প্রথম অধিবেশনেই উত্তেজনা, স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বিরোধী দলের ওয়াকআউট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনটি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীরা ওয়াকআউট করে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩০ পিএমআপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদে ঘটেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হলেও, ত্বরিত উত্তেজনা সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সংসদের বেশ কিছু সদস্য ওয়াকআউট করেন, যা নিয়ে সংসদে তীব্র আলোচনার ঝড় ওঠে।
সংসদীয় বক্তব্যে একদিকে প্রধানমন্ত্রী সংসদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার কথা বলেন, অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গতানুগতিক নয়, বরং বিশেষ সংসদ হিসেবে এই সংসদকে দেখতে চান।
অধিবেশন শুরু
বৃহস্পতিবারের অধিবেশন শুরু হয় কিছু অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় প্রথমে সভাপতি মনোনয়ন করা হয়।
অধিবেশন শুরুর সময় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি মনোনয়ন করা হয়। তার সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়।
সভাপতি নিয়ে একমত সরকার ও বিরোধীদল, কিন্তু
অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সমর্থন সরকার দলের পক্ষ থেকে সমর্থন জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রধানমন্ত্রী যার নাম প্রস্তাব করেছেন তিনি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। তার প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে।
একইসঙ্গে তিনি বলেন, তবে এই ধরনের প্রস্তাব করার আগে প্রধানমন্ত্রী অথবা তার প্রতিনিধি বিরোধী দলের সঙ্গে সমন্বয় করলে আরও ভালো হতো।
ডা. তাহের আরও বলেন, “আগামীতে এই ধরণের যে সমস্ত বিষয় আসবে আলোচনা করা সম্ভব সরকারি দল বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করলে পূর্বেই পরিবেশটা আরও উন্নত হয়।”
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবার ভোলা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এর আগে, তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।
ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা কায়সার কামাল। নেত্রকোনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
সংসদ অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বপালনকারী খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে মনোনয়ন জমা পড়েছিলো একটি করেই।
শুরুতেই মাইক্রোফোন নষ্ট
নবনির্বাচিত স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হতেই তার মাইকে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। জানা যায়, সিস্টেম হ্যাং হওয়ার কারণে মাইক থেকে শব্দ আসছিল না।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ৫৫ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন তার আসনে বসেন। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে সংসদ সদস্যরা তার বক্তব্য শুনতে পাননি। অনেকেই দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্পিকার বলেন, “আমার মূল মাইক এখনও অকেজো। আমি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করছি। সবাই ধৈর্য ধরুন। ১৭ বছর পর আমরা কার্যকর সংসদ পেয়েছি। অনভ্যস্ত সংসদ গণতান্ত্রিক বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত নয়। আশা করি, শিগগিরই সমস্যা সমাধান হবে।”
প্রাণবন্ত সংসদ চান প্রধানমন্ত্রী
প্রথম অধিবেশনে দুই দফায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্পিকার নির্বাচনের আগে ও পরে স্পিকারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সংসদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তারেক রহমান বলেন, বিগত দেড় দশকে যারা নিজেদের এমপি পরিচয় দিয়েছিলেন, তারা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। আজ দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষ এই সংসদের দিকে এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা এই সংসদকে অর্থবহ করতে চাই।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করতে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা চাই না। বরং সারগর্ভ ও যুক্তিযুক্ত তর্কের মাধ্যমে আমরা এই সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলতে চাই।
নিরপেক্ষ স্পিকার চান বিরোধী দলীয় নেতা
তারেক রহমানের পরে বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
বর্তমান সংসদকে গতানুগতিক কোনো সংসদ নয় বরং ২৪-এর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশেষ সংসদ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর যারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং জুলাই বিপ্লবে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের ত্যাগের বিনিময়েই আজ এই সংসদ গঠিত হয়েছে।
অধিবেশনে তিনি বলেন, “আজকের এই সংসদে অনেক তরুণ সদস্য এখানে। আমি বয়সে একটু বেশি হলেও, আমিও তরুণ। আমার জীবনে এটা প্রথমে এই সংসদে ঢোকা। সুতরাং আমিও তরুণদের একজন।”
সংসদে নব নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান শফিকুর রহমান। হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ‘লড়াকু বীর মুক্তিযোদ্ধা’ অভিহিত করে তাকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দেন বিরোধীদলীয় নেতা।
বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, “আজকের এই সংসদ গতানুগতিক কোন সংসদ নয়। এটি চব্বিশের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সংসদ।”
জীবনের প্রথম সংসদ অধিবেশন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অতীতে সংসদে জণগণের কল্যাণের আলোচনার পরিবর্তে মানুষের চরিত্রহননে বিপুল সময় ব্যয় হয়েছে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ উচ্চারণ করে স্পিকারের কাছ থেকে 'ইনসাফ' আশা করেন বলে জানান শফিকুর রহমান।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথের আহ্বান নাহিদ ইসলামের
ফ্যাসিবাদের দোসরমুক্ত জাতীয় সংসদ দেখতে চান বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলাম।
সরকারি দলের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ বলেন, “গণভোটের রায় অনুযায়ী আমরা যেমন সংসদ সদস্য একইভাবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য। আমাদের সরকারি দলের বন্ধুরা অবিলম্বে সংবিধান সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন বলেই আমরা বিশ্বাস করি।”
গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলো সাধন করতে চাই জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে তাদের রায় দিয়েছে। গণতন্ত্রে জনতার রায়ই সার্বভৌম- তার উপর কোন আইন বা বিধান চলতে পারে না।”
বক্তব্যে জুলাই গণআন্দোলনে নিহত- আহত সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলেন, তাদের অপরিসীম আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা সংসদ সদস্য। তিনি তার বক্তব্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অংশ নেয়া ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, অভিবাভবক, সাংস্কৃতিক কর্মী, আলেম সমাজ, তরুণ সেনা অফিসার- সৈনিক ও প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম জুলাই গণহত্যা, শরীফ ওসমান হাদী ও গুম-খুনের বিচারসহ বিগত সময় হওয়া লুটপাট এবং দুর্নীতির বিচার চান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কবিতা পাঠ
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে কবিতা পাঠ করেছেন বিএনপি মহসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বক্তব্যের সময় তিনি বলেন, আমি কবিতা পড়তে ভালোবাসি। তাই বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখা কয়েক লাইন কবিতা পড়ে শোনাতে চাই।
এরপর তিনি আল-মাহমুদের এর একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
জাতীয় সঙ্গীতের সময় বসে থাকা নিয়ে বিতর্ক
সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি যখন আসেন তখন জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছিল। সেসময় সরকারি দলের সব সংসদ সদস্য দাঁড়ালেও বসেছিলেন বিরোধী দল জামায়তে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়ত নেতাদের ইশারা করছেন দাঁড়ানোর জন্য। এক পর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহকে সবাইকে দাাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে দেখা যায়। এরপর সবাই উঠে দাঁড়ান।
ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শুক্রবার বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি চুপ্পু যখন সংসদে প্রবেশ করে তখন তাকে সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে যান এবং বিরোধীদলের সদস্যরা বসে যান। পাশাপাশি বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দ উচ্চ আওয়াজে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি মহান সংসদে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীত বাজানো শুরু হয়ে যায় কিন্তু বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদে ব্যস্ত থাকায় এবং স্পিকারে সাউন্ড সমস্যা থাকায় জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়টা প্রতিবাদরত বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বুঝতে পারেননি।
নবীন এই সংসদ সদস্য বলেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ (এমপি) জাতীয় সংগীত চলার বিষয়টা টের পেলে তিনি বিষয়টা বাকি সংসদ সদস্যদের জানান। জানা মাত্রই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং জাতীয় সংগীত শেষ হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বিরোধী দলের ওয়াকআউট
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে প্রায় পাঁচ মিনিট বিক্ষোভের পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের জন্য সংসদে আমন্ত্রণ জানালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম কিছু বলার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্পিকার মাইক না দিলে নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিলার ইন দা পার্লামেন্ট!’ তিনি ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানান। এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সব সদস্য নানা বক্তব্য দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন।
তখন বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে শুধু জামায়াতের আমীর তার আসনে বসে ছিলেন। স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালেও তারা বিক্ষোভ দেখাতেই থাকেন।
একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ বলে স্লোগান দেন। এই হইচইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদে স্পিকারের আসনের পাশে আসেন। স্পিকার তাকে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানান। তখনো বিক্ষোভ চলছিল। একপর্যায়ে স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে তার ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য সংসদ সদস্যরা ‘গেট আউট, গেট আউট’ বলে স্লোগান দেন।
এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ‘লজ্জা লজ্জা’ হলে বিদ্রূপ করেন।
স্পিকার বারবার সংসদ সদস্যদের প্রতি সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করার আহ্বান জানান। কিন্তু বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। শেষে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ‘ওয়াকআউট’ করার ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।
অন্যদিকে ভাষণ চালিয়ে যেতে থাকেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হয়। এর পরপরই অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মূলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার। বিরোধীদলীয় সদস্যরা আর সংসদ অধিবেশনে যোগ দেননি।
ওয়াকআউট নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ওয়াকআউট করে বেড়িয়ে আসার পর গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তখনকার প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। পরবর্তীতে দুইটি গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তা অস্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, এই ঘটনায় রাষ্ট্রপতি ‘জাতির কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন’।
এর পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার আর কোনো নৈতিক অধিকার থাকে না বলে দাবি করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে, গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছিলো।
সেই অধিবেশন না ডেকে রাষ্ট্রপতি গণভোটে পক্ষে ভোট দেওয়া ৭০ ভাগ জনগণকে অপমান করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এই তিন অপরাধের কারণে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা তার ভাষণ শুনতে চাননি বলে জানান শফিকুর রহমান।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংসদে ওয়াকআউট নতুন কিছু নয়।
যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তারা আলাপ আলোচনা করেছেন ৫ই অগাস্ট বিকেলবেলা, যে রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা শপথ নিয়েছেন, তাদের দু’একজন এই সংসদেও সংসদ সদস্য হয়ে এসেছেন। তো সেটা তাদেরকে জিজ্ঞেস করা যায় এই স্ববিরোধীতা কেন।”
এই সংসদ অর্থবহ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে বলে আশাবাদ রেখে তিনি বলেন, “জাতীয় সকল সমস্যার এবং ইস্যুর এখানে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে আমরা সমাধানের দিকে যাবো।”
মন্ত্রিসভার নতুন সদস্য
সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখিপুর) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। অধিবেশনের বিরতির সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে শপথ পড়ান।
প্রথম অধিবেশনেই উত্তেজনা, স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বিরোধী দলের ওয়াকআউট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনটি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীরা ওয়াকআউট করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদে ঘটেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হলেও, ত্বরিত উত্তেজনা সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সংসদের বেশ কিছু সদস্য ওয়াকআউট করেন, যা নিয়ে সংসদে তীব্র আলোচনার ঝড় ওঠে।
সংসদীয় বক্তব্যে একদিকে প্রধানমন্ত্রী সংসদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার কথা বলেন, অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গতানুগতিক নয়, বরং বিশেষ সংসদ হিসেবে এই সংসদকে দেখতে চান।
অধিবেশন শুরু
বৃহস্পতিবারের অধিবেশন শুরু হয় কিছু অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় প্রথমে সভাপতি মনোনয়ন করা হয়।
অধিবেশন শুরুর সময় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি মনোনয়ন করা হয়। তার সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়।
সভাপতি নিয়ে একমত সরকার ও বিরোধীদল, কিন্তু
অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সমর্থন সরকার দলের পক্ষ থেকে সমর্থন জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রধানমন্ত্রী যার নাম প্রস্তাব করেছেন তিনি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। তার প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে।
একইসঙ্গে তিনি বলেন, তবে এই ধরনের প্রস্তাব করার আগে প্রধানমন্ত্রী অথবা তার প্রতিনিধি বিরোধী দলের সঙ্গে সমন্বয় করলে আরও ভালো হতো।
ডা. তাহের আরও বলেন, “আগামীতে এই ধরণের যে সমস্ত বিষয় আসবে আলোচনা করা সম্ভব সরকারি দল বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করলে পূর্বেই পরিবেশটা আরও উন্নত হয়।”
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবার ভোলা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এর আগে, তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।
ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা কায়সার কামাল। নেত্রকোনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
সংসদ অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বপালনকারী খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে মনোনয়ন জমা পড়েছিলো একটি করেই।
শুরুতেই মাইক্রোফোন নষ্ট
নবনির্বাচিত স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হতেই তার মাইকে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। জানা যায়, সিস্টেম হ্যাং হওয়ার কারণে মাইক থেকে শব্দ আসছিল না।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ৫৫ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন তার আসনে বসেন। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে সংসদ সদস্যরা তার বক্তব্য শুনতে পাননি। অনেকেই দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্পিকার বলেন, “আমার মূল মাইক এখনও অকেজো। আমি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করছি। সবাই ধৈর্য ধরুন। ১৭ বছর পর আমরা কার্যকর সংসদ পেয়েছি। অনভ্যস্ত সংসদ গণতান্ত্রিক বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত নয়। আশা করি, শিগগিরই সমস্যা সমাধান হবে।”
প্রাণবন্ত সংসদ চান প্রধানমন্ত্রী
প্রথম অধিবেশনে দুই দফায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্পিকার নির্বাচনের আগে ও পরে স্পিকারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সংসদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তারেক রহমান বলেন, বিগত দেড় দশকে যারা নিজেদের এমপি পরিচয় দিয়েছিলেন, তারা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। আজ দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষ এই সংসদের দিকে এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা এই সংসদকে অর্থবহ করতে চাই।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করতে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা চাই না। বরং সারগর্ভ ও যুক্তিযুক্ত তর্কের মাধ্যমে আমরা এই সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলতে চাই।
নিরপেক্ষ স্পিকার চান বিরোধী দলীয় নেতা
তারেক রহমানের পরে বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
বর্তমান সংসদকে গতানুগতিক কোনো সংসদ নয় বরং ২৪-এর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশেষ সংসদ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর যারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং জুলাই বিপ্লবে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের ত্যাগের বিনিময়েই আজ এই সংসদ গঠিত হয়েছে।
অধিবেশনে তিনি বলেন, “আজকের এই সংসদে অনেক তরুণ সদস্য এখানে। আমি বয়সে একটু বেশি হলেও, আমিও তরুণ। আমার জীবনে এটা প্রথমে এই সংসদে ঢোকা। সুতরাং আমিও তরুণদের একজন।”
সংসদে নব নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান শফিকুর রহমান। হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ‘লড়াকু বীর মুক্তিযোদ্ধা’ অভিহিত করে তাকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দেন বিরোধীদলীয় নেতা।
বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, “আজকের এই সংসদ গতানুগতিক কোন সংসদ নয়। এটি চব্বিশের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সংসদ।”
জীবনের প্রথম সংসদ অধিবেশন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অতীতে সংসদে জণগণের কল্যাণের আলোচনার পরিবর্তে মানুষের চরিত্রহননে বিপুল সময় ব্যয় হয়েছে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ উচ্চারণ করে স্পিকারের কাছ থেকে 'ইনসাফ' আশা করেন বলে জানান শফিকুর রহমান।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথের আহ্বান নাহিদ ইসলামের
ফ্যাসিবাদের দোসরমুক্ত জাতীয় সংসদ দেখতে চান বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলাম।
সরকারি দলের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ বলেন, “গণভোটের রায় অনুযায়ী আমরা যেমন সংসদ সদস্য একইভাবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য। আমাদের সরকারি দলের বন্ধুরা অবিলম্বে সংবিধান সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন বলেই আমরা বিশ্বাস করি।”
গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলো সাধন করতে চাই জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে তাদের রায় দিয়েছে। গণতন্ত্রে জনতার রায়ই সার্বভৌম- তার উপর কোন আইন বা বিধান চলতে পারে না।”
বক্তব্যে জুলাই গণআন্দোলনে নিহত- আহত সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলেন, তাদের অপরিসীম আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা সংসদ সদস্য। তিনি তার বক্তব্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অংশ নেয়া ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, অভিবাভবক, সাংস্কৃতিক কর্মী, আলেম সমাজ, তরুণ সেনা অফিসার- সৈনিক ও প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম জুলাই গণহত্যা, শরীফ ওসমান হাদী ও গুম-খুনের বিচারসহ বিগত সময় হওয়া লুটপাট এবং দুর্নীতির বিচার চান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কবিতা পাঠ
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে কবিতা পাঠ করেছেন বিএনপি মহসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বক্তব্যের সময় তিনি বলেন, আমি কবিতা পড়তে ভালোবাসি। তাই বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখা কয়েক লাইন কবিতা পড়ে শোনাতে চাই।
এরপর তিনি আল-মাহমুদের এর একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
জাতীয় সঙ্গীতের সময় বসে থাকা নিয়ে বিতর্ক
সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি যখন আসেন তখন জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছিল। সেসময় সরকারি দলের সব সংসদ সদস্য দাঁড়ালেও বসেছিলেন বিরোধী দল জামায়তে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়ত নেতাদের ইশারা করছেন দাঁড়ানোর জন্য। এক পর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহকে সবাইকে দাাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে দেখা যায়। এরপর সবাই উঠে দাঁড়ান।
ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শুক্রবার বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি চুপ্পু যখন সংসদে প্রবেশ করে তখন তাকে সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে যান এবং বিরোধীদলের সদস্যরা বসে যান। পাশাপাশি বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দ উচ্চ আওয়াজে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি মহান সংসদে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীত বাজানো শুরু হয়ে যায় কিন্তু বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদে ব্যস্ত থাকায় এবং স্পিকারে সাউন্ড সমস্যা থাকায় জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়টা প্রতিবাদরত বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বুঝতে পারেননি।
নবীন এই সংসদ সদস্য বলেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ (এমপি) জাতীয় সংগীত চলার বিষয়টা টের পেলে তিনি বিষয়টা বাকি সংসদ সদস্যদের জানান। জানা মাত্রই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং জাতীয় সংগীত শেষ হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বিরোধী দলের ওয়াকআউট
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে প্রায় পাঁচ মিনিট বিক্ষোভের পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের জন্য সংসদে আমন্ত্রণ জানালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম কিছু বলার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্পিকার মাইক না দিলে নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিলার ইন দা পার্লামেন্ট!’ তিনি ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানান। এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সব সদস্য নানা বক্তব্য দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন।
তখন বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে শুধু জামায়াতের আমীর তার আসনে বসে ছিলেন। স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালেও তারা বিক্ষোভ দেখাতেই থাকেন।
একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ বলে স্লোগান দেন। এই হইচইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদে স্পিকারের আসনের পাশে আসেন। স্পিকার তাকে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানান। তখনো বিক্ষোভ চলছিল। একপর্যায়ে স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে তার ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য সংসদ সদস্যরা ‘গেট আউট, গেট আউট’ বলে স্লোগান দেন।
এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ‘লজ্জা লজ্জা’ হলে বিদ্রূপ করেন।
স্পিকার বারবার সংসদ সদস্যদের প্রতি সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করার আহ্বান জানান। কিন্তু বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। শেষে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ‘ওয়াকআউট’ করার ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।
অন্যদিকে ভাষণ চালিয়ে যেতে থাকেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হয়। এর পরপরই অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মূলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার। বিরোধীদলীয় সদস্যরা আর সংসদ অধিবেশনে যোগ দেননি।
ওয়াকআউট নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ওয়াকআউট করে বেড়িয়ে আসার পর গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তখনকার প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। পরবর্তীতে দুইটি গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তা অস্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, এই ঘটনায় রাষ্ট্রপতি ‘জাতির কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন’।
এর পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার আর কোনো নৈতিক অধিকার থাকে না বলে দাবি করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে, গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছিলো।
সেই অধিবেশন না ডেকে রাষ্ট্রপতি গণভোটে পক্ষে ভোট দেওয়া ৭০ ভাগ জনগণকে অপমান করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এই তিন অপরাধের কারণে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা তার ভাষণ শুনতে চাননি বলে জানান শফিকুর রহমান।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংসদে ওয়াকআউট নতুন কিছু নয়।
যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তারা আলাপ আলোচনা করেছেন ৫ই অগাস্ট বিকেলবেলা, যে রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা শপথ নিয়েছেন, তাদের দু’একজন এই সংসদেও সংসদ সদস্য হয়ে এসেছেন। তো সেটা তাদেরকে জিজ্ঞেস করা যায় এই স্ববিরোধীতা কেন।”
এই সংসদ অর্থবহ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে বলে আশাবাদ রেখে তিনি বলেন, “জাতীয় সকল সমস্যার এবং ইস্যুর এখানে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে আমরা সমাধানের দিকে যাবো।”
মন্ত্রিসভার নতুন সদস্য
সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখিপুর) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। অধিবেশনের বিরতির সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে শপথ পড়ান।
বিষয়: