ধর্মে হিন্দু কিন্তু মহররমে করেন শোক পালন; কারা এই ‘হুসাইনি ব্রাহ্মণ’?

ভারতীয় অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ সুনিল দত্ত গর্বের সাথে নিজেকে হুসাইনি ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচয় দিতেন। তার ছেলে বলিউড তারকা সঞ্জয় দত্তও হুসাইনি ব্রাহ্মণ পরিচয় দেন নিজের।

 

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০১:৪০ পিএম

ভারতের কিছু অঞ্চলে দেখা যায় এক সম্প্রদায়ের মানুষ; ধর্মে তারা হিন্দু, পূজা করেন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এবং পাশাপাশি আশুরাও পালন করেন, সম্মান জানান ইমাম হুসাইনকে। মহররমের মাসে তারা আনন্দ-উদযাপন ও এমনকি বিয়ে থেকেও বিরত থাকেন।

তাদের মূলমন্ত্র এক পুরনো কবিতা, ওয়াহ দত্ত সুলতান ! হিন্দু কা ধরম, মুসলমান কা ইমান, আধা হিন্দু, আধা মুসলমান (বাহ দত্ত সুলতান! হিন্দুর ধর্ম, মুসলমানের ইমান, আধা হিন্দু, আধা মুসলমান)। তাদের পরিচয়, তারা হুসাইনি ব্রাহ্মণ।

জনপ্রিয় ভারতীয় সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদের ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘কারবালা’ নাটকে উল্লেখ আছে হুসাইনি ব্রাহ্মণদের কথা; ‘মোহিয়াল’ ব্রাহ্মণদের এক শাখার যোদ্ধা, যারা ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের কারবালা যুদ্ধে ইমাম হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

মোহিয়াল ব্রাহ্মণদের সাতটি শাখা আছে: বালি, চিব্বর, ভিমওয়াল, লাউ, মোহন, বেদ এবং দত্ত।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস নাউ তাদের এক প্রতিবেদনে চেন্নাই-ভিত্তিক সাংবাদিক সাইদ মুজতবা আলিকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, মোহিয়াল ব্রাহ্মণদের দত্ত শাখা থেকেই হুসাইনি ব্রাহ্মণদের উৎপত্তি। তার লেখায় হুসাইনি ব্রাহ্মণদের ঐতিহাসিক উৎপত্তি নিয়ে লোকশ্রুতির কথাও জানা যায়।

লোকশ্রুতি অনুযায়ী, হুসাইনি ব্রাহ্মণরা বিশ্বাস করেন, দত্ত ব্রাহ্মণদের নেতা রাহাব সিং দত্ত ও তার সৈন্যরা বাগদাদে থাকতেন। নবী মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন কারবালার যুদ্ধের ডাক দিলে রাহাব সিং দত্ত, যার সাথে ইমাম হুসাইনের ভালো সম্পর্ক ছিলো, সাড়া দেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, রাহাব সিং দত্ত ও তার সৈন্যরা যে জায়গায় থাকতেন তাকে বলা হতো ‘দ্যায়র আল হিন্দিয়া।’ 

বাগদাদ থেকে ১৪৯ কিলোমিটার দূরের ছোট শহর হিন্দিয়া, যেটি কারবালা গভর্নরেটের মধ্যে পড়ে। এটিকেই ধরা হয় সেই দ্যার আল হিন্দিয়া। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ হুসাইনি ব্রাহ্মণদের নিয়ে লিখেছেন ননিকা দত্ত। তিনি জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাসের শিক্ষক ও ভারতের অমৃতসরের বিখ্যাত হুসাইনি ব্রাহ্মণ কবি ব্রহ্ম নাথ দত্ত ‘কাসির’-এর নাতনী।

ননিকা বলছেন, লোকশ্রুতি অনুযায়ী রাহব সিং দত্তের সাত ছেলে ছিলো, এবং সাতজনই কারবালার যুদ্ধে নিহত হন। মুন্সি প্রেমচাঁদের নাটকেও কারবালায় অংশ নিতে ভারত থেকে যাওয়া অসমসাহসী ‘সাত যোদ্ধার’ কথা জানা যায় 

“হুসাইনি ব্রাহ্মণদের অনেকেই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেখানকার নাগরিক হয়ে যায়। অনেকেই তাদের ‘হুসাইনি ব্রাহ্মণ’ পরিচয় ফেলে দিয়ে শুধুই ব্রাহ্মণ হিসেবেই জীবনযাপন করছেন, যা হুসাইনি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের থেকে একদমই আলাদা।”

বর্তমানের মোহিয়াল সম্প্রদায়ের দত্ত ব্রাহ্মণরা তাদের পূর্বপুরুষদের যুদ্ধ ও ত্যাগকে সম্মান জানাতে নিজেদের পরিচয় দেন হুসাইনি ব্রাহ্মণ হিসেবে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হুসাইনি ব্রাহ্মণরা পূর্বপুরুষদের ত্যাগকে স্মরণ করতে গলায় একটি দাগ এঁকে রাখেন।

টাইমস নাউ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারবালা যুদ্ধের সময় বাগদাদে ১,৪০০ ব্রাহ্মণ থাকতেন। বর্তমানে ভারতের পুনে, দিল্লি, আজমির, বিহার, চণ্ডীগড়, অমৃতসর, ও জম্মু, পাকিস্তানের সিন্ধ ও লাহোর এবং আফগানিস্তানের কান্দাহারে হুসাইনি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষ থাকেন।

তারা বিশ্বাস করেন, কারবালা যুদ্ধে রাহব সিং দত্ত ও তার সেনারাই তাদের পূর্বপুরুষ। তারা ব্যক্তিগত জীবনে হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বিভিন্ন শিয়া ধর্মীয় আচার পালন করে থাকেন, এবং সেই সূত্র ধরে প্রতিবছর আশুরায় তাজিয়া মিছিলেও অংশ নেন।

আশুরার তাজিয়া মিছিলে অংশ নেন হুসাইনি ব্রাহ্মণরা

ঐতিহাসিক প্রমাণ

অনেক ইসলামি পণ্ডিতই হুসাইনি ব্রাহ্মণদের উৎপত্তির ওপর প্রশ্ন তুলেছেন, এই বলে যে ইসলামিক ঐতিহাসিক নথিতে এর কোনো উল্লেখ নেই। তবে লাহোরের শিয়া ধর্মগুরু মাওলানা জাফর নাকবি বলেন, এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। এ ছাড়া, ব্রিটিশ ঐতিহাসিক টিপি স্ট্রেসির ‘দ্য হিস্টোরি অফ মুহিয়ালস: দ্য মিলিট্যান্ট ব্রাহ্মণ রেইস অফ ইন্ডিয়া’ বইতে হুসাইনি ব্রাহ্মণ ও কারবালায় তাদের অংশগ্রহণের কথা লেখা আছে।

ইসলামি পণ্ডিত গুলাম রসুল দেহলভিও হুসাইনি ব্রাহ্মণদের উৎপত্তির কথা বলেন। বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “স্বৈরাচারী ইয়াজিদ যখন ইমাম হোসাইনকে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে মেরে ফেলার চক্রান্ত করলেন, তখন তিনি বিশ্ব মানবতার উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছিলেন 'হাল মিন নাসিরিন ইয়ানসুরনা!' – যার অর্থ কেউ কি কোথাও আছে, যারা আমাদের সাহায্য করতে পারে?”

দেহলভির ভাষ্য অনুযায়ী, ইমাম হুসাইনের ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতের রাজা সমুদ্রগুপ্ত একদল সৈন্যকে কারবালায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোহিয়াল ব্রাহ্মণ রাহব সিং দত্ত। 

"কিন্তু দত্ত ও তার সাহসী সেনারা যখন কারবালায় পৌঁছলেন, ততক্ষণে ইমাম হোসাইন শহীদ হয়েছেন। ক্ষোভে-দু:খে ভারত থেকে যাওয়া ওই সৈন্যরা স্থির করলেন নিজেদের তরবারি দিয়েই তারা নিজেদের শিরশ্ছেদ করবেন। কিন্তু ইমামের আরব অনুরাগীরা তাদের বোঝালেন, এভাবে জীবন নষ্ট না করে তারা বরং জনাব-ই-মুখতারের বাহিনীতে যোগদান করুন এবং ইমামের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াইতে সামিল হোন," বলেন গুলাম রসুল দেহলভি।

ভারতীয় গবেষক শিশির কুমার মিত্র তার ‘দ্য ভিশন অফ ইন্ডিয়া’ নামক বইয়ে লিখেছেন, কারবালা যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই বড় সংখ্যক হিন্দু কারবালায় বসবাস করতেন। 

কারবালা যুদ্ধের হুসাইনি ব্রাহ্মণদের সাথে মহাভারতের যোগসূত্র পাওয়া যায় আরেক ইতিহাসবিদের লেখাত যিনি নিজেই একজন হুসাইনি ব্রাহ্মণ। পিএন বালি তার ‘দ্য হিস্ট্রি অফ মোহিয়ালস’ বইয়ে বলেছেন, মহাভারতের চরিত্র অশ্বত্থামা যুদ্ধে তার পিতা দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর পর দুঃখ-কষ্টে ঘুরতে ঘুরতে আরবে নির্বাসনে চলে যান। এই বইয়ে লেখা আছে, অশ্বত্থামার সূত্র ধরেই আরবে হিন্দুদের বসতি, এবং তারাই পরে ইমাম হুসাইনের আনুগত্য গ্রহণ করেন। 

খ্যাতিমান যতো হুসাইনি ব্রাহ্মণ

‘হুসাইনি’ ও ‘ব্রাহ্মণ’, শব্দ দু’টো পাশাপাশি দেখতে ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে আশ্চর্য মনে হলেও, অনেক জনপ্রিয় ও পরিচিত ব্যক্তি এই সম্প্রদায়ের সদস্য।

বলিউড অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ সুনিল দত্ত গর্বের সাথে নিজেকে হুসাইনি ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচয় দিতেন। লাহোরে তার পূর্বপুরুষদের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন হেরিটেজ সাইটে আর্থিক দানও করেছেন তিনি। তার ছেলে বলিউড তারকা সঞ্জয় দত্তও হুসাইনি ব্রাহ্মণ পরিচয় দেন নিজের।

হুসাইনি ব্রাহ্মণরা যোদ্ধা সম্প্রদায় হওয়ায় তাদের অনেকেই যোগ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। এর মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত হলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গগন দীপক বক্সি, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে নিয়োজিত ছিলেন।

এ ছাড়া লেখক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে কাশ্মিরি লাল জাকির, সবির দত্ত, নন্দকিশোর দত্ত ও সুনিতা ঝিংরান হুসাইনি ব্রাহ্মণ।

হুসাইনি ব্রাহ্মণদের ইতিহাস নিয়ে নানা ধরণের মতবাদ আছে। যারা কারবালা যুদ্ধকে এই সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হিসেবে বিশ্বাস করেন, তাদের থেকেও এসেছে নানা ধরণের বয়ান। কোথাও দেখা যাচ্ছে রাহব সিং দত্ত বাগদাদেই থাকতেন, আবার কোথাও বলা হচ্ছে তাকে যুদ্ধের ডাক পেয়ে ভারত থেকে তাকে পাঠিয়েছিলেন রাজা সমুদ্রগুপ্ত। কেউ বলেন ইমাম হুসাইনের সাথে রাহব সিং দত্তের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো, আবার কেউ বলেন কারবালায় তারা পৌঁছানোর আগেই ইমাম হুসাইনের মৃত্যু হয়।

তবে সত্য যেটাই হোক, হুসাইনি ব্রাহ্মণদের কাছে তাদের শুরুটা কারবালায় ইমাম হুসাইনের ডাকে সাড়া দিয়ে সেই যুদ্ধের আত্মত্যাগ থেকেই। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে অনেক মানুষ নিজেদের হুসাইনি ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচয় দেন। বিভিন্ন সময়ের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঊর্ধ্বে হিন্দু ও মুসলিম রীতি ও সংস্কৃতির অনন্য মিশ্রণ হিসেবে টিকে আছে তাদের পরিচয়।