখন কী বলছেন
দ্য ডিসেন্ট অভিযোগকারী কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তাদের বক্তব্যও একরৈখিক নয়। উদাহরণ হিসেবে, অভিযোগকারীদের একজন শতাব্দিকা ঊর্মি বলেছেন, তার অভিযোগ ছিল বুলিং নিয়ে। তিনি একইসঙ্গে এটাও বলেছেন, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পেছনে কেবল আলতাফ শাহনেওয়াজই দায়ী, এ কথা কেউ বলতে পারবে না; স্বর্ণময়ীর পারিবারিক ও সম্পর্কগত সমস্যাও ছিল বলে তিনি শুনেছেন।
তার বক্তব্য, আপত্তি ছিল অভিযোগের সুরাহা না হওয়া নিয়ে।
আরেকজন অভিযোগকারী বলেছেন, যৌন নিপীড়নের কোনো সরাসরি ঘটনা তিনি দেখেননি বা শোনেননি, যদিও আলতাফের আচরণ নিয়ে তার অস্বস্তি ছিল।
অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রের আচরণগত অভিযোগ ছিল, কিন্তু সেই অভিযোগগুলোকে পরে সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে “আত্মহত্যার কারণ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, দ্য ডিসেন্টের রিপোর্ট অনুযায়ী তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি।
ঢাকা স্ট্রিমের বক্তব্য
ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, অভিযোগের দিনই একটি সালিশির মাধ্যমে বিষয়টির প্রাথমিক সুরাহা করা হয় এবং সহকর্মীদের দাবির মুখে আলতাফ শাহনেওয়াজকে নিউজরুম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে আরও তদন্তের জন্য দুই সদস্যের কমিটিও করা হয়। তার দাবি, ওই কমিটি যৌন হয়রানির প্রমাণ পায়নি, তবে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কিছু প্রমাণ পেয়েছে। মানবসম্পদ বিভাগের দুই কর্মকর্তাও দ্য ডিসেন্টকে বলেন, যৌন নিপীড়ন বা সমস্যাজনক ফোনালাপ/চ্যাটের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তারা পাননি।
যা বলছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ
আলতাফ শাহনেওয়াজ তার বিরুদ্ধে ১৩ জুলাই ওঠা অভিযোগগুলোকে ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন। দ্য ডিসেন্টকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা বা কোনো নারী সহকর্মীকে নিপীড়ন কিংবা যৌন নিপীড়নের সঙ্গে তার ‘বিন্দুমাত্রও সংশ্লিষ্টতা নেই’ এবং তিনি নির্দোষ। তার ভাষ্য, সামাজিক মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এবং অনলাইন মবের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে তার ও তার পরিবারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। এতে তিনি সামাজিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, ক্ষুণ্ন হয়েছে তার পেশাগত ও সামাজিক সুনাম।
আলতাফের দাবি, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর পরিবারের পক্ষ থেকে করা অপমৃত্যুর মামলাতেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। এখন পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে, এটিকে তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, এতে প্রমাণ হয়েছে তার বিরুদ্ধে ছড়ানো অভিযোগগুলো ছিল বানোয়াট।
শেষ পর্যন্ত কোন ছবি স্পষ্ট হচ্ছে
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এক ধরনের ছবি দেয়: স্বর্ণময়ীর মৃত্যু আত্মহত্যা, সুইসাইড নোটে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভিমান, অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই। আর দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান দেখায় আরেকটি সমান্তরাল বাস্তবতা: মৃত্যুর পর একটি অস্পষ্ট কর্মক্ষেত্রের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দ্রুত অনলাইনে দায়ী করার বয়ান তৈরি হয়, যা পরে ব্যক্তি-আক্রমণ, ব্যবসায়িক ক্ষতি, সাইবার বুলিং এবং এক ধরনের মিডিয়া ট্রায়ালে গড়ায়।
এই দুই দিক একসঙ্গে পড়লে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যুর স্টোরি শুধু একটি অপমৃত্যুর তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আরেকটি বড় প্রশ্নের গল্প। একজনের মৃত্যু নিয়ে সত্য, শোক, অভিযোগ আর অনলাইন জনমতের সম্পর্ক ঠিক কোথায় গিয়ে মিশে যায়।
স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যু: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা ও অনলাইনে গড়ে ওঠা ভিন্ন এক বয়ান
সুইসাইড নোটে মায়ের প্রতি অভিমান, পুলিশের মতে অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি; দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অভিযোগ, প্রচার, টার্গেটেড অনলাইন ক্যাম্পেইন ও তার পরিণতি।
স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস পর পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি হত্যাকাণ্ড নয়, আত্মহত্যা। তদন্তকারী কর্মকর্তা পোস্টমর্টেম, রক্ত ও ভিসেরার রাসায়নিক বিশ্লেষণ, সুরতহাল, জব্দ করা আলামত এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা নোট পর্যালোচনা করে মত দিয়েছেন যে স্বর্ণময়ীর মৃত্যু হয়েছে ফাঁসের কারণে শ্বাসরোধে এবং তার প্রকৃতি আত্মহত্যামূলক।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় অন্য কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ করার মতো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে এই মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে যে বয়ান তৈরি হয়েছিল, তা ছিল একেবারেই ভিন্ন। সেখানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিমের কর্মী আলতাফ শাহনেওয়াজকে স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়, এমনকি তাকে নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগও ছড়ানো হয়।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান বলছে, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর তার কর্মক্ষেত্রের একটি পুরোনো অভিযোগকে সামনে এনে ধীরে ধীরে এমন এক সংঘবদ্ধ অনলাইন ক্যাম্পেইন তৈরি হয়, যা শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ নন, তার স্ত্রী ফাতেমা আবেদিন নাজলা এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এন’স কিচেনকেও টার্গেট করে।
পুলিশের প্রতিবেদনে কী আছে
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নিহতের নাম স্বর্ণময়ী বিশ্বাস, বয়স ৩৫, পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার বলে উল্লেখ আছে। তিনি ঢাকা স্ট্রিম নামে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করতেন। ঢাকায় বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন পরিবারের সদস্যরা দরজা ভেঙে তাকে নিজের কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফরেনসিক মতামত। সেখানে বলা হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে “asphyxia resulting from hanging”, অর্থাৎ ফাঁসের কারণে শ্বাসরোধে; এবং সেটি “suicidal in nature”।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে লিখেছেন, আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকেও এ মৃত্যু নিয়ে কোনো সন্দেহ উত্থাপন করা হয়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একটি নোটবুকের পাতায় স্বর্ণময়ীর নিজের হাতে লেখা বলে মনে করা একটি নোটের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সেই নোটে তিনি জীবনের প্রতি ক্লান্তি, ভরসা ভেঙে যাওয়ার কথা এবং বিশেষ করে মায়ের প্রতি গভীর অভিমানের কথা লিখেছেন।
দ্য ডিসেন্টও তাদের রিপোর্টে ওই নোটের অংশ উদ্ধৃত করেছে, যেখানে স্বর্ণময়ী লিখেছেন যে মাথার মধ্যে শুধু অভিমান, অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই, আর তার মায়ের জগতে তিনি কখনোই কেন্দ্রীয় কেউ ছিলেন না, ছিলেন শুধু দায়িত্ব।
অনলাইনে কেন তৈরি হলো অন্য গল্প
স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর পরপরই তার কর্মক্ষেত্র ঢাকা স্ট্রিমের একটি পুরোনো অভিযোগ সামনে আসে। দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মৃত্যুর তিন মাস আগে ১৩ জুলাই স্বর্ণময়ীসহ সাত নারী সহকর্মী আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
সেখানে নয় ধরনের আচরণগত অভিযোগ ছিল, যেমন অনুপযুক্ত আচরণ, ফ্লার্টেশন, বুলিং, ব্যক্তিগত যৌন ইতিহাস জানতে চাওয়া, রাত করে ফোন করা, অপ্রীতিকর মন্তব্য, নিউজরুমে ঝামেলা তৈরি করা ও প্রোফাইলিং। তবে দ্য ডিসেন্ট বলছে, ওই অভিযোগপত্রে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ছিল না।
এরপর স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পরে সামাজিক মাধ্যমে এই অভিযোগগুলোকেই নতুন ফ্রেমে হাজির করা হয়। দ্য ডিসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, “স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর জন্য আলতাফ দায়ী” এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে কয়েকটি ফেসবুক পেজ, ব্যক্তি অ্যাকাউন্ট, এমনকি কিছু রাজনৈতিক কর্মীও সক্রিয় ভূমিকা নেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, “ঢাকা ওপেরা” ও “মজদুর” নামের দুটি পেজ থেকে প্রথমে এ ধরনের পোস্ট ছড়ানো হয়, পরে তাতে যুক্ত হন আরও অনেকে। একইসঙ্গে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনও এই বয়ানকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে বলে রিপোর্টে উল্লেখ আছে।
অভিযোগের লক্ষ্য শুধু একজন ছিলেন না
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানের বড় আরেকটি দিক ছিলো, আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ ছিলেন না। তার স্ত্রী ফাতেমা আবেদিন নাজলা ও তার পরিচালিত এন’স কিচেনও ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের মুখে পড়ে।
রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, নাজলার ফেসবুক পোস্ট, তার ক্যাটারিং ব্যবসার পেজ, এমনকি তার খাবার নিয়ে অন্যের ইতিবাচক পোস্টের কমেন্ট বক্সেও বারবার স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়। অনেক মন্তব্যে নাজলার স্বামীকে দায়ী করা হয়, তাকেও পরোক্ষভাবে আক্রমণ করা হয়।
দ্য ডিসেন্টকে নাজলা বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় গত ছয় মাস ধরে তিনি নিয়মিত এই ধরনের মন্তব্য মুছেছেন, কিন্তু তবু তা বন্ধ হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক সাইবার বুলিং তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। ব্যবসায়িক ক্ষতির কথাও তিনি বলেছেন।
তার দাবি, এই পরিস্থিতিতে এন’স কিচেনের অর্ডার প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়, এবং ধানমন্ডির রেস্টুরেন্টে হামলার পর সেটি বন্ধ করে দিতে হয়।
পরিবার কী বলছে
দ্য ডিসেন্টকে স্বর্ণময়ীর ভাই সৌরভ বিশ্বাস বলেছেন, তারা আলতাফ শাহনেওয়াজকে আত্মহত্যার জন্য দায়ী মনে করেন না। তার ভাষায়, পরিবার তখনও কোনো অভিযোগ করেনি, এখনো করে না; আর স্বর্ণময়ী খুব ওপেন ছিলেন।
আলতাফের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে যে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তিনি কখনো পরিবারের সঙ্গে কিছু বলেননি।
স্বর্ণময়ীর মামাতো ভাই পার্থ ধরও বলেন, আত্মহত্যার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, কিন্তু আলতাফ বা অফিসের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে তারা নির্দিষ্ট কিছু জানেন না।
এই পারিবারিক অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুলিশের প্রতিবেদনের সঙ্গেও এটি মিলে যাচ্ছে। অপমৃত্যুর মামলায় পরিবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেনি, আর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, আত্মীয়-স্বজনেরও কোনো সন্দেহ ছিল না।
অভিযোগকারীরা এখন কী বলছেন
দ্য ডিসেন্ট অভিযোগকারী কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তাদের বক্তব্যও একরৈখিক নয়। উদাহরণ হিসেবে, অভিযোগকারীদের একজন শতাব্দিকা ঊর্মি বলেছেন, তার অভিযোগ ছিল বুলিং নিয়ে। তিনি একইসঙ্গে এটাও বলেছেন, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পেছনে কেবল আলতাফ শাহনেওয়াজই দায়ী, এ কথা কেউ বলতে পারবে না; স্বর্ণময়ীর পারিবারিক ও সম্পর্কগত সমস্যাও ছিল বলে তিনি শুনেছেন।
তার বক্তব্য, আপত্তি ছিল অভিযোগের সুরাহা না হওয়া নিয়ে।
আরেকজন অভিযোগকারী বলেছেন, যৌন নিপীড়নের কোনো সরাসরি ঘটনা তিনি দেখেননি বা শোনেননি, যদিও আলতাফের আচরণ নিয়ে তার অস্বস্তি ছিল।
অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রের আচরণগত অভিযোগ ছিল, কিন্তু সেই অভিযোগগুলোকে পরে সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে “আত্মহত্যার কারণ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, দ্য ডিসেন্টের রিপোর্ট অনুযায়ী তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি।
ঢাকা স্ট্রিমের বক্তব্য
ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, অভিযোগের দিনই একটি সালিশির মাধ্যমে বিষয়টির প্রাথমিক সুরাহা করা হয় এবং সহকর্মীদের দাবির মুখে আলতাফ শাহনেওয়াজকে নিউজরুম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে আরও তদন্তের জন্য দুই সদস্যের কমিটিও করা হয়। তার দাবি, ওই কমিটি যৌন হয়রানির প্রমাণ পায়নি, তবে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কিছু প্রমাণ পেয়েছে। মানবসম্পদ বিভাগের দুই কর্মকর্তাও দ্য ডিসেন্টকে বলেন, যৌন নিপীড়ন বা সমস্যাজনক ফোনালাপ/চ্যাটের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তারা পাননি।
যা বলছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ
আলতাফ শাহনেওয়াজ তার বিরুদ্ধে ১৩ জুলাই ওঠা অভিযোগগুলোকে ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন। দ্য ডিসেন্টকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা বা কোনো নারী সহকর্মীকে নিপীড়ন কিংবা যৌন নিপীড়নের সঙ্গে তার ‘বিন্দুমাত্রও সংশ্লিষ্টতা নেই’ এবং তিনি নির্দোষ। তার ভাষ্য, সামাজিক মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এবং অনলাইন মবের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে তার ও তার পরিবারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। এতে তিনি সামাজিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, ক্ষুণ্ন হয়েছে তার পেশাগত ও সামাজিক সুনাম।
আলতাফের দাবি, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর পরিবারের পক্ষ থেকে করা অপমৃত্যুর মামলাতেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। এখন পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে, এটিকে তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, এতে প্রমাণ হয়েছে তার বিরুদ্ধে ছড়ানো অভিযোগগুলো ছিল বানোয়াট।
শেষ পর্যন্ত কোন ছবি স্পষ্ট হচ্ছে
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এক ধরনের ছবি দেয়: স্বর্ণময়ীর মৃত্যু আত্মহত্যা, সুইসাইড নোটে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভিমান, অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই। আর দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধান দেখায় আরেকটি সমান্তরাল বাস্তবতা: মৃত্যুর পর একটি অস্পষ্ট কর্মক্ষেত্রের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দ্রুত অনলাইনে দায়ী করার বয়ান তৈরি হয়, যা পরে ব্যক্তি-আক্রমণ, ব্যবসায়িক ক্ষতি, সাইবার বুলিং এবং এক ধরনের মিডিয়া ট্রায়ালে গড়ায়।
এই দুই দিক একসঙ্গে পড়লে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যুর স্টোরি শুধু একটি অপমৃত্যুর তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আরেকটি বড় প্রশ্নের গল্প। একজনের মৃত্যু নিয়ে সত্য, শোক, অভিযোগ আর অনলাইন জনমতের সম্পর্ক ঠিক কোথায় গিয়ে মিশে যায়।
বিষয়: