বিশ্বকাপ ফুটবল যখন হয় তখন আমাদের দেশের মানুষ দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদল ব্রাজিল আর অন্যদল আর্জেন্টিনা। আপনি কোন পক্ষে আছেন? – সময়ের জিজ্ঞাসা।
‘চোরের দল’ বলে গুগলে সার্চ দেন। দেখবেন আর্জেন্টিনা সম্পর্কে অনেক কিছু চলে আসবে। আসবে অনেক সংযুক্তি বা লিংক, যেখানে আপনি পাবেন আর্জেন্টিনা নাকি ফিফার সবচেয়ে বেশি পছন্দের দল। পাবেন এমন মন্তব্য যে আর্জেন্টিনা মূলত ‘আর জেতে না’র দল হলেও ফিফা ও রেফারির কারণে তারা বারবার জিতে যায়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যারা খেলবে তারা যেন মাঠে আইনজীবী নিয়ে যায় সুবিচার পাওয়ার জন্য।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা যখন ইংল্যান্ডের সঙ্গে জিতে যায় তখনও মানুষ বলে আর্জেন্টিনার সাথে শুধু ফিফা বা রেফারিই থাকে না, স্বয়ং ‘ঈশ্বরও’ থাকেন।
আর ব্রাজিল? ব্রাজিল লিখে সার্চ দিলে চলে আসবে ‘সেভেন আপ’ খাওয়া দল! সাত গোল কিন্তু আর্জেন্টিনাও কম খায়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হেরে ব্রাজিল বিদায় নিলে ট্রল কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বলা হয় ব্রাজিল আসলে পরের বিশ্বকাপেই এক সাথে তিন বিশ্বকাপ জয় করে ফেলবে। কেউ কেউ অবশ্য বলেন যে ব্রাজিল নিজেদের নরওয়ে, ইংল্যান্ড, জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো বড়দল ভাবে। তাই সবার আগে নিজেরাই বিদায় নিয়ে নেয়! কথা হচ্ছে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার বাংলাদেশীয় সমর্থকদের এই ঝগড়া কি আদৌ মিটবে?
আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের খেলা আর সমর্থকদের ধরন দেখে এদেশের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের কথা খুব মনে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একবার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা খুব আলোচিত হয়েছিল। ২০০৬-৭-৮ সালে যারা এই ‘মাইনাস টু’র রূপকার ছিলেন তারা নিজেরাই দেশ ও রাজনীতি থেকে মাইনাস হয়ে গিয়েছেন, শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াই টিকে ছিলেন। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকদের কাণ্ডকারখানা দেখে কারও কারও মনে মাইনাস টু ফর্মুলার ‘ভাব’ জেগে উঠতে পারে। এই ভাব থেকেই হয়তো ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগালের সমর্থকদের সংখ্যা বাড়ছে দেশে। যাই ঘটুক ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকরা প্রয়োজনে আরও ১৬ বা ৩২ বছর অপেক্ষা করবে কাঙ্ক্ষিত শিরোপার জন্য, তবু হয়তো সমর্থন প্রত্যাহার করবে না। সমর্থক সম্ভবত এমনই হয়। ম্যারাডোনা নেই, আর্জেন্টিনার মেসিও থাকবে না, তবু আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক থেকে যাবে ফুটবল ঐতিহ্যের বাহক হিসেবেই, তারা কেউ নিরপেক্ষ হবেন না!
সবাই এমন ধারণা পোষণ করতে চান যে রেফারিরা নিরপেক্ষ থাকুক। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে সেটা ঘটেনি। ইতালি সেবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল এবং তখন ইতালি শাসন করতেন স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি। তিনি নাকি যাচাই-বাছাই করে রেফারি নিয়োগ দিয়েছিলেন। ফলাফল ইতালি চ্যাম্পিয়ন!
বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলছে না বলে কোনো সমষ্টিগত স্বার্থ না থাকলেও যখনই কেউ ফুটবল নিয়ে লেখেন, অজান্তেই তার সমর্থন চলে যায় তার ভালো লাগা দলের প্রতি। ম্যারাডোনা যখন হাত দিয়ে গোল করেন তখন কেউ কেউ কাব্য করে বলেন ঈশ্বরের হাত! আর পেলের তুলনা পেলে নিজেই। ফুটবলের কারণে তার নামটাই বদলে গেছে।
বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একসাথে পেলে আর ম্যারাডোনাকে ভালোবাসা যাবে না। নেইমার আর মেসিকে তুলনা করা কিংবা দু’জনকে ভালোবাসা যাবে না। আপনাকে বেছে নিতে হবে যে কোনো একদলকে। সমর্থনের প্রশ্নে বাংলাদেশটা আসলে আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মতো ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায় ভাগাভাগি হয়ে আছে!
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই এমন ভাগাভাগি ছিলো। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দুই ফাইনালিস্ট দল ছিলো উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। তখন অফিশিয়াল ফুটবল বলে কিছু ছিলো না। তাই কোন ফুটবল দিয়ে খেলা হবে সেটা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। সমাধান হয় এভাবে-ফার্স্ট হাফ খেলা হবে আর্জেন্টিনার বল দিয়ে আর সেকেন্ড হাফ খেলা হবে উরুগুয়ের আনা বল দিয়ে! আর্জেন্টিনা তাদের বল দিয়ে ফার্স্ট হাফে দুই গোল দিতে পেরেছিল। আর সেকেন্ড হাফে উরুগুয়ে তাদের বল দিয়ে চার গোল দিয়ে ফেলে। এই বিশ্বকাপে নয়টি দেশ অংশ নিয়েছিল এবং ইউরোপের যে দলগুলো অংশ নেয়, জাহাজে করে তাদের উরুগুয়েতে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল ১৪ দিন। ২০১৮ সালে বিমানে করে বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ রাশিয়ায় যেতে সর্বোচ্চ সময় লাগতে পারে মাত্র ১৮ ঘণ্টা। তবে ইরানের ভাগ্য খারাপ। যুদ্ধের কারণে আমেরিকায় থাকার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। তারা মেক্সিকো থেকে বিমানে এসেছে, খেলা শেষে আমেরিকা থেকে বিমানে করেই মেক্সিকো ফিরেছে। তবে বিশ্বকাপের বহু তথ্য বছরের পর বছর ধরে মানুষের মনে থাকবে, প্রতি বিশ্বকাপে নতুন নতুন তথ্য যোগ হবে। ১৯৯০ এর ক্যামেরুনের মতো ২০২৬ এর কেপ ভার্দেকে অনেকেই মনে রাখবেন। মনে হবে আয়োজনকারী দেশ ঘরের মাঠে ফুটবল খেলে বলে অনেক সুবিধা পায়।
নিজ দেশের মাঠে ফুটবল আয়োজন করে ফ্রান্স যেমন চ্যাম্পিয়ন (এই তালিকায় ইতালিও আছে) হয়েছে ঠিক তেমনি ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম পর্বই পার হতে পারেনি। ফ্রান্স কিংবা ইতালি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের বিশ্বকাপে প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে।১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘ঈশ্বরের হাতে’র কৃপায় চ্যাম্পিয়ন হলেও ১৯৯০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হেরে যায় বিশ্বকাপে একবারেই নতুন ক্যামেরুনের কাছে।
২০১৮ সালে রাশিয়ায় বিশ্বকাপ হচ্ছে, এই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্যামেরুনের রজার মিলা সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করেছিলেন। রজার মিলার বয়স ছিলো তখন ৪২ বছর। বিশ্বকাপের ইতিহাসে রজার মিলারের মতো মজার নাচ সম্ভবত আর কেউ দেখাতে পারেননি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে নিজ দেশের মাঠে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হেরে (৭-১) বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছিল ব্রাজিল। জার্মানির কাছে এই ‘সেভেন আপ’ পরাজয় নিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের অনেক আনন্দগাঁথা আছে।তবে ব্রাজিলের এমন দুঃখ আগেও ছিলো।চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েও ফাইনালে হেরেছিল উরুগুয়ের কাছে। সমর্থকদের কয়েকজন স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল।
আরও দুঃখ আছে বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি (জুলে রিমে ট্রফি) নিয়ে। দুই দুইবার সেটা চুরি হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে প্রথমবার উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয়বার চুরির পরে সেটি আর পাওয়া যায়নি। ১৯৮৩ সালের পরে এই ট্রফির অস্তিত্ব শুধু ছবি কিংবা ভিডিওতে আছে। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় এই চোরকে বলা যেতে পারে ‘এলেমদার চোর’। তবে চুরির ঘটনা বিশ্বকাপে আরও ঘটেছে।১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের ক্যাপ্টেন ববি মুর গ্রেফতার হন চুরির দায়ে। এই বিশ্বকাপে মাতলামির ঘটনাও ঘটেছিল। আর্জেন্টিনার মহাতারকা ম্যারাডোনার মাদক গ্রহণের ঘটনা কমবেশি সবাই জানেন। ১৯৯১ সালে মাদক গ্রহণের জন্য ১৫ মাস নিষিদ্ধ ছিলেন। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে দুই ম্যাচ খেলার পর আবারও ডোপ টেস্টে ধরা পড়েন, দল থেকে বহিষ্কৃত হন। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থক দল গড়ে উঠেছে এই ম্যারাডোনার কারণে। জীবন-যাপন, সমর্থন কিংবা ব্যক্তিগত নৈপুন্যের বিচার করে অনেকেই বলে থাকেন ম্যারাডোনা নিজেই এক মাদকের নাম। আমেরিকায় দু’বার বিশ্বকাপ হলেও দেশের মাটিতে তারা বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তবে প্রতিটি বিশ্বকাপ আলাদা আলাদা কারণে বিখ্যাত।
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ দুই কারণে বিখ্যাত। এবছরই জার্সিতে প্রথম নাম্বার বসানো হয়। এই বছরই প্রথম টেলিভিশনে খেলা দেখানো হয় যা আজও অব্যাহত আছে। আর ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ ছিলো অন্যরকম কেলেংকারিতে ভরা। চিলি আর ইতালির ম্যাচে তুমুল মারামারি শুরু হয় যা গ্যালারিতেও ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এরপরে লাল আর হলুদ কার্ডের প্রচলন শুরু হয় বিশ্বকাপে। তবে ইংল্যান্ডের সমর্থকদের গুন্ডামির রেকর্ড আছে। কোরিয়া ও জাপান যেবার বিশ্বকাপ আয়োজন করে সেবার অনেক ইংরেজ গুন্ডাদের ভিসা দেওয়া হয়নি। রাশিয়াও এই ইংরেজ গুন্ডাদের নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করেছে। ক্রিকেটের থার্ড বা ক্যামেরা আম্পায়ারিংয়ের মতো ফুটবলেও এমন রেফারিং শুরু হয়েছে ২০১৮ এর বিশ্বকাপে। খেলোয়াড়রা চাইলে রেফারি অবশ্যই সেটা বিবেচনা করে দেখবেন।
২০২৬ এ ‘ভার’ (ভিডিও অ্যাসিসট্যান্ট রেফারি) নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যতদিন যাবে ফুটবলও হয়তো তত প্রযুক্তি নির্ভর হবে।
লেখাটা শুরু করেছিলাম বিশ্বকাপ উন্মাদনা তথা এদেশের ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উল্টাপাল্টা কর্মকাণ্ড নিয়ে। ব্রাজিলের সমর্থকরা পেনাল্টি শট মিসের পর লিওনেল মেসির নাম দিয়েছেন ‘মিস পেনাল্টি’। সুন্দরীদের আদলে মেসির ছবিও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম পেনাল্টি মিস করেছিলেন ব্রাজিলের ডি ব্রিটো। এ পর্যন্ত মেসি চারটে পেনাল্টি মিস করেছেন। তবে চারটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা।
খেলায় ধারাবাহিক ব্যর্থতা কিংবা পরাজয় বাজে পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আসলে যে কোনো খেলার ফলাফলই আসল। গানের কথায় আছে –উইনার্স টেক ইট অল।
অনেকটা এমন- বিজয়ীর হাত ধরে হাঁটে/পৃথিবীর সব সুখ হাসি/তুনাবী তোমার জন্য শুধু পরাজিত হতে ভালোবাসি!
গানে বা কবিতায় যেমনই বলা হোক দিন শেষে জয়টাই আসল। ইতিহাসে যেমন বীরদের কথা লেখা থাকে ঠিক তেমনি পরাজিত মানুষের কোনো বন্ধু থাকে না। আর্জেন্টিনার বিপরীতে কেপ ভার্দে বা মিশর যতই ভালো খেলুক শেষমেষ তারা ‘হারুপার্টি’।
তবু হৃদয়ভাঙা পরাজয় শেষে হাতছানি দেবে নতুন খেলা। জয়ের আশায় আবার মাঠে নামবে খেলোয়াড়রা। রাজনীতি আর রাস্তার খেলাও চলবে। খেলা থামবে না। খেলারাম হুংকার দিতে থাকবে ‘খেলা হবে’।
খেলা হোক...
লেখক: রম্যলেখক



