হরমুজে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনা কি আবারও যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে
ওয়াশিংটন ঘটনাটিকে ইরানি আগ্রাসন হিসেবে দেখলেও তেহরান দায় স্বীকার করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় স্পষ্ট হয়েছে, পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ পিএমআপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
হরমুজে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত ঘিরে যুদ্ধের শঙ্কা। ছবি: এআই জেনারেটেড
হরমুজ প্রণালির কাছে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানই এর জন্য দায়ী। তবে তেহরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি। তবে দুই পক্ষ পালটাপালটি হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পূর্ণ সংঘাত না লাগলেও পরিস্থিতি যে কত সহজে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই ঘটনায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ওই হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে।
তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি একটি ইরানি ড্রোনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিধ্বস্ত হয়। সংঘর্ষটি পরিকল্পিত হামলা ছিল, নাকি অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই অনিশ্চয়তাই পুরো সংকটের কেন্দ্রে। কারণ, ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন হলেও ওয়াশিংটন এর প্রতিক্রিয়া দিয়েছে সামরিক ভাষায়।
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে, একাধিক দফা হামলা চালায়। তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা অভিযানের পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হামলা “সম্পন্ন” হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র “অযৌক্তিক ইরানি আগ্রাসন” মোকাবিলায় প্রস্তুত।
তবে পরিস্থিতি সেখানেই থেমে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর এবং জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতা জারি হওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার খবরও মিলেছে।
কী হয়েছিল
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার এপি জানিয়েছে, এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি একটি ইরানি ড্রোনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিধ্বস্ত হয়; সংঘর্ষটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
হেলিকপ্টারটি ওমান উপকূলের কাছে টহলের সময় বিধ্বস্ত হয়। এতে থাকা দুই ক্রু সদস্যকে পরে উদ্ধার করা হয়।
সেন্টকম জানিয়েছে, একটি মনুষ্যবিহীন নৌযানের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং পরে উদ্ধার করা হয়। দুই ক্রু সদস্যই নিরাপদ ও স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতে ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে একাধিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে চালানো হামলাগুলো ছিল “আনুপাতিক জবাব”। তাদের ভাষ্য, ইরানের “অযৌক্তিক আগ্রাসনের” জবাব দিতেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার ও গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।
ট্রাম্প প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে ঘটনাটিকে খুব বড় বিষয় নয় বলে মন্তব্য করে বলেন, পাইলট নিরাপদ আছেন।
তবে কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরান হেলিকপ্টারটি নামিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এর জবাব দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব দেয় ইরান। রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের দাবি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটি এবং জর্ডানের একটি মার্কিন সেনা উপস্থিতি থাকা ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইন বিমান হামলার সতর্কতা জারি করে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা জানায়। জর্ডানও জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরানের ছোড়া প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন সেনা হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং মার্কিন সামরিক অবকাঠামো।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, কোনো হামলাই “জবাবহীন” থাকবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের পরও ইরানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, “নিরাপদ থাকতে চাইলে বিদেশি বাহিনীকে অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে।”
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় ইরানের কোনো সামরিক অভিযান চালানো হয়নি।
ফলে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন একে ইরানি আগ্রাসন হিসেবে দেখালেও তেহরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি।
যুদ্ধবিরতির কী হবে?
এই পাল্টাপাল্টি হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে। জ্বালানি বাজার, খাদ্যপণ্যের দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হওয়ায় সেখানে নতুন উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি “দুই-তিন দিনের মধ্যে” হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা সীমিত করুক। বিপরীতে ইরান চাইছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ মুক্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত দেখিয়ে দিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইসরায়েয়ের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, ইরান সহজে কোনো চুক্তিতে যাবে না। সামরিক চাপ তেহরানের অবস্থান পুরোপুরি বদলে দেবে, এমন ধারণার ভিত্তি দুর্বল।
বারবার সীমিত হামলা ও পাল্টা হামলা দুই পক্ষকেই আরও বড় সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আর সামরিক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ারের মতে, সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
একই সঙ্গে তারা নিজেদের বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাইছে বলেও মত দেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের উদ্দেশ্য হলো, তাদের ওপর হামলা হলে তার মূল্য দিতে হবে, এই বার্তা দেওয়া।
ম্যাগনিয়ার বলেন, “কোনো পক্ষই সীমাহীন যুদ্ধ চায় বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এর মূল্য দুই পক্ষের জন্যই ভয়াবহ হবে।”
মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ইরান স্বাভাবিকভাবেই এর দায় স্বীকার করবে না। কারণ দায় স্বীকার করলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় ধরনের হামলা চালানো, এমনকি যুদ্ধের দিকে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এমন বার্তা দিচ্ছে যে প্রয়োজন হলে তারা যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।
তবে তেহরান এই হিসাব করছে জেনেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ খুব বেশি নেই।
হরমুজে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনা কি আবারও যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে
ওয়াশিংটন ঘটনাটিকে ইরানি আগ্রাসন হিসেবে দেখলেও তেহরান দায় স্বীকার করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় স্পষ্ট হয়েছে, পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালির কাছে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানই এর জন্য দায়ী। তবে তেহরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি। তবে দুই পক্ষ পালটাপালটি হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পূর্ণ সংঘাত না লাগলেও পরিস্থিতি যে কত সহজে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই ঘটনায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ওই হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে।
তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি একটি ইরানি ড্রোনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিধ্বস্ত হয়। সংঘর্ষটি পরিকল্পিত হামলা ছিল, নাকি অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই অনিশ্চয়তাই পুরো সংকটের কেন্দ্রে। কারণ, ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন হলেও ওয়াশিংটন এর প্রতিক্রিয়া দিয়েছে সামরিক ভাষায়।
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে, একাধিক দফা হামলা চালায়। তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা অভিযানের পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হামলা “সম্পন্ন” হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র “অযৌক্তিক ইরানি আগ্রাসন” মোকাবিলায় প্রস্তুত।
তবে পরিস্থিতি সেখানেই থেমে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর এবং জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতা জারি হওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার খবরও মিলেছে।
কী হয়েছিল
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার এপি জানিয়েছে, এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি একটি ইরানি ড্রোনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিধ্বস্ত হয়; সংঘর্ষটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
হেলিকপ্টারটি ওমান উপকূলের কাছে টহলের সময় বিধ্বস্ত হয়। এতে থাকা দুই ক্রু সদস্যকে পরে উদ্ধার করা হয়।
সেন্টকম জানিয়েছে, একটি মনুষ্যবিহীন নৌযানের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং পরে উদ্ধার করা হয়। দুই ক্রু সদস্যই নিরাপদ ও স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতে ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে একাধিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে চালানো হামলাগুলো ছিল “আনুপাতিক জবাব”। তাদের ভাষ্য, ইরানের “অযৌক্তিক আগ্রাসনের” জবাব দিতেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার ও গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।
ট্রাম্প প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে ঘটনাটিকে খুব বড় বিষয় নয় বলে মন্তব্য করে বলেন, পাইলট নিরাপদ আছেন।
তবে কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরান হেলিকপ্টারটি নামিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এর জবাব দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব দেয় ইরান। রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের দাবি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটি এবং জর্ডানের একটি মার্কিন সেনা উপস্থিতি থাকা ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইন বিমান হামলার সতর্কতা জারি করে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা জানায়। জর্ডানও জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরানের ছোড়া প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন সেনা হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং মার্কিন সামরিক অবকাঠামো।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, কোনো হামলাই “জবাবহীন” থাকবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের পরও ইরানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, “নিরাপদ থাকতে চাইলে বিদেশি বাহিনীকে অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে।”
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় ইরানের কোনো সামরিক অভিযান চালানো হয়নি।
ফলে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন একে ইরানি আগ্রাসন হিসেবে দেখালেও তেহরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি।
যুদ্ধবিরতির কী হবে?
এই পাল্টাপাল্টি হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে। জ্বালানি বাজার, খাদ্যপণ্যের দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হওয়ায় সেখানে নতুন উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি “দুই-তিন দিনের মধ্যে” হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা সীমিত করুক। বিপরীতে ইরান চাইছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ মুক্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত দেখিয়ে দিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইসরায়েয়ের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, ইরান সহজে কোনো চুক্তিতে যাবে না। সামরিক চাপ তেহরানের অবস্থান পুরোপুরি বদলে দেবে, এমন ধারণার ভিত্তি দুর্বল।
বারবার সীমিত হামলা ও পাল্টা হামলা দুই পক্ষকেই আরও বড় সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আর সামরিক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ারের মতে, সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
একই সঙ্গে তারা নিজেদের বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাইছে বলেও মত দেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের উদ্দেশ্য হলো, তাদের ওপর হামলা হলে তার মূল্য দিতে হবে, এই বার্তা দেওয়া।
ম্যাগনিয়ার বলেন, “কোনো পক্ষই সীমাহীন যুদ্ধ চায় বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এর মূল্য দুই পক্ষের জন্যই ভয়াবহ হবে।”
মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ইরান স্বাভাবিকভাবেই এর দায় স্বীকার করবে না। কারণ দায় স্বীকার করলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় ধরনের হামলা চালানো, এমনকি যুদ্ধের দিকে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এমন বার্তা দিচ্ছে যে প্রয়োজন হলে তারা যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।
তবে তেহরান এই হিসাব করছে জেনেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ খুব বেশি নেই।
(বিবিসি আল-জাজিরা ও গার্ডিয়ান অবলম্বনে)
বিষয়: