একটি শব্দকে ঘিরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ‘গুপ্ত’ কি নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার
একটি গ্রাফিতির লেখা বদলানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত পুরো কলেজ এলাকা ও আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক রক্তাক্ত ছবি নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএমআপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে এক তরুণের বিচ্ছিন্ন গোড়ালির রক্তাক্ত ছবি। দাবি করা হচ্ছে, চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে আহত হন তিনি।
প্রশ্ন উঠেছে এই `গুপ্ত' শব্দ নিয়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নতুন এক রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর ভবিষ্যতে এর প্রভাব নেতিবাচক হওয়ার শঙ্কাই বেশি।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই দফায় চট্টগ্রামে চলা সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেলের ব্যবহারে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। একটি গ্রাফিতির লেখা বদলানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত পুরো কলেজ এলাকা ও আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
আর এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক রক্তাক্ত ছবি নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে।
ছবিটিতে দেখা যায় একজনের পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদলের হামলায় আশরাফ হোসেন নামে তাদের এক কর্মীর গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা তারই ছবি।
আর ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটেছে একটি শব্দকে ঘিরে। ‘গুপ্ত’, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এই শব্দই যেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
সোমবার বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে মন্তব্য করেন।
কোনো দলের নাম না নিয়ে তিনি তাদের ‘গুপ্ত’ বলে উল্লেখ করে বলেন, তারা দেশে অশান্তি তৈরি করতে চায়।
এর পরদিন মঙ্গলবার সেই ‘গুপ্ত’ শব্দ ঘিরেই সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ হয়।
মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষ হয়।
কী হয়েছিল চট্টগ্রামে
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এ সময় উভয় পক্ষের কর্মীদের হাতে ধারালো অস্ত্র, কিরিচ, লাঠিসোঁটা দেখা যায়। ইটপাটকেল নিক্ষেপে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
আর এই সংঘর্ষের সূত্রপাত একটি গ্রাফিতির লেখা বদলানোকে কেন্দ্র করে।
কলেজের একটি দেয়ালে লেখা ছিল, ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’।
অভিযোগ করা হয়েছে, সোমবার কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা-কর্মী সেখানে গিয়ে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দেন। পরে ওই স্থানে লেখা হয় ‘গুপ্ত’।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা। বেলা ১২টার দিকে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয় এবং পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
উভয় পক্ষই হামলার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে। সংঘর্ষের প্রথম দফার পর পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পরে কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও বিকেলে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রশিবির একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করলে বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে মিছিলটি কলেজের দিকে আসে। এ সময় সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘর্ষের সময় আশপাশের দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের সামনে ছাত্রদল এবং নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন।
দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ছাত্রশিবিরের দাবি করেন, তাদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন নামের এক কর্মীর গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার ছবিই এ দাবির পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রক্তাক্ত ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মূলত তা নিয়েই শুরু হয় আলোচনা। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
একটি শব্দ, একটি গ্রাফিতি এবং একটি ভাইরাল ছবি মিলিয়ে আবারও উত্তেজনা শুরু হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক বয়ান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘গুপ্ত’ এখন আর কেবল একটি সাধারণ শব্দ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান বা টার্মিনোলজিতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক বলেন, শব্দটি আগে সীমিত বা অনানুষ্ঠানিক পরিসরে থাকলেও এখন তা মূলধারার রাজনৈতিক ভাষ্য, মিডিয়া ও রাজনীতিকদের বক্তব্যে জায়গা করে নিয়েছে।
‘গুপ্ত’ শব্দটি বাংলা ভাষায় নতুন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি কার্যকর রাজনৈতিক টার্মিনোলজি বা হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘গুপ্ত, জাশি, ‘চুমু শফিক- এ ধরনের শব্দ আগে ট্রল বা ব্যঙ্গের অংশ ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এসব শব্দ মূলধারার মিডিয়া এবং রাজনীতিবিদরাও এটি ব্যবহার করছে।”
একই ধরনের মত দিয়েছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরও। তিনি বলেন, ‘গুপ্ত’ এখন একটি রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে হাজির হয়েছে, যা কেবল শব্দের ব্যবহার নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির কৌশল।
সুস্থ রাজনীতির পরিপন্থি
মারুফ মল্লিকের মতে, ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে যে কোনো দল নিষিদ্ধ থাকলে বা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারলে, তাদের সদস্যরা অন্য দল বা প্ল্যাটফর্মের ভেতরে ঢুকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়েছে।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলেও এ অঞ্চলে বামপন্থীরা এ ধরনের রাজনীতি করেছে। বিশ্বজুড়েই এমন চর্চা আছে, এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসের শুরু থেকেই এটি কমবেশি বিদ্যমান।
তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখেন তিনি। তার মতে, সমস্যা তখনই গুরুতর হয়, যখন কোনো দল নিষিদ্ধ নয়, তারা স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করার সুযোগও রাখে, কিন্তু তবু তারা অন্য দলের ভেতরে লোক ঢুকিয়ে ‘গুপ্ত’ভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
সাধারণ রাজনৈতিক যোগাযোগ আর গুপ্ত অনুপ্রবেশ এক বিষয় নয় উল্লেখ করে মারুফ মল্লিক বলেন, একটি দল অন্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে কাউকে দায়িত্ব দেয়। কেউ বামপন্থীদের সঙ্গে, কেউ ইসলামপন্থিদের সঙ্গে, কেউ অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। কিন্তু সেটি আর গুপ্ত রাজনীতি এক জিনিস নয়।
তার ভাষায়, এখন যে ধরনের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা হচ্ছে একটি দলের ভেতরে অন্য একটি দলের লোক নিজেদের আড়াল করে অবস্থান নেয়, গুরুত্বপূর্ণ পদে যায়, এবং ভেতর থেকে সিদ্ধান্ত ও নীতিতে প্রভাব ফেলে।
এ ধরনের অনুপ্রবেশকে খুবই বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এতে একটি রাজনৈতিক দল ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার ব্যাখ্যায়, এ ধরনের লোকজন নীতিনির্ধারণে এমন হস্তক্ষেপ করতে পারে, যাতে দলটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে, সমালোচিত হয়, এবং জনসমর্থন হারায়; একই সঙ্গে যে শক্তির হয়ে তারা কাজ করে, সেই শক্তি লাভবান হয়। এটিকেই তিনি ‘গুপ্ত রাজনীতির ভয়াবহতা’ হিসেবে দেখছেন।
সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরও মনে করেন, এই ধরনের ‘ট্যাগিং’ সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অংশ হতে পারে না। তিনি বলছেন, এমন বয়ান রাজনীতিতে ইতিবাচক ফল আনে না; বরং বিভাজন, উত্তেজনা ও অবিশ্বাস বাড়ায়।
‘বুমেরাং হতে পারে’
সালাহউদ্দিন বাবর বলেন, “সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একসময় ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সেটাই তার কাল হয়। গুপ্ত নিয়ে একই রকম ফল আসতে পারে। বুমেরাং হতে পারে।”
বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক বলেন, ‘গুপ্ত’ শব্দটিও যারা রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে সামনে এনেছেন, ভবিষ্যতে তাদের জন্য সেটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
মারুফ মল্লিকও মনে করেন, ‘গুপ্ত’ তকমা-নির্ভর রাজনীতি দলগুলোর ভেতরেই অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও ক্ষয় তৈরি করে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সম্ভাব্য নতুন কমিটি গঠনকে ঘিরে ভেতরের দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, সেখানে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে সে ‘গুপ্ত’। এই দোষারোপের সংস্কৃতি দলীয় রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে যে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চলছে, তা সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চার অংশ নয়; বরং এটি রাজনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি প্রবণতা।
একটি শব্দকে ঘিরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ‘গুপ্ত’ কি নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার
একটি গ্রাফিতির লেখা বদলানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত পুরো কলেজ এলাকা ও আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক রক্তাক্ত ছবি নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে এক তরুণের বিচ্ছিন্ন গোড়ালির রক্তাক্ত ছবি। দাবি করা হচ্ছে, চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে আহত হন তিনি।
প্রশ্ন উঠেছে এই `গুপ্ত' শব্দ নিয়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নতুন এক রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর ভবিষ্যতে এর প্রভাব নেতিবাচক হওয়ার শঙ্কাই বেশি।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই দফায় চট্টগ্রামে চলা সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেলের ব্যবহারে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। একটি গ্রাফিতির লেখা বদলানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত পুরো কলেজ এলাকা ও আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
আর এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক রক্তাক্ত ছবি নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে।
ছবিটিতে দেখা যায় একজনের পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদলের হামলায় আশরাফ হোসেন নামে তাদের এক কর্মীর গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা তারই ছবি।
আর ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটেছে একটি শব্দকে ঘিরে। ‘গুপ্ত’, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এই শব্দই যেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
সোমবার বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে মন্তব্য করেন।
কোনো দলের নাম না নিয়ে তিনি তাদের ‘গুপ্ত’ বলে উল্লেখ করে বলেন, তারা দেশে অশান্তি তৈরি করতে চায়।
এর পরদিন মঙ্গলবার সেই ‘গুপ্ত’ শব্দ ঘিরেই সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ হয়।
মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষ হয়।
কী হয়েছিল চট্টগ্রামে
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এ সময় উভয় পক্ষের কর্মীদের হাতে ধারালো অস্ত্র, কিরিচ, লাঠিসোঁটা দেখা যায়। ইটপাটকেল নিক্ষেপে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
আর এই সংঘর্ষের সূত্রপাত একটি গ্রাফিতির লেখা বদলানোকে কেন্দ্র করে।
কলেজের একটি দেয়ালে লেখা ছিল, ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’।
অভিযোগ করা হয়েছে, সোমবার কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা-কর্মী সেখানে গিয়ে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দেন। পরে ওই স্থানে লেখা হয় ‘গুপ্ত’।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা। বেলা ১২টার দিকে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয় এবং পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
উভয় পক্ষই হামলার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে। সংঘর্ষের প্রথম দফার পর পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পরে কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও বিকেলে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রশিবির একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করলে বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে মিছিলটি কলেজের দিকে আসে। এ সময় সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘর্ষের সময় আশপাশের দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের সামনে ছাত্রদল এবং নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন।
দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ছাত্রশিবিরের দাবি করেন, তাদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন নামের এক কর্মীর গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার ছবিই এ দাবির পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রক্তাক্ত ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মূলত তা নিয়েই শুরু হয় আলোচনা। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
একটি শব্দ, একটি গ্রাফিতি এবং একটি ভাইরাল ছবি মিলিয়ে আবারও উত্তেজনা শুরু হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক বয়ান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘গুপ্ত’ এখন আর কেবল একটি সাধারণ শব্দ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান বা টার্মিনোলজিতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক বলেন, শব্দটি আগে সীমিত বা অনানুষ্ঠানিক পরিসরে থাকলেও এখন তা মূলধারার রাজনৈতিক ভাষ্য, মিডিয়া ও রাজনীতিকদের বক্তব্যে জায়গা করে নিয়েছে।
‘গুপ্ত’ শব্দটি বাংলা ভাষায় নতুন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি কার্যকর রাজনৈতিক টার্মিনোলজি বা হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘গুপ্ত, জাশি, ‘চুমু শফিক- এ ধরনের শব্দ আগে ট্রল বা ব্যঙ্গের অংশ ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এসব শব্দ মূলধারার মিডিয়া এবং রাজনীতিবিদরাও এটি ব্যবহার করছে।”
একই ধরনের মত দিয়েছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরও। তিনি বলেন, ‘গুপ্ত’ এখন একটি রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে হাজির হয়েছে, যা কেবল শব্দের ব্যবহার নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির কৌশল।
সুস্থ রাজনীতির পরিপন্থি
মারুফ মল্লিকের মতে, ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে যে কোনো দল নিষিদ্ধ থাকলে বা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারলে, তাদের সদস্যরা অন্য দল বা প্ল্যাটফর্মের ভেতরে ঢুকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়েছে।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলেও এ অঞ্চলে বামপন্থীরা এ ধরনের রাজনীতি করেছে। বিশ্বজুড়েই এমন চর্চা আছে, এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসের শুরু থেকেই এটি কমবেশি বিদ্যমান।
তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখেন তিনি। তার মতে, সমস্যা তখনই গুরুতর হয়, যখন কোনো দল নিষিদ্ধ নয়, তারা স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করার সুযোগও রাখে, কিন্তু তবু তারা অন্য দলের ভেতরে লোক ঢুকিয়ে ‘গুপ্ত’ভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
সাধারণ রাজনৈতিক যোগাযোগ আর গুপ্ত অনুপ্রবেশ এক বিষয় নয় উল্লেখ করে মারুফ মল্লিক বলেন, একটি দল অন্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে কাউকে দায়িত্ব দেয়। কেউ বামপন্থীদের সঙ্গে, কেউ ইসলামপন্থিদের সঙ্গে, কেউ অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। কিন্তু সেটি আর গুপ্ত রাজনীতি এক জিনিস নয়।
তার ভাষায়, এখন যে ধরনের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা হচ্ছে একটি দলের ভেতরে অন্য একটি দলের লোক নিজেদের আড়াল করে অবস্থান নেয়, গুরুত্বপূর্ণ পদে যায়, এবং ভেতর থেকে সিদ্ধান্ত ও নীতিতে প্রভাব ফেলে।
এ ধরনের অনুপ্রবেশকে খুবই বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এতে একটি রাজনৈতিক দল ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার ব্যাখ্যায়, এ ধরনের লোকজন নীতিনির্ধারণে এমন হস্তক্ষেপ করতে পারে, যাতে দলটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে, সমালোচিত হয়, এবং জনসমর্থন হারায়; একই সঙ্গে যে শক্তির হয়ে তারা কাজ করে, সেই শক্তি লাভবান হয়। এটিকেই তিনি ‘গুপ্ত রাজনীতির ভয়াবহতা’ হিসেবে দেখছেন।
সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরও মনে করেন, এই ধরনের ‘ট্যাগিং’ সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অংশ হতে পারে না। তিনি বলছেন, এমন বয়ান রাজনীতিতে ইতিবাচক ফল আনে না; বরং বিভাজন, উত্তেজনা ও অবিশ্বাস বাড়ায়।
‘বুমেরাং হতে পারে’
সালাহউদ্দিন বাবর বলেন, “সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একসময় ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সেটাই তার কাল হয়। গুপ্ত নিয়ে একই রকম ফল আসতে পারে। বুমেরাং হতে পারে।”
বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক বলেন, ‘গুপ্ত’ শব্দটিও যারা রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে সামনে এনেছেন, ভবিষ্যতে তাদের জন্য সেটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
মারুফ মল্লিকও মনে করেন, ‘গুপ্ত’ তকমা-নির্ভর রাজনীতি দলগুলোর ভেতরেই অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও ক্ষয় তৈরি করে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সম্ভাব্য নতুন কমিটি গঠনকে ঘিরে ভেতরের দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, সেখানে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে সে ‘গুপ্ত’। এই দোষারোপের সংস্কৃতি দলীয় রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে যে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চলছে, তা সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চার অংশ নয়; বরং এটি রাজনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি প্রবণতা।