আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে, ভয়াবহ এক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার (এপ্রিল,১৯২৬) রক্তের দাগ তখনো মোছে নাই। দুই সম্প্রদায়ের নেতারাই একে অপরকে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। ঠিক সেই থমথমে পরিস্থিতিতেও, ১৯২৬ সালের মে মাসে (বাংলা ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কনফারেন্স’ এর উদ্বোধনী অধিবেশনে নজরুল গাইলেন-
"অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ, কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ! 'হিন্দু না ওরা মুসলিম?' ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!"
তিনি পরিচয়ের প্রশ্নকে মানবতার বিপরীতে দাঁড় করাতে রাজি নন।
অথচ বিগত বছর দশেক ধরে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী অর্থাৎ পঁচিশে বৈশাখ, এগারোই জ্যৈষ্ঠ, বাইশে শ্রাবণ আর বারোই ভাদ্র—এই চারটা দিন যেন সোশ্যাল মিডিয়া ক্যালেন্ডারে নজরুলকে পেঁচিয়ে রবীন্দ্রবিদ্বেষ তথা সাম্প্রদায়িকতা উদযাপনের মচ্ছব। এখানে আসানসোলের “মুসলিম নজরুল ইসলাম” কে বাংলাদেশী হিসেবে দাড় করানো হয় “কলকাতার হিন্দু জমিদার রবীন্দ্রনাথ”এর বিরুদ্ধে। হাজার হাজার পোস্ট, ক্লিপিংস,ভ্লগ। লাখো শেয়ার, ইমোজি, মিলিয়ন ভিউ।
পরিতাপ এই, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল যে দুই মহাপ্রাণ, আজীবন তাদের চিন্তায়, কর্মে ও যাপনে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে মানবতার জয়গান গাইলেন, শেষ দিন পর্যন্ত হিন্দু- মুসলিম মিলনের প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেলেন, তারাই আজ স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্বেষের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নোংরা খেলায়। বিশেষত জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় গত দুই বছরে এই ঘৃণা মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মুঠোফোন আর অন্তর্জালে।
এই সময়ের নিদারুণ বাস্তবতা হলো এই—অধিকাংশ মানুষ পড়েন না; তারা রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল সম্পর্কে স্রেফ শোনেন। আর সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এটিই—আমরা পাঠের বদলে প্রচারণা দিয়ে মত গঠন করি। কখনো ধর্মের কারণে, কখনো শ্রেণির কারণে, কখনো রাজনীতির, কখনোবা ভূ-রাজনীতির কারণে।
কিন্তু নজরুল তো কেবল বিদ্রোহের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক মূর্তিমান ক্লান্তিহীন সংগ্রামী। তার কবিতা, প্রবন্ধ, সম্পাদকীয়, ব্যক্তিজীবন—সবখানেই একই ঘোষণা: মানুষ আগে, ধর্ম পরে।
যখন ব্রিটিশ শাসকের ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতি সফল, ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে বাংলায় যখন একের পর এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে, যখন ধর্মীয় পরিচয় মূল্যবান রাজনৈতিক মুদ্রা, নজরুল তখন একা একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন।
নজরুল লিখলেন“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।” এটি নিছক সাংস্কৃতিক সৌজন্যবাক্য ছিল না; এটি ছিল এক রক্তাক্ত সময়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান। আমাদের বুঝতে হবে, সময়টা উনিশশো বিষ থেকে উনিশশো চল্লিশ। যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জ্বরে কাঁপছে গোটা ভারতবর্ষ।
এই সময়ে লেখা প্রবন্ধে ভাষা আরও কঠোর। ‘হিন্দু-মুসলমান’(সেপ্টেম্বর,১৯২৬), ‘মন্দির ও মসজিদ’ (অক্টোবর,১৯২৬) ‘রুদ্র-মঙ্গল’(জুলাই,১৯২৭) —এসব লেখায় ‘ধর্মমাতাল’ ‘ধর্মের ষাড়’, ‘মূর্খ’, ‘হায়েনা’ ‘পশুর চীৎকার’ ‘শয়তানের চ্যালা’—এই শব্দচয়ন আকস্মিক বা অ্যাক্সিডেন্টাল নয়। তিনি জানতেন, সাম্প্রদায়িকতা কোনও ভদ্রলোকের জ্ঞানতাত্ত্বিক মতপার্থক্য নয়; এটি সংগঠিত সামাজিক বর্বরতা।
নজরুলের এই লড়াই কিন্তু ১৯২৬ এর দাঙ্গার পর হুট করে শুরু হয়নি। ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ করে পল্টন থেকে কলকাতায় ফিরেছেন নজরুল। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সাথে নজরুল ‘সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব নিলেন। সম্পাদকীয় নিবন্ধে ২১ বছর বয়সী নজরুল আহ্বান জানালেন,
"এস ভাই হিন্দু! এস মুসলমান! এস বৌদ্ধ! এস ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গণ্ডি কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। "
সে যুগে যখন রাজনীতি ঘুরত কেবল ‘হিন্দু-মুসলিম’ মেরুকরণে, নজরুল সেখানে ‘ইনক্লুসিভ’। একই সমান্তরালে ডেকেছিলেন ‘বৌদ্ধ’ এবং ‘ক্রিশ্চিয়ান’দেরও। অর্থাৎ তিনি কোনো আংশিক ধর্মীয় সমঝোতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন এক অখণ্ড অসাম্প্রদায়িক মানবিক ভূখণ্ড। নিবন্ধটি স্থান পায় তার প্রথম গদ্যগ্রন্থ ‘যুগবাণী’ তে। এই লেখার তীব্র অসাম্প্রদায়িক ও বিপ্লবী মেজাজ দেখে ব্রিটিশ সরকার ১৯২২ সালেই বইটি নিষিদ্ধ করেছিল। একই নিবন্ধের অন্য অংশে লিখছেন:
“এস ভাই হিন্দু! এস ভাই মুসলমান! তোমার আমার অনেক দুঃখ-ক্লেশ, অনেক ব্যথা-বেদনার ঝড় বহিয়া গিয়াছে; আমাদের এ বাঞ্ছিত মিলন বড় দুঃখের, বড় কষ্টের ভাই! খোদা যখন আমাদের জাগাইয়াছেন, তখন আর যেন আমরা না ঘুমাই... আমাদের এ মহামিলন চিরন্তন হোক।”
১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলের সেই ঐতিহাসিক বিকেলটি ছিল বাংলা সাহিত্যের যুগান্তকারী ঘটনা। মাত্র ৩০ বছর বয়সী এক যুবক কবিকে, যিনি ধর্মে মুসলমান, শ্রেণীতে অনভিজাত, পুরো বাঙালি জাতির পক্ষে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে—মঞ্চে সভাপতিত্ব করছেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আর প্রধান বক্তা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তরুণ নজরুল সেদিন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন সমস্ত সংকীর্ণতার দেয়াল। প্রফুল্লচন্দ্র যখন তাকে ‘বাঙালির কবি’ বলে বরণ করছেন, আর নেতাজি যখন ঘোষণা করছেন "আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব, তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনও তাঁর গান হবে আমাদের শক্তি" ,তখন উত্তরে নজরুল এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছিলেন—
“যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি। ...আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের।”
আর ব্যক্তিজীবন? সেখানেও একই ঘোষণা। একজন মুসলিম হিসেবে প্রমীলা দেবীকে ‘আঞ্জুমানে আহমদীয়া’ নির্দেশিত পথে বিয়ে করলেন, কোনওদিন ধর্মান্তরের দাবি তুললেন না, সন্তানদের নাম রাখলেন ‘কৃষ্ণ মোহাম্মদ’, ‘খালিদ অরিন্দম’। আজকের ফেসবুক যোদ্ধাদের অনেকে সম্ভবত এই খবর জানলে হৃদয়ে ঘা খাবে।
১৯৪১ সালের ৬ই এপ্রিল, কলকাতায় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র রজতজয়ন্তী উৎসবের সমাপনী মঞ্চে নজরুল দেন তার শেষ ভাষণ ‘যদি আর বাঁশী না বাজে’। তার ঠিক এক বছরের মাথায় তিনি চিরতরে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। অর্থাৎ, নিভে যাওয়ার আগে এটিই ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি নজরুলের শেষ উইল বা শেষ ইশতেহার।
"কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনোটাই নয়। আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।"
এই মানুষটিকেই আজ এক শ্রেণীর কবি ও বুদ্ধিজীবী(!) স্রেফ তার নামের পরিচয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাস্কট বানাতে চান। কেননা, এই অপচেষ্টার মূলে সমূহ রাজনৈতিক ফায়দা আছে। তাই তার গুজব কল কখনো বন্ধ হয় না। এই কারখানার উৎপাদিত পণ্যগুলোর তালিকা বৈচিত্র্যময়। যেমন—মুসলিমবিদ্বেষী রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কাব্যপ্রতিভার ভয়ে সম্পাদক-প্রকাশক-প্রেস মালিকদের ব্যবহার করে নজরুলকে দমিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করেছিলেন। আরও নাটকীয় সংস্করণ হলো, ঈর্ষার বিষে জর্জ্জরিত রবীন্দ্রনাথ ধুতুরার বিষ খাইয়ে নজরুলকে পাগল বানিয়েছেন। তাও আবার নিজের নাতনীকে নজরুলের সাথে বিয়ে দিয়ে, সেই নাতনীর মাধ্যমে। এমনকি নজরুলের প্রাপ্য নোবেল পুরস্কার হাতিয়ে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এখানে ডাক বিভাগের ষড়যন্ত্রও আছে, কারণ ষড়যন্ত্রতত্ত্বে ডাকপিয়ন না থাকলে বোধহয় পূর্ণতা আসে না।
সাধারণত মিথ্যারও একটা ন্যূনতম শৃঙ্খলা থাকে। এখানে সেটুকুও নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, হাস্যকর হলেও এগুলো নিরীহ গুজব নয়। বরং সামাজিক মাধ্যমে algorithmic repetition -এর ফলে absurdity-ও ‘alternative truth’ হয়ে ওঠে। যখন মানুষ পড়ে না, তলিয়ে দেখে না,কেবল সম্মতি উৎপাদনের যন্ত্র হয়ে যায়; যখন ইতিহাসের জায়গা নেয় মীম; যখন ক্লিপ-কালচার পূর্ণাঙ্গ পাঠকে প্রতিস্থাপন করে—তখন মিথ্যারও ভিসা-পাসপোর্ট লাগে না। সাথে ভিউ ব্যবসার অর্থনৈতিক উপযোগের বাড়তি প্রণোদনা।
এবার দলিলে ফেরা যাক। ইতিহাসের অনিবার্য অভ্যাস হলো—এটি গালগল্পের চেয়ে প্রামান্য নথিকে একটু বেশি গুরুত্ব দেয়।
যেমন ধরেন, প্রমীলা দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথ বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের রক্তের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। বাবা বসন্তকুমার ছিলেন ত্রিপুরা (কুমিল্লা) আদালতের একজন সাধারণ কর্মচারী। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী গিরিবালা মেয়ে আশালতাকে (যাকে নজরুল পরে ভালোবেসে ‘প্রমীলা’ নাম দেন) নিয়ে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ইন্দ্রকুমার ছিলেন বসন্তকুমারের চাচাতো ভাই। এই ইন্দ্রকুমারের ছেলে বীরেন্দ্রকুমারের সাথে বন্ধুতার সুবাদে নজরুলের যাতায়াত এবং সেখানেই প্রমীলার সাথে তার পরিচয়-প্রণয়-পরিণয়। গুজব মহাজনেরা মূলত বিভ্রান্তি তৈরি করে প্রমীলার এই দূর সম্পর্কের চাচী বিরজাসুন্দরী দেবীর বাপের বাড়ির ‘সিংহ ঠাকুর’ পদবীটি নিয়ে। নজরুল বিরজা দেবীকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন, ‘মা’ বলে ডাকতেন।‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থটি এই বিরজাসুন্দরী দেবীকেই উৎসর্গ করেছিলেন। তার বাপের বাড়ি ছিল কলকাতার আরেক বনেদী ‘সিংহ ঠাকুর’ পরিবার, যার সাথে জোড়াসাঁকোর ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’ ঠাকুর বা ‘কুশারী ঠাকুর’ পরিবারের কোনো সংযোগ ছিল না। আর কনের পরিবার বিশেষত কাকা ইন্দ্রকুমার ও মুসলিম সমাজ যখন এই অসবর্ণ বিয়ের তীব্র বিরোধিতা করছিল, তখন নজরুলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাইপো, প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২৪ সালের ২৫শে এপ্রিল কলকাতার কানাইলাল ধর লেনে নজরুল-প্রমীলার এই বিয়ের জন্য পর্দার আড়াল থেকে বাড়ি ভাড়া এবং যাবতীয় আইনি সুব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথ।

এবার আসা যাক রবীন্দ্রনাথের ঈর্ষা ও বিরোধিতা প্রসঙ্গে, ১৯২২ সালে, যখন তরুণ নজরুল ব্রিটিশবিরোধী অগ্নিমুখর পত্রিকা ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করছেন, তখন সেই পত্রিকার জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ আশীর্বাণী পাঠালেন—“আয় চলে আয় রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু…”। একজন প্রতিষ্ঠিত বিশ্বকবি, যিনি চাইলে নবীন কবিকে উপেক্ষাই করতে পারতেন, তিনি উল্টো তার বিদ্রোহী কণ্ঠকে স্বাগত জানালেন। পাঠক চিন্তা করুন, নজরুলের বয়স তখন তেইশ আর রবীন্দ্রনাথের একষট্টি। আরও নয় বছর আগে ১৯১৩ সালে নোবেল লরিয়েট। ওদিকে ১৪ বছরের কিশোর নজরুল তখন আসানসোলে রুটির দোকানে জীবনযুদ্ধে জেরবার। তখনও পর্যন্ত লেটো দলের জন্য কয়েকটি লোকসঙ্গীত ও সঙপালা ছাড়া তেমন কিছু লিখে উঠতে পারেন নি। অথচ রবীন্দ্রনাথ হলেন নজরুলের নোবেল চোর!!!
এর পরের বছর দৃশ্যটি আরও দারুন। ১৯২৩; আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজবন্দি নজরুল অনশনে। রাজবন্দিদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার এই আমরণ অনশন বাংলা সাহিত্যজগতকে নাড়া দিয়েছিল। শান্তিনিকেতনে বসে রবীন্দ্রনাথ উদ্বিগ্ন হয়ে টেলিগ্রাম পাঠালেন—“Give up hunger strike, our literature claims you.” এই ছোট্ট বাক্যে কেবল উদ্বেগ নয়, ছিল প্রতিভার যোগ্য স্বীকৃতি। তিনি তরুণ কবিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বাংলা সাহিত্যের প্রয়োজনীয় শক্তি হিসেবে দেখছিলেন।
ওদিকে কাব্যের সাবেকপন্থীরা নজরুলের রচনার চড়া সুর নিয়ে আপত্তি তুললে জোড়াসাঁকোয় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সামনে অমোঘ রায় দেন-
"কাব্যে অসির ঝনঝনানি থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে! সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনানিতে যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন তাকে কাব্যে প্রকাশ করতে হবে বৈকি! আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ঐ সুর বাজত।"
সেখানেই শেষ নয়। নিজের সদ্যরচিত গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ তিনি উৎসর্গ করলেন নজরুলকে। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল— “শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু”। পরিবারের বাইরের এক তরুণ সাহিত্যিকের প্রতি এমন প্রকাশ্য স্নেহ ও স্বীকৃতি ছিল ব্যতিক্রমী। বার্তাবাহক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় যখন জেলের ভেতরে নজরুলের হাতে সেই বই তুলে দেন, নজরুল আনন্দে সেই বই বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘চলচ্চিত্র’ (প্রথম খন্ড,১৯৫২) গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের বয়ানে জানাচ্ছেন,"তাকে বোলো... কবিতা লেখা যেন কোনো কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই।"
রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্যের ছিল না। তরুণ বয়স থেকেই নজরুল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সঙ্গীতের গভীর পাঠক ছিলেন। পল্টন থেকে ফেরার পর থেকে, তার ট্রাঙ্কে থাকত রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি, অসংখ্য গান তার মুখস্থ ছিল। শান্তিনিকেতনে প্রথম সাক্ষাতে তিনি কবিগুরুকে গান শুনিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত সম্বোধনে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার ‘গুরুদেব’।
রবীন্দ্রনাথও তাকে স্নেহ করতেন কেবল দূর থেকে নয়, নজরুলের কবিতার শক্তি তাঁকে মুগ্ধ করত, আবার অগ্রজের মতো খুনসুটির ভঙ্গিতে পরামর্শও দিতেন—যেন ঝড়ের মধ্যে সুরটাও বেঁচে থাকে। বয়সের পার্থক্যে পিতা-পুত্র সম্পর্ক। যার ভিত্তি হচ্ছে স্নেহ-প্রশয়-শ্রদ্ধা।
পরবর্ত্তীতে আরেকটি ঘটনাও খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় যখন সংগীত পরিচালক হিসেবে নজরুলের নাম এলো, তখন বিশ্বভারতীর রক্ষণশীল মহলের আপত্তি উঠেছিল তার রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনার ধরন নিয়ে। সেখানেও নজরুলের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। দিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা।
আর নজরুল? তিনি কি রবীন্দ্রনাথকে গোপন প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন?
নথি প্রমাণ কিন্তু উল্টো কথা বলে।
যখনই কোথাও রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করা হয়েছে, নজরুল বিরক্ত হয়েছেন। তার লেখালেখি, বক্তৃতা, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র—সবখানেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা স্পষ্ট। তিনি তাকে শুধু বড় কবি নয়, এক সভ্যতাগত উচ্চতার মানুষ হিসেবে দেখতেন।
১৯৪১ সালের বাইশে শ্রাবণ যখন রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন, শোকাতুর নজরুল খবর পাওয়া মাত্র ছুটে গোলেন অল ইন্ডিয়া (আকাশবানী, কলকাতা) রেডিওতে । পরলেন স্বরচিত শোক-কবিতা ‘রবি-হারা’
“দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে,অস্ত-পথের কোলে, /শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে /উদাস গগন-তলে,/ বিশ্বের রবি, ভারতের কবি, শ্যাম বাঙলার হৃদয়ের ছবি /তুমি চলে যাবে বলে । …স্বপ্নেও আর পাইব কি মোরা? তাই আজি অসহায় / বাঙলার নর-নারী, কবি-গুরু, সান্ত্বনা নাহি পায়।/ আমরা তোমারে ভেবেছি শ্রীভগবানের আশীর্বাদ,/ সে-আশিস যে লয় নাহি করে মৃত্যুর অবসাদ।/ বিদায়ের বেলা চুম্বন লয়ে যাও তব শ্রীচরণে,/ যে লোকেই থাক হতভাগ্য এ জাতিরে রাখিও মনে।”
পরে সেটি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকায় ,১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সেবছরেই সেপ্টেম্বর মাসেই বিখ্যাত হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) কোম্পানি নজরুলের নিজের কণ্ঠে এই কবিতাটির আবৃত্তি রেকর্ড করে প্রকাশ করে (রেকর্ড নম্বর: এন-২৭১৮৮)।
একই সময়ে ‘সালাম অস্ত-রবি’— এই শোকগাথায় নজরুল ব্যবহার করছেন ইসলামিক রূপক ও সুফি পরিভাষা। রবীন্দ্রনাথকে তিনি ধর্মীয় সীমানার ঊর্ধ্বে এক মানবিক ও আধ্যাত্মিক উচ্চতায় খোদার রহমত হিসেবে বসালেন,
“ফুলের, পাখির, চাঁদ-সুরুযের নাহি ক’ যেমন জাতি, / সকলে তাদেরে ভালোবাসে, ছিল তেমনি তোমার খ্যাতি। রস-লোক হতে রস দেয় যারা বৃষ্টিধারার প্রায়,/ তাদের নাহি ক’ ধর্ম ও জাতি, সকলের ঘরে যায়।”
"তুমি যেন সেই খোদার রহম, এসেছিলে রুপ ধরে, / আর্শের ছায়া দেখাইয়া ছিলে রুপের আর্শি ভরে। / কালাম ঝরেছে তোমার কলমে, সালাম লইয়া যাও..."
নজরুল রবীন্দ্রনাথকে কোনো সংকীর্ণ ভৌগোলিক কবি ভাবেননি। তিনি রবীন্দ্রনাথকে এক সারিতে প্রাচ্যের সব মহান সাধকদের সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছেন,
“ব্যাস, বাল্মীকি, কালিদাস, খৈয়াম, হাফিজ ও রুমী / আরবের ইমরুল-কায়েস্ যে ছিলে এক সাথে তুমি! / সকল দেশের সকল কালের সকল কবিরে ভাঙি’, / তাঁহাদের রূপে রসে রাঙাইয়া, বুঝি কত যুগ জাগি’/ তোমারে রচিল রসিক বিধাতা, অপরূপ সে বিলাস,/ তব রূপে গুণে ছিল যে পরম সুন্দরের আভাস। ”
নজরুলের এই ‘সালাম অস্ত-রবি’ শোকগাথাটি প্রকাশিত হয়, ভাদ্র ১৩৪৮ সংখ্যায় মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায়।
আজ যারা রবীন্দ্রনাথকে ধর্মের খাঁচায় ভরে বিচার করতে চান, তারা সম্ভবত এই অংশটি পড়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়বেন। কারণ তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘মুসলিম নজরুল’ বারবার এসে দাঁড়ান এক অসাম্প্রদায়িক, উদার, বৌদ্ধিক নজরুল হিসেবে—যিনি রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণের লক্ষ্য নয়, উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেছেন। সাহিত্যমান বিচারে শোক-কবিতা দুটি হয়তো অসামান্য কিছু নয়, কিন্তু নজরুলের আবেগ বুঝতে বা বট নেটিজেনদের কুৎসার বিপরীতে এর চেয়ে মোক্ষম জবাব আর কিছু হয়না।
রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে নজরুলকে দাঁড় করানোর এই বুদ্ধিবৃত্তিক অপচেষ্টা অবশ্য নতুন কিছু নয়। নজরুল যখন ‘বিদ্রোহী’র আকাশচুম্বী কাটতি ও সুরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন তার এই আধুনিকতা মেনে নিতে পারেনি ‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাস এবং কবি মোহিতলাল মজুমদারের মতো একদল আভিজাত্যবাদী সাহিত্যিক। শুরুতে মেন্টর থাকলেও নজরুল তারকা হয়ে ওঠায় ঈর্ষাকাতর মোহিতলাল দাবি করেন—নজরুল তার ‘আমি’ গদ্যের ভাব চুরি করেছেন; পরে তিনি সজনীকান্তের দলে ভিড়ে ‘দ্রোণ-গুরু’ নামের ব্যঙ্গ-কবিতা লেখেন। এই গোষ্ঠী প্রমীলা দেবীকে বিয়ের পর নজরুলের চরিত্র নিয়ে নিয়মিত কুৎসিত কার্টুন ছাপত এবং শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে কানভাঙানি দিত যে, নজরুল সাহিত্যে ‘প্রলেতারিয়েত’ বা ছোটলোকদের ব্রাত্য ভাষা ঢোকাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বকবি এই নোংরা খেলায় পা না দিয়ে সেই সুশীলদের মুখে স্পষ্ট বলেছিলেন-
"নজরুলের কবিতায় একটা প্রচণ্ড প্রাণশক্তি আছে, যা তোমাদের এই মরা সাহিত্যে নেই। ওর চুলে অত ঝাঁকুনি থাকতে পারে, কিন্তু ও খাঁটি কবি। তোমরা ওর পেছনে না লেগে নিজেদের লেখার দিকে নজর দাও।"
শুধু এই রক্ষণশীলরাই নয়, একদল তরুণ আধুনিক কবি ও লেখক (যাদের মূলত ‘কল্লোল’ এবং প্রগতিশীল ঘরানার কিছু উগ্র অংশ বলা যায়) রবীন্দ্র-বিরোধী একটি হাওয়া তোলার চেষ্টা করছিলেন। তাদের মূল বক্তব্য ছিল, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-যুগ শেষ এবং এখন রবীন্দ্রনাথকে ভেঙে নতুন ধারা তৈরি করতে হবে। তারা নজরুলকে এই রবীন্দ্র-বিরোধী শিবিরের নেতা বা প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। নজরুল এই ‘কল্লোল’ বা প্রগতিশীল আন্দোলনের একজন হওয়া সত্ত্বেও, কোনো রকম সস্তা দলবাজিকে প্রশ্রয় না দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। প্রভাবশালী সাহিত্যপত্রিকা ‘উত্তরা’র ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায় ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে সরাসরি লিখলেন-
"বাংলা ভাষায় যে-ই সাহিত্যচর্চা করবে, তাকে রবীন্দ্রনাথের ঋণ স্বীকার করতেই হবে। রবীন্দ্রনাথকে যে মানে না, সে বাঙালিই নয়, আর সে কবিও নয়।"
কী বুঝলেন? রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল—এটি কি আদৌ বাস্তব কোনো দ্বন্দ্ব? নাকি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ম্যানুফ্যাকচারড কনফ্লিক্ট?
প্রশ্নটা তাই রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল নয়। প্রশ্নটা—কে কাদের বিরুদ্ধে তাদের ব্যবহার করছে? সত্যি বলতে, রবীন্দ্রবিদ্বেষের এই সাম্প্রদায়িক প্রজেক্ট আসলে রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করার চেয়েও বড় কিছু। এই বঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে মুখোমুখি দাঁড় করানো মূলত বাঙালির অসাম্প্রদায়িক বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারকে ভাঙার প্রকল্প। সাতচল্লিশ থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে এই প্রকল্প চালু হয়। রবীন্দ্রনাথ হয়ে যান ‘ইসলাম বিদ্বেষী জমিদার ও হিন্দু কবি' আর তার বিপরীতে ঠেলে দেয়া হয় তৎকালে জীবন্মৃত নজরুলকে। সুস্থ থাকলে যিনি নিজেই ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করতেন এই ভেদবুদ্ধি। রবীন্দ্রনাথকে “হিন্দু” আর নজরুলকে “মুসলিম” বানিয়ে আলাদা আলাদা রাজনৈতিক খোপে পুরে দিলে উভয়ের চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই মুছে ফেলা যায়—তাদের মানবতাবাদ, তাদের উদারতা, তাদের মিলনের রাজনীতি।
এবং সেখানেই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধিক অসততা। আর সেই কাজে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে নজরুলকে—যে নজরুল নিজের জীবন দিয়ে এই বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়েছেন। নজরুলকে ‘কোট’ করা, হাম্বা রবে নজরুলের বিদ্রোহী পাঠ করা সহজ; নজরুলকে অনুসরণ করা কঠিন।
কারণ তিনি ‘বিদ্রোহী’ ছিলেন শুধু সাহিত্যিক অর্থে নয়; সামাজিক অর্থেও। ধর্মের নামে উন্মাদনা, অশিক্ষা, সংকীর্ণতা, আইডেন্টিটি শভিনিজম- এসবের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ ছিল আজীবনের।
সেই যুদ্ধ কি শেষ হয়েছে?
চারপাশে তাকালেই উত্তর পাওয়া যায়।
আজও মানুষকে ধর্ম দিয়ে ভাগ করা হয়। আজ প্রোপাগান্ডা ইতিহাসকে প্রতিস্থাপন করে। আজ সোশ্যাল মিডিয়া মব রিডিংয়ের জায়গা নেয়। আজও কবিদেরকে দলীয় কর্মীতে নামিয়ে আনার চেষ্টা হয়। তাই সত্যিই, নজরুলের যে লড়াই, আজো শেষ হয় নাই।
প্রশ্ন কেবল একটাই: আমরা কি সেই লড়াইয়ের উত্তরাধিকার, নাকি নোংরামির ফুট সোলজার?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কিউরেটর; মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া



