পূর্ণিমার আলোয় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক চরিত্রের মনে হয়, সে যেন দস্তয়েভস্কির কোনো উপন্যাসের চরিত্র। মাত্র একটি বাক্য। অথচ সেই একটি বাক্যই পাঠককে বুঝিয়ে দেয়, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের তাক শুধু বাংলা সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। তার নারী চরিত্ররা ছিলেন সুন্দর। কিন্তু তাদের সৌন্দর্য কখনো তাদের পরিচয় ছিলো না। তাদের পরিচয় ছিলো তাদের অসম্পূর্ণতায়।
নাবিয়া নাভেলী হোসেন
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩ এএমআপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
"আল্লাহ আমার জীবনের যত পুণ্য আছে, সব যেন হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে দেন।"
হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসটি শেষ করে কথাটি বলেছিলো এমন একজন, যে শুভ্র না হয়েও নিজেকে শুভ্র ভাবতেই বেশি পছন্দ করে। যদিও সে এই অভিযোগ কখনোই স্বীকার করবে না।
আমি হাসতেই সে শান্ত গলায় বলেছিলো, "একটা মানুষ এত সুন্দর, এত সাবলীলভাবে কীভাবে লিখতে পারে?"
পরে বুঝেছিলাম, কথাগুলো নিছক আবেগ ছিলো না। বরং একজন পাঠকের বিস্ময়, শব্দের প্রতি, ভাষার প্রতি, আর এমন এক লেখকের প্রতি, যিনি জটিল অনুভূতিকেও এত সহজ করে লিখতে পারতেন যে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টে যাওয়ার পরও গল্প শেষ হয় না। তার রেশ যেন থেকে যায় কখনো কিছুক্ষণ, কখনো আজীবন।
হুমায়ূন আহমেদকে শুধু একজন জনপ্রিয় লেখক বললে তার প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ তিনি শুধু বই লেখেননি। তিনি পাঠক তৈরি করেছিলেন।
বাংলা সাহিত্য বরাবরই সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, এরা প্রত্যেকেই বাংলা সাহিত্যকে নিজ নিজ সময়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তোলার ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের অবদান ছিলো একেবারেই স্বতন্ত্র।
তিনি সাহিত্যকে সহজ করেননি। তিনি সাহিত্যের দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন।
যে লেখক পাঠক ফিরিয়ে আনেন
প্রত্যেক পাঠকের জীবনেই একসময় পাঠ-অবরোধ আসে। বই শুরু হয়, শেষ হয় না। বুকশেলফ ভরা থাকে, অথচ কোনো গল্পই আর ডাকে না।
আমিও সেই অভিজ্ঞতার বাইরে নই। অদ্ভুতভাবে, এমন প্রতিবারই আমি ফিরে যাই হুমায়ূন আহমেদের কাছে। কারণ জানি, তার বইয়ের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা পার হলেই বাকিটা শেষ না করে আমার পক্ষে উঠে আসা প্রায় অসম্ভব। হয়তো এ কারণেই বহু মানুষের মতো আমার কাছেও পাঠ-অবরোধ কাটানোর সবচেয়ে সহজ পথ আজও হুমায়ূন আহমেদের কোনো একটি উপন্যাস।
কারন তার ভাষা ছিলো সহজ। কিন্তু ভাবনা নয়।
অনেকে মনে করেন, সাহিত্য মানেই দুর্বোধ্য ভাষা, দীর্ঘ বাক্য কিংবা জটিল প্রতীক। অথচ হুমায়ূন আহমেদ যেন উল্টো কথাটিই প্রমাণ করে গেছেন। কঠিন বিষয়কে কঠিন করে লেখা খুব বড় কৃতিত্ব নয়। প্রকৃত কৃতিত্ব হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে জটিল অনুভূতি, সম্পর্ক আর প্রশ্নগুলোকে এমন সহজ ভাষায় বলা, যা একজন কিশোর থেকে শুরু করে বহুদিন বই না-ছোঁয়া একজন মানুষও অনায়াসে বুঝতে পারে। সাহিত্য পাঠককে অভিধানের সামনে বসিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। সাহিত্যের কাজ জটিল জীবনকে সহজ ভাষায় অনুভব করানো। হুমায়ূন আহমেদ তার লেখা দিয়ে বারবার সেই কথাই প্রমাণ করে গেছেন।
মধ্যবিত্তের ভেতরেই যে মহাকাব্য
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো তার পর্যবেক্ষণ।
তিনি আমাদের এমন কোনো পৃথিবীতে নিয়ে যাননি, যা আমরা চিনি না। বরং ফিরিয়ে এনেছেন সেই পৃথিবীতেই, যেখানে আমরা প্রতিদিন বাস করি।
মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, সীমিত আয়ের সংসার, অসম্পূর্ণ ভালোবাসা, একতরফা অপেক্ষা, ছোট ছোট অভিমান, বৃষ্টিভেজা বিকেল, এক কাপ চা কিংবা লোডশেডিংয়ের অন্ধকার, এসবই তার গল্পে হয়ে উঠেছে সাহিত্যের উপাদান।
আর ছিলো জোছনা। পূর্ণিমার রাতকে তিনি শুধু প্রকৃতির একটি দৃশ্য হিসেবে দেখেননি; সেটিকে পরিণত করেছিলেন এক অনুভূতিতে। তার বই পড়ে কত পাঠক যে প্রথমবারের মতো পূর্ণিমার চাঁদকে নতুন চোখে দেখতে শিখেছেন, তার হিসাব নেই। জোছনা যেন তার গল্পে শুধু আলো নয়, ছিলো নীরবতা, ভালোবাসা, অপেক্ষা আর আশ্রয়ের আরেক নাম।
তিনি মধ্যবিত্তকে রোমান্টিসাইজ করেননি। তিনি মধ্যবিত্তকে মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, অসাধারণ গল্প সব সময় অসাধারণ মানুষের নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় গল্পগুলো লুকিয়ে থাকে একেবারে সাধারণ জীবনের ভেতর।
যে নারীরা শুধু প্রেমিকা ছিলেন না
হুমায়ূন আহমেদের কথা উঠলেই আমাদের মনে পড়ে হিমু, মিসির আলী কিংবা শুভ্রের নাম। অথচ তার সাহিত্যকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে চাইলে তার নারী চরিত্রদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
হয়তো এ কারণেই তার বইয়ের নারীরা আজও পাঠকের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠেন। কৈশোরে তাদের একভাবে মনে হয়, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আবার অন্যভাবে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও যেন নতুন করে আবিষ্কার করা যায়।
হুমায়ূন আহমেদের নারীরা ছিলেন সুন্দর। কিন্তু তাদের সৌন্দর্য কখনো তাদের পরিচয় ছিলো না। তাদের পরিচয় ছিলো তাদের অসম্পূর্ণতায়।
রূপা অপেক্ষা করেছে। কিন্তু তার পরিচয় শুধু অপেক্ষা নয়। তিনি জানতেন, হিমু হয়তো কোনো দিনই ফিরবে না। তবু তার ভালোবাসায় না ছিলো দাবি, না আত্মসমর্পণ। ছিলো বোঝাপড়া এবং সেই বোঝাপড়ার মধ্যেও নিজের মর্যাদা ধরে রাখার এক নীরব শক্তি।
হিমুর খালা জানতেন, হিমু আবারও কোনো না কোনো বিপদে জড়িয়ে পড়বে। তবু প্রতিবার তার জন্য দরজা খোলা ছিলো। কারণ কিছু সম্পর্কের ভাষা রাগ নয়, দায়িত্ব। অভিযোগ নয়, নিঃশর্ত স্নেহ।
আবার মারিয়া যেন সময়েরও কিছুটা আগে হাঁটা একজন নারী। যে সময়ে ঢাকার রাস্তায় কোনো নারীকে স্পোর্টস কার চালাতে দেখা ছিলো বিরল, সেই সময়েই হুমায়ূন আহমেদ এমন একজন নারী চরিত্র কল্পনা করেছিলেন, যার আত্মবিশ্বাসই ছিলো তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
নীলু অসাধারণ হওয়ার চেষ্টা করেনি। আর ঠিক সেই কারণেই তিনি মনে থেকে যান। হুমায়ূন আহমেদ যেন জানতেন, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সব সময় নাটকীয় হতে হয় না। খুব সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।
আবার লীলাবতী মনে করিয়ে দেয়, তার নারী চরিত্রদের জীবন শুধু প্রেমের চারপাশে ঘুরত না। বাবার সঙ্গে কাটানো অল্প কয়েকটি দিনের স্মৃতি, সম্পর্কের কোমলতা, হারিয়ে যাওয়ার ভয়, এসবও সমান গুরুত্ব পেয়েছে তার লেখায়। একজন নারীর পরিচয় শুধু কারও প্রেমিকা বা স্ত্রী হওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; তিনি একই সঙ্গে কন্যা, বন্ধু, স্বপ্নদেখা মানুষ এবং নিজের আলাদা এক সত্তা।
আর তারপর আসে রেণু। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে রহস্যময় নারী চরিত্র।
দেবী’র রেণুকে শুধু অলৌকিক চরিত্র বললে ভুল হবে। আবার তাকে নিছক মানসিক রোগী বললেও গল্পের প্রতি অবিচার করা হবে। শৈশবের এক গভীর ট্রমা তাকে এমন এক সংবেদনশীলতার দিকে ঠেলে দেয়, যা যুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি যেন অলৌকিকতার কোনো অবতার নন; বরং এক রহস্যময় মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে অদৃশ্য এক রক্ষাকারী শক্তির উপস্থিতি অনুভব করা যায়। রেণুকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিসির আলী তার সমস্ত যুক্তি, মনস্তত্ত্ব, পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণকে সামনে আনেন। ট্রমা, অবচেতন মন, অতিসংবেদনশীলতা সবকিছুর মধ্যেই তিনি উত্তর খোঁজেন। কিন্তু রেণুর ক্ষেত্রে এসে তার যুক্তিবাদও যেন প্রথমবারের মতো নিজের সীমারেখার মুখোমুখি দাঁড়ায়। দেবী শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে প্রশ্ন থেকে যায় যে সত্যিই কি সব রহস্যের ব্যাখ্যা সম্ভব?
এই প্রশ্নটি শুধু দেবী’র নয়; হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যেরও। তিনি উত্তর দিতে ততটা আগ্রহী ছিলেন না, যতটা আগ্রহী ঞ্ছিলেন প্রশ্ন রেখে যেতে।
হয়তো এ কারণেই তার চরিত্রদের আমরা তাদের পেশা দিয়ে মনে রাখি না; মনে রাখি তাদের স্বভাব দিয়ে। আমরা বলি হিমু, মিসির আলী, রূপা, রেণু, নীলু কিংবা লীলাবতী। যেন তারা বইয়ের মানুষ নন, আমাদেরই চেনা কেউ।
হয়তো এ কারণেই তার নারী চরিত্রদের আলাদা করে মনে রাখার জন্য কোনো বিশেষণ লাগে না। তারা নিখুঁত ছিলেন না।
তারা অসম্পূর্ণ ছিলেন। আর ঠিক সেই কারণেই তারা আজও এত বাস্তব।
হুমায়ূন আহমেদ মানুষের গল্প লিখতেন। তাই তার পুরুষেরা যেমন মনে থাকে, তেমনি মনে থাকে তার নারীরাও। আর খুব সম্ভবত, এটাই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
দর্শন, কিন্তু দর্শনের ভাষায় নয়
হিমু, মিসির আলী, শুভ্র - বাংলা সাহিত্যের এই তিন চরিত্র যেন তিনটি ভিন্ন দর্শন।
হিমু সমাজের বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে হেঁটে প্রশ্ন করতে শেখায়। মিসির আলী যুক্তি দিয়ে অজানাকে বোঝার চেষ্টা করেন। শুভ্র মানুষের ভেতরের নীরবতাকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের দর্শন কখনো বক্তৃতা হয়ে আসেনি। এসেছে গল্প হয়ে।
হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম-এ পাঁচটি নীলপদ্মের যে রূপক তিনি ব্যবহার করেন, তা যেন মানুষের অনুভূতিরই এক প্রতিচ্ছবি। কিছু জিনিস জীবনে একবারই দেওয়া যায়। ভালোবাসা, বিশ্বাস কিংবা হৃদয়ের গভীরতম অংশ, সেগুলো ফেরত এলেও আর আগের মতো থাকে না।
তিনি উত্তর দেননি। ভাবতে শিখিয়েছেন।
তার গল্পের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো অপূর্ণতা। সব গল্পের শেষ তিনি লিখে দেননি।
অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন। বাস্তব জীবন যেমন সব সময় গুছিয়ে শেষ হয় না, তার গল্পও তেমনই অনেক সময় পাঠকের মনে শেষ হয়েছে।
সহজ ভাষার আড়ালে বিশাল পাঠভুবন
হুমায়ূন আহমেদের ভাষা ছিলো সহজ। কিন্তু তার পাঠ ছিলো বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত।
পূর্ণিমার আলোয় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক চরিত্রের মনে হয়, সে যেন দস্তয়েভস্কির কোনো উপন্যাসের চরিত্র। মাত্র একটি বাক্য। অথচ সেই একটি বাক্যই পাঠককে বুঝিয়ে দেয়, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের তাক শুধু বাংলা সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না।
দস্তয়েভস্কি, আন্তন চেখভ কিংবা পরে হারুকি মুরাকামির মতো লেখকদের তিনি শুধু পড়েননি; তাদের নিয়ে লিখেছেন, কথা বলেছেন এবং কখনো কখনো তাদের উপস্থিতিও রেখেছেন নিজের গল্পের ভেতর। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লেখা ‘নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদ’ বইয়ে তিনি হারুকি মুরাকামির প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথাও লিখেছেন।
একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা কিংবা মিসির আলীর গল্পগুলোতে বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখ নিছক নাম উচ্চারণ নয়। মানুষের মনস্তত্ত্ব, অপরাধবোধ, একাকিত্ব কিংবা অস্তিত্বের প্রশ্নকে বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার এক নীরব ইঙ্গিত।
মজার বিষয় হলো, অনেক পাঠকের কাছেই দস্তয়েভস্কির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পাতায়। হয়তো সেখান থেকেই কেউ একদিন ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট হাতে তুলে নিয়েছে। হয়তো সেখান থেকেই একজন পাঠকের বুকশেলফ আরও বড় হয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ শুধু গল্প লেখেননি। তিনি পাঠকের সামনে আরও বড় এক সাহিত্যভুবনের দরজাও খুলে দিয়েছিলেন।
একটি উপন্যাস, একটি প্রজন্ম
দারুচিনি দ্বীপ শুধু একটি উপন্যাস নয়। অনেকের কাছে সেটি ছিলো অভিযানের প্রথম স্বপ্ন। বন্ধুদের নিয়ে একদিন কোথাও হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে। অচেনা কোনো দ্বীপে পা রাখার কৌতূহল। পৃথিবীটাকে নিজের শহরের বাইরে গিয়ে নতুন করে দেখার সাহস।
সম্ভবত দারুচিনি দ্বীপ–এর সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। এটি শুধু একটি গল্প বলেনি; একটি প্রজন্মকে কল্পনা করতে শিখিয়েছিলো। ভ্রমণকে শুধু স্থান বদল নয়, নিজের ভেতরের মানুষটাকেও নতুন করে আবিষ্কারের এক উপলক্ষ হিসেবে দেখিয়েছিলো।
হুমায়ূন আহমেদের গল্পে অভিযান মানেই পাহাড়-জঙ্গল পেরোনো নয়। কখনো সেটি বন্ধুত্বের, কখনো ভালোবাসার, কখনো নিজের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার যাত্রা। তার চরিত্রেরা আমাদের শিখিয়েছে, পৃথিবী বড় হওয়ার আগে মানুষের কৌতূহল বড় হতে হয়।
হয়তো এ কারণেই তার বই পড়ে বড় হওয়া অনেকের কাছেই কোনো একদিন বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ার স্বপ্নটা এত পরিচিত লাগে। যেন সেই ইচ্ছের বীজ রোপণ করে গিয়েছিলো একটি উপন্যাস।
কিছু বই গল্প বলে। কিছু বই জীবনযাপনের ইচ্ছে তৈরি করে।
শুধু বই নয়
কখনো হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া হিমু, কখনো মায়াবী যুক্তির মিসির আলী, আবার কখনো শুভ্রর নীরবতা, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে শুধু কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেননি; সৃষ্টি করেছিলেন একেকটি জীবনদর্শন। আর কোথাও কোথাও তিনি নিজেও যেন হয়ে উঠেছিলেন জোছনা, বৃষ্টি আর সাধারণ জীবনের এক চিরসবুজ জাদুকর।
নন্দিত নরকে থেকে কিছুক্ষণ, দেবী থেকে জোছনা ও জননীর গল্প - প্রতিটি বইতেই দেখা গেছে একেক রকম হুমায়ূন আহমেদকে। কাগজের পাতায় আঁকা চরিত্রগুলো এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছিলো যে তারা বইয়ের ভেতরে আটকে থাকেনি; পাঠকের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
শুধু বই নয়, টেলিভিশন নাটকেও তিনি একই জাদু দেখিয়েছেন। এইসব দিনরাত্রি, আজ রবিবার কিংবা কোথাও কেউ নেই শুধু নাটক ছিলো না; ছিলো একটি প্রজন্মের পারিবারিক স্মৃতি।
বাকের ভাইয়ের চরিত্রটি এমন এক সাংস্কৃতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, যার নজির বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে বিরল। একটি কাল্পনিক চরিত্রের ফাঁসি ঠেকাতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো। বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি আর ঘটেনি।
একুশে বইমেলার সেই অপেক্ষা
ফেব্রুয়ারির বিকেল। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সামনে দীর্ঘ লাইন। কারও হাতে আগের বছরের বই। কেউ অটোগ্রাফ নেবে। কেউ শুধু একবার লেখককে কাছ থেকে দেখবে। আজকের ভাষায় একে বলা যায় 'ফ্যানডম'। বাংলাদেশের পাঠকসমাজ সেই অভিজ্ঞতা অনেক আগেই পেয়েছিলো। তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন লেখক। হুমায়ূন আহমেদ প্রমাণ করেছিলেন যে বাংলাদেশেও একজন লেখকের নতুন বই প্রকাশ একটি সাংস্কৃতিক ঘটনাও হতে পারে।
তার বইয়ের বিক্রি শুধু প্রকাশকদের ব্যবসায়িক সাফল্যই এনে দেয়নি; বাংলা বইয়ের বাজারকেও নতুন গতি দিয়েছিলো।
আজও একুশে বইমেলায় নতুন পাঠক তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় করতে আসে, পুরোনো পাঠক ফিরে আসে পুরোনো বন্ধুর কাছে।
শিল্পী ও মানুষ
হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্ক ছিলো, এখনও আছে। তার কিছু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ কখনো থামেনি।
শিল্পীকে তার শিল্প থেকে আলাদা করে দেখা উচিত কি না, সেই বিতর্কের সহজ উত্তর নেই। হয়তো একজন লেখকের ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্ক কখনো শেষ হবে না। কিন্তু একজন পাঠকের বুকশেলফে তার জায়গা তৈরি হয় শেষ পর্যন্ত তার লেখার শক্তিতেই।
তবে একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন।
বাংলাদেশে পাঠাভ্যাসকে জনপ্রিয় করা, বাংলা বইয়ের বাজারকে প্রাণবন্ত রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে বইয়ের দিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিলো অসাধারণ।
আজও কেউ যদি প্রথমবারের মতো বাংলা সাহিত্য পড়তে চান, অনেকের প্রথম পরামর্শ থাকে "একটা হুমায়ূন আহমেদের বই দিয়ে শুরু করুন।"
এটি কেবল একজন লেখকের জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়। এটি একজন লেখকের প্রতি একটি সমাজের আস্থারও প্রমাণ। হয়তো কোনো একদিন আরেকজন পাঠক প্রথমবারের মতো কিছুক্ষণ পড়বে।
বইটা বন্ধ করবে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকবে।
তারপর খুব আস্তে করে বলবে, "একটা মানুষ এত সুন্দর, এত সাবলীলভাবে কীভাবে লিখতে পারে?" সেদিনও হুমায়ূন আহমেদ নতুন করে জন্ম নেবেন। কারণ কিছু মানুষ শুধু বই লেখেন না।
তারা পাঠক তৈরি করেন। আর একজন লেখকের প্রকৃত অমরত্ব সম্ভবত সেখানেই।
হুমায়ূন আহমেদ: শব্দের পরেও যে মানুষটি রয়ে গেলেন
পূর্ণিমার আলোয় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক চরিত্রের মনে হয়, সে যেন দস্তয়েভস্কির কোনো উপন্যাসের চরিত্র। মাত্র একটি বাক্য। অথচ সেই একটি বাক্যই পাঠককে বুঝিয়ে দেয়, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের তাক শুধু বাংলা সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। তার নারী চরিত্ররা ছিলেন সুন্দর। কিন্তু তাদের সৌন্দর্য কখনো তাদের পরিচয় ছিলো না। তাদের পরিচয় ছিলো তাদের অসম্পূর্ণতায়।
"আল্লাহ আমার জীবনের যত পুণ্য আছে, সব যেন হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে দেন।"
হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসটি শেষ করে কথাটি বলেছিলো এমন একজন, যে শুভ্র না হয়েও নিজেকে শুভ্র ভাবতেই বেশি পছন্দ করে। যদিও সে এই অভিযোগ কখনোই স্বীকার করবে না।
আমি হাসতেই সে শান্ত গলায় বলেছিলো, "একটা মানুষ এত সুন্দর, এত সাবলীলভাবে কীভাবে লিখতে পারে?"
পরে বুঝেছিলাম, কথাগুলো নিছক আবেগ ছিলো না। বরং একজন পাঠকের বিস্ময়, শব্দের প্রতি, ভাষার প্রতি, আর এমন এক লেখকের প্রতি, যিনি জটিল অনুভূতিকেও এত সহজ করে লিখতে পারতেন যে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টে যাওয়ার পরও গল্প শেষ হয় না। তার রেশ যেন থেকে যায় কখনো কিছুক্ষণ, কখনো আজীবন।
হুমায়ূন আহমেদকে শুধু একজন জনপ্রিয় লেখক বললে তার প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ তিনি শুধু বই লেখেননি। তিনি পাঠক তৈরি করেছিলেন।
বাংলা সাহিত্য বরাবরই সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, এরা প্রত্যেকেই বাংলা সাহিত্যকে নিজ নিজ সময়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তোলার ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের অবদান ছিলো একেবারেই স্বতন্ত্র।
তিনি সাহিত্যকে সহজ করেননি। তিনি সাহিত্যের দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন।
যে লেখক পাঠক ফিরিয়ে আনেন
প্রত্যেক পাঠকের জীবনেই একসময় পাঠ-অবরোধ আসে। বই শুরু হয়, শেষ হয় না। বুকশেলফ ভরা থাকে, অথচ কোনো গল্পই আর ডাকে না।
আমিও সেই অভিজ্ঞতার বাইরে নই। অদ্ভুতভাবে, এমন প্রতিবারই আমি ফিরে যাই হুমায়ূন আহমেদের কাছে। কারণ জানি, তার বইয়ের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা পার হলেই বাকিটা শেষ না করে আমার পক্ষে উঠে আসা প্রায় অসম্ভব। হয়তো এ কারণেই বহু মানুষের মতো আমার কাছেও পাঠ-অবরোধ কাটানোর সবচেয়ে সহজ পথ আজও হুমায়ূন আহমেদের কোনো একটি উপন্যাস।
কারন তার ভাষা ছিলো সহজ। কিন্তু ভাবনা নয়।
অনেকে মনে করেন, সাহিত্য মানেই দুর্বোধ্য ভাষা, দীর্ঘ বাক্য কিংবা জটিল প্রতীক। অথচ হুমায়ূন আহমেদ যেন উল্টো কথাটিই প্রমাণ করে গেছেন। কঠিন বিষয়কে কঠিন করে লেখা খুব বড় কৃতিত্ব নয়। প্রকৃত কৃতিত্ব হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে জটিল অনুভূতি, সম্পর্ক আর প্রশ্নগুলোকে এমন সহজ ভাষায় বলা, যা একজন কিশোর থেকে শুরু করে বহুদিন বই না-ছোঁয়া একজন মানুষও অনায়াসে বুঝতে পারে। সাহিত্য পাঠককে অভিধানের সামনে বসিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। সাহিত্যের কাজ জটিল জীবনকে সহজ ভাষায় অনুভব করানো। হুমায়ূন আহমেদ তার লেখা দিয়ে বারবার সেই কথাই প্রমাণ করে গেছেন।
মধ্যবিত্তের ভেতরেই যে মহাকাব্য
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো তার পর্যবেক্ষণ।
তিনি আমাদের এমন কোনো পৃথিবীতে নিয়ে যাননি, যা আমরা চিনি না। বরং ফিরিয়ে এনেছেন সেই পৃথিবীতেই, যেখানে আমরা প্রতিদিন বাস করি।
মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, সীমিত আয়ের সংসার, অসম্পূর্ণ ভালোবাসা, একতরফা অপেক্ষা, ছোট ছোট অভিমান, বৃষ্টিভেজা বিকেল, এক কাপ চা কিংবা লোডশেডিংয়ের অন্ধকার, এসবই তার গল্পে হয়ে উঠেছে সাহিত্যের উপাদান।
আর ছিলো জোছনা। পূর্ণিমার রাতকে তিনি শুধু প্রকৃতির একটি দৃশ্য হিসেবে দেখেননি; সেটিকে পরিণত করেছিলেন এক অনুভূতিতে। তার বই পড়ে কত পাঠক যে প্রথমবারের মতো পূর্ণিমার চাঁদকে নতুন চোখে দেখতে শিখেছেন, তার হিসাব নেই। জোছনা যেন তার গল্পে শুধু আলো নয়, ছিলো নীরবতা, ভালোবাসা, অপেক্ষা আর আশ্রয়ের আরেক নাম।
তিনি মধ্যবিত্তকে রোমান্টিসাইজ করেননি। তিনি মধ্যবিত্তকে মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, অসাধারণ গল্প সব সময় অসাধারণ মানুষের নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় গল্পগুলো লুকিয়ে থাকে একেবারে সাধারণ জীবনের ভেতর।
যে নারীরা শুধু প্রেমিকা ছিলেন না
হুমায়ূন আহমেদের কথা উঠলেই আমাদের মনে পড়ে হিমু, মিসির আলী কিংবা শুভ্রের নাম। অথচ তার সাহিত্যকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে চাইলে তার নারী চরিত্রদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
হয়তো এ কারণেই তার বইয়ের নারীরা আজও পাঠকের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠেন। কৈশোরে তাদের একভাবে মনে হয়, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আবার অন্যভাবে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও যেন নতুন করে আবিষ্কার করা যায়।
হুমায়ূন আহমেদের নারীরা ছিলেন সুন্দর। কিন্তু তাদের সৌন্দর্য কখনো তাদের পরিচয় ছিলো না। তাদের পরিচয় ছিলো তাদের অসম্পূর্ণতায়।
রূপা অপেক্ষা করেছে। কিন্তু তার পরিচয় শুধু অপেক্ষা নয়। তিনি জানতেন, হিমু হয়তো কোনো দিনই ফিরবে না। তবু তার ভালোবাসায় না ছিলো দাবি, না আত্মসমর্পণ। ছিলো বোঝাপড়া এবং সেই বোঝাপড়ার মধ্যেও নিজের মর্যাদা ধরে রাখার এক নীরব শক্তি।
হিমুর খালা জানতেন, হিমু আবারও কোনো না কোনো বিপদে জড়িয়ে পড়বে। তবু প্রতিবার তার জন্য দরজা খোলা ছিলো। কারণ কিছু সম্পর্কের ভাষা রাগ নয়, দায়িত্ব। অভিযোগ নয়, নিঃশর্ত স্নেহ।
আবার মারিয়া যেন সময়েরও কিছুটা আগে হাঁটা একজন নারী। যে সময়ে ঢাকার রাস্তায় কোনো নারীকে স্পোর্টস কার চালাতে দেখা ছিলো বিরল, সেই সময়েই হুমায়ূন আহমেদ এমন একজন নারী চরিত্র কল্পনা করেছিলেন, যার আত্মবিশ্বাসই ছিলো তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
নীলু অসাধারণ হওয়ার চেষ্টা করেনি। আর ঠিক সেই কারণেই তিনি মনে থেকে যান। হুমায়ূন আহমেদ যেন জানতেন, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সব সময় নাটকীয় হতে হয় না। খুব সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।
আবার লীলাবতী মনে করিয়ে দেয়, তার নারী চরিত্রদের জীবন শুধু প্রেমের চারপাশে ঘুরত না। বাবার সঙ্গে কাটানো অল্প কয়েকটি দিনের স্মৃতি, সম্পর্কের কোমলতা, হারিয়ে যাওয়ার ভয়, এসবও সমান গুরুত্ব পেয়েছে তার লেখায়। একজন নারীর পরিচয় শুধু কারও প্রেমিকা বা স্ত্রী হওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; তিনি একই সঙ্গে কন্যা, বন্ধু, স্বপ্নদেখা মানুষ এবং নিজের আলাদা এক সত্তা।
আর তারপর আসে রেণু। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে রহস্যময় নারী চরিত্র।
দেবী’র রেণুকে শুধু অলৌকিক চরিত্র বললে ভুল হবে। আবার তাকে নিছক মানসিক রোগী বললেও গল্পের প্রতি অবিচার করা হবে। শৈশবের এক গভীর ট্রমা তাকে এমন এক সংবেদনশীলতার দিকে ঠেলে দেয়, যা যুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি যেন অলৌকিকতার কোনো অবতার নন; বরং এক রহস্যময় মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে অদৃশ্য এক রক্ষাকারী শক্তির উপস্থিতি অনুভব করা যায়। রেণুকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিসির আলী তার সমস্ত যুক্তি, মনস্তত্ত্ব, পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণকে সামনে আনেন। ট্রমা, অবচেতন মন, অতিসংবেদনশীলতা সবকিছুর মধ্যেই তিনি উত্তর খোঁজেন। কিন্তু রেণুর ক্ষেত্রে এসে তার যুক্তিবাদও যেন প্রথমবারের মতো নিজের সীমারেখার মুখোমুখি দাঁড়ায়। দেবী শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে প্রশ্ন থেকে যায় যে সত্যিই কি সব রহস্যের ব্যাখ্যা সম্ভব?
এই প্রশ্নটি শুধু দেবী’র নয়; হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যেরও। তিনি উত্তর দিতে ততটা আগ্রহী ছিলেন না, যতটা আগ্রহী ঞ্ছিলেন প্রশ্ন রেখে যেতে।
হয়তো এ কারণেই তার চরিত্রদের আমরা তাদের পেশা দিয়ে মনে রাখি না; মনে রাখি তাদের স্বভাব দিয়ে। আমরা বলি হিমু, মিসির আলী, রূপা, রেণু, নীলু কিংবা লীলাবতী। যেন তারা বইয়ের মানুষ নন, আমাদেরই চেনা কেউ।
হয়তো এ কারণেই তার নারী চরিত্রদের আলাদা করে মনে রাখার জন্য কোনো বিশেষণ লাগে না। তারা নিখুঁত ছিলেন না।
তারা অসম্পূর্ণ ছিলেন। আর ঠিক সেই কারণেই তারা আজও এত বাস্তব।
হুমায়ূন আহমেদ মানুষের গল্প লিখতেন। তাই তার পুরুষেরা যেমন মনে থাকে, তেমনি মনে থাকে তার নারীরাও। আর খুব সম্ভবত, এটাই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
দর্শন, কিন্তু দর্শনের ভাষায় নয়
হিমু, মিসির আলী, শুভ্র - বাংলা সাহিত্যের এই তিন চরিত্র যেন তিনটি ভিন্ন দর্শন।
হিমু সমাজের বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে হেঁটে প্রশ্ন করতে শেখায়। মিসির আলী যুক্তি দিয়ে অজানাকে বোঝার চেষ্টা করেন। শুভ্র মানুষের ভেতরের নীরবতাকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের দর্শন কখনো বক্তৃতা হয়ে আসেনি। এসেছে গল্প হয়ে।
হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম-এ পাঁচটি নীলপদ্মের যে রূপক তিনি ব্যবহার করেন, তা যেন মানুষের অনুভূতিরই এক প্রতিচ্ছবি। কিছু জিনিস জীবনে একবারই দেওয়া যায়। ভালোবাসা, বিশ্বাস কিংবা হৃদয়ের গভীরতম অংশ, সেগুলো ফেরত এলেও আর আগের মতো থাকে না।
তিনি উত্তর দেননি। ভাবতে শিখিয়েছেন।
তার গল্পের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো অপূর্ণতা। সব গল্পের শেষ তিনি লিখে দেননি।
অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন। বাস্তব জীবন যেমন সব সময় গুছিয়ে শেষ হয় না, তার গল্পও তেমনই অনেক সময় পাঠকের মনে শেষ হয়েছে।
সহজ ভাষার আড়ালে বিশাল পাঠভুবন
হুমায়ূন আহমেদের ভাষা ছিলো সহজ। কিন্তু তার পাঠ ছিলো বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত।
পূর্ণিমার আলোয় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক চরিত্রের মনে হয়, সে যেন দস্তয়েভস্কির কোনো উপন্যাসের চরিত্র। মাত্র একটি বাক্য। অথচ সেই একটি বাক্যই পাঠককে বুঝিয়ে দেয়, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের তাক শুধু বাংলা সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না।
দস্তয়েভস্কি, আন্তন চেখভ কিংবা পরে হারুকি মুরাকামির মতো লেখকদের তিনি শুধু পড়েননি; তাদের নিয়ে লিখেছেন, কথা বলেছেন এবং কখনো কখনো তাদের উপস্থিতিও রেখেছেন নিজের গল্পের ভেতর। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লেখা ‘নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদ’ বইয়ে তিনি হারুকি মুরাকামির প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথাও লিখেছেন।
একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা কিংবা মিসির আলীর গল্পগুলোতে বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখ নিছক নাম উচ্চারণ নয়। মানুষের মনস্তত্ত্ব, অপরাধবোধ, একাকিত্ব কিংবা অস্তিত্বের প্রশ্নকে বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার এক নীরব ইঙ্গিত।
মজার বিষয় হলো, অনেক পাঠকের কাছেই দস্তয়েভস্কির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পাতায়। হয়তো সেখান থেকেই কেউ একদিন ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট হাতে তুলে নিয়েছে। হয়তো সেখান থেকেই একজন পাঠকের বুকশেলফ আরও বড় হয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ শুধু গল্প লেখেননি। তিনি পাঠকের সামনে আরও বড় এক সাহিত্যভুবনের দরজাও খুলে দিয়েছিলেন।
একটি উপন্যাস, একটি প্রজন্ম
দারুচিনি দ্বীপ শুধু একটি উপন্যাস নয়। অনেকের কাছে সেটি ছিলো অভিযানের প্রথম স্বপ্ন। বন্ধুদের নিয়ে একদিন কোথাও হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে। অচেনা কোনো দ্বীপে পা রাখার কৌতূহল। পৃথিবীটাকে নিজের শহরের বাইরে গিয়ে নতুন করে দেখার সাহস।
সম্ভবত দারুচিনি দ্বীপ–এর সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। এটি শুধু একটি গল্প বলেনি; একটি প্রজন্মকে কল্পনা করতে শিখিয়েছিলো। ভ্রমণকে শুধু স্থান বদল নয়, নিজের ভেতরের মানুষটাকেও নতুন করে আবিষ্কারের এক উপলক্ষ হিসেবে দেখিয়েছিলো।
হুমায়ূন আহমেদের গল্পে অভিযান মানেই পাহাড়-জঙ্গল পেরোনো নয়। কখনো সেটি বন্ধুত্বের, কখনো ভালোবাসার, কখনো নিজের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার যাত্রা। তার চরিত্রেরা আমাদের শিখিয়েছে, পৃথিবী বড় হওয়ার আগে মানুষের কৌতূহল বড় হতে হয়।
হয়তো এ কারণেই তার বই পড়ে বড় হওয়া অনেকের কাছেই কোনো একদিন বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ার স্বপ্নটা এত পরিচিত লাগে। যেন সেই ইচ্ছের বীজ রোপণ করে গিয়েছিলো একটি উপন্যাস।
কিছু বই গল্প বলে। কিছু বই জীবনযাপনের ইচ্ছে তৈরি করে।
শুধু বই নয়
কখনো হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া হিমু, কখনো মায়াবী যুক্তির মিসির আলী, আবার কখনো শুভ্রর নীরবতা, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে শুধু কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেননি; সৃষ্টি করেছিলেন একেকটি জীবনদর্শন। আর কোথাও কোথাও তিনি নিজেও যেন হয়ে উঠেছিলেন জোছনা, বৃষ্টি আর সাধারণ জীবনের এক চিরসবুজ জাদুকর।
নন্দিত নরকে থেকে কিছুক্ষণ, দেবী থেকে জোছনা ও জননীর গল্প - প্রতিটি বইতেই দেখা গেছে একেক রকম হুমায়ূন আহমেদকে। কাগজের পাতায় আঁকা চরিত্রগুলো এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছিলো যে তারা বইয়ের ভেতরে আটকে থাকেনি; পাঠকের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
শুধু বই নয়, টেলিভিশন নাটকেও তিনি একই জাদু দেখিয়েছেন। এইসব দিনরাত্রি, আজ রবিবার কিংবা কোথাও কেউ নেই শুধু নাটক ছিলো না; ছিলো একটি প্রজন্মের পারিবারিক স্মৃতি।
বাকের ভাইয়ের চরিত্রটি এমন এক সাংস্কৃতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, যার নজির বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে বিরল। একটি কাল্পনিক চরিত্রের ফাঁসি ঠেকাতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো। বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি আর ঘটেনি।
একুশে বইমেলার সেই অপেক্ষা
ফেব্রুয়ারির বিকেল। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সামনে দীর্ঘ লাইন। কারও হাতে আগের বছরের বই। কেউ অটোগ্রাফ নেবে। কেউ শুধু একবার লেখককে কাছ থেকে দেখবে। আজকের ভাষায় একে বলা যায় 'ফ্যানডম'। বাংলাদেশের পাঠকসমাজ সেই অভিজ্ঞতা অনেক আগেই পেয়েছিলো। তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন লেখক। হুমায়ূন আহমেদ প্রমাণ করেছিলেন যে বাংলাদেশেও একজন লেখকের নতুন বই প্রকাশ একটি সাংস্কৃতিক ঘটনাও হতে পারে।
তার বইয়ের বিক্রি শুধু প্রকাশকদের ব্যবসায়িক সাফল্যই এনে দেয়নি; বাংলা বইয়ের বাজারকেও নতুন গতি দিয়েছিলো।
আজও একুশে বইমেলায় নতুন পাঠক তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় করতে আসে, পুরোনো পাঠক ফিরে আসে পুরোনো বন্ধুর কাছে।
শিল্পী ও মানুষ
হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্ক ছিলো, এখনও আছে। তার কিছু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ কখনো থামেনি।
শিল্পীকে তার শিল্প থেকে আলাদা করে দেখা উচিত কি না, সেই বিতর্কের সহজ উত্তর নেই। হয়তো একজন লেখকের ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্ক কখনো শেষ হবে না। কিন্তু একজন পাঠকের বুকশেলফে তার জায়গা তৈরি হয় শেষ পর্যন্ত তার লেখার শক্তিতেই।
তবে একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন।
বাংলাদেশে পাঠাভ্যাসকে জনপ্রিয় করা, বাংলা বইয়ের বাজারকে প্রাণবন্ত রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে বইয়ের দিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিলো অসাধারণ।
আজও কেউ যদি প্রথমবারের মতো বাংলা সাহিত্য পড়তে চান, অনেকের প্রথম পরামর্শ থাকে "একটা হুমায়ূন আহমেদের বই দিয়ে শুরু করুন।"
এটি কেবল একজন লেখকের জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়। এটি একজন লেখকের প্রতি একটি সমাজের আস্থারও প্রমাণ। হয়তো কোনো একদিন আরেকজন পাঠক প্রথমবারের মতো কিছুক্ষণ পড়বে।
বইটা বন্ধ করবে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকবে।
তারপর খুব আস্তে করে বলবে, "একটা মানুষ এত সুন্দর, এত সাবলীলভাবে কীভাবে লিখতে পারে?" সেদিনও হুমায়ূন আহমেদ নতুন করে জন্ম নেবেন। কারণ কিছু মানুষ শুধু বই লেখেন না।
তারা পাঠক তৈরি করেন। আর একজন লেখকের প্রকৃত অমরত্ব সম্ভবত সেখানেই।
মানুষ চলে যান। গল্প থেকে যায়।
আর কিছু কিছু গল্পের কাজ শুধু গল্প বলা নয়—
নতুন গল্পপাঠক তৈরি করা।