শেখ হাসিনা কি ফিরতে পারবেন?

নেতৃত্বের বদল হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ বাড়বে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসনিম খলিল বিষয়টাকে প্যারাডক্স হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনাকে বাদ না দিলে আওয়ামী লীগের পক্ষে বাংলাদেশের ইলেক্টোরাল রাজনীতিতে ফিরে আসা অসম্ভব। আর দ্বিতীয় হলো শেখ হাসিনা না থাকলে আওয়ামী লীগই থাকবে না।”

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ‘ফিরে এসেছে’ বলে নিজের ফেইসবুকে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। মঙ্গলবার এক ফেইসবুক পোস্টে আওয়ামী লীগ কীভাবে ফিরেছে, তার তালিকা তুলে ধরেন। এমনকি সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও বুধবার ফেইসবুকে জানিয়েছেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি। তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।” চারিদিকে এতো আলোচনা ভারতীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার এক সাক্ষাৎকার ঘিরে।

শেখ হাসিনা ভারতীয় গণমাধ্যমে সরাসরি জানিয়েছেন- তিনি দেশে ফিরবেন মাথা উঁচু করে। প্রশ্ন উঠছে, আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে কীভাবে প্রত্যাবর্তন সম্ভব? শেখ হাসিনার কথায়, “বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরেও তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার সব চেষ্টা করে। কিন্তু উল্টো আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েই ফিরে এসেছে। যারা এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী মনে করছেন তাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে বলব।” 

শেখ হাসিনার ফিরে আসা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও মন্তব্য করেছেন মঙ্গলবার। তিনি বলেছেন, “শেখ হাসিনাকে আমরা ক্ষমতা থেকে সরাতে চেয়েছি, কারণ তিনি ইনসাফ করেন নাই। পরবর্তী যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে— তার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনসাফ থাকবে। এমনকি শত্রুর প্রতি ইনসাফ থাকবে। শেখ হাসিনার প্রতি আমাদের ইনসাফ থাকবে।”

এসব তর্ক-বিতর্ক সমালোচনার ঝড়ে প্রশ্ন উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানরা কি দেশে কিংবা ক্ষমতায় ফিরতে পারেন? জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বিশ্ব ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইরানের মোহাম্মদ রেজা পাহলভি এভাবেই গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তিউনিশিয়ার জিনে এল-আবিদিন বেন আলি, ফিলিপিনের ফার্দিনান্দ মার্কোসকেও দেশ ছাড়তে হয়েছে জনতার অভ্যুত্থানের মুখে।

তারা কেউই আর নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। কিন্তু বাংলাদেশে এখন আলোচনার বিষয় ২০২৪ সালে ক্ষমতার গদি থেকে উৎখাত হয়ে ভারত চলে যাওয়া শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে। ভারতীয় গণমাধ্যমে তার সাক্ষাৎকার বেশ কয়েকবারই প্রকাশ হয়েছে। তবে এবার আলোচিত হয়েছে তার বক্তব্য। তিনি আনন্দবাজারকে জানালেন, “সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব।”

ইতিহাসে এমন পতনের পর কেউ কি ফিরতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল আলাপ-কে বলেন, ইতিহাসে এরকম দেখা যায় না সচরাচর। গণআন্দোলনে পতিত যে স্বৈরাচার বলেন বা শাসক বলেন এদের নরমালি কোথাও ফেরার ইতিহাস নাই। এটা হয় যে ওদের পরবর্তী প্রজন্মের একটা সম্ভাবনা থাকে। যেমন, ফিলিপিনসে ওদের ছেলে বা নাতি এরকম লোকজন ফিরে আসতে পেরেছিল।”   

তবে তাসনিম মনে করেন সামরিক অভ্যুত্থান এবং গণঅভ্যুত্থানের ভেতর পার্থক্য আছে। গণঅভ্যুত্থানের ভেতর যাদের পতন হয় তারা ফিরতে না পারলেও সামরিক অভ্যুত্থানে যাদের পতন হয় তারা প্রায় ফিরে আসে। পরবর্তীতে যখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ফিরে আসে তখন এরা ফেরার সুযোগ পায়।

এই বিষয়টাকে তিনি গ্লোবাল ট্রেন্ড হিসেবে দেখছেন ১৯৪৫ সাল অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাস্তবতায়। কারণ তার আগে আধুনিক রাষ্ট্র সেভাবে ছিল না, তাই আগের হিসাবটা ভিন্ন।

অন্যদিকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি রিসার্চ স্কলার আশিষ কুমার দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসেন। তিনি আলাপ-কে বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান বা বড় জনআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনেক নেতারই পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার নজির আছে।”

উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর কথাও উল্লেখ করেন। একইভাবে পাকিস্তানে নওয়াজ শরীফসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও দল বিভিন্ন সময় সামরিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতির অভিযোগ বা রাজনৈতিক সংকটের কারণে ক্ষমতা হারালেও পরবর্তীতে নির্বাচনি রাজনীতিতে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও দলীয় রাজনীতির পুনর্গঠন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আংশিক পুনরুত্থান দেখা গেছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে পরিবারের পতনের পরও তাদের দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হলেও রাজনৈতিক শক্তিগুলো সম্পূর্ণভাবে মুছে যায় না।

আশিষ কুমারকে প্রশ্ন করা হয়, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থানে বলপ্রয়োগের অভিযোগ শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি অন্য উদাহরণ থেকে আলাদা কিনা। জবাবে তিনি বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও সরকারবিরোধী গণআন্দোলন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের উদাহরণ রয়েছে।” 

তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদাহরণ টেনে বলেন, জরুরি অবস্থার সময় তার বিরুদ্ধেও গণতন্ত্র দমন ও বিরোধীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। পরে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হলেও আবার রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসেন।

শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ ফেরার বাস্তবতা

শেখ হাসিনা তার সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরেও তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার সব চেষ্টা করে। কিন্তু উল্টো আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েই ফিরে এসেছে।”

প্রশ্ন হচ্ছে এবারও কি আওয়ামী লীগ আগের মতো ফিরে আসতে পারবে? এর উত্তরে তাসনিম খলিল মনে করেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি যদি আমরা বিবেচনা করি তাহলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ফিরে আসার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো শেখ হাসিনা নিজে। কারণ উনি যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন আওয়ামী লীগের দায়িত্ব উনি কাউকে দেবেন না।

নেতৃত্বের বদল হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ বাড়বে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসনিম বিষয়টাকে প্যারাডক্স হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনাকে বাদ না দিলে আওয়ামী লীগের পক্ষে বাংলাদেশের ইলেক্টোরাল রাজনীতিতে ফিরে আসা অসম্ভব। আর দ্বিতীয় হলো শেখ হাসিনা না থাকলে আওয়ামী লীগই থাকবে না। সুতরাং এটা একটা প্যারাডক্স।”

তবে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল মনে করেন শেখ হাসিনার ফিরে আসার বাস্তবতা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে এই সরকার কেমন শাসন করবে তার ওপর। যদিও মাসুদ কামাল জানান তিনি ৫ আগস্টের পরই দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “ড. ইউনূস সাহেবের অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে সারাদেশে অপশাসন তৈরি করেছিলেন। মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলেছেন, তখন মানুষ তুলনা করা শুরু করেছে। ইউনূসের আমলটা ভালো নাকি হাসিনার আমল? যখন এই তুলনা শুরু করেছে তখন থেকে আসলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার বাস্তবতা আস্তে আস্তে তৈরি হয়েছে।”

মাসুদ কামাল মনে করেন বর্তমান নির্বাচিত সরকার যে শাসন চালাবে, তারা যেভাবে দেশটাকে পরিচালনা করবে সেই পরিচালনা যদি মানুষের প্রত্যাশাকে মেটাতে না পারে তাহলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার বাস্তবতা আরো দৃঢ়তা পাবে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি রিসার্চ স্কলার আশিষ কুমার আলাপ-কে বলেন, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উদাহরণ বিবেচনায় নিলে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তবে সব নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনি কাঠামো এবং জনমতের ওপর।

ফিরে আসা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে তখনও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাস বিরোধী আইনে নিষিদ্ধ অবস্থায় আছে। বলা হয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ।

এই নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তাদের ফেরা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ কামাল বলেন, “সারা দেশে যদি অরাজকতা তৈরি হয় তাহলে সেটাকে এই সরকার কীভাবে হ্যান্ডেল করবে? তারা এমন একটা চাপ প্রয়োগ করবে আইন তুলে নিতে বাধ্য হবে। পৃথিবীতে কোনো আন্দোলন কি আইন মেনে চলে?”

একইসঙ্গে মাসুদ কামাল মনে করেন যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেটি অবৈধ।

“বাংলাদেশে একজন নাগরিকের রাজনীতি করার অধিকারটা সংবিধান দিয়েছে। সাংবিধানিক সেই অধিকার প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে রহিত করা যায় না।” বলেন মাসুদ কামাল। 

অন্যান্য দেশে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্র প্রধানরা রাজনীতির সুযোগ পেলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রম বলে মন্তব্য করেন আশিষ কুমার। তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে একটি বড় রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদাহরণ থেকে অনেক আলাদা। যেখানে নেপাল-শ্রীলঙ্কাতেও ক্ষমতাচ্যুত দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিতে পেরেছে।

নেতৃত্ব নিয়ে যত প্রশ্ন

শেখ হাসিনার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কে আসবে এসব বিষয়ে গত ১৮ মাস আলোচনা কম হয়নি। যার মধ্যে ছিল ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’কে এনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গ। যদিও এসব কোনো আলোচনাই টেকসই হয়নি।

নেতৃত্ব বদল নিয়ে তাসনিম খলিল সামনে নিয়ে আসেন পরিবারতন্ত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ। তিনি মনে করেন এই উপমহাদেশে বড় বড় দলগুলো ডাইনেস্টিক পলিটিক্স করে আসছে। পাকিস্তানে ভুট্টো’র পরিবার, ভারতে ইন্দিরা গান্ধী থেকে রাহুল গান্ধী। অর্থাৎ পার্টিগুলোর নেতৃত্বে বদল আসে পরবর্তী জেনারেশনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে।  

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তাসনিম খলিল বলেন, বাংলাদেশে যেটা হয়েছে, সেটা হলো দুইটা ডাইনিস্টিক পার্টি আছে। একটা হলো আওয়ামী লীগ আরেকটা হলো বিএনপি। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, শেখ মুজিব টু শেখ হাসিনা। এর পরে আর কেউ নাই। হাসিনার পরবর্তী নেতা কে আওয়ামী লীগের? এটা তো আমার ধারণা হাসিনাও জানে না।

যদিও বিএনপি’র কথা বলতে গিয়ে তাসনিম মনে করেন জিয়াউর রহমান টু খালেদা জিয়া। তারপরে একটা জেনারেশন পরিবর্তন হয়ে, গণঅভ্যুত্থানের আগেই তারেক রহমানের হাতে বিএনপির একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল।

এই বিষয়টা বিএনপির সুবিধা হিসেবে দেখছেন তাসনিম খলিল। তিনি মনে করেন তারেক রহমান নির্বাসনে থাকার কারণে পুরোটা সময় পার্টিকে সমন্বয়ে কাজে লাগিয়েছেন। যার সুফল এসেছে নির্বাচনে।

তবে মাসুদ কামাল ড. ইউনূসের প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণের কারণে পুরনো আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, “ড. ইউনূস সরকার যেভাবে আওয়ামী লীগকে নির্বংশ করতে চেয়েছেন, তাতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনটা আমি মনে করি অবধারিত হয়ে গেছে।”  

তিনি মনে করেন যদি অপরাধীদের সাজার আওতায় আনা এবং যারা নিরাপরাধ তাদের আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ দিতো, তাহলে আওয়ামী লীগের ফিরে আসাটা এখন অনেক কঠিন হতো কিংবা অসম্ভব ছিল।

এই সুযোগে আওয়ামী লীগের কোনো পরিবর্তন হবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক। তিনি বলেন, “তারা যদি এখন আসে তাহলে সেই আগের সবাইকে নিয়েই ফিরবে। অর্থাৎ আগে আওয়ামী লীগ যা করতো, এলে তাই করবে। এখানে কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো চেঞ্জ হবে না।”

তিনি আরও বলেন, আমার কাছে খুবই আশ্চর্য লাগছে, একটা পলিটিক্যাল লিডারের সবসময় বলা উচিত আমাদেরও ভুল হয়েছে। সেই ভুলটা আমরা যদি আসি শুধরাবো। কিন্তু উনার (শেখ হাসিনা) কথা শুনে মনে হয় উনি বলতে চাচ্ছেন যে আমরা যদি আসি আমরা আগের মতো করে আসবো।  

মাসুদ কামাল মনে করেন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে বলতে হবে তারা ভুল করেছে এবং ভুল শুধরে আমরা আসবো। যদি তারা শুধরে না আসে, তাহলে দেশের জন্য ভালো হবে না বলে জানান তিনি।

সমর্থকদের কী হবে

আওয়ামী লীগের ভোট সমাজে এখনও আছে। এমন আলোচনাও রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সেই ভোটার কিংবা সমর্থকদের কী হবে এমন প্রশ্নে তাসনিম খলিল বলেন, বাংলাদেশে আমরা একটা মিসকনসেপশনের ওপর বসে আছি। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ওদের (আওয়ামী লীগের) একটা বড় সমর্থক গোষ্ঠী আছে। এইবারের ইলেকশনটা হলো একেবারে নতুন একটা ইলেকশন। এইবারের সকল হিসাব নিকাশ ওলট-পালট হয়ে গেছে।

তাসনিম মনে করেন আওয়ামী লীগ ভোটার সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটা হলো ধর্মীয় সংখ্যালঘু, তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন। তারা এবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। আরেকটা হলো বাংলাদেশে মধ্যপন্থি বা মধ্য বামপন্থি বা যারা একটু সেক্যুলার কালচারে বিশ্বাসী। এরা জামায়াত ও ডানপন্থার উত্থানে শংকিত হয়ে দলে দলে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।

“তাহলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ ভোট অলরেডি বিএনপিতে চলে গেছে। আওয়ামী লীগ তো নাই। আল্টিমেটলি এবারের নির্বাচনে ইকুয়েশন চেঞ্জ হয়ে গেছে।”

ভারতে অবস্থান কী হবে

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে ভারত একটি জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। এমন আলোচনা প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি রিসার্চার আশিষ কুমার আলাপ-কে বলেন, দিল্লির অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে ধারাবাহিক এবং কৌশলগত। ভারতের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদী অংশীদার। যার শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশেষ করে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় স্থিতিশীল ছিল।

তবে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার আমলে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে না দিলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না- এমন অবস্থানের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা ছেদ ঘটেছিল বলে জানান। তবে এও উল্লেখ করেন, বর্তমান নির্বাচিত তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার সে ধরনের কোনো শর্ত না দেওয়ায় এবার সম্পর্ক ভালোর দিকে যাবে।

তিনি বলেন, “ভারত সাধারণত আঞ্চলিক অংশীদারদের ক্ষেত্রে “কনটিনিউটি অব পার্টনারশিপ” নীতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ব্যক্তি পরিবর্তনের কারণে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হবে না। সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণই থাকবে।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনে ভারতের ভূমিকা থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসনিম খলিল বলেন, “আমাদের কাছে মনে হয় ভারত না জানি কী শক্তিশালী রাষ্ট্র। আপনি যদি দেখেন ভারতের পররাষ্ট্র নীতি শুধু বাংলাদেশে না, নেপালে ফেইল করছে, মালদ্বীপে ফেইল করছে, শ্রীলঙ্কায় ফেইল করছে। সেই সব দেশে ভারত কী করতে পারছে? আল্টিমেটলি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে ভারত এমন কী করবে যে আওয়ামী লীগকে তারা ফেরত আনবে?”

তাসনিম খলিল মনে করেন এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করার জন্য হয়তো ভারতের হাতে কিছু টুলস আছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থা নেই। বর্তমানে বিশ্বের যে পরিস্থিতি সেখানে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে এখন অনেকটা স্ট্যাবেল।