“যেকোনো মেয়ে যখনই সে বাইরে চলে আসে, তার একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব দাঁড়ায়, তার নিজস্ব বক্তব্য থাকে, যখনই সে নিজস্ব একটা মতামত ব্যক্ত করে, তখনই কিন্তু সে বেশি বুলিংয়ের শিকার হয়, তখনই তাকে নিয়ে এ ধরনের মর্যাদাহানিকর, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলা হয়।”
ফাতিন নূর অবনি
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৩ পিএমআপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
"সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি এবং 'মোরাল' পুলিশিং নারীদের জনজীবন ও রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে।"
জাইমা রহমান যেদিন প্রসঙ্গ তুললেন তার কয়েকদিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেই শিকার হলেন 'মোরাল পুলিশিং'য়ের।
ঘটনাচক্রে জাইমা রহমান এখন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন চরিত্র। যদিও তিনি রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত নন, কিন্তু তিনি বাংলাদেশের 'ফার্স্ট ফ্যামিলি মেম্বার’। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা তিনি।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশের কোনো একটি ক্লাবে নেচে গেয়ে সময় উদযাপন করছেন একদল বন্ধু।
ছবি আর ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেইসবুক উত্তাল হয়ে ওঠে। বলা হয় সেই ছবি ভিডিওর একজন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান।
ছবি-ভিডিও শেয়ার করে কটু মন্তব্যের বন্যায় ভেসে যায় টাইমলাইন। চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও বাদ দেননি কেউ। অনেকেই মন্তব্য করেন ‘ভেবেছিলাম ভালো মেয়ে’।
প্রথমত ছবিটির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে? একাধিক ফ্যাক্ট চেকার ছবিটিকে এআই বা ডিপফেকইক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
ছবিটির সত্যাসত্য ভিন্ন বিতর্ক। বরং প্রশ্ন উঠছে ‘ভালো মেয়ের সংজ্ঞা কী?’। নিছকই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র হওয়ার কারণেই কি জাইমা রহমানের দিকে বাঁকা চোখের মন্তব্য? না-কি সহজাত ‘পুরুষতান্ত্রিক’ মনোভাবনারই প্রকাশ।
সংজ্ঞা ঠিক করবে কে?
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, “ভালো মেয়ে বলতে কাদেরকে বোঝানো হচ্ছে? ভালো মেয়ে মানে কী? কার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভালো মেয়ে হতে হবে? কে সেটা বলার অধিকার রাখে?”
সমাজবিজ্ঞান কিংবা অপরাধবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যেই কর্মকান্ড বাংলাদেশে বেআইনি নয় কিংবা সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতি নেই, সেসবের উচিত অনুচিতের চৌহদ্দি ঠিক করবে কে?
সমাজ কিছু অদৃশ্য নিয়ম-রীতি আরোপ করে, সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘জেন্ডার নর্মস’ বা লিঙ্গীয় আচরণবিধি। এর কোনো নির্ধারিত নিয়ম নেই, বরং সামাজিক মনোজগতের ওপর নির্ভর করে তা প্রতিনিয়ত পাল্টে যায়।
আইটি ইউনিভার্সিটি অব কোপেনেহেগেনের গবেষক হাসিব আহসান নাদিম মনে করেন, রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মা-খালা-নানি-দাদিদের মানুষ যেভাবে দেখে, সেই পর্যবেক্ষণই সমাজে প্রতিফলনের চেষ্টা করে।
হাসিব আহসান বলছিলেন, “জাইমা রহমানকে নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে একটা “জেন্ডার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড” কাজ করছে। সাংস্কৃতিক চর্চা থেকেই এই মনোভাবের উৎপত্তি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, ড. কাজলী সেহ্রিন ইসলাম বলেন, “একজন ‘ভালো’ নারী বা মেয়ে বলতে এ সমাজ মূলত একজন অনুগত নারীকে বোঝে, যিনি তাকে যা বলা হয় এবং তার কাছে যা আশা করা হয় তাই করেন এবং যার চরিত্র ও আচার আচরণ সমাজের বেঁধে দেওয়া নারীসুলভ প্রত্যাশা ও বাধাধরা নিয়মের সাথে মিলে যায়।”
সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন মনে করেন, সমাজ তাকেই ‘ভালো মেয়ে’ বলছে যে গান শুনতে পারবে না, নাচতে পারবে না, বন্ধুদের সাথে বসতে পারবে না। যে সবসময়ই একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকবে।
নাচ কি অপরাধ?
লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর থেকে উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিচ্ছেন জাইমা রহমান। কার্যত রাজনীতিতে এখনও সক্রিয় হননি।
নির্বাচনের কয়েকদিন পর থেকেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন তিনি। যারা তার বন্ধুদের সাথে কাটানো ব্যক্তিগত সময়ের আচরণ ও পোশাক নিয়ে সমালোচনা করছে। একে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণ’ বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে গবেষক হাসিব আহসান নাদিম বলছেন, “ছেলেরা নাচতে পারলেও মেয়েরা পারবে না, কেন পারবে না? কারণ আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা মোরাল সারভেইল্যান্স, একটা মোরাল পুলিশিং করার চেষ্টা করি।”
আইনজীবী সারা হোসেন প্রশ্ন তুলছেন, “সে নাচ করছে বা বন্ধুদের সাথে আছে, এটাই কি অভিযোগ? নাচ করা কি অপরাধ?”
কারো ব্যক্তি জীবনের কোনো বিষয় যা বাংলাদেশে কখনও অপরাধ বলে গণ্য করা হয়নি, তাকে একটা সামাজিক বা নৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখাকে অত্যন্ত রক্ষণশীল ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিকোণ বলে মনে করছেন এই সিনিয়র আইনজীবী।
জাইমা রহমানকে টার্গেট করার পিছনে লৈঙ্গিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষক হাসিব আহসান নাদিম মনে করেন, বাংলাদেশে প্রচলিত নয় এমন কোন আচার যখন একটা রাজনৈতিক পরিবারের কাউকে করতে দেখা যায় তখন বিরোধীরা অনলাইন ট্রলিংকে বেছে নেন।
“জনপরিসরে থাকা নারীরা শুধু চরিত্র হননেরই শিকার হন না, এমনকি তাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পুরুষ রাজনীতিবিদদের মধ্যকার ক্ষমতার রাজনীতিতেও তাদের ব্যবহার করা হয়।”, এমন মত ড. কাজলী সেহ্রিনের। তিনি বলেন,”নারীবিদ্বেষীরা মূলত এই ইঙ্গিতই দিতে চায় যে, “নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ‘পুরুষত্ব’ যার নেই, সে কীভাবে দেশ চালাবে?”
সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন বলছিলেন, “ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করসে, ইংল্যান্ডে বড় হইসে, স্বাভাবিক একজন সাধারন মানুষ গান শুইনা নাচে। আমার মেয়েও নাচে।”
”একটা মানুষ তার মতো করে একটা জিনিস উপভোগ করতেসে, তাকে নিয়ে এসব বলা এটা ’টেস্টলেস’, যোগ করেন খালেদ মুহিউদ্দীন।
নারীর ব্যক্তি জীবন রাজনৈতিক হাতিয়ার
সীমা মোসলেম বলছেন, “যেকোনো মেয়ে যখনই সে বাইরে চলে আসে, তার একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব দাঁড়ায়, তার নিজস্ব বক্তব্য থাকে, যখনই সে নিজস্ব একটা মতামত ব্যক্ত করে, তখনই কিন্তু সে বেশি বুলিংয়ের শিকার হয়, তখনই তাকে নিয়ে এ ধরনের মর্যাদাহানিকর, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলা হয়।”
এমন ঘটনা কম-বেশি সবসময়ই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে মনে করেন এই নারী অধিকার কর্মী।
তবে সারা হোসেন বলছেন, রাজনীতিতে নারীদের ছোট করে দেখার এই সংস্কৃতি আরও আগে থেকেই চলে আসছে।
তিনি বলেন, “আমরা এর আগেও শেখ হাসিনা, তার নারী মন্ত্রী এবং তার পরিবারের নারী সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জঘন্য ট্রোলিং দেখেছি। এখন আমরা যা দেখছি, সেটি ঠিক ততটাই অগ্রহণযোগ্য।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনীতিতে যখনই কোনো নারী নেতৃত্ব জনপ্রিয় হতে শুরু করেন, তখনই তার 'চরিত্র' নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। তবে এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ধারা।
সীমা মোসলেম বলছেন, “প্রতি ৫ জন নারীর ৩ জনই সহিংসতার শিকার হন। সারা বিশ্বেই, আজকে যাদেরকে আমরা উন্নত দেশ বলছি, সবখানেই। জাতিসংঘ কিন্তু তাই বলছে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই এই সহিংসতার কারণ।”
ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিনের ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস করে তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। একইভাবে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজের কলেজের একটি নাচের ভিডিও প্রচার করে তাকে 'অপরিণত' প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে ড. কাজলী সেহ্রিন বলেন, “সাধারণভাবে নারী, বিশেষ করে যারা রাজনীতি বা জনপরিসরে সক্রিয়, তাদের ক্ষেত্রে তাদের পেশাগত পরিচয় থেকে মানুষ আসলে তাদের ‘নারী’ পরিচয় এবং যৌনতাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।”
এআই বিতর্ক
জাইমা রহমানের নাম দিয়ে ভাইরাল হওয়া ছবি ভিডিও নিয়ে ফ্যাক্ট চেকাররা বলছেন এটি এআই দিয়ে তৈরি।
তার বিদেশের জীবনকে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার অংশ হিসেবে ব্যবহার করে মূলত রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চলছে।
একজন পুরুষ রাজনীতিবিদের এমন ছবি পাওয়া গেলে কি একই প্রতিক্রিয়া হতো? হাসিব আহসান নাদিম বলেন, “ছেলেদের শেমিং, যেটা আমরা আগেও দেখেছি, সেটা কোনো মদের বোতলের সাথে দেখানো হয় বা কোনো মাফিয়ার সাথে মিট করার জন্য দেখানো হয়। কিন্তু ফিমেইলদের ক্ষেত্রে, আমাদের সমাজে যেটা হয়, আমাদের যে বাঙালি বা রিলিজিয়াস রিপ্রেজেন্টেশান আছে, সেটাকে একটা টুল হিসেবে ইউজ করে মেয়েদের ড্রেসটাকে আনা হয়।”
ড. কাজলী সেহ্রিন বলেন, “ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো কি না, সেটি কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন হতে পারে না। আসলে এখানে কোনো কৈফিয়তেরই প্রয়োজন নেই।”
“আযানের সময় জাইমা রহমানের মাথায় কাপড় দেওয়া যেমন কোনো সংবাদ হওয়ার মতো বিষয় ছিল না, তেমনি তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কারও মাথাব্যথার কোনো কারণ নেই”, যোগ করেন ড. সেহ্রিন।
ছড়িয়ে পড়া ছবি ভিডিওগুলোতে কাউকে নিন্দা জানানোর মতো কোনো উপকরণ ছিলো কি না প্রশ্ন করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই যারা এই ছবি ভিডিও নিয়ে মন্তব্য করছে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
সব স্তরেই ‘মোরাল পুলিশিং'
সোশ্যাল মিডিয়ার এই আক্রমণ কেবল নামজাদা রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেই নয়ম বরং সব স্তরের নারীরাই এর শিকার হন।
সম্প্রতি ফারিয়া ইলা নামের এক তরুণীর ট্রাকে গান গাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকেও নানা মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে।
'আলাপ'-এর পডকাস্টে এসে তিনি যখন তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, সেখানেও দেখা গেছে মন্তব্যকারীদের বড় অংশ তার পোশাক নিয়েই মন্তব্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন পুরুষ যখন একই ধরণের কাজ করেন, তাকে বড়জোর 'বখাটে' বা 'উচ্ছৃঙ্খল' বলা হয়। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সেটি সরাসরি তার 'চরিত্র' এবং 'পারিবারিক সম্মানের' সাথে জুড়ে দেওয়া হয়।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার একটি মতামত কলাম লিখেছিলেন। যেখানে তিনি বলেন, “৯৯ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি নারীদের প্রতি কমপক্ষে একটি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।”
সীমা মোসলেম বলছেন, “কোনো একটা সহিংসতার পর মেয়েটার কি দোষ ছিলো সেটাই আমরা আগে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, তারপর সহিংসতা কেন হলো তা দেখতে যাই।”
বাংলাদেশে পাবলিক ফিগারদের ব্যক্তি জীবন নিয়ে সাইবার বুলিংয়ের তালিকা বেশ দীর্ঘ। অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা বা পরীমণি যখনই কোনো সংকটে পড়েছেন বা প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন, তখনই তাদের অতীত জীবন ও পোশাক আলোচনায় এসেছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা নারী নেত্রী উমামা ফাতেমা বা নুসরাত তাবাসসুমদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র। আন্দোলনের যৌক্তিকতার প্রশ্নের চেয়ে ব্যক্তি জীবন বা বন্ধুমহলের ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলেছে।
নারী অধিকার কর্মী সীমা মোসলেমের মতে, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি না, এটা নারীর মধ্যেও আছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে থাকায় নারীদের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি বলে মনে করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধিকার কর্মীদের মতে, যখন একজন নারী প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক ছাঁচ ভেঙে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেন, তখন তাকে থামানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পথ হলো তাকে সামাজিকভাবে 'ধর্মবিরোধী' বা 'সংস্কৃতিবিরোধী' তকমা দেওয়া।
কেন নারী সহজ লক্ষ্যবস্তু
সামাজিক কাঠামোতে নারীর অধস্তন অবস্থার কারণেই নারীর প্রতি এই দৃষ্টিকোণ মনে করেন সীমা মোসলেম। তিনি বলেন, “সমাজের ক্ষমতার কাঠামোতে নারী সবসময় নিচে আছে। এর কারণেই নারীর প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করছে। সেটা আমাদের পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, জনপরিসরে, সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়।”
সাইবার স্পেস নারীর উপর সহিংসতার অবাধ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। জবাবদিহিতাহীন চিন্তা প্রকাশ কখনও হয়ে ওঠে অন্যের ক্ষতির কারণ।
ভালো মেয়ের সংজ্ঞা কী
“যেকোনো মেয়ে যখনই সে বাইরে চলে আসে, তার একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব দাঁড়ায়, তার নিজস্ব বক্তব্য থাকে, যখনই সে নিজস্ব একটা মতামত ব্যক্ত করে, তখনই কিন্তু সে বেশি বুলিংয়ের শিকার হয়, তখনই তাকে নিয়ে এ ধরনের মর্যাদাহানিকর, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলা হয়।”
"সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি এবং 'মোরাল' পুলিশিং নারীদের জনজীবন ও রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে।"
৯ই ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজের একটি পোস্টের লাইন এটি।
জাইমা রহমান যেদিন প্রসঙ্গ তুললেন তার কয়েকদিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেই শিকার হলেন 'মোরাল পুলিশিং'য়ের।
ঘটনাচক্রে জাইমা রহমান এখন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন চরিত্র। যদিও তিনি রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত নন, কিন্তু তিনি বাংলাদেশের 'ফার্স্ট ফ্যামিলি মেম্বার’। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা তিনি।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশের কোনো একটি ক্লাবে নেচে গেয়ে সময় উদযাপন করছেন একদল বন্ধু।
ছবি আর ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেইসবুক উত্তাল হয়ে ওঠে। বলা হয় সেই ছবি ভিডিওর একজন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান।
ছবি-ভিডিও শেয়ার করে কটু মন্তব্যের বন্যায় ভেসে যায় টাইমলাইন। চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও বাদ দেননি কেউ। অনেকেই মন্তব্য করেন ‘ভেবেছিলাম ভালো মেয়ে’।
প্রথমত ছবিটির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে? একাধিক ফ্যাক্ট চেকার ছবিটিকে এআই বা ডিপফেকইক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
ছবিটির সত্যাসত্য ভিন্ন বিতর্ক। বরং প্রশ্ন উঠছে ‘ভালো মেয়ের সংজ্ঞা কী?’। নিছকই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র হওয়ার কারণেই কি জাইমা রহমানের দিকে বাঁকা চোখের মন্তব্য? না-কি সহজাত ‘পুরুষতান্ত্রিক’ মনোভাবনারই প্রকাশ।
সংজ্ঞা ঠিক করবে কে?
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, “ভালো মেয়ে বলতে কাদেরকে বোঝানো হচ্ছে? ভালো মেয়ে মানে কী? কার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভালো মেয়ে হতে হবে? কে সেটা বলার অধিকার রাখে?”
সমাজবিজ্ঞান কিংবা অপরাধবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যেই কর্মকান্ড বাংলাদেশে বেআইনি নয় কিংবা সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতি নেই, সেসবের উচিত অনুচিতের চৌহদ্দি ঠিক করবে কে?
সমাজ কিছু অদৃশ্য নিয়ম-রীতি আরোপ করে, সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘জেন্ডার নর্মস’ বা লিঙ্গীয় আচরণবিধি। এর কোনো নির্ধারিত নিয়ম নেই, বরং সামাজিক মনোজগতের ওপর নির্ভর করে তা প্রতিনিয়ত পাল্টে যায়।
আইটি ইউনিভার্সিটি অব কোপেনেহেগেনের গবেষক হাসিব আহসান নাদিম মনে করেন, রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মা-খালা-নানি-দাদিদের মানুষ যেভাবে দেখে, সেই পর্যবেক্ষণই সমাজে প্রতিফলনের চেষ্টা করে।
হাসিব আহসান বলছিলেন, “জাইমা রহমানকে নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে একটা “জেন্ডার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড” কাজ করছে। সাংস্কৃতিক চর্চা থেকেই এই মনোভাবের উৎপত্তি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, ড. কাজলী সেহ্রিন ইসলাম বলেন, “একজন ‘ভালো’ নারী বা মেয়ে বলতে এ সমাজ মূলত একজন অনুগত নারীকে বোঝে, যিনি তাকে যা বলা হয় এবং তার কাছে যা আশা করা হয় তাই করেন এবং যার চরিত্র ও আচার আচরণ সমাজের বেঁধে দেওয়া নারীসুলভ প্রত্যাশা ও বাধাধরা নিয়মের সাথে মিলে যায়।”
সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন মনে করেন, সমাজ তাকেই ‘ভালো মেয়ে’ বলছে যে গান শুনতে পারবে না, নাচতে পারবে না, বন্ধুদের সাথে বসতে পারবে না। যে সবসময়ই একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকবে।
নাচ কি অপরাধ?
লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর থেকে উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিচ্ছেন জাইমা রহমান। কার্যত রাজনীতিতে এখনও সক্রিয় হননি।
নির্বাচনের কয়েকদিন পর থেকেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন তিনি। যারা তার বন্ধুদের সাথে কাটানো ব্যক্তিগত সময়ের আচরণ ও পোশাক নিয়ে সমালোচনা করছে। একে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণ’ বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে গবেষক হাসিব আহসান নাদিম বলছেন, “ছেলেরা নাচতে পারলেও মেয়েরা পারবে না, কেন পারবে না? কারণ আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা মোরাল সারভেইল্যান্স, একটা মোরাল পুলিশিং করার চেষ্টা করি।”
আইনজীবী সারা হোসেন প্রশ্ন তুলছেন, “সে নাচ করছে বা বন্ধুদের সাথে আছে, এটাই কি অভিযোগ? নাচ করা কি অপরাধ?”
কারো ব্যক্তি জীবনের কোনো বিষয় যা বাংলাদেশে কখনও অপরাধ বলে গণ্য করা হয়নি, তাকে একটা সামাজিক বা নৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখাকে অত্যন্ত রক্ষণশীল ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিকোণ বলে মনে করছেন এই সিনিয়র আইনজীবী।
জাইমা রহমানকে টার্গেট করার পিছনে লৈঙ্গিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষক হাসিব আহসান নাদিম মনে করেন, বাংলাদেশে প্রচলিত নয় এমন কোন আচার যখন একটা রাজনৈতিক পরিবারের কাউকে করতে দেখা যায় তখন বিরোধীরা অনলাইন ট্রলিংকে বেছে নেন।
“জনপরিসরে থাকা নারীরা শুধু চরিত্র হননেরই শিকার হন না, এমনকি তাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পুরুষ রাজনীতিবিদদের মধ্যকার ক্ষমতার রাজনীতিতেও তাদের ব্যবহার করা হয়।”, এমন মত ড. কাজলী সেহ্রিনের। তিনি বলেন,”নারীবিদ্বেষীরা মূলত এই ইঙ্গিতই দিতে চায় যে, “নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ‘পুরুষত্ব’ যার নেই, সে কীভাবে দেশ চালাবে?”
সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন বলছিলেন, “ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করসে, ইংল্যান্ডে বড় হইসে, স্বাভাবিক একজন সাধারন মানুষ গান শুইনা নাচে। আমার মেয়েও নাচে।”
”একটা মানুষ তার মতো করে একটা জিনিস উপভোগ করতেসে, তাকে নিয়ে এসব বলা এটা ’টেস্টলেস’, যোগ করেন খালেদ মুহিউদ্দীন।
নারীর ব্যক্তি জীবন রাজনৈতিক হাতিয়ার
সীমা মোসলেম বলছেন, “যেকোনো মেয়ে যখনই সে বাইরে চলে আসে, তার একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব দাঁড়ায়, তার নিজস্ব বক্তব্য থাকে, যখনই সে নিজস্ব একটা মতামত ব্যক্ত করে, তখনই কিন্তু সে বেশি বুলিংয়ের শিকার হয়, তখনই তাকে নিয়ে এ ধরনের মর্যাদাহানিকর, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলা হয়।”
এমন ঘটনা কম-বেশি সবসময়ই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে মনে করেন এই নারী অধিকার কর্মী।
তবে সারা হোসেন বলছেন, রাজনীতিতে নারীদের ছোট করে দেখার এই সংস্কৃতি আরও আগে থেকেই চলে আসছে।
তিনি বলেন, “আমরা এর আগেও শেখ হাসিনা, তার নারী মন্ত্রী এবং তার পরিবারের নারী সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জঘন্য ট্রোলিং দেখেছি। এখন আমরা যা দেখছি, সেটি ঠিক ততটাই অগ্রহণযোগ্য।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনীতিতে যখনই কোনো নারী নেতৃত্ব জনপ্রিয় হতে শুরু করেন, তখনই তার 'চরিত্র' নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। তবে এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ধারা।
সীমা মোসলেম বলছেন, “প্রতি ৫ জন নারীর ৩ জনই সহিংসতার শিকার হন। সারা বিশ্বেই, আজকে যাদেরকে আমরা উন্নত দেশ বলছি, সবখানেই। জাতিসংঘ কিন্তু তাই বলছে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই এই সহিংসতার কারণ।”
ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিনের ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস করে তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। একইভাবে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজের কলেজের একটি নাচের ভিডিও প্রচার করে তাকে 'অপরিণত' প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে ড. কাজলী সেহ্রিন বলেন, “সাধারণভাবে নারী, বিশেষ করে যারা রাজনীতি বা জনপরিসরে সক্রিয়, তাদের ক্ষেত্রে তাদের পেশাগত পরিচয় থেকে মানুষ আসলে তাদের ‘নারী’ পরিচয় এবং যৌনতাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।”
এআই বিতর্ক
জাইমা রহমানের নাম দিয়ে ভাইরাল হওয়া ছবি ভিডিও নিয়ে ফ্যাক্ট চেকাররা বলছেন এটি এআই দিয়ে তৈরি।
তার বিদেশের জীবনকে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার অংশ হিসেবে ব্যবহার করে মূলত রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চলছে।
একজন পুরুষ রাজনীতিবিদের এমন ছবি পাওয়া গেলে কি একই প্রতিক্রিয়া হতো? হাসিব আহসান নাদিম বলেন, “ছেলেদের শেমিং, যেটা আমরা আগেও দেখেছি, সেটা কোনো মদের বোতলের সাথে দেখানো হয় বা কোনো মাফিয়ার সাথে মিট করার জন্য দেখানো হয়। কিন্তু ফিমেইলদের ক্ষেত্রে, আমাদের সমাজে যেটা হয়, আমাদের যে বাঙালি বা রিলিজিয়াস রিপ্রেজেন্টেশান আছে, সেটাকে একটা টুল হিসেবে ইউজ করে মেয়েদের ড্রেসটাকে আনা হয়।”
ড. কাজলী সেহ্রিন বলেন, “ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো কি না, সেটি কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন হতে পারে না। আসলে এখানে কোনো কৈফিয়তেরই প্রয়োজন নেই।”
“আযানের সময় জাইমা রহমানের মাথায় কাপড় দেওয়া যেমন কোনো সংবাদ হওয়ার মতো বিষয় ছিল না, তেমনি তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কারও মাথাব্যথার কোনো কারণ নেই”, যোগ করেন ড. সেহ্রিন।
ছড়িয়ে পড়া ছবি ভিডিওগুলোতে কাউকে নিন্দা জানানোর মতো কোনো উপকরণ ছিলো কি না প্রশ্ন করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই যারা এই ছবি ভিডিও নিয়ে মন্তব্য করছে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
সব স্তরেই ‘মোরাল পুলিশিং'
সোশ্যাল মিডিয়ার এই আক্রমণ কেবল নামজাদা রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেই নয়ম বরং সব স্তরের নারীরাই এর শিকার হন।
সম্প্রতি ফারিয়া ইলা নামের এক তরুণীর ট্রাকে গান গাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকেও নানা মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে।
'আলাপ'-এর পডকাস্টে এসে তিনি যখন তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, সেখানেও দেখা গেছে মন্তব্যকারীদের বড় অংশ তার পোশাক নিয়েই মন্তব্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন পুরুষ যখন একই ধরণের কাজ করেন, তাকে বড়জোর 'বখাটে' বা 'উচ্ছৃঙ্খল' বলা হয়। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সেটি সরাসরি তার 'চরিত্র' এবং 'পারিবারিক সম্মানের' সাথে জুড়ে দেওয়া হয়।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার একটি মতামত কলাম লিখেছিলেন। যেখানে তিনি বলেন, “৯৯ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি নারীদের প্রতি কমপক্ষে একটি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।”
সীমা মোসলেম বলছেন, “কোনো একটা সহিংসতার পর মেয়েটার কি দোষ ছিলো সেটাই আমরা আগে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, তারপর সহিংসতা কেন হলো তা দেখতে যাই।”
বাংলাদেশে পাবলিক ফিগারদের ব্যক্তি জীবন নিয়ে সাইবার বুলিংয়ের তালিকা বেশ দীর্ঘ। অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা বা পরীমণি যখনই কোনো সংকটে পড়েছেন বা প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন, তখনই তাদের অতীত জীবন ও পোশাক আলোচনায় এসেছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা নারী নেত্রী উমামা ফাতেমা বা নুসরাত তাবাসসুমদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র। আন্দোলনের যৌক্তিকতার প্রশ্নের চেয়ে ব্যক্তি জীবন বা বন্ধুমহলের ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলেছে।
নারী অধিকার কর্মী সীমা মোসলেমের মতে, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি না, এটা নারীর মধ্যেও আছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে থাকায় নারীদের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি বলে মনে করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধিকার কর্মীদের মতে, যখন একজন নারী প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক ছাঁচ ভেঙে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেন, তখন তাকে থামানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পথ হলো তাকে সামাজিকভাবে 'ধর্মবিরোধী' বা 'সংস্কৃতিবিরোধী' তকমা দেওয়া।
কেন নারী সহজ লক্ষ্যবস্তু
সামাজিক কাঠামোতে নারীর অধস্তন অবস্থার কারণেই নারীর প্রতি এই দৃষ্টিকোণ মনে করেন সীমা মোসলেম। তিনি বলেন, “সমাজের ক্ষমতার কাঠামোতে নারী সবসময় নিচে আছে। এর কারণেই নারীর প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করছে। সেটা আমাদের পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, জনপরিসরে, সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়।”
সাইবার স্পেস নারীর উপর সহিংসতার অবাধ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। জবাবদিহিতাহীন চিন্তা প্রকাশ কখনও হয়ে ওঠে অন্যের ক্ষতির কারণ।
গবেষক হাসিব আহসান নাদিম বলছেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় এনিওয়ান ইজ অ্যা কিং তার পেইজে।”
'ভালো মেয়ে'র সংজ্ঞা
'ভালো মেয়ে'র মাপকাঠি কে নির্ধারণ করবে? যদি পোশাক কোনো নারীর একমাত্র সূচক হয়, তবে মেধা, শিক্ষা এবং নেতৃত্বগুন হয়ে ওঠে গৌণ।
ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তার লেখায় যে 'ধীর ক্ষয়ের' কথা বলেছিলেন, এই সাইবার বুলিং বা স্লাটশেমিং তারই একটি রূপ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে চলা এই সহিংসতা তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আইনজীবী সারা হোসেন মনে করেন এধরনের সমালোচনাকে “পুশ ব্যাক” করতে হবে। এধরনের আক্রমণকে প্রতিরোধ করতে হবে।
বিষয়: