একটা ধাঁধা দিয়ে শুরু করলে কেমন হয়? আচ্ছা বলুন তো- “তুমি কেমন করে গোল ‘খাও’ হে গুণী, আমি অবাক হয়ে গুনি কেবল গুনি!” এই লাইনগুলো রবিগুরু কবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন দেশের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে লিখেছেন? বুঝতে পেরেছি, আপনি আগের লাইনটি আবার পড়তে শুরু করেছেন। আপনার ভাবনা খোলাসা করে দিই- চলুন বাকিটা পড়া যাক!
“তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি কেবল শুনি...”। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন এই অমর বাণী সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তিনি নিশ্চিতভাবেই লিওনেল মেসিকে ফুটবল মাঠে ‘বল পায়ে মলয় সমীরে’ নাচতে দেখেননি। দেখলে গীতাঞ্জলির বাণী পাল্টে নির্ঘাত লিখতেন, “তুমি কেমন করে গোল করো হে মেসি, আমি ভিরমি খেয়ে পড়ি কেবল পড়ি!” আসলেই তো, একজন জলজ্যান্ত মানুষ কীভাবে পাঁচজন বিশ্বমানের ডিফেন্ডারকে ইডলি-দোসার মতো মুড়িয়ে, গোলকিপারকে পুদিনার চাটনি বানিয়ে বলটা জালে জড়িয়ে দেয়? আমরা সাধারণ দর্শকরা টিভির সামনে ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি—পায়ের নিচে কি কোনো ব্লুটুথ ডিভাইস লুকানো আছে, নাকি এলিয়েনদের স্পেসশিপ থেকে সরাসরি কোনো জাদুটোনা পাচার করা হচ্ছে?
মেসির এই মহাজাগতিক গোল-রহস্যের কূলকিনারা যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা ফুটবলবিজ্ঞানীরা করতে পারছেন না, ঠিক তখনই আমাদের দেশের ফুটবল পাড়ায় দীর্ঘশ্বাসগুলো আরও চওড়া হয়ে উঠছে। তবে আমাদের বাঙালি দর্শকদের একটা অদ্ভুত গুণ আছে। আমরা টিভির পর্দায় মেসির পায়ে বল দেখলে যেভাবে ‘আহা উহু’ করে স্বর্গীয় আনন্দ পাই, ঠিক একইভাবে স্টেডিয়ামে বা টিভিতে আমাদের দেশীয় পুরুষ ফুটবলারদের খেলা দেখলেও ‘উহু আহা’ করে (কষ্টে, ব্যথায়, লজ্জায়) কঁকিয়ে উঠি। আমাদের ফুটবলাররা মাঠে নামলে খেলাটা আর খেলা থাকে না, ওটা হয়ে ওঠে এক পরম আধ্যাত্মিক সাধনা—যেখানে বল ছোঁয়ার চেয়ে বলকে ধূর্ততার সাথে এড়িয়ে যাওয়ার এক অলৌকিক চেষ্টা প্রতীয়মান হয়।
বিশ্বের নামী-দামী স্ট্রাইকাররা যেখানে জ্যামিতির সূত্র মেনে গোলপোস্টের কোণা খুঁজে বেড়ায়, সেখানে আমাদের দামাল ছেলেরা গোলপোস্টের সামনে গেলে হঠাৎ করে চরম বৈরাগ্য লাভ করেন। বল পায়ে পেলেই তাদের মনে জাগে বুদ্ধদেবের মতো অহিংস বাণী—“সংসার যেমন অনিত্য, গোলপোস্টের ওই জালটাও তেমনই মায়া। একে তীব্র আঘাতে বিদ্ধ করা পাপ।“
ফলশ্রুতিতে, তারা বলটি পরম মমতায় প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে না মেরে আকাশের দিকে ভাসিয়ে দেন, যেন মেঘেদের কাছে কোনো গোপন প্রেমপত্র পাঠাচ্ছেন। অথবা গোল করো না গোল করো না, ছড়া কাটতে গিয়ে বলটি প্রতিপক্ষের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
অথবা বলটা পায়ে এলেই বাংলাদেশের খেলোয়াড় ভাবে—“এখন কী করবো?”
তারপর ভাবে—“কারে দিব?”
তারপর শেষমেশ দেয়—প্রতিপক্ষের পায়ে।
তুমি বলো মেসি, তুমি কেমন করে ড্রিবল করো?
আমাদের ছেলেরা ড্রিবল করতে গিয়ে নিজেরাই ড্রিবল হয়ে যায়। বল সামনে যায়, খেলোয়াড় পেছনে পড়ে থাকে।
ডিফেন্ডারকে কাটাতে গিয়ে নিজেরাই কাটা পড়ে।
এরপর শত শত গোল খাওয়ার এক অনন্য রেকর্ড বই পকেটে নিয়ে তারা বীরদর্পে বিমানবন্দরে নামেন। বিদেশে গিয়ে গোল খাওয়াটা তাদের কাছে কোনো পরাজয় নয়, ওটা যেন এক প্রকার ‘সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি’। প্রতিপক্ষ গোল দেবে, আর আমাদের ডিফেন্ডাররা ‘অতিথি দেবো ভবঃ’ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে গোলপোস্টের সদর দরজা হা-ভাতের মতো খুলে দিয়ে সেলফি তোলার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকবে—এটাই তো বাংলার খাঁটি আতিথেয়তা!
গোল দেওয়ার চেয়ে গোল খাওয়ার এই যে একনিষ্ঠ ও ক্লান্তিহীন সাধনা, এর পেছনে আমাদের অভিভাবক সংস্থা ‘বাফুফে’ (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন)-এর অবদান কিন্তু স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। বাফুফের কর্তাব্যক্তিরা দলকে ‘শক্ত’ করার জন্য যে অক্লান্ত মগজ খাটান, তা সত্যি সেলুলয়েডে ধরে রাখার মতো থ্রিলার। তারা দলকে এতটাই শক্ত করতে চান যে, মাঠে নামলে খেলোয়াড়দের পা দুটো নড়াচড়াও করতে পারে না—একেবারে সিমেন্ট দিয়ে জমাট বাঁধা পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়! রেশমি কাপড়ের মতো মসৃণ পাসিং ফুটবল বা আধুনিক ট্যাকটিকস তাদের ডিকশনারিতে নেই; তারা বিশ্বাস করেন ‘অনড়-অটল’ স্থবিরতায়। মাঠের পারফরম্যান্স যতই পাতালে নামুক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে প্রেস কনফারেন্সে বাফুফে কর্তারা যেভাবে নিজেদের ডিফেন্ড করেন, সেই ডিফেন্সের এক শতাংশ যদি আমাদের ফুটবলাররা মাঠে করতে পারতো, তবে স্বয়ং মেসির আর্জেন্টিনারও সাধ্য ছিল না বাংলাদেশের জালে একটা বল জড়ায়!
তবে পুরুষ ফুটবলাররা যখন “বল আমার, গোল তোমার” নামক চরম ঔদাসীন্যের নীতিতে বিশ্বাসী, তখন আমাদের দেশের নারী ফুটবলাররা কিন্তু ঠিকই জাত চেনাচ্ছেন। তারা যখন মাঠে নামেন, মনে হয় যেন একেকজন সত্যি সত্যিই লিওনেল মেসির দূরসম্পর্কের বোন! পুরুষ দল যখন বিদেশে গিয়ে গোলসিমেট্রি বা গোল হজমের গোল্ডেন জুবিলি পালন করে উৎসবের আমেজ তৈরি করে, নারী দল তখন একের পর এক চ্যাম্পিয়ন ট্রফি এনে দেশের মুখ রক্ষা করে।
অথচ সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পুরুষ ফুটবলারদের তুলনায় নারীরা পায় যৎসামান্য। পুরুষেরা যেখানে কোটি টাকার চুক্তি করে মাঠের ঘাস কাটেন, সেখানে নারী ফুটবলাররা যেন বাফুফের অবহেলা আর ভাঙা বুট জুতোকেই ফুটবলের গোল বানিয়ে প্রতিপক্ষের জালে নির্মমভাবে ঢুকিয়ে দেয়। এ যেন এক জ্বলন্ত স্যাটায়ার—যাদের পকেট ভারী, তাদের পা অবশ; আর যাদের পকেট শূন্য, তাদের পা থেকে আগুন ঝরে!
তাই লিওনেল মেসির কাছে আমাদের ১৭ কোটি ফুটবলপ্রেমীর বিনীত ও আকুল অনুরোধ, হে ফুটবল ঈশ্বর! আপনি যেভাবে আলতো ছোঁয়ায় ডিফেন্ডারদের বোকা বানান, সেই জাদুর এক-চিলতে হাওয়া কি আমাদের পুরুষ ফুটবলারদের পায়ে একটু ফুঁ দিয়ে দেওয়া যায় না? কিংবা বাফুফের চেয়ারগুলোতে একটু জাদুর কাঠি ছোঁয়ানো যায় না? যাতে অন্তত আমাদের স্ট্রাইকাররা গোলপোস্ট আর কর্নার ফ্ল্যাগের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটা বুঝতে পারে!
আমরা জানি, আপনি আরও অনেক বছর এভাবে গোল করবেন আর আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখবো। আর আমাদের ফুটবলকে দেখে কেবলই মনে মনে গুনগুন করব—"তুমি কেমন করে গোল ‘খাও’ হে গুণী, আমি অবাক হয়ে গুনি কেবল গুনি!"
বি.দ্র: অস্ট্রিয়ার সঙ্গে খেলায় কিন্তু মেসি পেনাল্টি মিস করেছেন এটা ভুলে যাওয়া চলবে না। আরেকটা কথা নিশ্চয়ই সবার মনে থাকবে- বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও মেসির।



