শুরুতেই রোজায় বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়েছে নতুন সরকার
‘রমজানের পণ্য যা প্রয়োজন ছিল তা চলে আসছে। নতুন করে আমদানি ও উৎপাদন করার সুযোগ নেই’, তাই নতুন সরকারের পক্ষে রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে উল্লেখ করে একজন অর্থনীতিবিদ সরকারের উদ্দেশ্যে বলছেন, ”গড ব্লেস দেম।”
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএমআপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
শুরুতেই রোজায় বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়েছে নতুন সরকার
নির্বাচনের পর থেকে দুই দফায় কমেছে সোনার দাম। কিন্তু রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজারে এখন উলটো চিত্র।
বন্দর ধর্মঘট ও ভোটের ছুটির মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হওয়া ঘাটতিতে নিত্যপণ্যের বাজারে যে মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছিল তা অব্যাহত ছিল বুধবারও।
গত এক সপ্তাহে বেড়েছে মুরগি, খেজুর, ছোলা, ফলসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম।
এক দিন আগে শপথ নেয়া তারেক রহমানের সরকারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রমজানে এই নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। এই টেস্ট কেইসে উতরে গেলে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচনকালীন সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি এখনও কাটিয়ে উঠতে না পারায় এবং নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরি হলে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন ব্যবসায়ীরা।
আর অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সুশাসনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি চাঁদাবাজ ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে রজমানকে ঘিরে মূল্যস্ফীতির পারদ আরও বাড়বে।
এ দিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে বাজার স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন।
বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, “আগামীতে যে রমজান শুরু হচ্ছে, এই রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা প্লাস হচ্ছে সেহরি, ইফতার, তারাবির সময়টা যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে এবং সরকারের যে কমিটমেন্ট, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় যে বিষয়গুলো বলেছেন—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড সেগুলো কীভাবে ইমিডিয়েটলি আসলে কিছু দৃশ্যমান কাজ করা যায়, সেই বিষয়গুলো নিয়েও তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন।”
ইতোমধ্যেই সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, “আগামীকাল থেকে পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে। এ সময়ে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”
রাজধানীর রায়ের বাজারসহ দেশের কয়েকটি বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে গত এক সপ্তাহে, শসা, টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচ, লেবুর দাম পণ্যভেদে বেড়েছে ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত।
গরুর দাম মোটামুটি একই থাকলেও রমজানকে সামনে রেখে বেড়েছে মাছ ও মুরগির দাম।
ধানমন্ডি মধুবাজারের বিক্রেতা মো. সালাম বলেন, “ভোটের মধ্যে ঢাকায় মানুষ কম ছিল, সরবরাহ কম ছিল। এখনও দাম বেশ চড়া। গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম গড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।”
এই অবস্থা পুরো দেশজুড়েই। যশোর বড় বাজারের ক্রেতা আনিকা তাহসীন বলেন, “রমজানের আগে সব পণ্যের দামই বেড়েছে। গতকাল খেজুর, বাগদা চিংড়ি, রুই, ব্রয়লার মুরগী কিনেছি, গত সপ্তাহের তুলনায় গড়ে ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে এসব পণ্যের দাম।”
নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখন আর তাদের পক্ষে রমজানের জন্য আমদানি বা উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। তাদের হাতে রয়েছে কেবল বাজার এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়গুলো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “রমজানের পণ্য যা প্রয়োজন ছিল তা চলে আসছে। নতুন করে আমদানি ও উৎপাদন করার সুযোগ নেই।”
তাই এই চ্যালেঞ্জ উৎরানো কঠিন হবে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ”গড ব্লেস দেম।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে।
রমজানকে সামনে রেখে তিন মাস আগে থেকেই এলসি খোলা এবং পণ্য আমদানির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।
এলসি হলো এটি একটি আর্থিক দলিল, যা বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি লেনদেনের নিশ্চয়তা প্রদান করে
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “রমজানের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য আমদানি করা আছে এবং মজুতও রয়েছে। এখন আমদানিকারকরা যদি সঠিকভাবে মজুত পণ্য বাজারে সরবরাহ করেন, তবে কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকবে না বলে আশা করা যাচ্ছে।”
আশার কথা শুনিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানও।
তিনি আলাপকে জানিয়েছেন, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, সয়াবিন তেলের মতো পণ্যগুলো আগাম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে।
“রমজানের চাহিদা ও বাজার বিবেচনায় নিয়ে আমরা আগাম ও সমন্বিত প্রস্তুতি নিয়েছি। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতেও একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
কোথাও কৃত্রিম সংকটের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব।
দায়িত্ব নিয়েই নাগরিক জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে নতুন সরকারকে, বলছেন, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন।
“নিঃসন্দেহে এটি তাদের জন্য বড় পরীক্ষা,” আলাপকে বলেন তিনি। এই চ্যালেঞ্জে সরকার উতরে যেতে পারলে মানুষের আস্থা বাড়বে বলেই মনে করছেন তিনি।
তার ভাষায়, “নতুন সরকার যদি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে।”
তবে নতুন সরকারের জন্য কাজটা সহজ হবে না বলেই মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
“বর্তমান মূল্যস্ফীতি সাময়িক নয়, এটি কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। এটা কমিয়ে আনাটা তাই সহজ হবে না,” বলেন ড. রহমান।
তবে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া গেলে বাজার মনিটরিং এর সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল সংস্কার ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমিয়ে আনা যাবে বলেই মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
সিপিডি’র অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, রমজানের সময় তিনটি প্রধান বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া গেলে রমজানের বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
“বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারকে প্রথমে সুশাসনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে হবে। চাঁদাবাজির বিষয়গুলো রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী যারা বাজার কারসাজির সুযোগ নিচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তৃতীয়ত, রমজানের সময় নিরাপদ খাদ্য একটি ইস্যু হয়ে ওঠে এ বিষয়টিও তাদের মাথায় রাখতে হবে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারের চিত্র যখন উলটো, প্রতিদিনই বাড়ছে দাম, সবমিলে তাই বলা যায়, নতুন সরকারের জন্য প্রথম রমজান হতে যাচ্ছে আগামীর অর্থনীতি ও সরকার পরিচালনার টেস্ট কেইস।
শুরুতেই রোজায় বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়েছে নতুন সরকার
‘রমজানের পণ্য যা প্রয়োজন ছিল তা চলে আসছে। নতুন করে আমদানি ও উৎপাদন করার সুযোগ নেই’, তাই নতুন সরকারের পক্ষে রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে উল্লেখ করে একজন অর্থনীতিবিদ সরকারের উদ্দেশ্যে বলছেন, ”গড ব্লেস দেম।”
নির্বাচনের পর থেকে দুই দফায় কমেছে সোনার দাম। কিন্তু রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজারে এখন উলটো চিত্র।
বন্দর ধর্মঘট ও ভোটের ছুটির মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হওয়া ঘাটতিতে নিত্যপণ্যের বাজারে যে মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছিল তা অব্যাহত ছিল বুধবারও।
গত এক সপ্তাহে বেড়েছে মুরগি, খেজুর, ছোলা, ফলসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম।
এক দিন আগে শপথ নেয়া তারেক রহমানের সরকারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রমজানে এই নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। এই টেস্ট কেইসে উতরে গেলে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচনকালীন সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি এখনও কাটিয়ে উঠতে না পারায় এবং নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরি হলে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন ব্যবসায়ীরা।
আর অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সুশাসনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি চাঁদাবাজ ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে রজমানকে ঘিরে মূল্যস্ফীতির পারদ আরও বাড়বে।
এ দিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে বাজার স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন।
বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, “আগামীতে যে রমজান শুরু হচ্ছে, এই রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা প্লাস হচ্ছে সেহরি, ইফতার, তারাবির সময়টা যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে এবং সরকারের যে কমিটমেন্ট, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় যে বিষয়গুলো বলেছেন—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড সেগুলো কীভাবে ইমিডিয়েটলি আসলে কিছু দৃশ্যমান কাজ করা যায়, সেই বিষয়গুলো নিয়েও তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন।”
ইতোমধ্যেই সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, “আগামীকাল থেকে পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে। এ সময়ে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”
‘গড ব্লেস দেম’
রাজধানীর রায়ের বাজারসহ দেশের কয়েকটি বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে গত এক সপ্তাহে, শসা, টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচ, লেবুর দাম পণ্যভেদে বেড়েছে ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত।
গরুর দাম মোটামুটি একই থাকলেও রমজানকে সামনে রেখে বেড়েছে মাছ ও মুরগির দাম।
ধানমন্ডি মধুবাজারের বিক্রেতা মো. সালাম বলেন, “ভোটের মধ্যে ঢাকায় মানুষ কম ছিল, সরবরাহ কম ছিল। এখনও দাম বেশ চড়া। গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম গড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।”
এই অবস্থা পুরো দেশজুড়েই। যশোর বড় বাজারের ক্রেতা আনিকা তাহসীন বলেন, “রমজানের আগে সব পণ্যের দামই বেড়েছে। গতকাল খেজুর, বাগদা চিংড়ি, রুই, ব্রয়লার মুরগী কিনেছি, গত সপ্তাহের তুলনায় গড়ে ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে এসব পণ্যের দাম।”
নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখন আর তাদের পক্ষে রমজানের জন্য আমদানি বা উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। তাদের হাতে রয়েছে কেবল বাজার এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়গুলো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “রমজানের পণ্য যা প্রয়োজন ছিল তা চলে আসছে। নতুন করে আমদানি ও উৎপাদন করার সুযোগ নেই।”
তাই এই চ্যালেঞ্জ উৎরানো কঠিন হবে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ”গড ব্লেস দেম।”
আমদানিতে সন্তুষ্টি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে।
রমজানকে সামনে রেখে তিন মাস আগে থেকেই এলসি খোলা এবং পণ্য আমদানির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।
এলসি হলো এটি একটি আর্থিক দলিল, যা বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি লেনদেনের নিশ্চয়তা প্রদান করে
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “রমজানের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য আমদানি করা আছে এবং মজুতও রয়েছে। এখন আমদানিকারকরা যদি সঠিকভাবে মজুত পণ্য বাজারে সরবরাহ করেন, তবে কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকবে না বলে আশা করা যাচ্ছে।”
আশার কথা শুনিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানও।
তিনি আলাপকে জানিয়েছেন, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, সয়াবিন তেলের মতো পণ্যগুলো আগাম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে।
“রমজানের চাহিদা ও বাজার বিবেচনায় নিয়ে আমরা আগাম ও সমন্বিত প্রস্তুতি নিয়েছি। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতেও একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
কোথাও কৃত্রিম সংকটের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব।
সরকারের বাজার পরীক্ষা
দায়িত্ব নিয়েই নাগরিক জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে নতুন সরকারকে, বলছেন, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন।
“নিঃসন্দেহে এটি তাদের জন্য বড় পরীক্ষা,” আলাপকে বলেন তিনি। এই চ্যালেঞ্জে সরকার উতরে যেতে পারলে মানুষের আস্থা বাড়বে বলেই মনে করছেন তিনি।
তার ভাষায়, “নতুন সরকার যদি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে।”
তবে নতুন সরকারের জন্য কাজটা সহজ হবে না বলেই মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
“বর্তমান মূল্যস্ফীতি সাময়িক নয়, এটি কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। এটা কমিয়ে আনাটা তাই সহজ হবে না,” বলেন ড. রহমান।
তবে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া গেলে বাজার মনিটরিং এর সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল সংস্কার ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমিয়ে আনা যাবে বলেই মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
সিপিডি’র অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, রমজানের সময় তিনটি প্রধান বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া গেলে রমজানের বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
“বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারকে প্রথমে সুশাসনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে হবে। চাঁদাবাজির বিষয়গুলো রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী যারা বাজার কারসাজির সুযোগ নিচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তৃতীয়ত, রমজানের সময় নিরাপদ খাদ্য একটি ইস্যু হয়ে ওঠে এ বিষয়টিও তাদের মাথায় রাখতে হবে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারের চিত্র যখন উলটো, প্রতিদিনই বাড়ছে দাম, সবমিলে তাই বলা যায়, নতুন সরকারের জন্য প্রথম রমজান হতে যাচ্ছে আগামীর অর্থনীতি ও সরকার পরিচালনার টেস্ট কেইস।
বিষয়: