প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জটিল রাজনৈতিক দোলাচলের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে জামায়াত। চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে দলটির উত্থানকে চমকপ্রদই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রিয়াজুল বাশার
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩১ পিএমআপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে দলটি হয় সরকার গঠন করবে, নয়তো প্রধান বিরোধী দল হবে।
ভারতীয় উপমহাদেশে একটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ শাসনামলে যাত্রা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। আট দশক পেরিয়ে দলটি, উপমহাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যের দোরগোড়ায়।
পাকিস্তানে সীমিত প্রভাব, ভারতে প্রায় অস্তিত্বহীন, আর বাংলাদেশে দীর্ঘদিন প্রান্তিক রাজনীতির ভেতর ঘুরপাক খাওয়া দলটি হঠাৎই ভিন্ন এক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে দলটি হয় সরকার গঠন করবে, নয়তো প্রধান বিরোধী দল হবে।
উপমহাদেশীয় রাজনীতির ইতিহাসে এর আগে জামায়াতে ইসলামী কোনো দেশেই এমন দৃশ্যমান ও কাঠামোগত রাজনৈতিক শক্তি দেখাতে পারেনি।
দলটির এই উত্থান সংগত কারণেই জন্ম দিচ্ছে বিপুল বিস্ময়, প্রশ্ন, বিতর্ক ও বিশ্লেষণের।
বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনীতি থেকে কার্যত নির্বাসিত, নেতৃত্ব সংকট এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতার মধ্যেও জামায়াতের ‘হঠাৎ’ এই পুনরুত্থান কি রাজনৈতিক গিমিক, নাকি এর পেছনে আছে দলটির সুপরিকল্পিত কৌশল?
একদিকে আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ শক্তির অনুপস্থিতিতে তৈরি রাজনৈতিক শূন্যতা, অন্যদিকে ইসলামপন্থি ভোট ব্যাংকের পুনর্গঠন-এই দুই বাস্তবতার সংযোগেই কি জামায়াতের রাজনীতির এই উত্থান? না কি, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো রাজনৈতিক শক্তির কাঠামোগত দুর্বলতাই তাদের শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছে?
তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত দলটির নেতৃত্ব। কেননা, জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব দলটিকে তাদের চিরায়ত রাজনীতি থেকে বের করে এনেছে।
তারা বর্তমান সময়ের সাথে সঙ্গতিপুর্ণ একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরছেন। এক্ষেত্রে জামায়াতকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
জামায়াত একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হলেও, দলীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই জামায়াতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন ডা. শফিক।
অতীতে ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে অন্য কোনো আমীর যা পারেননি, ঠিক সেই কাজটি নীরবে করে চলেছেন ডাক্তার শফিকুর রহমান।
তিনি দলটিকে ‘গোঁড়া হার্ডলাইন’ অতীত থেকে টেনে তুলে মূলধারার রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। অবশ্য দেশের লুম্ফেন রাজনীতি, দুর্নীতি এবং ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থাও জামায়াতকে শক্ত জমিনে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কোনো কোনো বিশ্লেষক জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে শফিকুর রহমানের অবদানকেই বড় করে দেখছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটায় সহমর্মী মতাদর্শের বড় দল হিসেবে সুবিধা পাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর মনে করেন, শফিকুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বেই জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক এই উত্থান। তিনি বলেন, “আমি বলবো, জামায়াতের এই উত্থানে আমীর শফিকুর রহমানের অবদান সিক্সটি পারসেন্ট। বাকি ফোরটি পারসেন্ট এসেছে কর্মীদের সাংগঠনিক দক্ষতায়।”
তবে জামায়াতের উত্থানকে একটু ভিন্নভাবে দেখেন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস গবেষক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমি এটা শুধু শফিক সাহেব বা জামায়াতের সফলতা বলবো না। জামায়াত যদি বড় আকারে জিতেও, এটা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে ধর্মতান্ত্রিক রাজনীতির যে উত্থান, সমাজের দক্ষিণপন্থি যে মোড় বদল ঘটেছে, তারই ফল বড় দল হিসেবে জামায়াতের পকেটে যাবে।”
“এই কৃতিত্ব এককভাবে কোনো ব্যক্তির বা কোনো দলেরও নয়। এটা সামাজিক যে পরিবর্তন, ওই ধারার পরিবর্তনের সুফল সাধারণত প্রধান দলের পকেটেই যায়।”
ঐতিহাসিক ফলের অপেক্ষায় জামায়াতে ইসলামী
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আমীর ছিলেন মওদুদী। তার পর পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর হয়েছেন পাঁচজন। স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশেও আমীরের দায়িত্ব সামলেছেন পাঁচজন।
বাংলাদেশের কোনো সংসদ নির্বাচনেই জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ ১৮ আসন এবং ১২ দশমিক ১৩ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।
পাকিস্তানেও দলটির অবস্থা নড়বড়ে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কোনো আসনেই জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি।
ফলে, বাংলাদেশে জামায়াতের সাম্প্রতিক উত্থানকে চমকপ্রদই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন জরিপেও উঠে আসছে দলটির বিপুল ভোট বৃদ্ধির পুর্বাভাস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআইয়ের ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা যাচ্ছে— বিএনপির সমর্থন যেখানে ৩৩ শতাংশ, সেখানে জামায়াতের সমর্থন ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার জরিপে জামায়াত আরও এগিয়ে রয়েছে বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ন্যারেটিভ, প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) এবং জাগরণ ফাউন্ডেশনের যৌথ ওই জরিপে বলা হয়েছে, বিএনপির সমর্থন ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
১২ তারিখের ভোটের পর জামায়াত বিরোধী বা সরকারি দল যে হচ্ছে, এটা পরিষ্কার। ফল যাই হোক না কেনো, এটাই হবে উপমহাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। আর সাফল্যের এই মুকুট যতটা দল হিসেবে জামায়াতের, তারচেয়েও বেশী অবশ্যই ডা. শফিকের।
“অবশ্যই। প্রথমবারের মতো এত বড় অর্জন হবে, যদি তারা বিরোধীদলও হতে পারে,” আলাপ-কে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
তিনি বলেন, “কোনো একটা জরিপে দেখলাম, আওয়ামী লীগের ১৩ শতাংশ ভোট জামায়াতে যেতে পারে। যদি এ ধরনের হিসেব নিকেশ হয় তাহলে তো সত্যিকার চিত্রটা বোঝা যাবে না যে, আসলে তারা কী অর্জন করলো, আর কী করতে পারলো না।”
“যদি একক ভোটে জামায়াত বিরোধীদল হতে পারে, তাহলে সেটা তার জন্য ল্যান্ডমার্ক, একটা মাইলস্টোন,” যোগ করেন সাব্বির আহমেদ।
জামায়াত: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জটিল রাজনৈতিক দোলাচলের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে জামায়াত। অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় ১৯৪১ সালে মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর উদ্যোগে ইসলামি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী।
শুরুতে এটি ছিল একটি সামাজিক সংগঠন এবং লক্ষ্য ছিল ইসলামি আদর্শভিত্তিক একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা সামনে চলে এলে জটিলতায় পড়ে জামায়াত।
দলটি প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যায়। হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠদের নিয়ে ভারত এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠদের পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এতে কিছুটা হলেও ধাক্কা খায় জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্র প্রকল্প।
তবে ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ‘রিভাইভাল ইন মোশন: দ্যা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ অ্যান্ড পাকিস্তান’ নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, “এটা তাদের জন্য একটা সুযোগ সৃষ্টি করে। কারণ দেশভাগের পরই পাকিস্তানকে ‘প্রকৃত’ ইসলামি সমাজে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে জামায়াত।”
মওদুদী ছিলেন আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার কঠোর সমালোচক। স্বাধীন পাকিস্তানে সংগঠনটি জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামি নীতির বাস্তবায়ন, শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব ব্যাখ্যার ইসলাম প্রচারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৯ সালের অবজেকটিভ রেজুলেশন প্রণয়নে জামায়াতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, যা পাকিস্তানের সংবিধানের ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯৫০-এর দশকে জামায়াত রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার কঠোর বিরোধিতা করতে থাকে।
ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের নিবন্ধে লেখা হয়েছে, “আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে জামায়াত ও অন্যান্য কট্টর সুন্নি গোষ্ঠীর ভূমিকা পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা করে, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান।”
নানা পরিক্রমায় জামায়াতে ইসলামী কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। এবং শেষ পর্যন্ত দলটি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়।
দলটির নেতারা পাকিস্তানের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। দলটির নেতারা আলবদর, আলশামস, রাজাকারবাহিনী, শান্তি কমিটি গড়ে তোলেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী শক্তি হিসেবে এসব সংগঠন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িয়ে পড়ে। গণহত্যা, লুটপাট, নির্যাতন ও ব্যাপক যৌন সহিংসতায় ওইসব বাহিনী জড়িত ছিল বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
৭১ এর যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয় এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ভেতর দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। সেই সাথে আপাত মৃত্যু ঘটে জামায়াতের রাজনীতিরও। যদিও, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে আলাদা সংগঠনে বিভক্ত হয়ে যায় জামায়াতে ইসলামী।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরুর পরই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় ১৯৭৯ সালে আবার মঞ্চে ফিরে আসে দলটি। সামরিক শাসকত্তোর ৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৮টি আসন পেয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয় জামায়াত।
কিন্তু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এলে জনমতের চাপে পড়ে জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির ওপর নজরদারি বাড়ে এবং নির্বাচনি সমর্থন কমে যায়। এমনকি নাগরিক আন্দোলনও হয়েছিল দলটির বিরুদ্ধে।
কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করলে, জামায়াতের জন্য আবারও সুযোগ আসে। দলটিও আওয়ামী লীগের পাশাপাশি একই দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এককভাবে ভোটে লড়ে মাত্র তিন আসনে বিজয়ী হয় দলটি।
এরপর আবার বিএনপির সঙ্গে জোটে ভিড়ে যায় দলটি। ২০০১ সালে দুজন মন্ত্রী নিয়ে সরকারের অংশ হয় জামায়াত। তবে, ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে জামায়াতের জন্য নতুন বাস্তবতা হাজির হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
২০১৩ সালে আদালতের আদেশে নিবন্ধন হারায় জামায়াত। এরপর থেকে দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে। এসময় তারা গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কিছুদিন আগে জামায়াতে ইসলামীকে আবারও নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশে কেন জামায়াতের উত্থান?
গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর অবিশ্বাস্যভাবে দৃশ্যপটে হাজির হয় জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক থাকা দলটি একেবারে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়।
শেখ হাসিনা পতনের পর, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের মুখে প্রথম শোনা যায় দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে তাদের যোগাযোগ হয়েছে।
এমনকি যেসব তরুণদের কোটা সংস্কার আন্দোলনই গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল, সেই তরুণদের গড়া দল এনসিপিও এখন জামায়াতের বাহুতলে বন্দী, মাত্র ১০ শতাংশ আসনে লড়ছে তারা।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক শূন্যতায় দ্রুত ফিরে আসে জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ত্বরিতগতিতে সংগঠিত হতে থাকে।
সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান ডেইলি স্টারে এক লেখায় জামায়াতের উত্থানের পেছনে আটটি কারণ দেখিয়েছেন।
এগুলো হলো: একাত্তরের কলঙ্কের দুর্নাম ফিকে হয়ে যাওয়া, বিএনপির তুলনায় জামায়াতের সততার সুনাম বেশি হওয়া, জনকল্যাণমূলক রাজনীতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, মধ্যপন্থি ও নমনীয় অবস্থান উপস্থাপন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, ভারত-বিরোধী মনোভাব এবং পরিবর্তনের দল হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন।
বাংলাদেশের জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমীকরণে জামায়াতকে প্রায়ই কোণঠাসা হয়ে থাকতে হতো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটির গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে বড় বাধা ছিল প্রভাবশালী সুফি ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের উদারপন্থি এলিট ও গণমাধ্যমে জামায়াতের উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করেছে। দেশের নাগরিক সমাজ- বিশেষত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও শহুরে পেশাজীবীরা- উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে তারা জামায়াতকে সন্দেহের চোখে দেখেন কিংবা প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন।”
এর ফলে জামায়াতের ঐতিহ্যগত ইসলামপন্থি প্ল্যাটফর্ম প্রভাবশালী শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি, যা দলটির বিস্তারে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জুলাই বিপ্লবের পর ‘নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ পেয়ে যায় জামায়াত’।
ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, “আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নড়িয়ে দেওয়ায় জামায়াত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখে এবং পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেকে বিপ্লবপন্থি শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।”
এই কৌশল দলটির নতুন করে জাগিয়ে তোলে, গণমাধ্যমে উপস্থিতি বাড়ায় এবং জনসমর্থনে গতি আনে। বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে নিজেদের প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তি হিসেবে প্রজেক্ট করছে জামায়াত। আর একাজটি হয়েছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকের নেতৃত্বে। মূলত এটাই তার সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি।
দাতব্য কাজে জামায়াত সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োগ করে, দলীয় প্ল্যাটফর্ম নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে- অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার ও সামাজিক সমতার মতো বামধারার সঙ্গে যুক্ত নীতিগুলোকে গ্রহণ করে।
দলটির নেতারা প্রকাশ্যে সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছেন এবং ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্র-এর ধারণা তুলে ধরছেন, সবার জন্য আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সংখ্যালঘু নিয়ে ভাষ্য বদলেছে, প্রথমবারের মতো হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে প্রার্থী করা হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভেড়ানো, একাত্তরের জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গও এসেছে।
আর জামায়াতে ইসলামী এসবই করছেন শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে।
দ্যা ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, “এই উদীয়মান ‘ইসলামপন্থি বাম’ শুধু জামায়াতের পরিচয়ই বদলে দিচ্ছে না; বরং বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির রেখাচিত্রও নতুনভাবে আঁকছে-দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিয়ে।”
তবে জামায়াতের উত্থান নিয়ে আলতাফ পারভেজের ব্যাখ্যা হচ্ছে, “যদি বাংলাদেশ কখনো বামপন্থার দিকে টার্ন নেয়, তাহলে যে দলটা প্রধান বামপন্থী দল সেই সুবিধাভোগী হবে। এখানে বাংলাদেশ যেহেতু ডানদিকে টার্ন নিয়েছে, সেহেতু সুফল জামায়াতের পকেটেই যাবে।”
ভোটে জামায়াতে ইসলাম ব্যর্থ হলে, সেই দায়ভারও শফিকুর রহমানকে নিতে হবে বলে করেন এই বিশ্লেষক।
আলতাফ পারভেজ বলেন, “যদি নির্বাচনে ভালো করে জামায়াত, তাহলে শফিক সাহেবের নেতৃত্ব টিকে থাকবে। যদি জামায়াত খারাপ করে শফিক সাহেবকে কিন্তু নেতৃত্বে ছেড়ে দিতে হতে পারে।”
জামায়াতের রাজনৈতিক প্রকল্প কতটা বদলেছে অনুমান করা কঠিন। কিন্তু দলকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করা হলেও, দলটির কাঠামোর মধ্যেই এমন কিছু বিষয় আছে যা আধুনিক বিশ্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
যেমন নারী ইস্যু। মওদুদীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা। ইতিহাসের পক্ষে না দাঁড়ানোর দায়সহ এমন কিছু বিষয় যা বাংলাদেশ কেনো বিশ্বের যে কোনো সমাজেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
ভোটের মাঠে এ বিষয়ে জামায়াত আগের মতোই অস্বস্তির মধ্যে আছে। কেননা, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী নারী। দলটি নারীর ইস্যুতে বারবার সমালোচনার মুখে পড়ছে। নারী নেতৃত্বে নিয়ে দলটির অবস্থান পরিষ্কার না। যদিও তারা দাবি করছেন, জামায়াত সরকার গঠন করলে, নারীরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া হবে না। কিন্তু দলটি এবারের নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। যদিও জুলাই সনদে সই করা দল হিসেবে তাদের অঙ্গীকার ছিলো ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে তারা মনোনয়ন দেবেন।
দলটির আমীর শফিকুর রহমান সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলেছেন, নারীরা নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। কারণ, আল্লাহ এটির অনুমতি দেননি।
বাংলাদেশে আড়াই দশকের বেশি সরকার প্রধান ছিলেন দুজন নারী। জামায়াত কখনো একজনের নেতৃত্বে জোট বেঁধে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে, আবার আরেকজনের সঙ্গে আন্দোলনে সহমত হয়েছে।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “কিছুটা কৌশলী না হলে জামায়াতের মতো দলের এতদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব না। তারা কৌশলে বদলেছে। আবার সমাজেও ইসলামিকীকরণের প্রভাব আছে।”
“ইসলামী রাজনীতি ধর্মভিত্তিক। এখানে ধর্ম বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরতে পারবে না। তার সেই সুযোগ নাই। ধর্মের কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর যুগোপযোগী ব্যাখ্যা হতে পারে। যেমন নারীর বিষয়। কতটুক স্বাধীনতা নারীর দেওয়া যেতে পারে, সেটা ধর্মে একটা বিধিনিষেধ আছে।”
নারী, মুক্তিযুদ্ধসহ এমন কিছু বিষয় আছে যা সবসময়ই জামায়াতের রাজনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ। তারপরও একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে মানুষের নিত্যজীবনের বিষয়গুলো সাধারণভাবে ডিল করে সাড়া জাগাতে পেরেছে দলটি।
সামাজিক নানা সমস্যার বিরুদ্ধে নিজেদের আদর্শ মানুষ বা দল হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা রয়েছে। জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান এক সময় বামপন্থী রাজনীতি করতেন। ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগে যোগ দেন। পরে ছাত্রশিবির হয়ে জামায়াতে আসেন।
ব্যক্তি শফিকুর রহমানের চালচলন, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গিতে তার অতীত রাজনীতির ছাপ পাওয়া যায় বলে মনে করেন বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ।
“শফিকুর রহমান ট্রাডিশনালিস্ট এবং মডার্নিস্ট- এই দুইটার সমন্বয়। যেহেতু তার একটা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল আগে। আমার মনে হয় ওই ধারার (জাসদ ছাত্রলীগ) কিছুটা প্রভাব তার মধ্যে আছে, তার আচার-আচরণে ও কথাবার্তায়।”
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক উত্থানের কেন্দ্রে যে নামটি বারবার ফিরে আসছে, তিনি ডা. শফিকুর রহমান। তার নেতৃত্বেই জামায়াত প্রথমবারের মতো নিজেকে শুধু ইসলামপন্থি দল নয়, বরং একটি বিকল্প রাষ্ট্রক্ষমতার দাবিদার হিসেবে হাজির করতে পেরেছে।
নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা-এসব প্রশ্ন জামায়াতের পিছু ছাড়েনি এবং ছাড়বেও না। আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের যে দাবি দলটি করছে, তা বাস্তবে কতটা টিকে থাকে, সেটিই হবে আগামী দিনের বড় পরীক্ষা।
জামায়াতের উত্থান: ইতিহাস সেরা আমীর কি ডা. শফিক
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জটিল রাজনৈতিক দোলাচলের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে জামায়াত। চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে দলটির উত্থানকে চমকপ্রদই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতীয় উপমহাদেশে একটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ শাসনামলে যাত্রা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। আট দশক পেরিয়ে দলটি, উপমহাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যের দোরগোড়ায়।
পাকিস্তানে সীমিত প্রভাব, ভারতে প্রায় অস্তিত্বহীন, আর বাংলাদেশে দীর্ঘদিন প্রান্তিক রাজনীতির ভেতর ঘুরপাক খাওয়া দলটি হঠাৎই ভিন্ন এক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে দলটি হয় সরকার গঠন করবে, নয়তো প্রধান বিরোধী দল হবে।
উপমহাদেশীয় রাজনীতির ইতিহাসে এর আগে জামায়াতে ইসলামী কোনো দেশেই এমন দৃশ্যমান ও কাঠামোগত রাজনৈতিক শক্তি দেখাতে পারেনি।
দলটির এই উত্থান সংগত কারণেই জন্ম দিচ্ছে বিপুল বিস্ময়, প্রশ্ন, বিতর্ক ও বিশ্লেষণের।
বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনীতি থেকে কার্যত নির্বাসিত, নেতৃত্ব সংকট এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতার মধ্যেও জামায়াতের ‘হঠাৎ’ এই পুনরুত্থান কি রাজনৈতিক গিমিক, নাকি এর পেছনে আছে দলটির সুপরিকল্পিত কৌশল?
একদিকে আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ শক্তির অনুপস্থিতিতে তৈরি রাজনৈতিক শূন্যতা, অন্যদিকে ইসলামপন্থি ভোট ব্যাংকের পুনর্গঠন-এই দুই বাস্তবতার সংযোগেই কি জামায়াতের রাজনীতির এই উত্থান? না কি, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো রাজনৈতিক শক্তির কাঠামোগত দুর্বলতাই তাদের শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছে?
তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত দলটির নেতৃত্ব। কেননা, জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব দলটিকে তাদের চিরায়ত রাজনীতি থেকে বের করে এনেছে।
তারা বর্তমান সময়ের সাথে সঙ্গতিপুর্ণ একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরছেন। এক্ষেত্রে জামায়াতকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
জামায়াত একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হলেও, দলীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই জামায়াতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন ডা. শফিক।
অতীতে ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে অন্য কোনো আমীর যা পারেননি, ঠিক সেই কাজটি নীরবে করে চলেছেন ডাক্তার শফিকুর রহমান।
তিনি দলটিকে ‘গোঁড়া হার্ডলাইন’ অতীত থেকে টেনে তুলে মূলধারার রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। অবশ্য দেশের লুম্ফেন রাজনীতি, দুর্নীতি এবং ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থাও জামায়াতকে শক্ত জমিনে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কোনো কোনো বিশ্লেষক জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে শফিকুর রহমানের অবদানকেই বড় করে দেখছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটায় সহমর্মী মতাদর্শের বড় দল হিসেবে সুবিধা পাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর মনে করেন, শফিকুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বেই জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক এই উত্থান। তিনি বলেন, “আমি বলবো, জামায়াতের এই উত্থানে আমীর শফিকুর রহমানের অবদান সিক্সটি পারসেন্ট। বাকি ফোরটি পারসেন্ট এসেছে কর্মীদের সাংগঠনিক দক্ষতায়।”
তবে জামায়াতের উত্থানকে একটু ভিন্নভাবে দেখেন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস গবেষক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমি এটা শুধু শফিক সাহেব বা জামায়াতের সফলতা বলবো না। জামায়াত যদি বড় আকারে জিতেও, এটা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে ধর্মতান্ত্রিক রাজনীতির যে উত্থান, সমাজের দক্ষিণপন্থি যে মোড় বদল ঘটেছে, তারই ফল বড় দল হিসেবে জামায়াতের পকেটে যাবে।”
“এই কৃতিত্ব এককভাবে কোনো ব্যক্তির বা কোনো দলেরও নয়। এটা সামাজিক যে পরিবর্তন, ওই ধারার পরিবর্তনের সুফল সাধারণত প্রধান দলের পকেটেই যায়।”
ঐতিহাসিক ফলের অপেক্ষায় জামায়াতে ইসলামী
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আমীর ছিলেন মওদুদী। তার পর পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর হয়েছেন পাঁচজন। স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশেও আমীরের দায়িত্ব সামলেছেন পাঁচজন।
বাংলাদেশের কোনো সংসদ নির্বাচনেই জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ ১৮ আসন এবং ১২ দশমিক ১৩ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।
পাকিস্তানেও দলটির অবস্থা নড়বড়ে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কোনো আসনেই জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি।
ফলে, বাংলাদেশে জামায়াতের সাম্প্রতিক উত্থানকে চমকপ্রদই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন জরিপেও উঠে আসছে দলটির বিপুল ভোট বৃদ্ধির পুর্বাভাস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআইয়ের ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা যাচ্ছে— বিএনপির সমর্থন যেখানে ৩৩ শতাংশ, সেখানে জামায়াতের সমর্থন ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার জরিপে জামায়াত আরও এগিয়ে রয়েছে বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ন্যারেটিভ, প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) এবং জাগরণ ফাউন্ডেশনের যৌথ ওই জরিপে বলা হয়েছে, বিএনপির সমর্থন ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
১২ তারিখের ভোটের পর জামায়াত বিরোধী বা সরকারি দল যে হচ্ছে, এটা পরিষ্কার। ফল যাই হোক না কেনো, এটাই হবে উপমহাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। আর সাফল্যের এই মুকুট যতটা দল হিসেবে জামায়াতের, তারচেয়েও বেশী অবশ্যই ডা. শফিকের।
“অবশ্যই। প্রথমবারের মতো এত বড় অর্জন হবে, যদি তারা বিরোধীদলও হতে পারে,” আলাপ-কে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
তিনি বলেন, “কোনো একটা জরিপে দেখলাম, আওয়ামী লীগের ১৩ শতাংশ ভোট জামায়াতে যেতে পারে। যদি এ ধরনের হিসেব নিকেশ হয় তাহলে তো সত্যিকার চিত্রটা বোঝা যাবে না যে, আসলে তারা কী অর্জন করলো, আর কী করতে পারলো না।”
“যদি একক ভোটে জামায়াত বিরোধীদল হতে পারে, তাহলে সেটা তার জন্য ল্যান্ডমার্ক, একটা মাইলস্টোন,” যোগ করেন সাব্বির আহমেদ।
জামায়াত: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জটিল রাজনৈতিক দোলাচলের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে জামায়াত। অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় ১৯৪১ সালে মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর উদ্যোগে ইসলামি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী।
শুরুতে এটি ছিল একটি সামাজিক সংগঠন এবং লক্ষ্য ছিল ইসলামি আদর্শভিত্তিক একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা সামনে চলে এলে জটিলতায় পড়ে জামায়াত।
দলটি প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যায়। হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠদের নিয়ে ভারত এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠদের পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এতে কিছুটা হলেও ধাক্কা খায় জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্র প্রকল্প।
তবে ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ‘রিভাইভাল ইন মোশন: দ্যা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ অ্যান্ড পাকিস্তান’ নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, “এটা তাদের জন্য একটা সুযোগ সৃষ্টি করে। কারণ দেশভাগের পরই পাকিস্তানকে ‘প্রকৃত’ ইসলামি সমাজে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে জামায়াত।”
মওদুদী ছিলেন আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার কঠোর সমালোচক। স্বাধীন পাকিস্তানে সংগঠনটি জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামি নীতির বাস্তবায়ন, শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব ব্যাখ্যার ইসলাম প্রচারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৯ সালের অবজেকটিভ রেজুলেশন প্রণয়নে জামায়াতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, যা পাকিস্তানের সংবিধানের ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯৫০-এর দশকে জামায়াত রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার কঠোর বিরোধিতা করতে থাকে।
ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের নিবন্ধে লেখা হয়েছে, “আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে জামায়াত ও অন্যান্য কট্টর সুন্নি গোষ্ঠীর ভূমিকা পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা করে, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান।”
নানা পরিক্রমায় জামায়াতে ইসলামী কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। এবং শেষ পর্যন্ত দলটি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়।
দলটির নেতারা পাকিস্তানের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। দলটির নেতারা আলবদর, আলশামস, রাজাকারবাহিনী, শান্তি কমিটি গড়ে তোলেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী শক্তি হিসেবে এসব সংগঠন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িয়ে পড়ে। গণহত্যা, লুটপাট, নির্যাতন ও ব্যাপক যৌন সহিংসতায় ওইসব বাহিনী জড়িত ছিল বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
৭১ এর যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয় এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ভেতর দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। সেই সাথে আপাত মৃত্যু ঘটে জামায়াতের রাজনীতিরও। যদিও, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে আলাদা সংগঠনে বিভক্ত হয়ে যায় জামায়াতে ইসলামী।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরুর পরই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় ১৯৭৯ সালে আবার মঞ্চে ফিরে আসে দলটি। সামরিক শাসকত্তোর ৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৮টি আসন পেয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয় জামায়াত।
কিন্তু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এলে জনমতের চাপে পড়ে জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির ওপর নজরদারি বাড়ে এবং নির্বাচনি সমর্থন কমে যায়। এমনকি নাগরিক আন্দোলনও হয়েছিল দলটির বিরুদ্ধে।
কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করলে, জামায়াতের জন্য আবারও সুযোগ আসে। দলটিও আওয়ামী লীগের পাশাপাশি একই দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এককভাবে ভোটে লড়ে মাত্র তিন আসনে বিজয়ী হয় দলটি।
এরপর আবার বিএনপির সঙ্গে জোটে ভিড়ে যায় দলটি। ২০০১ সালে দুজন মন্ত্রী নিয়ে সরকারের অংশ হয় জামায়াত। তবে, ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে জামায়াতের জন্য নতুন বাস্তবতা হাজির হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
২০১৩ সালে আদালতের আদেশে নিবন্ধন হারায় জামায়াত। এরপর থেকে দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে। এসময় তারা গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কিছুদিন আগে জামায়াতে ইসলামীকে আবারও নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশে কেন জামায়াতের উত্থান?
গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর অবিশ্বাস্যভাবে দৃশ্যপটে হাজির হয় জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক থাকা দলটি একেবারে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়।
শেখ হাসিনা পতনের পর, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের মুখে প্রথম শোনা যায় দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে তাদের যোগাযোগ হয়েছে।
এমনকি যেসব তরুণদের কোটা সংস্কার আন্দোলনই গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল, সেই তরুণদের গড়া দল এনসিপিও এখন জামায়াতের বাহুতলে বন্দী, মাত্র ১০ শতাংশ আসনে লড়ছে তারা।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক শূন্যতায় দ্রুত ফিরে আসে জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ত্বরিতগতিতে সংগঠিত হতে থাকে।
সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান ডেইলি স্টারে এক লেখায় জামায়াতের উত্থানের পেছনে আটটি কারণ দেখিয়েছেন।
এগুলো হলো: একাত্তরের কলঙ্কের দুর্নাম ফিকে হয়ে যাওয়া, বিএনপির তুলনায় জামায়াতের সততার সুনাম বেশি হওয়া, জনকল্যাণমূলক রাজনীতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, মধ্যপন্থি ও নমনীয় অবস্থান উপস্থাপন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, ভারত-বিরোধী মনোভাব এবং পরিবর্তনের দল হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন।
বাংলাদেশের জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমীকরণে জামায়াতকে প্রায়ই কোণঠাসা হয়ে থাকতে হতো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটির গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে বড় বাধা ছিল প্রভাবশালী সুফি ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের উদারপন্থি এলিট ও গণমাধ্যমে জামায়াতের উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করেছে। দেশের নাগরিক সমাজ- বিশেষত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও শহুরে পেশাজীবীরা- উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে তারা জামায়াতকে সন্দেহের চোখে দেখেন কিংবা প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন।”
এর ফলে জামায়াতের ঐতিহ্যগত ইসলামপন্থি প্ল্যাটফর্ম প্রভাবশালী শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি, যা দলটির বিস্তারে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জুলাই বিপ্লবের পর ‘নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ পেয়ে যায় জামায়াত’।
ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, “আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নড়িয়ে দেওয়ায় জামায়াত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখে এবং পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেকে বিপ্লবপন্থি শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।”
এই কৌশল দলটির নতুন করে জাগিয়ে তোলে, গণমাধ্যমে উপস্থিতি বাড়ায় এবং জনসমর্থনে গতি আনে। বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে নিজেদের প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তি হিসেবে প্রজেক্ট করছে জামায়াত। আর একাজটি হয়েছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকের নেতৃত্বে। মূলত এটাই তার সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি।
দাতব্য কাজে জামায়াত সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োগ করে, দলীয় প্ল্যাটফর্ম নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে- অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার ও সামাজিক সমতার মতো বামধারার সঙ্গে যুক্ত নীতিগুলোকে গ্রহণ করে।
দলটির নেতারা প্রকাশ্যে সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছেন এবং ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্র-এর ধারণা তুলে ধরছেন, সবার জন্য আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সংখ্যালঘু নিয়ে ভাষ্য বদলেছে, প্রথমবারের মতো হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে প্রার্থী করা হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভেড়ানো, একাত্তরের জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গও এসেছে।
আর জামায়াতে ইসলামী এসবই করছেন শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে।
দ্যা ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, “এই উদীয়মান ‘ইসলামপন্থি বাম’ শুধু জামায়াতের পরিচয়ই বদলে দিচ্ছে না; বরং বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির রেখাচিত্রও নতুনভাবে আঁকছে-দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিয়ে।”
তবে জামায়াতের উত্থান নিয়ে আলতাফ পারভেজের ব্যাখ্যা হচ্ছে, “যদি বাংলাদেশ কখনো বামপন্থার দিকে টার্ন নেয়, তাহলে যে দলটা প্রধান বামপন্থী দল সেই সুবিধাভোগী হবে। এখানে বাংলাদেশ যেহেতু ডানদিকে টার্ন নিয়েছে, সেহেতু সুফল জামায়াতের পকেটেই যাবে।”
ভোটে জামায়াতে ইসলাম ব্যর্থ হলে, সেই দায়ভারও শফিকুর রহমানকে নিতে হবে বলে করেন এই বিশ্লেষক।
আলতাফ পারভেজ বলেন, “যদি নির্বাচনে ভালো করে জামায়াত, তাহলে শফিক সাহেবের নেতৃত্ব টিকে থাকবে। যদি জামায়াত খারাপ করে শফিক সাহেবকে কিন্তু নেতৃত্বে ছেড়ে দিতে হতে পারে।”
জামায়াতের রাজনৈতিক প্রকল্প কতটা বদলেছে অনুমান করা কঠিন। কিন্তু দলকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করা হলেও, দলটির কাঠামোর মধ্যেই এমন কিছু বিষয় আছে যা আধুনিক বিশ্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
যেমন নারী ইস্যু। মওদুদীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা। ইতিহাসের পক্ষে না দাঁড়ানোর দায়সহ এমন কিছু বিষয় যা বাংলাদেশ কেনো বিশ্বের যে কোনো সমাজেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
ভোটের মাঠে এ বিষয়ে জামায়াত আগের মতোই অস্বস্তির মধ্যে আছে। কেননা, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী নারী। দলটি নারীর ইস্যুতে বারবার সমালোচনার মুখে পড়ছে। নারী নেতৃত্বে নিয়ে দলটির অবস্থান পরিষ্কার না। যদিও তারা দাবি করছেন, জামায়াত সরকার গঠন করলে, নারীরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া হবে না। কিন্তু দলটি এবারের নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। যদিও জুলাই সনদে সই করা দল হিসেবে তাদের অঙ্গীকার ছিলো ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে তারা মনোনয়ন দেবেন।
দলটির আমীর শফিকুর রহমান সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলেছেন, নারীরা নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। কারণ, আল্লাহ এটির অনুমতি দেননি।
বাংলাদেশে আড়াই দশকের বেশি সরকার প্রধান ছিলেন দুজন নারী। জামায়াত কখনো একজনের নেতৃত্বে জোট বেঁধে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে, আবার আরেকজনের সঙ্গে আন্দোলনে সহমত হয়েছে।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “কিছুটা কৌশলী না হলে জামায়াতের মতো দলের এতদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব না। তারা কৌশলে বদলেছে। আবার সমাজেও ইসলামিকীকরণের প্রভাব আছে।”
“ইসলামী রাজনীতি ধর্মভিত্তিক। এখানে ধর্ম বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরতে পারবে না। তার সেই সুযোগ নাই। ধর্মের কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর যুগোপযোগী ব্যাখ্যা হতে পারে। যেমন নারীর বিষয়। কতটুক স্বাধীনতা নারীর দেওয়া যেতে পারে, সেটা ধর্মে একটা বিধিনিষেধ আছে।”
নারী, মুক্তিযুদ্ধসহ এমন কিছু বিষয় আছে যা সবসময়ই জামায়াতের রাজনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ। তারপরও একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে মানুষের নিত্যজীবনের বিষয়গুলো সাধারণভাবে ডিল করে সাড়া জাগাতে পেরেছে দলটি।
সামাজিক নানা সমস্যার বিরুদ্ধে নিজেদের আদর্শ মানুষ বা দল হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা রয়েছে। জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান এক সময় বামপন্থী রাজনীতি করতেন। ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগে যোগ দেন। পরে ছাত্রশিবির হয়ে জামায়াতে আসেন।
ব্যক্তি শফিকুর রহমানের চালচলন, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গিতে তার অতীত রাজনীতির ছাপ পাওয়া যায় বলে মনে করেন বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ।
“শফিকুর রহমান ট্রাডিশনালিস্ট এবং মডার্নিস্ট- এই দুইটার সমন্বয়। যেহেতু তার একটা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল আগে। আমার মনে হয় ওই ধারার (জাসদ ছাত্রলীগ) কিছুটা প্রভাব তার মধ্যে আছে, তার আচার-আচরণে ও কথাবার্তায়।”
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক উত্থানের কেন্দ্রে যে নামটি বারবার ফিরে আসছে, তিনি ডা. শফিকুর রহমান। তার নেতৃত্বেই জামায়াত প্রথমবারের মতো নিজেকে শুধু ইসলামপন্থি দল নয়, বরং একটি বিকল্প রাষ্ট্রক্ষমতার দাবিদার হিসেবে হাজির করতে পেরেছে।
নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা-এসব প্রশ্ন জামায়াতের পিছু ছাড়েনি এবং ছাড়বেও না। আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের যে দাবি দলটি করছে, তা বাস্তবে কতটা টিকে থাকে, সেটিই হবে আগামী দিনের বড় পরীক্ষা।
বিষয়: