মতামত

ইতিহাসের সাংবিধানিক সীমা: নৈতিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক বৈধতা

এই কারণেই আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্ব কখনোই রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতার উৎস হয়ে উঠবে না?

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

গণতন্ত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারেরও আগে একটি আরও সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক রূপান্তর ঘটে। ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্ব একসময় রাজনৈতিক বিশেষাধিকারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

সাংবিধানিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল কিংবা আন্দোলনই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। সাধারণ নাগরিকের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতায় আসতে চাওয়া সবার জন্যও সেই একই নিয়ম প্রযোজ্য। কথাটি এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা প্রায়ই এর গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করি না। অথচ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, গণতন্ত্রের সংকট শুরু হয় তখনই, যখন কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক শক্তিকে এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা শুরু হয়।

গণতন্ত্র হঠাৎ একদিনে ধ্বংস হয় না। তার অবক্ষয় শুরু হয় আরও আগে—মানুষের রাজনৈতিক বিচারবোধে। একসময় তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে কিছু রাজনৈতিক শক্তিকে অন্যদের মতো একই সাংবিধানিক মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। কারণ তারা নাকি অন্যদের তুলনায় বেশি দেশপ্রেমিক, বেশি নৈতিক, কিংবা জাতির প্রতি তাদের অবদান এতটাই অসাধারণ যে সাধারণ সাংবিধানিক নিয়ম তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। এই বিশ্বাসই ধীরে ধীরে নৈতিক কর্তৃত্বকে রাজনৈতিক বৈধতার উৎসে পরিণত করে এবং সাংবিধানিক সমতার নীতিকে দুর্বল করে দেয়।

প্রতিটি জাতিরই এমন কিছু মানুষ থাকে, যাদের ত্যাগ ও অবদান তার ইতিহাসকে নির্মাণ করে। কেউ স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন, কেউ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, আবার কেউ জাতীয় সংকটের মুহূর্তে দেশকে রক্ষা করেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোনো উদারতার বিষয় নয়; এটি একটি সভ্য রাজনৈতিক সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

কিন্তু কৃতজ্ঞতারও একটি সাংবিধানিক সীমা আছে। কোনো রাজনৈতিক শক্তির ঐতিহাসিক অবদান যতই মহান হোক না কেন, তা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ বা স্থায়ী অধিকার দেয় না। একটি প্রজাতন্ত্র তার প্রতিষ্ঠাতাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে পারে, তাদের অবদানকে জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকার করতে পারে। কিন্তু তাই বলে তাদের সাংবিধানিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না। বরং সাংবিধানিক গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—ঐতিহাসিক অবদানকে যথাযোগ্য সম্মান জানানো, কিন্তু তাকে কখনো রাজনৈতিক বিশেষাধিকারের ভিত্তি হতে না দেওয়া।

তাত্ত্বিকভাবে এই পার্থক্যটি বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু বাস্তবে এটিই গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। কারণ একটি জাতির ইতিহাসের রয়েছে অসাধারণ নৈতিক শক্তি। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাবলির সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতির সমষ্টিগত স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং নিজেদের সম্পর্কে তার ধারণাকে গড়ে তোলে। আমরা কারা, কোথা থেকে এসেছি, কিংবা কোন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছি—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও অনেকাংশে ইতিহাস থেকেই আসে। তাই রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনের পক্ষে নিজেদের সেই উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা অস্বাভাবিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেই দাবির যথেষ্ট নৈতিক ভিত্তি থাকে।

আসল সংকট শুরু হয় অন্যত্র। যখন অতীতের অবদান থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্ব বর্তমানের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে ছাপিয়ে যায়। মানুষ তখন সরকারের বর্তমান জবাবদিহির চেয়ে অতীতে সেই দল বা আন্দোলনের অবদান কত বড় ছিল, সেই প্রশ্নকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের সূচনা সাধারণত সেখান থেকেই। স্বৈরাচারের মধ্য দিয়ে নয়; শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে।

আমরা সাধারণত স্বৈরতন্ত্রকে সীমাহীন ক্ষমতালিপ্সার পরিণতি হিসেবে দেখি। আমাদের ধারণা, ক্ষমতালোভী শাসকেরা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে, সমালোচনার পরিসর সংকুচিত করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার প্রায় সবটাই নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে। এই ব্যাখ্যা ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ কেবল ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা কোনো সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারে না। তার আগে প্রয়োজন সমাজের নৈতিক সম্মতি। আর সেই সম্মতি মানুষ কেবল ক্ষমতার প্রতি মুগ্ধ হয়ে দেয় না; দেয় তখনই, যখন তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক শক্তি অন্যদের তুলনায় শাসনের জন্য নৈতিকভাবে অধিকতর বৈধ।

এই প্রক্রিয়াটি এতটাই ধীর ও সূক্ষ্ম যে সমাজ অনেক সময় টেরই পায় না, কখন গণতন্ত্রের ভিত নড়ে গেছে। শুরুতে একটি রাজনৈতিক শক্তি জাতির জন্য অসাধারণ অবদান রাখে। সেই অবদান জন্ম দেয় কৃতজ্ঞতার। কৃতজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় আস্থা। আর সেই আস্থা ধীরে ধীরে ব্যতিক্রমকে স্বাভাবিক করে তোলে। মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে রাজনৈতিক সমতার জায়গায় নীরবে একটি শ্রেণিবিন্যাস গড়ে উঠেছে, তখন পর্যন্ত সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপকেই তারা স্বাভাবিক ও ন্যায্য বলে মেনে নিয়েছে।

স্বৈরতন্ত্রের সূচনা তাই তখন হয় না, যখন কোনো শাসকের হাতে অতিরিক্ত কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত হয়। তার সূচনা হয় আরও আগে—যখন একটি সমাজ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নৈতিক কর্তৃত্বের কারণে কিছু রাজনৈতিক শক্তি সাধারণ সাংবিধানিক নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস এই বিপদের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

আজ আওয়ামী লীগকে ঘিরে জনপরিসরের অধিকাংশ আলোচনা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রশ্নেই আবর্তিত হচ্ছে। দলটি কি আবার নির্বাচনি রাজনীতিতে ফিরতে পারবে? এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কি ন্যায়সঙ্গত ছিল? দলটি কি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে? এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। কারণ এগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ। অথচ আমাদের সামনে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে—কীভাবে একটি গণতন্ত্র এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে কোনো রাজনৈতিক শক্তি নিজেকে সাধারণ সাংবিধানিক নিয়মের ব্যতিক্রম বলে ভাবতে শুরু করে?

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার করার কোনো ন্যায্য উপায় নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর সেই সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা—কিছু বিতর্ক সত্ত্বেও—ছিল অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কোনো গভীর বিশ্লেষণ এই সত্যকে উপেক্ষা করতে পারে না। সমস্যাও সেখানে নয়।

আসল সংকট শুরু হয় অন্যত্র। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল না এই বিশ্বাস যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। সেই বিশ্বাসের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। তাদের মৌলিক ভুল ছিল সেই ঐতিহাসিক অবদানকে বর্তমান রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি বানানো। এর ফলে ধীরে ধীরে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা সাধারণ সাংবিধানিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে বিশেষ রাজনৈতিক মর্যাদার উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ আর কেবল গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেনি। ক্রমে দলটি এমন একটি রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ করে, যার কেন্দ্রে ছিল নিজেকে জাতির প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের একক অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরা।

এর ফলেই মুক্তিযুদ্ধ থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতার উৎসে পরিণত হয়। সরকারের সমালোচনাকে তখন সহজেই মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জাতির প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে তুলে ধরা যায়। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকেও আর গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হয় না; বরং এমন শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যারা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একবার এই মানসিক রূপান্তর ঘটে গেলে সাংবিধানিক জবাবদিহির পক্ষে যুক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র যখন বর্তমানের জনগণের পরিবর্তে অতীতের নৈতিক কৃতিত্ব থেকে নিজের বৈধতা আহরণ করতে শুরু করে, তখন গণতান্ত্রিক জবাবদিহি আর সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য থাকে না।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ শুধু প্রশাসন পরিচালনা করা নয়; তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখা। কারণ গণতন্ত্র একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করে—কোনো রাজনৈতিক শক্তির নৈতিক কর্তৃত্ব বা ঘোষিত মহৎ উদ্দেশ্য তাকে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী করে তোলে না।

কিন্তু যখন নৈতিক কর্তৃত্বই রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎসে পরিণত হয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের স্বাধীনতা হারাতে থাকে। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাকে আর গণতন্ত্রের সুরক্ষাকবচ হিসেবে নয়, জাতীয় অগ্রগতির পথে অপ্রয়োজনীয় বাধা হিসেবে দেখা হয়। সমালোচনার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। সরকারও তখন নিজেকে জনগণের অস্থায়ী প্রতিনিধি নয়, জাতির স্থায়ী অভিভাবক হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এ কারণেই গণতান্ত্রিক অবক্ষয় খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো নাটকীয় সাংবিধানিক বিপর্যয় দিয়ে শুরু হয়। আদালত থাকে। সংসদও থাকে। নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল থাকে। কিন্তু নীরবে বদলে যায় তাদের চরিত্র, কাজের ধরন এবং সর্বোপরি তাদের সাংবিধানিক ভূমিকা।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি ছিল এখানেই। সংকটের সূত্রপাত নির্বাহী বিভাগের হাতে ক্ষমতা ক্রমে কেন্দ্রীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে নয়; তারও আগে বদলে গিয়েছিল আমাদের রাজনৈতিক বিচারবোধ। আরও বেশি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে একটি রাজনৈতিক দল নিজের ঐতিহাসিক অবদান ও নৈতিক কর্তৃত্বের কারণে অন্যদের তুলনায় শাসনের জন্য অধিকতর বৈধ। সেই মুহূর্ত থেকেই সাংবিধানিক সমতার নীতি নীরবে দুর্বল হতে শুরু করে।

তবে এই শিক্ষা শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়। ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্বকে রাজনৈতিক বিশেষাধিকারের ন্যায্যতায় পরিণত করার এই প্রলোভন কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রায় প্রতিটি গণতন্ত্রই কোনো না কোনো সময় এমন একটি বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়েছে যে. একটি রাজনৈতিক শক্তিই অন্যদের তুলনায় বেশি দেশপ্রেমিক, বেশি নৈতিক, কিংবা জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য বেশি অপরিহার্য।

এই বিশ্বাসের ভাষা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোথাও তার ভিত্তি স্বাধীনতার ইতিহাস, কোথাও বিপ্লবের উত্তরাধিকার, কোথাও ধর্ম, কোথাও জাতীয়তাবাদ, কোথাও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, আবার কোথাও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। ভাষা বদলায়, প্রতীক বদলায়, ইতিহাসের বয়ানও নতুন রূপ পায়; কিন্তু অন্তর্নিহিত যুক্তি একই থাকে। একসময় একটি রাজনৈতিক শক্তি আর নিজেকে সাধারণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ বলে মনে করে না। বরং নিজেকে জাতির নৈতিক প্রতিনিধি, এমনকি একমাত্র বৈধ অভিভাবক হিসেবে দেখতে শুরু করে। আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই সাংবিধানিক সমতার নীতি বাস্তবে আর সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য থাকে না।

এই কারণেই আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্ব কখনোই রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতার উৎস হয়ে উঠবে না?

যদি সেই শিক্ষা অর্জিত না হয়ে থাকে, তাহলে একই ইতিহাস অন্য রূপে ফিরে আসবে। হয়তো অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে, অন্য কোনো নেতৃত্বের মাধ্যমে, কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক ভাষায়। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত যুক্তি একই থাকবে। আবারও এমন এক বিশ্বাস জন্ম নেবে যে ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্ব বর্তমানের রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হতে পারে।

আর যদি বাংলাদেশ সত্যিই এই শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে, তাহলে জুলাই–অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় থাকবে না। সেটি সাংবিধানিক সমতার এক পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। কারণ প্রতিটি গণতন্ত্রকেই শেষ পর্যন্ত এই শিক্ষাই বারবার নতুন করে অর্জন করতে হয়—কোনো রাজনৈতিক শক্তির ঐতিহাসিক অবদান যত মহানই হোক না কেন, তা কখনোই তাকে সাধারণ সাংবিধানিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না।

অতএব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না শুধু কোন দল ক্ষমতায় আসে তার ওপর। প্রকৃত নির্ধারক প্রশ্ন হবে একটাই—আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারব, যেখানে ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, আমরা তাকে একই সাংবিধানিক মানদণ্ডে বিচার করব?

একটি পরিণত প্রজাতন্ত্র কখনো এই প্রশ্ন করে না—কোনো রাজনৈতিক দল অন্যদের তুলনায় অধিক আস্থার যোগ্য? বরং সে প্রশ্ন করে—কোনো রাজনৈতিক দলই কি এমন কোনো ঐতিহাসিক বা নৈতিক মর্যাদার অধিকারী, যা তাকে সংবিধানের সাধারণ নিয়মের বাইরে দাঁড়ানোর অধিকার দেয়? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেয় একটি গণতন্ত্র সাংবিধানিক সমতার প্রতি কতটা সত্যনিষ্ঠ।

শেষ পর্যন্ত একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের শক্তি তার ইতিহাসে নয়, নিজের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রতি তার আচরণে। সে ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক কর্তৃত্বকে কখনোই রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হতে দেয় না।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভিজিটিং ইন্টারন্যাশনাল স্কলার ইন লিডারশিপ অ্যান্ড এথিকস, ইউনিভার্সিটি অব রিচমন্ড, যুক্তরাষ্ট্র। 

[মতামত কলামে প্রকাশিত লেখার দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের, সম্পাদক এর জন্য দায়ী নন]