মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ডুবে থাকার পর যখন একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবই খুলে বসে, তখন সে কেবল একটি বৈদ্যুতিক ডিভাইস থেকে আরেকটি সনাতন মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় না, সে এক সময়বোধ থেকে আরেক সময়বোধে প্রবেশের চেষ্টা করে। স্ক্রিনের সময় খণ্ডিত, দ্রুত উত্তেজনাময় আর বইয়ের সময় ধীর, গভীর এবং মনোযোগ নির্ভর।
দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর মন অন্যদিকে সরে যাওয়া তাই কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সামাজিকভাবে উৎপাদিত মানসিক অভ্যাস। এই অভ্যাস গড়ে উঠেছে অবিরাম স্ক্রল করার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যেখানে আঙুলের সামান্য নড়াচড়ায় নতুন উদ্দীপনা হাজির হয় আর পুরনো মনোযোগ পরিত্যক্ত হয়।
এই ভাঙা মনোযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হারিয়ে যাওয়ার ভয় যা Fear of Missing Out বা ফোমো। কবিগুরু যেভাবে বলেছিলেন- ‘‘ওহে হারাই হারাই সদা ভয় হয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।’’
হ্যাঁ, অনলাইনে না থাকলে মনে হয় পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটে যাচ্ছে যেখানে আমি নেই। এই ভয় আদতে কোনো স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর আবেগ ব্যবস্থাপনার কৌশল। মিডিয়া স্টাডিজের ভাষায় একে বলা যায় Affective Governance, যেখানে ব্যবহারকারীর উৎকণ্ঠা কৌতূহল ও আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে রাখা হয়। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এই আবেগ শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার।
এই বাস্তবতার প্রতিদিনের দৃশ্যপট তৈরি করছে টিকটক, ফেসবুক রিলস, ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টস। ছোট ছোট ভিডিওর এই জগত আবেগ বিনোদন এবং তাৎক্ষণিক আকর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হাস্যরস, নাটকীয়তা, অতিনাটকীয় অভিনয় স্থানীয় মিম, নাচ, গান, ভাইরাল অডিওতে ঠোঁট মেলানো—সব মিলিয়ে এক ধরনের চাক্ষুষ চিনি। এই কনটেন্টগুলো দ্রুত গ্রহণযোগ্য তবে দ্রুত বিস্মৃতিযোগ্য। ফলে মন অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তাৎক্ষণিক আনন্দে আর গভীর চিন্তা হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর।
এই বিনোদন কাঠামোর পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে তা বিশ্লেষণ করলে ক্রিস্টিয়ান ফুকসের ডিজিটাল পুঁজিবাদ ধারণা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফুকস দেখিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারী কেবল ভোক্তা নয়, সে নিজেই পণ্য। বাংলাদেশের তরুণরা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে তখন তারা বিনা মজুরিতে ডিজিটাল শ্রম প্রদান করে। তাদের সময় মনোযোগ আবেগ এবং তথ্য অ্যালগরিদমের কাঁচামাল হয়ে ওঠে।
এই অ্যালগরিদম কোনো নিরপেক্ষ প্রযুক্তি নয়। এটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা মনোযোগ অর্থনীতি যেখানে প্রতিটি সেকেন্ডই লাভের একক। অ্যালগরিদম এমন কনটেন্ট সামনে আনে যা সবচেয়ে বেশি আবেগ উসকে দিতে পারে—হাসি, রাগ, বিস্ময় কিংবা সহানুভূতি। ফলে চিন্তার বদলে প্রতিক্রিয়া বাড়ে। প্রশ্ন করার বদলে স্ক্রল চলতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে অক্সফোর্ডের বছরের সেরা শব্দ হিসেবে নির্বাচিত Brainrot কেবল একটি ইন্টারনেট রসিকতা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক রোগ নির্ণয়। নিম্নমানের ডিজিটাল কনটেন্টের অতিরিক্ত ব্যবহারে মস্তিষ্কের যে ধীর ক্ষয় ঘটে তারই নাম এটি। স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, অ্যালগরিদম চালিত ভিডিও ধারাবাহিকভাবে গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। এই অংশটি দায়িত্বশীল চিন্তা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের স্ক্রিন জেনারেশন এই ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৩ কোটি ১৪ লাখের বেশি যার মধ্যে ১১ কোটিরও বেশি মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। সাশ্রয়ী স্মার্টফোন ও কম দামের ডেটা ডিজিটাল প্রবেশ সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রবেশের সঙ্গে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি ছিলো না।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকের কাছে আর জীবনের অংশ নয়, জীবনটাই সেখানে। খবর বিনোদন সম্পর্ক রাজনীতি এমনকি ব্যবসাও কয়েকটি অ্যাপের ভেতরে সীমাবদ্ধ। স্কুলে মিডিয়া সাক্ষরতা প্রায় অনুপস্থিত। পরিবার জানে না সন্তানের স্ক্রিন অভ্যাস কেমন। আর রাষ্ট্র এখনো অ্যালগরিদমিক ক্ষমতাকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বুঝে উঠতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় চমকটি এখানে, সমস্যা কনটেন্ট নয় প্রযুক্তি নয় এমনকি স্ক্রিনও নয়। সমস্যা হলো আমরা মনোযোগকে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সম্পদ হিসেবে চিনতে শিখিনি। জমি দখল আর ভোট দখল নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হই কিন্তু মনোযোগ দখল যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী ক্ষমতা তা আমরা উপেক্ষা করি।
তাহলে উপায়? মিডিয়া সাক্ষরতাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিবারকে স্ক্রিন সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রকে অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্ক্রল থামানো সমাধান নয়, প্রশ্ন করা শুরু করাই আসল প্রতিরোধ। কারণ যে প্রজন্ম প্রশ্ন করতে শেখে না সে প্রজন্ম ইতিহাস তৈরি করে না কেবল স্ক্রল করে যায় ভবিষ্যতের ওপর।
মোবাইল ফোনের অতি ব্যবহারকারীর এই অবস্থাকে একটি কাব্যিক উপমায় বোঝা যায় জীবনানন্দের কথিত সেই উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতার রূপকে। অতি-স্ক্রলিং ও ডিজিটাল অ্যালগরিদমের আধিপত্যে মানুষ কেবল নীরব নয়, বরং নিজের মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে। উটের গ্রীব যখন মরুতে নিস্তব্ধ থাকে, চারপাশের শব্দ, বাতাস, জীবনকেন্দ্র সবই শূন্য হয়ে যায়, ঠিক তেমনি তরুণ প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবনে স্ক্রিনের ছাপ নিস্তব্ধতা এনে দিয়েছে। বাঁধনগুলো—পূর্বের সামাজিক বন্ধন, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, স্থানীয় সংস্কৃতির সংবেদন—ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। একে বলা যায় আধুনিক জীবনের ‘ডিজিটাল মরুভূমি’ যেখানে প্রতিটি মনুষ্য সম্পর্ক নীরব সংকেতের মতো ঝরে পড়ছে।
এই নিস্তব্ধতা শুধু শারীরিক বিচ্ছিন্নতার নয়, মানসিক ও আবেগীয় বিচ্ছিন্নতারও। মানুষ একসঙ্গে থাকলেও একই কক্ষে বসে একে অপরের দিকে তাকায় না; তাদের চোখ, মন, চিন্তা সব স্ক্রিনে বিন্যস্ত। আত্মীয়তা যাই যাই করছে অর্থাৎ পারিবারিক সংযোগ, বন্ধুত্বের গভীরতা, স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সবই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। জীবনানন্দের ভাষায়, এটি এমন নিঃসঙ্গতা যা দেখার নয়, অনুভবের। নিস্তব্ধতার মাঝেও একটি সঙ্কুচিত চাপ অনুভূত হয়—সামাজিকতার মৃদু নিঃশেষ, আত্মীয়তার দূরত্ব, একাকীত্বের নতুন রূপ।
এই রূপকটিকে আরও সম্প্রসারণ করলে দেখা যায়, স্ক্রিনের ভিতরে প্রবেশের সঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে অদৃশ্য ধ্বনি, এক ধরনের কাব্যিক একাকিত্ব। উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা যেন প্রতিফলিত করছে তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে। স্ক্রিনে ডুবে থাকা ছাত্র-ছাত্রী, নাচ-গান-মিম-কমেডি রিলসের মধ্যে, তাদের ভেতরের জীবন চুপচাপ ক্ষয় হচ্ছে। আঙুলের নড়াচড়া আর চোখের ঝলক কেবল ক্ষণস্থায়ী আনন্দ দিচ্ছে, কিন্তু মনের গভীরতা, চিন্তার স্থায়িত্ব হারাচ্ছে।
এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ারও অংশ। উটের গ্রীবার নিস্তব্ধতা যেমন মরুর বিস্তৃত শূন্যতা প্রতিফলিত করে, তেমনি তরুণ সমাজের স্ক্রিন কেন্দ্রিক জীবনও তাদের চারপাশের সামাজিক নেটওয়ার্ক, সম্পর্ক ও ঐতিহ্যের শূন্যতা প্রতিফলিত করছে। বন্ধুর হাসি, আত্মীয়ের স্পর্শ, পাড়া-মহল্লার কথোপকথন—সবই আজ নীরব, সবই ছায়ার মতো পাতলা হয়ে গেছে।
শেষমেষ এই কাব্যিক রূপক আমাদের সতর্ক করে দেয় যে প্রযুক্তি স্বাধীনতা নয়; এটি মনোযোগ, সম্পর্ক ও সামাজিকতা নিয়ন্ত্রণের একটি শক্তিশালী বাহন। ‘উটের গ্রীবার নিস্তব্ধতা’ আর ‘ডিজিটাল মরুভূমি’ একসঙ্গে আমাদের শোনাচ্ছে এক বিরূপ সত্য; আমাদের হারানো জীবন, বিলীন বন্ধন, নিঃশেষ আত্মীয়তা, সবই এখানে আঙুলের নড়াচড়া ও স্ক্রিনের জগতে নিঃসঙ্গভাবে বিচ্ছিন্ন। সব বাঁধন উড়ে যাচ্ছে, বিদায় নিচ্ছে সামাজিকতা, আত্মীয়তাও যাই যাই করছে। সব সম্পর্ক ঘরে ফিরছে অসহায়—সব দায় দরদ মহব্বত—ফুরাবে সব লেনদেন; থাকবে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক।
ইমেইল: [email protected]



