বিএনপির ভূমিধস বিজয়, ঐতিহাসিক উত্থান জামায়াতের 

ঐতিহাসিক বিজয়ে সরকার গঠনের পথে বিএনপি, আর নজিরবিহীন উত্থানে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত জামায়াতে ইসলামী। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সূচনা। এই ফলাফল কি স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি সামনে অপেক্ষা করছে আদর্শিক টানাপোড়েনের নতুন অধ্যায়? 

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম

ভোটের আগের জরিপগুলোকে হার মানিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।

এই জয় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য শুধু রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনই নয়, বরং প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরো শক্তিশালীভাবে ফিরে আসা।

সর্বশেষ ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ২১২টিতে। 

প্রতিষ্ঠার পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক যেসব নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় বিজয়।

মধ্য-ডান ঘরানা থেকে সরে অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থি অবস্থান গ্রহণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও শাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি-সব মিলিয়ে ভোটারদের বিস্তৃত সমর্থন টানতে দলটি সক্ষম হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

তবে এই নির্বাচনের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নজিরবিহীন উত্থান।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ইতোমধ্যে ৭৭টি আসন নিশ্চিত করে সংসদে প্রধান বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে দলটি এর আগে কখনও এত আসনে জয় পায়নি—এমনকি এর তিনভাগের একভাগও নয়। এর আগের তাদের সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা ছিল ১৮টি।

রক্ষণশীল রাজনীতির এই শক্তিশালী উত্থান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন পাল্টে দিতে পারে। 

তারপরও বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ‘অত্যন্ত দরকারি’ এবং অনেকেই এটাকে ‘মাইলফলক’ হিসেবেই মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে দ্রুত। যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনকে ‘সফল’ আখ্যা দিয়ে ঐতিহাসিক এই জয়ের জন্য তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

বিশ্বনেতাদের মধ্যে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রথম বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

বিএনপির বিজয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “দলটি একটি নির্ণায়ক ভোটে শক্তিশালী জনসমর্থন অর্জন করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”

তবে কিছু প্রশ্ন ঘুরে ফিরে ফিরে আসছে।

বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত কিছু জায়গায় দলীয় প্রার্থীরা কেন হেরে বসলেন? আবার আওয়ামী অধ্যুষিত কিছু জায়গায় কীভাবে জয় পেলো বিএনপি? আর জামায়াতই এত আসন কীভাবে পেল?

ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণকারী ঘটনাগুলো

“এই দুইটা জিনিসই বিএনপির পক্ষে ম্যাসিভ জোয়ার সৃষ্টি করেছে। তখনতো আমি ভাবছিলাম, বিএনপি ৩০০টা আসনই পেয়ে যাবে।”

লন্ডনে সতেরো বছরের বেশি নির্বাসিত জীবন যাপনের পর তারেক রহমান ২৫শে ডিসেম্বর যখন ঢাকায় নামেন, তখন প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল বেজে উঠেছে।

তাকে অভিনন্দন জানালেন বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী, বিমানবন্দর থেকে মানুষের স্রোত, প্রাণঢালা অভিনন্দন, রাজকীয় সংবর্ধনা।

কার্যত সেদিন থেকেই ভোটের মাঠের সবচেয়ে বড় নিউজমেকার হয়ে উঠেছিলেন তারেক রহমান, তিনি যেখানে যাচ্ছিলেন, যা করছিলেন, সবই তখন গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ খবর।

এর পাঁচদিনের মাথায় মারা যান দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় লাখো মানুষের ভিড়, বিদেশি অতিথিদের আগমন বিএনপির নির্বাচনি দৌড়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

এই দুই ঘটনা থেকে বিএনপি ‘বিরাট বুস্ট’ পেয়েছিল বলে মনে করেন বিবিসি বাংলার সাবেক সম্পাদক সাবির মুস্তাফা 

“এই দুইটা জিনিসই বিএনপির পক্ষে ম্যাসিভ জোয়ার সৃষ্টি করেছে। তখনতো আমি ভাবছিলাম, বিএনপি ৩০০টা আসনই পেয়ে যাবে।”

এই প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা নিহত হওয়ার পর রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের বিপূল ব্যবধানে জয়ের প্রসঙ্গ টানেন জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক।

“বিএনপি এই সিমপ্যাথি থেকে বেনিফিট পেয়েছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

ভোটের আগে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কয়েকটি সংস্থা থেকে চালানো নানা ধরনের জরিপের ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসতে চলেছে।

চব্বিশের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয় এবং নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ে দলটি।

ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে বিএনপি এবং তাদেরই একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী।

ভোটাররাও ভাগ হতে থাকে দুই শিবিরে। বিএনপির মধ্যপন্থা অবস্থান এবং জামায়াতের প্রচার জোরদার হতে থাকে।

জুলাই আন্দোলন থেকে সৃষ্টি হওয়া তরুণদের দল এনসিপি নিয়ে জোট গঠন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে প্রার্থী করার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্ন বার্তা দিতে চাইলেও জামায়াতের ঐতিহাসিক রক্ষণশীল অবস্থা থেকে দলটি বের হতে পারেনি।

নির্বাচনের আগে নারী ইস্যু ও ধর্ম নিয়ে বারবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে জামায়াত। আর বিএনপির অবস্থান ছিল ঠিক তার উল্টো।

লন্ডনের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে ‘নম্র ও সংযত ভঙ্গির’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্রিটিশ জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া ‘রাজনীতিতে সহনশীলতা’ বাড়ানোর জন্য তারেক রহমানের আহ্বানের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

“লন্ডনের কিংস্টন এলাকায় স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটানো সময় তাঁকে আরও সংযত করেছে বলে তার সহযোগীরা মনে করেন,” লেখা হয়েছে গার্ডিয়ানে। 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআইয়ের ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখানো হয়, বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থন ২৯ শতাংশ।

ভোটের প্রচারে বিএনপির পক্ষে সমর্থন আরো বাড়তে থাকে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ধর্মীয় বিষয় এড়িয়ে চলা, নাগরিকদের প্রাত্যহিক বাস্তব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার এড়িয়ে চলা জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে তোলে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পেছনে দুই তিনটা প্রধান কারণ রয়েছে বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক খান রবিউল আলম।

“দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে জনগণ একটা স্থিতির দিকে যেতে চায়। এই মেসেজটা তারেক জিয়া খুব ইফেকটিভলি কমিউনিকেট করতে পেরেছেন,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

“তার বক্তব্যের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা, প্রতিহিংসা ছিল না। তার এই অভিব্যক্তিটা মানুষের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে আমার মনে হয়।”

এরপরই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে ভোটের প্রচার। জামায়াতে ইসলামীর প্রচারে ‘বেহেশতের টিকেট’-এর মতো পারলৌকিক বিষয় ফুটে ওঠে। নারী ইস্যুতে ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে প্রচুর ব্যাখ্যা দিতে হয় তাদের।

অপরদিকে ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান, এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন ও মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা তারেক রহমানের প্রচারণায় গুরুত্ব পায় বলে মনে করেন খান রবিউল আলম।

“নাগরিক সেবার উন্নয়নমূলক ভাবনা খুব শক্তভাবে কাজ করেছে। ধর্মের দিকে উনি অতো ঝোঁকেন নাই। রাষ্ট্রের কর্মক্ষমতাকে তুলে ধরেছেন,” বলেন এই বিশ্লেষক।

আরেকটা বেনিফিট হল শেষ ১৭ বছর বিএনপি আন্দোলন করেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সেটারও একটা পুরস্কারও সে পেয়েছে।

সে পুরস্কার হয়ত জামায়াতও কিছুটা পেয়েছে। কারণ জামায়াত নির্যাতিত হয়েছে। আন্দোলন করেছে।

তারেক রহমানের ‘সংযত ও বিদ্বেষহীন’ বক্তব্যই কি আওয়ামী লীগের ভোটারদের বিএনপির প্রতি টেনেছে?

পশ্চিমাঞ্চল জামায়াতের দখলে

দেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মহানগরী এবং মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাংশে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা।

বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীদের জয় পাওয়া আসনগুলোর ম্যাপের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় জামায়াতের প্রার্থীরা সিংহভাগ আসনে জয় পেয়েছে।

জামায়াত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন যেসব জেলায় তার বেশিরভাগই সীমান্তঘেঁষা। কেন দেশের পশ্চিম অংশের সীমান্তঘেঁষা জেলাতে জামায়াতের জয়জয়কার?

দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর আলাপ-কে বলেন, “পশ্চিমের কিছু জেলায় ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর ভোট বেশি। যেমন- সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আগে থেকেই সেখানে জামায়াতের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসছেন।”

কিন্তু এবার হিসাবনিকাশ একেবারে উল্টে গেছে। সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-৩ আসন একসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এবার সেখানে জিতেছেন দাঁড়িপাল্লার আমির হামজা। কুষ্টিয়ার চারটির মধ্যে তিনটিই জামায়াতের।  

চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের চারটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন, যেখানে একসময় প্রভাব ছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের।

যশোরের আসনগুলোতে একসময় দাপট ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। এবার সেখানে ভিন্ন চিত্র। ছয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই জিতেছে জামায়াত।

সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে আট আসনে এবং ঝিনাইদহে তিনটায় জয় পেয়েছে জামায়াত।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে জামায়াতের উত্থানের পেছনে বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্তকেও দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দলের মনোনয়ন ‘যথাযথ’ প্রার্থীকে না দেওয়া এবং দলীয় কোন্দলের অবসান ঘটাতে বিএনপি নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। 

১৯৯১ সাল থেকে রংপুর জেলায় দাপট দেখিয়ে আসছিল জাতীয় পার্টি। এবার সেখানকার ছয়টি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।

নওগাঁর ছয়টি, চাঁপাইনবাগঞ্জের তিনটি, কুড়িগ্রাম দুইটি এবং লালমনিরহাটে তিন আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত।

খান রবিউল আলম মনে করেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জাতীয় পার্টির দুর্বল হয়ে পড়া- এসমস্ত কারণেই মূলত এই শক্তিটা ক্রিয়েট হচ্ছে। এটা নিয়ে ‘সারপ্রাইজড’ হওয়ার কিছু নাই।

তবে জামায়াতের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে ধর্মীয় ওয়াজের প্রচার ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন তিনি।

“আরেকটি হচ্ছে দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। রংপুর ও কুড়িগ্রামে সেই প্রবনতা বেড়েছে।”

দেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মহানগরী এবং মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাংশে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা।

খান রবিউল বলেন, “জামায়াত খারাপ করেছে তুলনামূলক শহুরে এলাকাগুলোতে। কারণ, শহরের মানুষ বেশি তথ্য রাখে, আয়-ইনকাম বেশি। আর দরিদ্র মানুষদের পছন্দের ক্ষেত্রে ধর্ম একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।” 

তবে জামায়াতের সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে দলটির আমীর শফিকুর রহমানের ভূমিকা আছে বলে মনে করেন নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর।

”এই উত্থানের পেছনে রয়েছে বর্তমান আমীরের ডায়নামিক নেতৃত্ব। অতীতের আমীরদের তুলনায় পাবলিক পালস তিনি বেশি অনুভব করতে পারেন।”

আওয়ামী লীগের দুর্গে বিএনপির বিজয়

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রধান প্রতিপক্ষ হবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট, এই হিসাব চলছে ভোটের তফসিলের পর থেকেই।

ক্ষমতায় বসে বিরোধীদলকে সামলানো বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশিরভাগ সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ- বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল মসৃণ হয় না।

জামায়াতের মতো বিরোধীদল সামলানো বিএনপির পক্ষে কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার।

আলাপ-কে তিনি বলেন, “৭০-৮০-৯০ আসনের একটি বিরোধী দল এবং যেই বিরোধী দলের নাম জামায়াতে ইসলামী এবং যে বিরোধী দলে এনসিপি এবং মামুনুল হকের মতো লোকেরা আছেন, তাদের কিন্তু যে কোনো রাজনীতি করার প্রশস্ত জায়গা তৈরি হবে এবং বিএনপিকে খুব সতর্কভাবে দেশ পরিচালনা করতে হবে।”

আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত বেশকিছু অঞ্চলে বিএনপি একচ্ছত্র জয় পেয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর তেমন কোনো উপস্থিতি সেখানে দেখা যায়নি।

গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুরের সিংহভাগ আসনে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা।

খান রবিউল আলম বলেন, ”আওয়ামী লীগের একটা বড় সমর্থন বিএনপি পেয়েছে। আওয়ামী লীগের লোকজনের ক্যালকুশেনটা হচ্ছে, উনারা (বিএনপি) ক্যাম্পেইন প্রসেসের ভেতরে আওয়ামী লীগকে দোষী করা, শেখ হাসিনার বিচার করা, আওয়ামী লীগের লোকজনকে জেলে ভরা- এই ধরনের কোনো রিভেঞ্জ তারা দেখাননি।

“এই কারণে তারা (আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা) একটা ট্রানজিট রুট খুঁজে পেয়েছেন। অথবা তারা মনে করছেন যে, বিএনপি যদি আসে তাহলে আরো কমফোর্টেবল থাকবো, জামায়াতের তুলনায়।”

আশরাফ কায়সার মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় বিএনপিকে বেশি স্বস্তিদায়ক মনে করেন আওয়ামী লীগে সমর্থকেরা।

“প্রায় ৯০ ভাগ আওয়ামী লীগ সমর্থকরা তো আসলে নিরীহ। তারা দলকে ভালোবাসে। তারা তো অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলো না। তারা বিএনপিকে মডারেট মধ্যপন্থি এবং একসাথে বসবাসের মত দল বলে মনে করে।”

“কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে সেটা মনে করে না। এজন্য বিএনপি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক যে সমস্ত জেলাগুলোতে সেই জায়গাতে ভালো করেছে।”

ভোটের আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শেখ হাসিনাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করেছেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের প্রতি সহানুভুতিও ফুটে ওঠে তার বক্তব্যে।

এমনকি বিএনপির নেতাদের আওয়ামী লীগ নিয়ে বিতর্কমূলক বক্তব্য এড়িয়ে চলতে দেখা গেছে।

খান রবিউল আলম বলেন, “বিএনপির পরবর্তী প্রতিপক্ষ শক্তি যদি জামায়াত হয়, আর জামায়াত যদি আন্দোলনে নামে, তখন কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিএনপির লাগবে। সেই শক্তি আওয়ামী লীগ বা অন্য রাজনৈতিক দল।”

তিনি বলেন, “বিএনপি ভাল করেছে এই কারণে যে, বিএনপির বিশাল বিজয়ের পেছনে আওয়ামী লীগের ভোট একটা প্রভাবক। আওয়ামী লীগের ভোট যোগ না হলে ধানের শীষকে কিন্তু চ্যালেঞ্জে পড়তে হতো। বিএনপির কাভার হয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট দিয়ে। কারণ জেনজিদের একটা বড় ভোট পড়েছে দাঁড়িপাল্লায়। আওয়ামী লীগের এই মাইগ্রেশনটা বিএনপিকে উইন করতে হেল্প করেছে।”

ভোটে জিতে সরকার গঠন করতে না পারলেও জামায়াতে ইসলামী বিরোধীদলে শক্ত অবস্থান নেবে বলে দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান এবং তাদের ইসলামপন্থি জোট ভবিষ্যতে বিএনপি ও বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

তারেক রহমান গার্ডিয়ানকে বলেছেন, উগ্র ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চরিত্রের জন্য হুমকি নয়।

“যদি আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে পারি, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারি এবং সম্মানজনক জীবনের সুযোগ দিতে পারি, তাহলে মানুষ এ ধরনের চিন্তা থেকে সরে আসবে,” বলেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে বিএনপি। আর শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। 

ভোটের পর  স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও, নীতিগত ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায় সামনে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।