দিনাজপুরে কোদাল দিয়ে খাল কাটার দৃশ্য। প্রায় পাঁচ দশকের ব্যবধানে একই জায়গায়, একই ধরনের কর্মসূচিতে বাবা জিয়াউর রহমান ও ছেলে তারেক রহমান। এটি কি কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন, নাকি বাংলাদেশের উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজনীতির নতুন প্রতীক? তারেক রহমান কি নিজের পথ তৈরি করছেন, না কি হাঁটছেন পিতার ছায়া ধরে?
রিয়াজুল বাশার
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৪২ এএমআপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০২:১১ পিএম
খাল খনন কর্মসূচিতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটা ও পোশাক আশাক দেখে বাবা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ছেলে তারেক রহমানের সাদৃশ্য খুঁজছেন অনেকেই
বিএনপির মিডিয়া সেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ৪৯ বছরের ব্যবধানের দুটি ঘটনা একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। মাত্র ২৯ সেকেন্ডের একটি ভার্টিক্যাল রিলসের দুই ফ্রেমে দুই প্রজন্মের ঘটনা।
উপরের ফ্রেমে ১৯৭৭ সালে তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোদাল দিয়ে খাল কাটার ভিডিও। আর একই ভিডিওর নিচের ফ্রেমে ২০২৬ সালে কোদাল দিয়ে খাল কাটছেন তারই ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
খাল কাটার উদ্বোধন করে তারেক রহমান যখন সমাবেশের মঞ্চের চেয়ারে বসলেন, তখন প্যান্টের নিচের দিকে ছিটকে আসা কাদার ছোপ।
কাছাকাছি একটি ছবি দেখা যায় প্রায় ৪০ বছর আগের। খালের মাটিতে বসে আছেন জিয়াউর রহমান, প্যান্টে লেপ্টে আছে কাদামাটি।
শুধু বিএনপির মিডিয়া সেলই নয়, গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামেও দেখা গেছে, বাবা-ছেলের কর্মসূচির সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা।
‘বাবার পথ ধরলেন তারেক রহমান’, ‘যেন বাবার সেই প্রতিচ্ছবি’, ‘শহীদ জিয়ার পদচিহ্নে হাঁটলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’- এমন শিরোনাম দেখা গেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে।
স্বাভাবিকভাবেই দুই প্রজন্মের এই কার্যক্রমের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও অনেকেই পিতার ছাপ খুঁজছেন ছেলের মধ্যে।
জিয়াউর রহমান যে ধারায় ‘জনপ্রিয়’ হয়েছিলেন, তারেক রহমানও হয়ত সেই পথ অনুসরণ করছেন বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার আলাপ-কে বলেন, “তারেক রহমানের মধ্যে আমরা জিয়াউর রহমানের একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছি।”
“আমার মনে হয়, উনি খুব বুঝেশুনে এই পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, কথাবার্তায় তার বাবাকে অনেকটা অনুসরণ করছেন।”
এরপরও প্রশ্ন উঠছে, পূর্বসূরিকে অনুসরণ করার মাধ্যমে সরকারপ্রধান কি ‘সস্তা’ জনপ্রিয়তার পথে হাঁটছেন?
দিনাজপুরের খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের ঘটনা ছাপিয়ে গেছে উন্নয়ন প্রকল্পের আলোচনাকে। সামনে এসেছে, বাংলাদেশের উত্তরাধিকারের রাজনীতির প্রতীক।
খাল কাটা কর্মসূচি: জিয়া থেকে তারেক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই বিএনপির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ‘জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণ’-এর ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
আর এটা হবে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র পুনর্বাস্তবায়ন।
দেশের কৃষি উন্নয়নে ১৯৭৭ সালে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।
“এর মাধ্যমে তিনি বিশেষ করে খরা মৌসুমে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত সেচের পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেন,” লেখা হয়েছে বাংলাপিডিয়াতে।
কর্মসূচি হাতে নেওয়ার দেড় বছরের মধ্যে দেড় হাজারেরও অধিক নতুন খাল খনন ও পুনর্খনন করেন বলে বাংলাপিডিয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বিআইআইএসএস জার্নালের এক প্রতিবেদনের বরাতে লিখেছেন, ১৯৭৯-১৯৮১ সালের মধ্যে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়।
বিভিন্ন সময় সংস্কার করলেও দেশের বেশিরভাগ ভরাট হয়ে গেছে। এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন খাল খনন করেছে ১৪ হাজার ৬২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সচল আছে মাত্র ৫ হাজার ২৫০ কিলোমিটার।
এবারের ভোটের আগে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিলো, দেশের হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল ও তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।
সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সোমবার খাল পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি?
জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল দিনাজপুরে সাহাপাড়া থেকে। তারেক রহমানও শুরু করলেন সেখান থেকেই।
সোমবার দিনাজপুরে পৌঁছে কোদাল দিয়ে কোপ দিয়ে কর্মসূচি উদ্বোধনের পরই তারেক রহমানের বিভিন্ন ছবি ভাইরাল হতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ডেলটা লেন্স নামের একটি পেইজে জিয়া ও তারেকের কোদাল হাতে দুটো ছবি এক করে পোস্ট দেওয়া হয়।
পোস্টে লেখা হয়, “সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দিনাজপুরে যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, প্রায় পাঁচ দশক পর সেই ধারাবাহিকতায় সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের কাজের উদ্বোধন করলেন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।”
তবে তারেক রহমানের এই ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনাও করছেন কেউ কেউ।
এইচ রহমান মিলু নামের একজন ফেইসবুকে লিখেছেন, “জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে এখন পর্যন্ত যা করেছেন তা আমার দৃষ্টিতে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা মাত্র, যেমনটি তার পিতা জিয়াউর রহমান করেছিলেন।”
পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, কথাবার্তায় তারেক রহমান কেন বাবাকে ‘অনেকটা অনুসরণ’ করছেন, সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার।
“যেহেতু তার বাবার যে ইমেজ বাংলাদেশে রয়েছে, অনেক বিতর্ক থাকতে পারে তার ক্ষমতায় আরোহণ নিয়ে। কিন্তু তার যে অনাড়ম্বর জীবন এবং সততার যে দৃষ্টান্ত; তার কিছুটা যদি তারেক রহমান রপ্ত করতে পারেন বা পারসেপশন দাঁড় করাতে পারেন, আমার ধারণা তার রাজনীতির জন্য এটা একটা বড় ব্যাপার।”
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তার পরিবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরিহার্য হয়ে আছে গত পাঁচ দশক ধরে।
১৯৮১ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া। ১৭ বছর বিরোধী অবস্থানে থাকার পর, গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির আবার ক্ষমতায় ফিরেছে জিয়াউর রহমানের পারিবারিক লিগ্যাসির হাত ধরেই।
স্বাভাবিকভাবেই দলের প্রতিষ্ঠাতার নীতি, কৌশল ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এখনো প্রভাবিত করে দলটিকে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ নেওয়ার পর নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত নীতির ধারায় ফিরে যেতে আগ্রহী। আমরা সেদিকেই কাজ করছি।’
এই বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার বলেন, “আমরা ভালোভাবেই বুঝতে পারছি, সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করছেন তার সন্তান তারেক রহমান।”
খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করার পর অনেকেই মনে করছেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক স্টাইল ও ভাবমূর্তির ধারাবাহিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। সমালোচকদের মতে, এই ঘটনা প্রতীকী রাজনীতি এবং জনপ্রিয়তা আদায়ের কৌশল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নেতাভিত্তিক দলীয় ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে রেওয়াজ গড়ে উঠেছে, সেই বাস্তবতায় তারেক রহমান কি স্বতন্ত্রভাবে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারবেন? না কি পিতার উত্তরাধিকারে ছায়ায় এগুবেন? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে অপেক্ষা করতে হবে।
খাল খনন কর্মসূচিতে যে আলোচনা নতুন করে ফিরছে
দিনাজপুরে কোদাল দিয়ে খাল কাটার দৃশ্য। প্রায় পাঁচ দশকের ব্যবধানে একই জায়গায়, একই ধরনের কর্মসূচিতে বাবা জিয়াউর রহমান ও ছেলে তারেক রহমান। এটি কি কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন, নাকি বাংলাদেশের উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজনীতির নতুন প্রতীক? তারেক রহমান কি নিজের পথ তৈরি করছেন, না কি হাঁটছেন পিতার ছায়া ধরে?
বিএনপির মিডিয়া সেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ৪৯ বছরের ব্যবধানের দুটি ঘটনা একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। মাত্র ২৯ সেকেন্ডের একটি ভার্টিক্যাল রিলসের দুই ফ্রেমে দুই প্রজন্মের ঘটনা।
উপরের ফ্রেমে ১৯৭৭ সালে তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোদাল দিয়ে খাল কাটার ভিডিও। আর একই ভিডিওর নিচের ফ্রেমে ২০২৬ সালে কোদাল দিয়ে খাল কাটছেন তারই ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দুজনের পোশাকের মিলও অনেকটা। কোদাল দিয়ে মাটি কাটার সময় জিয়াউর রহমানের পরনে টিশার্ট, জিন্স, মাথায় ক্যাপ, হাতে চেইনওয়ালা ঘড়ি।
খাল কাটার উদ্বোধন করে তারেক রহমান যখন সমাবেশের মঞ্চের চেয়ারে বসলেন, তখন প্যান্টের নিচের দিকে ছিটকে আসা কাদার ছোপ।
কাছাকাছি একটি ছবি দেখা যায় প্রায় ৪০ বছর আগের। খালের মাটিতে বসে আছেন জিয়াউর রহমান, প্যান্টে লেপ্টে আছে কাদামাটি।
শুধু বিএনপির মিডিয়া সেলই নয়, গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামেও দেখা গেছে, বাবা-ছেলের কর্মসূচির সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা।
‘বাবার পথ ধরলেন তারেক রহমান’, ‘যেন বাবার সেই প্রতিচ্ছবি’, ‘শহীদ জিয়ার পদচিহ্নে হাঁটলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’- এমন শিরোনাম দেখা গেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে।
স্বাভাবিকভাবেই দুই প্রজন্মের এই কার্যক্রমের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও অনেকেই পিতার ছাপ খুঁজছেন ছেলের মধ্যে।
জিয়াউর রহমান যে ধারায় ‘জনপ্রিয়’ হয়েছিলেন, তারেক রহমানও হয়ত সেই পথ অনুসরণ করছেন বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার আলাপ-কে বলেন, “তারেক রহমানের মধ্যে আমরা জিয়াউর রহমানের একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছি।”
“আমার মনে হয়, উনি খুব বুঝেশুনে এই পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, কথাবার্তায় তার বাবাকে অনেকটা অনুসরণ করছেন।”
এরপরও প্রশ্ন উঠছে, পূর্বসূরিকে অনুসরণ করার মাধ্যমে সরকারপ্রধান কি ‘সস্তা’ জনপ্রিয়তার পথে হাঁটছেন?
দিনাজপুরের খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের ঘটনা ছাপিয়ে গেছে উন্নয়ন প্রকল্পের আলোচনাকে। সামনে এসেছে, বাংলাদেশের উত্তরাধিকারের রাজনীতির প্রতীক।
খাল কাটা কর্মসূচি: জিয়া থেকে তারেক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই বিএনপির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ‘জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণ’-এর ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
আর এটা হবে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র পুনর্বাস্তবায়ন।
দেশের কৃষি উন্নয়নে ১৯৭৭ সালে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।
“এর মাধ্যমে তিনি বিশেষ করে খরা মৌসুমে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত সেচের পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেন,” লেখা হয়েছে বাংলাপিডিয়াতে।
কর্মসূচি হাতে নেওয়ার দেড় বছরের মধ্যে দেড় হাজারেরও অধিক নতুন খাল খনন ও পুনর্খনন করেন বলে বাংলাপিডিয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বিআইআইএসএস জার্নালের এক প্রতিবেদনের বরাতে লিখেছেন, ১৯৭৯-১৯৮১ সালের মধ্যে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়।
বিভিন্ন সময় সংস্কার করলেও দেশের বেশিরভাগ ভরাট হয়ে গেছে। এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন খাল খনন করেছে ১৪ হাজার ৬২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সচল আছে মাত্র ৫ হাজার ২৫০ কিলোমিটার।
এবারের ভোটের আগে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিলো, দেশের হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল ও তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।
সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সোমবার খাল পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি?
জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল দিনাজপুরে সাহাপাড়া থেকে। তারেক রহমানও শুরু করলেন সেখান থেকেই।
সোমবার দিনাজপুরে পৌঁছে কোদাল দিয়ে কোপ দিয়ে কর্মসূচি উদ্বোধনের পরই তারেক রহমানের বিভিন্ন ছবি ভাইরাল হতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ডেলটা লেন্স নামের একটি পেইজে জিয়া ও তারেকের কোদাল হাতে দুটো ছবি এক করে পোস্ট দেওয়া হয়।
পোস্টে লেখা হয়, “সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দিনাজপুরে যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, প্রায় পাঁচ দশক পর সেই ধারাবাহিকতায় সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের কাজের উদ্বোধন করলেন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।”
তবে তারেক রহমানের এই ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনাও করছেন কেউ কেউ।
এইচ রহমান মিলু নামের একজন ফেইসবুকে লিখেছেন, “জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে এখন পর্যন্ত যা করেছেন তা আমার দৃষ্টিতে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা মাত্র, যেমনটি তার পিতা জিয়াউর রহমান করেছিলেন।”
পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, কথাবার্তায় তারেক রহমান কেন বাবাকে ‘অনেকটা অনুসরণ’ করছেন, সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার।
“যেহেতু তার বাবার যে ইমেজ বাংলাদেশে রয়েছে, অনেক বিতর্ক থাকতে পারে তার ক্ষমতায় আরোহণ নিয়ে। কিন্তু তার যে অনাড়ম্বর জীবন এবং সততার যে দৃষ্টান্ত; তার কিছুটা যদি তারেক রহমান রপ্ত করতে পারেন বা পারসেপশন দাঁড় করাতে পারেন, আমার ধারণা তার রাজনীতির জন্য এটা একটা বড় ব্যাপার।”
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তার পরিবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরিহার্য হয়ে আছে গত পাঁচ দশক ধরে।
১৯৮১ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া। ১৭ বছর বিরোধী অবস্থানে থাকার পর, গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির আবার ক্ষমতায় ফিরেছে জিয়াউর রহমানের পারিবারিক লিগ্যাসির হাত ধরেই।
স্বাভাবিকভাবেই দলের প্রতিষ্ঠাতার নীতি, কৌশল ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এখনো প্রভাবিত করে দলটিকে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ নেওয়ার পর নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত নীতির ধারায় ফিরে যেতে আগ্রহী। আমরা সেদিকেই কাজ করছি।’
এই বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার বলেন, “আমরা ভালোভাবেই বুঝতে পারছি, সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করছেন তার সন্তান তারেক রহমান।”
খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করার পর অনেকেই মনে করছেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক স্টাইল ও ভাবমূর্তির ধারাবাহিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। সমালোচকদের মতে, এই ঘটনা প্রতীকী রাজনীতি এবং জনপ্রিয়তা আদায়ের কৌশল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নেতাভিত্তিক দলীয় ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে রেওয়াজ গড়ে উঠেছে, সেই বাস্তবতায় তারেক রহমান কি স্বতন্ত্রভাবে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারবেন? না কি পিতার উত্তরাধিকারে ছায়ায় এগুবেন? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে অপেক্ষা করতে হবে।
বিষয়: