বিদায় বাংলাদেশের ‘পাপেটম্যান’

মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন আলো-ছায়া-অবয়বের কারিগর। পাপেট বলতে মানুষ যখন কেবল গ্রামীণ মেলার পুতুল নাচ বুঝতো, তখন তিনি সেই লোকশিল্পকে আধুনিক মননের শিল্পভাষায় রূপান্তর করেছিলেন। সুতোর টান ছিঁড়েপাপেটম্যানবিদায় নিলেও, তার তৈরি জাদুর জগত বেঁচে থাকবে বাঙালির মননে। বিদায় প্রিয় শিল্পী।

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

প্রাণহীন কিছু পুতুল আর এক টুকরো সুতো। এর ভেতরেই তিনি বুনে দিতেন এক জীবন্ত জগত। যে জগতের গল্পে কখনও থাকতো রূপকথা, কখনও দুরন্ত শৈশব-কৈশোর।

সেই জাদুকর, বাংলাদেশের ‘পাপেটম্যান’ মুস্তাফা মনোয়ার পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে। যেখানে তাকে আর বাঁধা যাবে না কোনো সুতোর টানে। রেখে গেছেন শতাব্দীসম সৃষ্টি, রঙিন স্বপ্নের ক্যানভাস।

ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়। সব্যসাচী এই শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন আলো-ছায়া-অবয়বের কারিগর। পাপেট বলতে মানুষ যখন কেবল গ্রামীণ মেলার পুতুল নাচ বুঝতো, তখন তিনি সেই লোকশিল্পকে আধুনিক মননের শিল্পভাষায় রূপান্তর করেছিলেন।

১৯৩৫ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের মনোহরপুরে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম। বাবা কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যিক পরিমণ্ডল তার ভেতরে বুনে দিয়েছিল শিল্পের প্রথম বীজ।

তবে শুধু শব্দে নয়, মুস্তাফা মনোয়ারের মন মজেছিল রেখা, রঙ আর মাটির গন্ধে। কলকাতায় শিশু বিদ্যাপীঠে শিক্ষায় হাতেখড়ি। কৈশোরে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে, বোনের বাড়িতে। ভাষা আন্দোলনের বছর তিনি নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে নবম শ্রেণীর ছাত্র।

ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চেয়ে করা মিছিলে গুলির খবর শুনে ছবি আঁকতে শুরু করলেন। বন্ধুদের নিয়ে তা সাঁটিয়ে দিলেন নারায়ণগঞ্জের দেয়ালে।

ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ছবি আঁকার কারণে ওই বয়সেই কারাবরণ করেন। এক মাস পর ছাড়া পান। কিন্তু ছবি আঁকা থেকে পিছপা হননি।

পরে আবার চলে যান বাবার কর্মস্থল কলকাতায়। সেখানে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন সায়েন্সে। কিন্তু তার মন পড়ে থাকতো ক্যানভাস-তুলিতেই।

পাশের বাড়িতেই থাকতেন লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। তার উৎসাহেই ভর্তি হন কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন মুস্তাফা মনোয়ার।

১৯৬৫ সালে পারিবারিক উদ্যোগে বিয়ে হয় মুস্তাফা মনোয়ারের। স্ত্রী মেরী মনোয়ার তখন পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করতেন।

পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর একে একে । এরপর একে একে কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে কাজ করেন।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের টেলিভিশন মাধ্যমে তার অবদান অনস্বীকার্য। বিটিভির উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি যখন দায়িত্ব পালন করেন, তখন টেলিভিশন কেবল খবর-অনুষ্ঠান নয়, বরং হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতির পীঠস্থান।

টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামে দুই চরিত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। এই পাপেট চরিত্রগুলো কেবল আনন্দই দেয়নি। বরং স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিরোধী পাকিস্তানী মনোভাবের প্রকাশকে ব্যঙ্গ করা হত পাপেট শোয়ের মাধ্যমে।

যুদ্ধ পরবর্তী একটা প্রজন্মকেও তার পাপেট শো শিখিয়েছিল দেশপ্রেম, ভালোবাসা, সততা আর মানবিকতা। বাউল-পারুল জুটির কথোপকথনেও ছিলো কতো স্বপ্নের দিশা।

টেলিভিশনের কালজয়ী সব নাটক আর অনুষ্ঠানের আবহ সংগীত ও সেট ডিজাইনেও ছিল তার অনন্য নান্দনিকতার ছোঁয়া।

মুস্তাফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন, পাপেট কোনো সস্তা বিনোদন নয়। এটি মানুষের ভেতরের অহংকারকে ভেঙে ফেলার এক দারুণ মাধ্যম। তিনি প্রায়ই বলতেন, “মানুষ যখন একটা পুতুলকে সুতো দিয়ে নাচায়, তখন সে আসলে বুঝতে পারে সে নিজেও প্রকৃতির বা ঈশ্বরের এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।"

রঙের তুলি, নাট্যনির্দেশনা, চারুকলার শিক্ষকতা, শিল্পের এমন কোনো আঙিনা নেই যেখানে তার পায়ের ছাপ পড়েনি। শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই গুণী শিল্পী।

তবে সব পুরস্কারের ঊর্ধ্বে ছিল তার চিরতরুণ মন আর শিশুদের প্রতি গভীর টান। বয়স নব্বইয়ের কোঠায় পৌঁছালেও তার চোখের পরিচিত ঝিলিক আর শিশুর মতো সরল হাসি ম্লান হয়নি কখনো।

মুস্তাফা মনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন। চিকিৎসা চলছিলো স্কয়ার হাসপাতালে।

সুতোর টান ছিঁড়ে ‘পাপেটম্যান’ বিদায় নিলেও, তার তৈরি জাদুর জগত বেঁচে থাকবে বাঙালির মননে। বিদায় ‘পাপেটম্যান’।