কাজীদা মরে গেছেন। বেঁচে নেই বাস্তবের রাহাত খানও। সেবা’ও মরে গেলো। আশা করি এটা ‘সাময়িক’ই হবে! শুধু কোনদিন বয়স না বাড়া মাসুদ রানা, সোহানা, মেজর জেনারেল রাহাত খান, গিলটি মিয়া, উ সেন, কবির চৌধুরীসহ আরো অসংখ্য চরিত্র বেঁচে থাকবেন সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বইয়ের অক্ষরগুলোর মাঝে।
আহরার হোসেন
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০৩:১৯ পিএমআপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ০৪:২১ পিএম
ছবি: এআই জেনারেটেড
মাসুদ রানার কথা মনে আছে? ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের’ সেই ‘দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই’ যিনি ‘গোপন মিশন’ নিয়ে ঘুরে বেড়ান দেশ-দেশান্তরে। তিনি একজন প্লেবয় - ‘কাছে টানেন কিন্তু বাঁধনে জড়ান না’। বহুগামী চরিত্র হওয়ার পরও তার একজন প্রেমিকা আছেন, সুন্দরী প্রতিভাময়ী সোহানা। তিনিও একজন স্পাই। তার একজন বস আছেন, মেজর জেনারেল রাহাত খান। প্রচণ্ড রাশভারী।
আপনি যদি সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা সিরিজের ভক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, কে এই রাহাত খান। কেন এই ‘বুড়োর’ সামনে গেলে ‘বুকের ভেতর হাতুড়ির বাড়ি’ পড়তো দুঃসাহসী মেজর রানার। এই ‘বুড়োর’ সাথে সত্যি সত্যি একবার দেখা হয়ে গিয়েছিলো আমার। কাল্পনিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘বিসিআই’য়ের অফিস যেখানে সেই মতিঝিলেরই এক ভুতূড়ে ভবনের একটি নির্মানাধীন ফ্লোরে।
বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এক কাল্পনিক চরিত্রের সাথে কীভাবে আমার সত্যি সত্যি দেখা হয়ে গিয়েছিল সেই গল্পই বলবো। তার আগে বলে নেই হঠাৎ কেন এই গল্প ফেঁদে বসেছি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ছয় দশকের পুরোনো একটি পুস্তক প্রকাশনী সংস্থা ‘সেবা’ গত বুধবার একটি নোটিশ দিয়ে তাদের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
নোটিশে সংস্থাটি বলছে, ‘অভ্যন্তরীণ নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয়’ সামনে আসায় ‘অডিট কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে সেবা প্রকাশনীর সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে’।
তার মানে হচ্ছে, ১৯৬৬ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় একাধিক স্পাই ও ডিটেকটিভ সিরিজের জন্মদাতা সেবা প্রকাশনী ২০২৬ সালে ৬০ বছরে এসে ‘সাময়িকভাবে’ মৃত্যুবরণ করলো। সাময়িক এই মৃত্যু থেকে সেবা প্রকাশনী আবার কোনদিন জেগে উঠবে কি?
২০০০ সালের পর যেসব শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যাদের বয়স এখন ২৫ বা তার বেশি, তাদের মনে হয়তো এই মৃত্যু কোন দাগ কাটবে না।
কারণ ততদিনে মানুষ স্যাটেলাইট আর ইন্টারনেটের কারণে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছে। মাসুদ রানা, রাহাত খান, সোহানা, গিলটি মিয়া, কিশোর, মুসা কিংবা রবিনরা আর তাদের চমৎকৃত করে না। কারণ ততদিনে তারা যেখানে সেখানে বসেই দেখে ফেলতে পারে জেমস বন্ড।
তারপরও দুএকজন ভুলে ভ্রান্তিতে মাসুদ রানা সিরিজের যে কোনো একটি পর্বের কয়েক পাতা উল্টোলেই বুঝে ফেলেন, এই মাসুদ রানা চরিত্রটি জেমস বন্ডের হুবহু কপি।
বিসিআই প্রধান রাহাত খান আর এমআইসিক্স প্রধান ‘এম’-এর মধ্যে লৈঙ্গিক পার্থক্য ছাড়া আর তেমন কোন পার্থক্য নেই।
কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সৈয়দ মাহমুদ আলী যদি আজ বেঁচে থাকেন তাহলে সেবা’র এই মৃত্যু নিশ্চয়ই তার মনে দাগ কাটবে।
এই লোকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল বছর দশেক আগে। তখন তার বয়স সত্তর। আমাকে বলেছিলেন তিনি ৫০ বছর ধরে মাসুদ রানা পড়ছেন। তখনো পড়েন। তিনি মাসুদ রানায় এমনই বুঁদ ছিলেন যে নিজের ছেলের নাম তিনি রেখেছিলেন মাসুদ।
সেবা প্রকাশনীর মৃত্যুঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে এই শতকের শুরু থেকেই। ক্ষয়িষ্ণু পাঠক। তারপরও এটিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনোয়ার হোসেন। কিন্তু তখন তিনি বার্ধক্যের কোঠায়। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেবা প্রকাশনী পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছিলেন।
বুধবার সেবা’র সাময়িক মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেছেন যে কাজী শাহনূর হোসেন, তিনি কাজীদা অর্থাৎ কাজী আনোয়ার হোসেনেরই ছেলে।
২০২২ সালের ১৯এ জানুয়ারি কাজীদার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সেবা প্রকাশনীর লিগ্যাসি একরকম শেষই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারও বহু আগে থেকে নিয়মিত লেখক আবদুল হাকিমের সাথে কপিরাইট ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন কাজী আনোয়ার হোসেন, যা সেবা প্রকাশনীর ব্যবসা আর সুনামকে অনেকটা খাদের কিনারে নিয়ে যায়। আর সেই যে সেবা’র টানা উত্থানের নিম্নগতি শুরু সেখান থেকে আজ সেবা’র প্রকাশনা কর্মসূচির যে ‘সাময়িক’ স্থগিত অবস্থা, এমন ঘটনা গত ষাট বছরে ঘটেনি।
কথাসাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন বেঁচে থাকলে এটা ঘটতো কি-না জানি না, তবে তার মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠিত সেবা প্রকাশনী টিকে থাকতে পারলো মোটে চার বছর।
অথচ কী দুর্দান্ত, কী জনপ্রিয় সব উপন্যাস একের পর এক উপহার দিয়ে গেছে সেবা।
পঞ্চাশ বছর! একজন নায়ককে কেন্দ্র করে এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোন ভাষাতে কি কাহিনী লেখা হয়েছে? প্রথম বই ‘ধ্বংসপাহাড়’। প্রকাশকাল মে, ১৯৬৬। এই বইয়ের উর্দু সংস্করণ ‘মউত কা টিলা’।
মাসুদ রানা সিরিজের শেষ বইটি প্রকাশ হয়েছিল ২০২৪ সালে, ‘ব্ল্যাক লিস্ট’। এটি ছিল সিরিজের ৪৭২ নম্বর বই। এর পর দুই বছর আর কোন মাসুদ রানা প্রকাশ হয়নি। অথচ ২০১৬ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি চল্লিশ দিনে একটি করে মাসুদ রানা প্রকাশিত হয়েছে।
এত গেল মাসুদ রানা বৃত্তান্ত। এর বাইরে সেবা’র আরো ছিল ‘কুয়াশা’ নামে রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ। এই সিরিজটিরও রয়েছে ৭৮টি বই।
আরও ছিল কিশোর থ্রিলার ‘তিন গোয়েন্দা’। এই সিরিজের রয়েছে আরো ১৫৮টি পর্ব। অসংখ্য বিশ্ব ক্ল্যাসিকের বাংলা রূপান্তরও আমরা পড়েছি এই সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে।
লক্ষ্যণীয় হলো, এই বইটিকে কখনো নিম্নবিত্ত ক্রেতার নাগালের বাইরে যেতে দেয়নি সেবা প্রকাশনী। বরঞ্চ সস্তা নিউজপ্রিন্ট আর পেপারব্যাকে ছাপা সেবা প্রকাশনীর অ্যাপ্রোচ ছিল স্রোতের বিপরীতে থেকে বইয়ের দাম কম রাখা।
সেবা প্রকাশনীর সাথে আমার যখন পরিচয় তখন প্রকাশনীটি মধ্যবয়সে।
১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকাল। লম্বা সামার ভ্যাকেশন কাটাতে হস্টেল থেকে বাড়িতে এসেছি। বহুবার পড়া বইগুলো তাক থেকে নামিয়ে নেড়েচেড়ে কাটাই দীর্ঘ দুপুরগুলো।
এমনই এক দুপুরে আব্বা আমার হাতে তুলে দিলেন মেটে রঙের একখানা বড়সড় খাম। উপরে সিল মারা, তাতে লেখা বুকপোস্ট। আরেকপাশে টাইপ করা অক্ষরে লেখা আমার নাম আর ঠিকানা। খাম খুলতে বেরিয়ে এলো ছোটখাটো একটা বই। নিউজপ্রিন্টে ছাপা পেপারব্যাক। সাউদিয়া ১০৩। মনে পড়ে গেল, কদিন আগেই ঢাকার সেগুনবাগিচার এক ঠিকানায় ১০০ টাকা মানিঅর্ডার করে পাঠিয়েছিলাম। কথা ছিলো এই টাকার বিনিময়ে বই পাঠানো হবে। যতদিন টাকা শেষ না হবে ততদিন বই আসতে থাকবে। যতদূর মনে পরে সাউদিয়া-১০৩ এর দাম ছিলো ২৪ টাকা। মানে আরো তিনখানা বই পাওয়া যাবে। যথাসময়ে বাকি বইগুলোও হাতে এসেছিল।
কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময় কাটতো হস্টেলের কঠোর অনুশাসনে। সেখানে ‘আউট বই’ পড়া নিষিদ্ধ। ফলে মাসুদ রানার সাথে পত্রমিতালী আর দীর্ঘায়িত হয়নি। কিন্তু ছিয়ানব্বই সালের গ্রীষ্মের সেই দুপুরে ‘২৪/৪ সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০’ ঠিকানাটির সাথে এক আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। সেই আত্মীয়ের বাড়িতে প্রথমবারের মত বেড়াতে যেতে সময় লেগেছিল কুড়ি বছর।
২০১৬ সালে প্রথম গিয়েছিলাম সেবা প্রকাশনীর সেগুনবাগিচার অফিসে। সেবা প্রকাশনীর সেবার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। উদ্দেশ্য এই উপলক্ষ্যে কাজীদার যদি কোনভাবে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করা যায়। ফোন তো তারা কেউ ধরেন না। তাই সরাসরি অফিসে।
কিন্তু সেদিন সেবা প্রকাশনীর অফিসের মূল ফটকও পার হতে পারিনি। উপর থেকে শুধু বার্তা এসেছিল, কাজীদা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন না। তার ছেলেরাও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ওইবার।
কোন এক অদ্ভূত কারণে কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদেরকে ও তাদের প্রতিষ্ঠান সেবা’কে সাধারণের জন্য দূর্লঙ্ঘনীয় করে রেখেছেন সারাটা জীবন। আমার পুরো জীবদ্দশায় একবারই কাজীদার ইন্টারভিউ আমার চোখে পড়েছে। সাংবাদিক শিবব্রত বর্মনকে তিনি সেই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন যেটি ২০১৯ সালে ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতে।
মৃত্যুর আগে সম্ভবত গণমাধ্যমকে দেওয়া সেটিই ছিল তার শেষ সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আগামী ষাট বছরেও সেবার প্রয়োজন ফুরাবে বলে মনে করি না”।
আফসোস তার মাত্র সাত বছরের মাথায় সেবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল অথবা সেবা নিজেই ‘সাময়িকভাবে’ কিংবা কে জানে স্থায়ীভাবেই ফুরিয়ে গেল।
কাজীদার সাক্ষাৎকার না মিললেও সেবার সাক্ষাৎ মিলেছিল কাজীদারই শৈশবের বন্ধু ও সহপাঠী রাহাত খানের সাথে। আমাদের চিরচেনা প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক রাহাত ভাই। ২০২০ সালে প্রয়াত হওয়ার আগ পর্যন্ত রাহাত খান ছিলেন তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক পত্রিকা বর্তমান-এর সম্পাদক পদে।
কাজীদাকে নিয়ে কথা বলার জন্য রাহাত ভাইয়ের সাথে আমার দু’দফা সাক্ষাৎ হয় ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে।
প্রথম দফায় জাতীয় প্রেসক্লাবে। দ্বিতীয় দফায় মতিঝিলের একটি নির্মানাধীন ভবনে। ওই ভবনটিরই দেয়ালবিহীন একটা ফ্লোরে। সেখানেই দৈনিক বর্তমানের নিউজরুম। পত্রিকাটির কার্যক্রম তখন কেবল শুরু হয়েছে।
রাহাত ভাইয়ের সাথে আলাপেই ওইবার জেনেছিলাম, কাজী আনোয়ার হোসেন তার ‘মেজর জেনারেল রাহাত খান’ চরিত্রটি সৃষ্টিই করেছিলেন আমাদের এই রাহাত ভাইকে কেন্দ্র করেই।
ছাত্রজীবনে রাহাত ভাইয়ের আস্তানা ছিল সেগুনবাগিচায় কাজীদার বাড়ি কাম প্রকাশনা অফিসেই। সেখানেই তিনি ঘুমাতেন, সেকথাও আমাকে দশ বছর আগে জানিয়েছিলেন প্রয়াত রাহাত ভাই।
“আমি মোটেও সেই মেজর জেনারেল রাহাত খান নই। আমি শুধুই রাহাত খান”, আমাকে সেদিন বলেছিলেন রাহাত ভাই।
তিনি আমাকে আরো বলেছিলেন, তার বন্ধু কাজী আনোয়ার হোসেন এই সিরিজগুলো লেখার এক পর্যায়ে তাকে একটি পর্ব দেখতে দিয়েছিলেন। তখন তিনি মফস্বলের একটি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। ওই পর্বটি পড়েই তিনি আবিষ্কার করেন, তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে বইয়ের একটি চরিত্র হিসেবে।
“দ্বিতীয়বার যখন দেখা হল তার সাথে তখন তাকে বললাম, এটা কী করেছেন আপনি? তখন তিনি আদরের সঙ্গে আমাকে বললেন, চোপ”।
“আমি বললাম, আমাকে মানায় নাকি, এরকম একটা স্বাস্থ্য নিয়ে মেজর জেনারেল! থ্রি স্টার জেনারেল! তবে যাই হোক, এটা ছিল লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। তিনি আমাকে খুব ভালবাসতেন। বিশ্বাস করি এখনো সেই ভালবাসা তার অন্তরে আছে আমার জন্য” - দশ বছর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন রাহাত খান।
সেবা প্রকাশনী থেকেই বের হওয়া রহস্য পত্রিকা থেকে জেনেছি, নায়কের নামের ‘মাসুদ’ অংশটি লেখক নিয়েছেন প্রয়াত গীতিকবি মাসুদ করিমের নাম থেকে।
আর মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংয়ের নাম থেকে নিয়েছেন ‘রানা’ অংশটি।
মাসুদ রানা সিরিজে আরো বহু নিয়মিত চরিত্র রয়েছে। যেমন: সোহেল, সোহানা, রুপা, রাঙার মা, গিলটি মিয়া, ভিনসেন্ট গগল, জর্জ হ্যামিলটন। এদের নামও কি তাহলে বাস্তবের চরিত্র থেকে নেওয়া?
কাজী আনোয়ার হোসেনকে তার ডাক নামে, অর্থাৎ নওয়াব নামে ডাকতেন রাহাত খান। তিনি বলেন, “নওয়াব যাদের ভালবাসতেন তাদের নামগুলো বিভিন্ন ভালো ভালো চরিত্রের নাম হিসেবে ব্যবহার করতেন। আর তার সঙ্গে যারা শত্রুতা করেছে, বেছে বেছে ওদের সবাইকে ভিলেনের নাম দিয়েছেন”।
মাসুদ রানা সিরিজের কয়েকজন নিয়মিত এবং দুর্ধর্ষ ভিলেনের একজন কবির চৌধুরী। তিনি একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কিন্তু বিপথে যাওয়া মানুষ।
এছাড়া নিয়মিত ভিলেনদের তালিকায় আরো রয়েছেন কবির চৌধুরীর ছেলে খায়রুল কবির, উ সেন প্রমুখ।
মাসুদ রানাকে নিয়ে অন্তত দুটি সিনেমা তৈরি হওয়ার খবর আমি জানি। প্রথম সিনেমাটি হয় ১৯৭৪ সালে - ‘মাসুদ রানা’ নামেই। সেই সিনেমায় মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনয় করেই ‘সোহেল রানা’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ।
সোহেল রানা সম্প্রতি আলাপ-এ এসেছিলেন। সুস্থ আছেন। আশা করি আরো বহু বছর বাঁচবেন।
দ্বিতীয় সিনেমাটি ‘এমআর-নাইন: ডু অর ডাই’ মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। সেখানে মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনয় করেন চিত্রনায়ক এবিএম সুমন। তিনি তরুণ। সুস্থ আশা করি শতায়ু হবেন।
কিন্তু কাজীদা মরে গেছেন। বেঁচে নেই বাস্তবের রাহাত খানও। সেবা’ও মরে গেলো - আশা করি এটা ‘সাময়িক’ই হবে!
শুধু কোনদিন বয়স না বাড়া মাসুদ রানা, সোহানা, মেজর জেনারেল রাহাত খান, গিলটি মিয়া, উ সেন, কবির চৌধুরীসহ আরো অসংখ্য চরিত্র বেঁচে থাকবেন সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বইয়ে ছাপা অক্ষরগুলোর মাঝে।
স্মৃতিচারণ
সেবা প্রকাশনীর ‘সাময়িক’ মৃত্যুতে শোকগাঁথা
কাজীদা মরে গেছেন। বেঁচে নেই বাস্তবের রাহাত খানও। সেবা’ও মরে গেলো। আশা করি এটা ‘সাময়িক’ই হবে! শুধু কোনদিন বয়স না বাড়া মাসুদ রানা, সোহানা, মেজর জেনারেল রাহাত খান, গিলটি মিয়া, উ সেন, কবির চৌধুরীসহ আরো অসংখ্য চরিত্র বেঁচে থাকবেন সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বইয়ের অক্ষরগুলোর মাঝে।
মাসুদ রানার কথা মনে আছে? ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের’ সেই ‘দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই’ যিনি ‘গোপন মিশন’ নিয়ে ঘুরে বেড়ান দেশ-দেশান্তরে। তিনি একজন প্লেবয় - ‘কাছে টানেন কিন্তু বাঁধনে জড়ান না’। বহুগামী চরিত্র হওয়ার পরও তার একজন প্রেমিকা আছেন, সুন্দরী প্রতিভাময়ী সোহানা। তিনিও একজন স্পাই। তার একজন বস আছেন, মেজর জেনারেল রাহাত খান। প্রচণ্ড রাশভারী।
আপনি যদি সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা সিরিজের ভক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, কে এই রাহাত খান। কেন এই ‘বুড়োর’ সামনে গেলে ‘বুকের ভেতর হাতুড়ির বাড়ি’ পড়তো দুঃসাহসী মেজর রানার। এই ‘বুড়োর’ সাথে সত্যি সত্যি একবার দেখা হয়ে গিয়েছিলো আমার। কাল্পনিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘বিসিআই’য়ের অফিস যেখানে সেই মতিঝিলেরই এক ভুতূড়ে ভবনের একটি নির্মানাধীন ফ্লোরে।
বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এক কাল্পনিক চরিত্রের সাথে কীভাবে আমার সত্যি সত্যি দেখা হয়ে গিয়েছিল সেই গল্পই বলবো। তার আগে বলে নেই হঠাৎ কেন এই গল্প ফেঁদে বসেছি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ছয় দশকের পুরোনো একটি পুস্তক প্রকাশনী সংস্থা ‘সেবা’ গত বুধবার একটি নোটিশ দিয়ে তাদের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
নোটিশে সংস্থাটি বলছে, ‘অভ্যন্তরীণ নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয়’ সামনে আসায় ‘অডিট কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে সেবা প্রকাশনীর সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে’।
তার মানে হচ্ছে, ১৯৬৬ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় একাধিক স্পাই ও ডিটেকটিভ সিরিজের জন্মদাতা সেবা প্রকাশনী ২০২৬ সালে ৬০ বছরে এসে ‘সাময়িকভাবে’ মৃত্যুবরণ করলো। সাময়িক এই মৃত্যু থেকে সেবা প্রকাশনী আবার কোনদিন জেগে উঠবে কি?
২০০০ সালের পর যেসব শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যাদের বয়স এখন ২৫ বা তার বেশি, তাদের মনে হয়তো এই মৃত্যু কোন দাগ কাটবে না।
কারণ ততদিনে মানুষ স্যাটেলাইট আর ইন্টারনেটের কারণে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছে। মাসুদ রানা, রাহাত খান, সোহানা, গিলটি মিয়া, কিশোর, মুসা কিংবা রবিনরা আর তাদের চমৎকৃত করে না। কারণ ততদিনে তারা যেখানে সেখানে বসেই দেখে ফেলতে পারে জেমস বন্ড।
তারপরও দুএকজন ভুলে ভ্রান্তিতে মাসুদ রানা সিরিজের যে কোনো একটি পর্বের কয়েক পাতা উল্টোলেই বুঝে ফেলেন, এই মাসুদ রানা চরিত্রটি জেমস বন্ডের হুবহু কপি।
বিসিআই প্রধান রাহাত খান আর এমআইসিক্স প্রধান ‘এম’-এর মধ্যে লৈঙ্গিক পার্থক্য ছাড়া আর তেমন কোন পার্থক্য নেই।
কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সৈয়দ মাহমুদ আলী যদি আজ বেঁচে থাকেন তাহলে সেবা’র এই মৃত্যু নিশ্চয়ই তার মনে দাগ কাটবে।
এই লোকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল বছর দশেক আগে। তখন তার বয়স সত্তর। আমাকে বলেছিলেন তিনি ৫০ বছর ধরে মাসুদ রানা পড়ছেন। তখনো পড়েন। তিনি মাসুদ রানায় এমনই বুঁদ ছিলেন যে নিজের ছেলের নাম তিনি রেখেছিলেন মাসুদ।
সেবা প্রকাশনীর মৃত্যুঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে এই শতকের শুরু থেকেই। ক্ষয়িষ্ণু পাঠক। তারপরও এটিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনোয়ার হোসেন। কিন্তু তখন তিনি বার্ধক্যের কোঠায়। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেবা প্রকাশনী পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছিলেন।
বুধবার সেবা’র সাময়িক মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেছেন যে কাজী শাহনূর হোসেন, তিনি কাজীদা অর্থাৎ কাজী আনোয়ার হোসেনেরই ছেলে।
২০২২ সালের ১৯এ জানুয়ারি কাজীদার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সেবা প্রকাশনীর লিগ্যাসি একরকম শেষই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারও বহু আগে থেকে নিয়মিত লেখক আবদুল হাকিমের সাথে কপিরাইট ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন কাজী আনোয়ার হোসেন, যা সেবা প্রকাশনীর ব্যবসা আর সুনামকে অনেকটা খাদের কিনারে নিয়ে যায়। আর সেই যে সেবা’র টানা উত্থানের নিম্নগতি শুরু সেখান থেকে আজ সেবা’র প্রকাশনা কর্মসূচির যে ‘সাময়িক’ স্থগিত অবস্থা, এমন ঘটনা গত ষাট বছরে ঘটেনি।
কথাসাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন বেঁচে থাকলে এটা ঘটতো কি-না জানি না, তবে তার মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠিত সেবা প্রকাশনী টিকে থাকতে পারলো মোটে চার বছর।
অথচ কী দুর্দান্ত, কী জনপ্রিয় সব উপন্যাস একের পর এক উপহার দিয়ে গেছে সেবা।
পঞ্চাশ বছর! একজন নায়ককে কেন্দ্র করে এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোন ভাষাতে কি কাহিনী লেখা হয়েছে?
প্রথম বই ‘ধ্বংসপাহাড়’। প্রকাশকাল মে, ১৯৬৬। এই বইয়ের উর্দু সংস্করণ ‘মউত কা টিলা’।
মাসুদ রানা সিরিজের শেষ বইটি প্রকাশ হয়েছিল ২০২৪ সালে, ‘ব্ল্যাক লিস্ট’। এটি ছিল সিরিজের ৪৭২ নম্বর বই। এর পর দুই বছর আর কোন মাসুদ রানা প্রকাশ হয়নি। অথচ ২০১৬ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি চল্লিশ দিনে একটি করে মাসুদ রানা প্রকাশিত হয়েছে।
এত গেল মাসুদ রানা বৃত্তান্ত। এর বাইরে সেবা’র আরো ছিল ‘কুয়াশা’ নামে রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ। এই সিরিজটিরও রয়েছে ৭৮টি বই।
আরও ছিল কিশোর থ্রিলার ‘তিন গোয়েন্দা’। এই সিরিজের রয়েছে আরো ১৫৮টি পর্ব। অসংখ্য বিশ্ব ক্ল্যাসিকের বাংলা রূপান্তরও আমরা পড়েছি এই সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে।
লক্ষ্যণীয় হলো, এই বইটিকে কখনো নিম্নবিত্ত ক্রেতার নাগালের বাইরে যেতে দেয়নি সেবা প্রকাশনী। বরঞ্চ সস্তা নিউজপ্রিন্ট আর পেপারব্যাকে ছাপা সেবা প্রকাশনীর অ্যাপ্রোচ ছিল স্রোতের বিপরীতে থেকে বইয়ের দাম কম রাখা।
সেবা প্রকাশনীর সাথে আমার যখন পরিচয় তখন প্রকাশনীটি মধ্যবয়সে।
১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকাল। লম্বা সামার ভ্যাকেশন কাটাতে হস্টেল থেকে বাড়িতে এসেছি। বহুবার পড়া বইগুলো তাক থেকে নামিয়ে নেড়েচেড়ে কাটাই দীর্ঘ দুপুরগুলো।
এমনই এক দুপুরে আব্বা আমার হাতে তুলে দিলেন মেটে রঙের একখানা বড়সড় খাম। উপরে সিল মারা, তাতে লেখা বুকপোস্ট। আরেকপাশে টাইপ করা অক্ষরে লেখা আমার নাম আর ঠিকানা। খাম খুলতে বেরিয়ে এলো ছোটখাটো একটা বই। নিউজপ্রিন্টে ছাপা পেপারব্যাক। সাউদিয়া ১০৩। মনে পড়ে গেল, কদিন আগেই ঢাকার সেগুনবাগিচার এক ঠিকানায় ১০০ টাকা মানিঅর্ডার করে পাঠিয়েছিলাম। কথা ছিলো এই টাকার বিনিময়ে বই পাঠানো হবে। যতদিন টাকা শেষ না হবে ততদিন বই আসতে থাকবে। যতদূর মনে পরে সাউদিয়া-১০৩ এর দাম ছিলো ২৪ টাকা। মানে আরো তিনখানা বই পাওয়া যাবে। যথাসময়ে বাকি বইগুলোও হাতে এসেছিল।
কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময় কাটতো হস্টেলের কঠোর অনুশাসনে। সেখানে ‘আউট বই’ পড়া নিষিদ্ধ। ফলে মাসুদ রানার সাথে পত্রমিতালী আর দীর্ঘায়িত হয়নি। কিন্তু ছিয়ানব্বই সালের গ্রীষ্মের সেই দুপুরে ‘২৪/৪ সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০’ ঠিকানাটির সাথে এক আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। সেই আত্মীয়ের বাড়িতে প্রথমবারের মত বেড়াতে যেতে সময় লেগেছিল কুড়ি বছর।
২০১৬ সালে প্রথম গিয়েছিলাম সেবা প্রকাশনীর সেগুনবাগিচার অফিসে। সেবা প্রকাশনীর সেবার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। উদ্দেশ্য এই উপলক্ষ্যে কাজীদার যদি কোনভাবে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করা যায়। ফোন তো তারা কেউ ধরেন না। তাই সরাসরি অফিসে।
কিন্তু সেদিন সেবা প্রকাশনীর অফিসের মূল ফটকও পার হতে পারিনি। উপর থেকে শুধু বার্তা এসেছিল, কাজীদা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন না। তার ছেলেরাও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ওইবার।
কোন এক অদ্ভূত কারণে কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদেরকে ও তাদের প্রতিষ্ঠান সেবা’কে সাধারণের জন্য দূর্লঙ্ঘনীয় করে রেখেছেন সারাটা জীবন। আমার পুরো জীবদ্দশায় একবারই কাজীদার ইন্টারভিউ আমার চোখে পড়েছে। সাংবাদিক শিবব্রত বর্মনকে তিনি সেই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন যেটি ২০১৯ সালে ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতে।
মৃত্যুর আগে সম্ভবত গণমাধ্যমকে দেওয়া সেটিই ছিল তার শেষ সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আগামী ষাট বছরেও সেবার প্রয়োজন ফুরাবে বলে মনে করি না”।
আফসোস তার মাত্র সাত বছরের মাথায় সেবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল অথবা সেবা নিজেই ‘সাময়িকভাবে’ কিংবা কে জানে স্থায়ীভাবেই ফুরিয়ে গেল।
কাজীদার সাক্ষাৎকার না মিললেও সেবার সাক্ষাৎ মিলেছিল কাজীদারই শৈশবের বন্ধু ও সহপাঠী রাহাত খানের সাথে। আমাদের চিরচেনা প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক রাহাত ভাই। ২০২০ সালে প্রয়াত হওয়ার আগ পর্যন্ত রাহাত খান ছিলেন তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক পত্রিকা বর্তমান-এর সম্পাদক পদে।
কাজীদাকে নিয়ে কথা বলার জন্য রাহাত ভাইয়ের সাথে আমার দু’দফা সাক্ষাৎ হয় ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে।
প্রথম দফায় জাতীয় প্রেসক্লাবে। দ্বিতীয় দফায় মতিঝিলের একটি নির্মানাধীন ভবনে। ওই ভবনটিরই দেয়ালবিহীন একটা ফ্লোরে। সেখানেই দৈনিক বর্তমানের নিউজরুম। পত্রিকাটির কার্যক্রম তখন কেবল শুরু হয়েছে।
রাহাত ভাইয়ের সাথে আলাপেই ওইবার জেনেছিলাম, কাজী আনোয়ার হোসেন তার ‘মেজর জেনারেল রাহাত খান’ চরিত্রটি সৃষ্টিই করেছিলেন আমাদের এই রাহাত ভাইকে কেন্দ্র করেই।
ছাত্রজীবনে রাহাত ভাইয়ের আস্তানা ছিল সেগুনবাগিচায় কাজীদার বাড়ি কাম প্রকাশনা অফিসেই। সেখানেই তিনি ঘুমাতেন, সেকথাও আমাকে দশ বছর আগে জানিয়েছিলেন প্রয়াত রাহাত ভাই।
“আমি মোটেও সেই মেজর জেনারেল রাহাত খান নই। আমি শুধুই রাহাত খান”, আমাকে সেদিন বলেছিলেন রাহাত ভাই।
তিনি আমাকে আরো বলেছিলেন, তার বন্ধু কাজী আনোয়ার হোসেন এই সিরিজগুলো লেখার এক পর্যায়ে তাকে একটি পর্ব দেখতে দিয়েছিলেন। তখন তিনি মফস্বলের একটি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। ওই পর্বটি পড়েই তিনি আবিষ্কার করেন, তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে বইয়ের একটি চরিত্র হিসেবে।
“দ্বিতীয়বার যখন দেখা হল তার সাথে তখন তাকে বললাম, এটা কী করেছেন আপনি? তখন তিনি আদরের সঙ্গে আমাকে বললেন, চোপ”।
“আমি বললাম, আমাকে মানায় নাকি, এরকম একটা স্বাস্থ্য নিয়ে মেজর জেনারেল! থ্রি স্টার জেনারেল! তবে যাই হোক, এটা ছিল লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। তিনি আমাকে খুব ভালবাসতেন। বিশ্বাস করি এখনো সেই ভালবাসা তার অন্তরে আছে আমার জন্য” - দশ বছর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন রাহাত খান।
সেবা প্রকাশনী থেকেই বের হওয়া রহস্য পত্রিকা থেকে জেনেছি, নায়কের নামের ‘মাসুদ’ অংশটি লেখক নিয়েছেন প্রয়াত গীতিকবি মাসুদ করিমের নাম থেকে।
আর মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংয়ের নাম থেকে নিয়েছেন ‘রানা’ অংশটি।
মাসুদ রানা সিরিজে আরো বহু নিয়মিত চরিত্র রয়েছে। যেমন: সোহেল, সোহানা, রুপা, রাঙার মা, গিলটি মিয়া, ভিনসেন্ট গগল, জর্জ হ্যামিলটন। এদের নামও কি তাহলে বাস্তবের চরিত্র থেকে নেওয়া?
কাজী আনোয়ার হোসেনকে তার ডাক নামে, অর্থাৎ নওয়াব নামে ডাকতেন রাহাত খান। তিনি বলেন, “নওয়াব যাদের ভালবাসতেন তাদের নামগুলো বিভিন্ন ভালো ভালো চরিত্রের নাম হিসেবে ব্যবহার করতেন। আর তার সঙ্গে যারা শত্রুতা করেছে, বেছে বেছে ওদের সবাইকে ভিলেনের নাম দিয়েছেন”।
মাসুদ রানা সিরিজের কয়েকজন নিয়মিত এবং দুর্ধর্ষ ভিলেনের একজন কবির চৌধুরী। তিনি একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কিন্তু বিপথে যাওয়া মানুষ।
এছাড়া নিয়মিত ভিলেনদের তালিকায় আরো রয়েছেন কবির চৌধুরীর ছেলে খায়রুল কবির, উ সেন প্রমুখ।
মাসুদ রানাকে নিয়ে অন্তত দুটি সিনেমা তৈরি হওয়ার খবর আমি জানি। প্রথম সিনেমাটি হয় ১৯৭৪ সালে - ‘মাসুদ রানা’ নামেই। সেই সিনেমায় মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনয় করেই ‘সোহেল রানা’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ।
সোহেল রানা সম্প্রতি আলাপ-এ এসেছিলেন। সুস্থ আছেন। আশা করি আরো বহু বছর বাঁচবেন।
দ্বিতীয় সিনেমাটি ‘এমআর-নাইন: ডু অর ডাই’ মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। সেখানে মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনয় করেন চিত্রনায়ক এবিএম সুমন। তিনি তরুণ। সুস্থ আশা করি শতায়ু হবেন।
কিন্তু কাজীদা মরে গেছেন। বেঁচে নেই বাস্তবের রাহাত খানও। সেবা’ও মরে গেলো - আশা করি এটা ‘সাময়িক’ই হবে!
শুধু কোনদিন বয়স না বাড়া মাসুদ রানা, সোহানা, মেজর জেনারেল রাহাত খান, গিলটি মিয়া, উ সেন, কবির চৌধুরীসহ আরো অসংখ্য চরিত্র বেঁচে থাকবেন সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বইয়ে ছাপা অক্ষরগুলোর মাঝে।
আহরার হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক, আলাপ।