গরম পড়লেই পানির সংকটে পড়ছে মিরপুরবাসী

মিরপুরে টানা পানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। ৬০ ফিট, কাঁঠালতলা, নামাপাড়া, ইব্রাহিমপুরসহ একাধিক এলাকায় কোথাও পানি নেই, কোথাও অপ্রতুল সরবরাহে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। 

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্বদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন ড. মফিদুল আলম। বেশ কয়েকদিন ধরেই অফিসে যাওয়ার সময় বিপাকে পড়তে হয় তাকে। কারণ, বাসায় পানি থাকছে না। 

“পানি ছাড়া তো জীবন অচল। একদিন না থাকলেই বোঝা যায়, আসলে আমাদের জীবনে এটা কতটা দরকার,”  আলাপকে বলেন তিনি। 

তবে এর আগে ‘এতটা সমস্যায়’ পড়তে হযনি বলে জানান ড. মফিদুল। প্রতিবেশীরা প্রায়ই এমন সমস্যায় পড়েন সেটা শুনেছেন তিনি। ওয়াসার গাড়িতে পানিও নতেক দেখেছেন। 

ঢাকার মিরপুৃরের ৬০ ফিট এলাকায় থাকেন মফিদুল আলম। তার পাশাপাশি বাসায় থাকেন মাহবুব আলম। পেশায় এই সাংবাদিক জানালেন, মাঝে মাঝে পানির সমস্যায় পড়েছেন তিনিও।  

মিরপুরের অন্যান্য এলাকার চিত্রও প্রায় একই। 

৬০ ফিট থেকে একটু দূরে গেলেই মণিপুর কাঠালতলা। স্থানীয়রা বলছেন, সেখানে পানির সংকট ‘ভয়াবহ’ আকার ধারণ করেছে। 

 কাঠালতলার বাসিন্দা সাফায়েত হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৫-২০ দিন ধরে পানির সংকটে ভুগছেন তারা। 

“পানির ভয়াবহ সমস্যা। খুবই অল্প পানি আসে। সেটা নিয়ে কাজও করা যায় না। ওয়াসার গাড়ি আসলে পানি কিনতে হয়,” আলাপকে বলেন তিনি। 

এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পাম্প নষ্ট হয়েছে বলে জানানো হয় তাদের।

ইব্রাহিমপুর, মুসলিম বাজার, নামাপাড়া এলাকাতেও প্রায় একই দৃশ্য। কোথাও পানি আছে, কোথাও নেই। মুসলিম বাজারের বাসিন্দা মোস্তফা শামিম জানান, তার বাসায় পানির সমস্যা নেই। তবে তার এলাকাতে এই সমস্যা প্রকট। 

আলাপকে তিনি বলেন, “আমার বাসাতে এই সমস্যা খুব একটা নেই। তবে এলাকার অনেকেই এই সমস্যায় ভুগছেন। পানির গাড়িও আসছে। অনেক প্রতিবেশীকে দেখেছি পানি কিনে বাসায় নিয়ে যাচ্ছে।”

পানির সংকট নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে ওয়াসা

মিরপুরের এই পানি সংকট এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তীব্র ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত পানি নেই, কোথাও থাকলেও তা এতটাই অনিয়মিত ও অপ্রতুল যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। 

ওয়াসার গাড়ি এলেও অনেক এলাকায় তা চাহিদার তুলনায় কম। তাই সংগ্রহের জন্য দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ সারিতে। 

এর আগে ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের দিকেও মিরপুর এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছিলো। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সে সময় ঢাকা ওয়াসার কাছে গাড়িতে পানি সরবরাহের জন্য আবেদন করেছিলেন বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দা। 

সংকটের ব্যাখ্যা হিসেবে ওয়াসা সেসময় জানিয়েছিলো, ঢাকা ওয়াসার দৈনিক পানি উৎপাদনের ক্ষমতা কমবেশি ৩০০ কোটি লিটার। চাহিদাও এমনই। তবে শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় পানির চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। 

পানির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে এলাকাবাসী

সে সময়ও সংকটের একটা কারণ ছিল সাভারের ভাকুর্তা অয়েলফিল্ড প্রকল্পের কয়েকটি নলকূপ ঝড়ে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়।  

ওয়াসা জানিয়েছিল, সেই অয়েলফিল্ডের পানি দিয়ে মিরপুর এলাকায় পানি সরবরাহ করা হতো। তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্য এলাকার গাড়িগুলো মিরপুর এলাকায় স্থানান্তর করে পানি সরবরাহ করা  হয়। 

সাম্প্রতিক পানি সংকট নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা জানিয়েছে, এটি মূলত একাধিক কারিগরি ও মৌসুমি কারণে সৃষ্ট সাময়িক সমস্যা। পাম্প ও ওয়েলফিল্ড প্ল্যান্টের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার জনসংযোগ দপ্তরের উপপ্রধান মো. আব্দুল কাদের জানান, বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকটের অভিযোগ তারা পেয়েছেন। তারা খোঁজ নিচ্ছেন কীভাবে এই সংকট সামাল দেওয়া যায়। 

তিনি বলেন, মিরপুরের ওয়েলফিল্ড ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন হঠাৎ কমে যায়, যার প্রভাব সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। এছাড়া কিছু টিউবওয়েলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন,“আমরা যে ক্যাপাসিটি দিয়ে সারা বছর পানি দিই, সেই সিস্টেমেই এখন কিছু পাম্পে উৎপাদন কমে গেছে। তাই সাময়িকভাবে সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।”

ওয়াসার পক্ষ থেকে জানানো হয়, আপাতত সংকট মোকাবিলায় রেশনিং পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় পানির গাড়ি পাঠিয়ে পানি দেওয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতি কবে ঠিক হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তার ভাষ্য, গরমের সময় এমনিতেই পানির চাহিদা বেড়ে যায়। আর সেসময় পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। দ্বিমুখী এই বাস্তবতায় সংকট বাড়ে পানির। 

আব্দুল কাদের বলেন, “এটা এমন কিছু নয় যা স্থায়ী। এক-দুই দিনের বৃষ্টি হলে পানি সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”

ওয়াসার এই কর্মকর্তা বলেন, পানির এই সংকটের পেছনে জলবায়ু, কারিগরী ও সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু বিষয় কাজ করে।  

তিনি বলেন, নতুন টিউবওয়েল স্থাপন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।  তাই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে তারা রেশনিং করছেন ও গাড়ি দিয়ে পানি সরবরাহ করছেন। 

বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণেও অনেক সময় এই সংকট তৈরি হয় বলে জানান আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, মিরপুরের এই এলাকাগুলোতে হয়তো বিদ্যুৎ সমস্যা নেই। তবে কেরাণীগঞ্জ, সাভারের ভাকুর্তায় বিদ্যুতের সমস্যা হয়। তখন সেখানে পানি দিতে হয় মিরপুর অঞ্চলের এই পাম্প দিয়ে। তখন এদিকে একটা সংকট দেখা দেয়।