ইতিহাসের সেরা ফল জামায়াতের

জামায়াত একক দল হিসেবে তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। কিভাবে এল এই সাফল্য? আরও কী ভালো হতে পারত?

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম

দীর্ঘ দেড় দশকের একচেটিয়া রাজনৈতিক প্রভাবের পর এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছে। 

যদিও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, তবে জামায়াত একক দল হিসেবে তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

তবে এর পেছনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জাতীয় পার্টির দুর্বল হয়ে পড়া, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও মিডিয়ার জামায়াতকে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা দেওয়াসহ নানান কারণ জামায়াতের এই সাফল্য এসেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ঐতিহাসিক নির্বাচনি ফলাফল

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১- দলীয় জোট অন্ততঃ ৭৭টি আসনে জয়লাভ করতে যাচ্ছে। যা বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর তাদের দলটির ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। 

এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১৮টি এবং ২০০১ সালে ১৭টি আসনে জয় ছিল তাদের সেরা সাফল্য।

এর পেছনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাবির মুস্তফা।

“আওয়ামী লীগ না থাকার শূন্যতার মধ্যে এই নির্বাচনে জামায়াতের একটা সুযোগ ছিল, সে সুযোগটা ব্যবহার করে তারা তাদের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়েছে,”আলাপ-কে তিনি বলেন।

কোথায় আধিপত্য, কেন?

জামায়াত এবার সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে, সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের সবকটিতেই তারা জয়লাভ করেছে। এছাড়া বাগেরহাট, রংপুর ও উত্তরের সীমান্ত জেলাগুলোতেও তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসাবে পরিচিত রংপুরে এমন জয় জামায়াতের বড় অর্জন হিসাবে দেখলেও এখানে জাতীয় পার্টির ব্যর্থতাকেও বড় কারণ হিসাবে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক খান মো. রবিউল আলম।

“এই অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় প্রচার, ওয়াজ মাহফিলের প্রসার ঘটেছে। 

“আরেকটি হচ্ছে দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। রংপুর ও কুড়িগ্রামে প্রবণতা বেড়েছে,” আলাপকে তিনি বলেন, 

দরিদ্র মানুষদের পছন্দের ক্ষেত্রে ধর্ম একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে বলে মনে করছেন তিনি। 

দৈনিক নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা।

তার ভাষায়, “সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় জামায়াত সব সময়ই ভাল করে আসছিল। কিন্তু গত দীর্ঘ দিন নির্বাচন না হওয়ায় বোঝা যায়নি এসব এলাকায় জামায়াত কতটা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।”

ভোটের হার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটে পড়েছে ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ।

জামায়াত অতীতে কখনও ১৮টির বেশি আসন বা ১২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তবে এবার তারা সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে মোট ভোটের কত শতাংশ দলটি পেয়েছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য এখনো জানা যায়নি।

জামায়াতের এই ভোটের ফলাফল নিয়ে “সারপ্রাইজ হওয়ার কিছু নাই” বলে মনে করছেন মো. রবিউল আলম।

এমন “ভিন্ন পরিস্থিতিতে নির্বাচন না হলে” আগের মতোই ১৫ থেকে ১৬টি আসনই জামায়াত পেত বলে তার মত । 

তবে তার এই কথার সঙ্গে একমত নন দৈনিক নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। 

জামায়াতের আশানুরূপ আসন না পাওয়ার পেছনে দলটির ‘নিজেদের বাইরে না যাওয়ার মনমানসিকতাকে’ কারণ হিসাবে তুলে ধরছেন।

“জামায়াতের ধারণা ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ আসন কিন্তু তারা পায়নি। এর অন্যতম প্রধান কারণ তাদের আমরা আর মামারা মনোভাব। যারা মানুষের কাছে যেতে পেরেছে তারা জয় নিয়ে এসেছে,” তিনি বলেন।