প্রধানমন্ত্রীর যথাসময়ে অফিস যাওয়া যখন এক ‘বিরল কৃতিত্ব’

পলিক্রনিক সমাজের মানুষের কাছে সময় 'রৈখিক' নয়, বরং এটি 'ফ্লেক্সিবল'। এখানে কাজ শেষ করার চেয়ে মানুষের সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব বেশি। তাই আড্ডা দিতে দিতে দেরি হওয়া বা সময় মেনে না চলা এখানে সামাজিকভাবে অনেক সময় গ্রহণযোগ্য।

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:২০ পিএম

নির্ধারিত সময়ের চেয়ে মাত্র ২০ সেকেন্ড আগেই প্লাটফর্ম ছেড়ে গিয়েছিলো জাপানের 'তুকুবা এক্সপ্রেস', আর তাতেই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে হয় জাপানের রেল কোম্পানিকে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট সময়ানুবর্তিতার জন্য এতই বিখ্যাত ছিলেন যে, কোনিগসবার্গের মানুষ তাদের ঘড়ির সময় ঠিক করতো কান্টের বিকেলে হাঁটতে বের হওয়া দেখে। অথচ বাংলাদেশের একজন প্রধানমন্ত্রী সঠিক সময়ে অফিসে যাওয়ায় তা হয়ে যায় জাতীয় দৈনিকের খবর। সময়ানুবর্তিতার এই স্বাভাবিক বিষয়টি বাংলাদেশে কেন ‘ব্যতিক্রমী ঘটনা’? সময়ানুবর্তিতা নিয়ে বাঙালির এই উদাসীনতার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণই বা কী?

কী খবর? কেন খবর?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এরপর সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করেন তিনি। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে গণমাধ্যমগুলোর খবরে জায়গা পায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে আসার বিষয়টি। নিতান্ত সাধারণ ঘটনাটি হয়ে ওঠে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর ‘খবর’। প্রধানমন্ত্রীর ঠিক সময়ে অফিসে আসা কি ব্যতিক্রমী ঘটনা? কেমন ছিলেন বাংলাদেশের আগের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা? 

সরকার রাষ্ট্রপ্রধানদের সময়জ্ঞান

শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ানুবর্তিতার প্রমাণ পাওয়া যায় নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইগুলোতে। ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে তিনি লিখেছেন জেলে কীভাবে তিনি সময়কে ভাগ করে নিতেন। তিনি লেখেন, ‘মানুষ সময় পায় না, অথচ আমি সময় কাটাতে পারি না।‘ বাইরের জীবনেও তিনি সময়ের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন বলে জানান তাকে কাছ থেকে দেখা ব্যক্তিরা। তবে রাজনৈতিক জনসভার ভিড়ের কারণে অনেক সময় দেরি হতো, যা নিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করতেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সময়ের ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। সাংবাদিক রেজওয়ান সিদ্দিকী তার লেখায় উল্লেখ করেন, ‘জিয়াউর রহমান তার কর্মকর্তাদের ভোর ৫টায় বা ৬টায় ডাকতেন এবং গ্রামে গঞ্জে পরিদর্শনে যেতেন। তার সময়ানুবর্তিতা তৎকালীন আমলাতন্ত্রের জন্য একটি উদাহরণে পরিণত হয়েছিল’।

জিয়াউর রহমানের সময়ানুবর্তিতা নিয়ে বলতে গিয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব বদিউর রহমান আলাপ-কে  বলেন, ‘জিয়াউর রহমান সাহেব এমন ছিলেন সময়ানুবর্তিতাতে, ক্যাবিনেট মিটিং-এ কোন মন্ত্রী যদি একটু দেরীতে আসতেন,তিনি হাত দিয়ে থামায় ফেলতেন’।

ক্ষমতা নেয়ার শুরুতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সময় সম্পর্কে সচেতন থাকলেও পরবর্তীতে উদাসীন হন বলে জানা যায়। মুনতাসীর মামুন তার ‘সেই সব দিনগুলি’ বইয়ে লিখেন, ‘দেরি করে আসা’কে এরশাদ এক ধরনের আভিজাত্য বা ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখাতে চাইতেন। তিনি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের অপেক্ষায় রাখতেন এবং নিজে অনেকটা দেরিতে উপস্থিত হতেন।

সময় নিয়ে বিপরীত অবস্থানের কথা জানা যায় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তার বই ‘বেগম খালেদা জিয়া : হার লাইফ হার স্টোরি’তে  খালেদা জিয়ার জীবনযাত্রার একটি চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে দেখা যায়, খালেদা জিয়া সাধারণত রাত ২টা বা ৩টা পর্যন্ত রাজনৈতিক ফাইল বা বৈঠক নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এই কারণেই তার দিনের কর্মসূচিগুলো শুরু হতে কিছুটা দেরি হত। 

অপরদিকে সাংবাদিক ও কলামিস্ট এ বি এম মুসা তার লেখায় শেখ হাসিনাকে 'আর্লি রাইজার' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা শেখ হাসিনার সকালে উঠে দাপ্তরিক কাজ শুরু করার কথা অনেকবার বর্ণনা করেছেন। 

সময়ের এই পার্থক্য নিয়ে শেখ হাসিনা বিভিন্ন জনসভা ও প্রেস কনফারেন্সে খালেদা জিয়াকে কটাক্ষও করেছেন। 

খালেদা জিয়া সরাসরি এই বিষয়ে কথা না বললেও, তার দলের সিনিয়র নেতারা এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তারা খালেদা জিয়ার দেরিতে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা ‘অলসতা নয়, বরং কাজের ধরন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। 

জোয়ার-ভাটা ও ঘড়ির কাটা

সময় নিয়ে বাঙ্গালীর এই উদাসীনতার কারণ কী? বাঙালির সময়ের ধারণা বা সময়ানুবর্তিতা নিয়ে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের আলোকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান তার ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ বইয়ে বাঙালির সময়ের অপচয় ও অলসতা নিয়ে চমৎকার আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, আমাদের কৃষিভিত্তিক সমাজে সময়ের হিসাব ছিল ঋতুভিত্তিক বা জোয়ার-ভাটা ভিত্তিক। যা ঘড়ির কাটার মতো সুনির্দিষ্ট ছিল না। ঔপনিবেশিক আমলে এ অঞ্চলে ঘড়ির প্রচলন শুরু হলেও আগে থেকে চলে আসা ঢিলেঢালা ভাবটি আজও বাঙ্গালির মানসিকতায় রয়ে গেছে।

বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টি. হল তার ‘দ্য সাইলেন্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ এবং ‘বিয়ন্ড কালচার’ বইয়ে সময়ের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দক্ষিণ এশীয় সমাজকে পলিক্রনিক সমাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পলিক্রনিক সমাজের মানুষের কাছে সময় 'রৈখিক' নয়, বরং এটি নমনীয় বা 'ফ্লেক্সিবল'। এখানে কাজ শেষ করার চেয়ে মানুষের সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব বেশি। তাই আড্ডা দিতে দিতে দেরি হওয়া বা সময় মেনে না চলা এখানে সামাজিকভাবে অনেক সময় গ্রহণযোগ্য।

সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ রিচার্ড লুইস তার ‘হোয়েন কালচারস কোলাইড’ বইতে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষকে 'মাল্টি-অ্যাক্টিভ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এই সংস্কৃতির মানুষ মনে করে যে তারা একসাথে অনেক কাজ করতে পারে এবং সময়সূচি পরিবর্তন করা বা দেরি করাটা কোনো বড় অপরাধ নয়।

সমাজবিজ্ঞানীদের তত্ত্বমতে, বাঙালির দেরি করার পেছনে কেবল অলসতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আমাদের নদীমাতৃক ও কৃষিভিত্তিক জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতির ওপর মানুষের হাত ছিল না বলে সময়ের সূক্ষ্ম হিসাবের গুরুত্ব কম ছিল।

এই যদি হয় ‘খবর’

কোনো সমাজে যখন স্বাভাবিক নৈতিকতাগুলো ‘বিশেষ ঘটনায়’ পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজে ‘জেনারেল এক্সপেক্টেশন’ বা 'সাধারণ প্রত্যাশা'র স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এটি এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘অ্যাবনরমাল নরমালসি’ বা 'অপ্রকৃতিস্থ স্বাভাবিকতা'। অর্থাৎ, অনিয়মই এখানে সাধারণ নিয়ম, আর নিয়ম মানাটাই ‘বিরল কৃতিত্ব’। 

সমাজবিজ্ঞানী ডায়ান ভন এই প্রবণতার নামকরণ করেছেন 'নরমালাইজেশন অব ডেভিয়েন্স' হিসেবে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন অনিয়মই দীর্ঘকাল ধরে নিয়ম হিসেবে পালিত হয়, তখন সঠিক কাজটি করাই এক ধরণের ‘বিরল’ ঘটনা বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দেরি করে আসা ছিল আভিজাত্য বা পাওয়ার স্ট্যাটাসের অংশ।

নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক সময়ে অফিসে এসে সেই 'স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া অনিয়ম'কে আপাতদৃষ্টিতে একটি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তার 'ক্যারিশম্যাটিক অথরিটি' তত্ত্বে দেখিয়েছেন, অনুসারীরা সবসময় তাদের নেতার আচরণ অনুকরণ করে। 

প্রধানমন্ত্রীর এই সময়ানুবর্তিতা যদি সাময়িক কোন ঘটনা না হয়ে একটি 'টপ-ডাউন' সংস্কারের অংশ হয়, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে সমাজের মনস্তত্ত্ব বদলে দিতে পারে।