জন্মতিথিতে বিদ্রোহী কবির সৃজন ভূগোল

তার গান শুনে আমরা মুগ্ধ হই, কবিতা পড়ে উদ্বেলিত হই, এবং আজও ‘লাথি মার ভাঙরে তালা, যত সব বন্দিশালা!’— এই পঙ্‌ক্তি উচ্চারণ করলে রক্ত গরম হয়ে ওঠে।

আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

কাজী নজরুল ইসলামকে নিছক ‘বিদ্রোহী কবি’ আখ্যায় বন্দি করলে তার প্রকৃত বিস্তার বোঝা যায় না। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, সম্পাদক, সৈনিক, রাজনৈতিক কর্মী—সর্বোপরি এই উপমহাদেশের রসসুষমায় সম্পূর্ণ নিমজ্জিত এক অস্থির পথিক। নজরুল-সাহিত্যের যে মোহাবেশ আজও পাঠককে বুঁদ করে রাখে, তার শিকড় লুকিয়ে আছে তার অল্প সময়ের জীবনে চষে বেড়ানো বিস্তীর্ণ ভূগোল এবং সেই ভূগোল থেকে শুষে নেওয়া গভীর লোকায়ত অভিজ্ঞতার মধ্যে।

জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪এ মে, পশ্চিম বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে, চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতের মধ্যে। এরপর তাকে ঘুরতে হয়েছে রানীগঞ্জ, মাথরুন, প্রসাদপুর, আবার আসানসোল—হোটেলের বয়, রুটির দোকানের কাজ, খানসামাগিরি। ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলের অবৈতনিক ছাত্র হয়ে আবার ফিরে আসা চুরুলিয়ায়। এই ছোটবেলাতেই তার পায়ের তলায় জমা হতে থাকে বাংলার মাটি, নদী, গঞ্জ, রেললাইন, বাউল-ফকির, মাজার, লেটোর দল— যা তার কাব্য-গানে প্রাণের মেলা বসিয়েছে। 

পড়ুয়া বয়সে সপ্তম শ্রেণি পেরোনোর পরই ময়মনসিংহ ছেড়ে ফিরে আসেন চুরুলিয়ায়; হয়তো ভেতরে টানছিল স্বদেশ, আবার ছুটবেন বলে। ১৯১৭ সালে প্রিটেস্ট পরীক্ষার আগেই যে দুরন্ত তরুণ সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে লাহোরের পথে রওনা দিলেন, তিনি যেন জানতেন, সৃষ্টির আগুন জ্বালাতে গেলে নিজের গ্রাম-চেনা মুখ ফেলে পেছনে তার থেকে অনেক দূরে ছুটতে হয়।

লাহোর-করাচির সেনানিবাস সেই আগুনে যেন ঘি ঢাললো। গঞ্জা বা আবিসিনিয়া লাইনে কেটেছে সৈনিকজীবন, অর্জন করলেন ব্যাটালিয়ান কোয়ার্টার মাস্টারের পদ, কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা সেখানেই শুরু হলো তার সাহিত্যচর্চার বিধিবদ্ধ পর্ব। করাচিতে দাঁড়িয়েই তিনি কল্পনায় দেখতে পেলেন মরুচারিণী ইরানি বালিকাকে, কাবুল-ইরান-তুরানের ইতিহাস-মর্যাদার সঙ্গে ঠাঁই পেলো তার লেখায়। অথচ তিনি কোনোদিন পা রাখেননি পারস্যে বা তুরানে। এই যে নিজের ভৌগোলিক সীমাকে অনায়াসে অতিক্রম করার ক্ষমতা, এ এক বিরল প্রতিভার লক্ষণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই কল্পনার পাশাপাশি তার লেখার মূল পটভূমি রইলো একান্তভাবেই স্থানীয়—ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ— বড় অর্থে এই উপমহাদেশেরই মাটি আর মানুষের জীবন। 

তিনি চষে বেড়িয়েছেন চুরুলিয়া থেকে করাচি, কলকাতা থেকে কুমিল্লা, কৃষ্ণনগর থেকে ঢাকা— অখণ্ড ভারতের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা আর্ত-পীড়িত-মেহনতির কাছে পৌঁছে গেছেন সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে, তাদের ভাষা শিখেছেন, সুর কুড়িয়েছেন, মালা গেঁথেছেন— ব্রজগোপী খেলে হরি। 

পশ্চিম থেকে তার সমকালীন জীবনানন্দ দাশ বা অগ্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের মতো কখনো নজরুল কুম্ভদান করেননি; বরং এই অঞ্চলের রসসুধা তিনি আপন পাত্রে ভরেছেন। সেই কারণেই তার গান আর কবিতা আজও বাংলার কৃষক-শ্রমিক, নাগরিক-গ্রামীণ, হিন্দু-মুসলমান সবার গলায় গলায় মেশে, প্রাণে বসে পড়ে, কানে সুষমা ঢালে।

সেনাবাহিনী থেকে ফিরে ১৯২০ সালে কলকাতায় পদার্পণ করলেন যিনি, অচিরেই হয়ে উঠলেন দুর্বার অভিযাত্রী। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট, টার্নার স্ট্রিট, তালতলা লেন— এই ঠিকানাগুলো যেন বিপ্লবী সাহিত্যের তীর্থস্থান হয়ে উঠলো। একই বছরের মধ্যে কলকাতা, বরিশাল, দেওঘর ঘুরে আবার কলকাতা। পরের বছর কুমিল্লা, দৌলতপুর, সেখান থেকে প্রণয়, বিবাহ, বিবাহ-রাত্রেই দৌলতপুর ত্যাগের নাটকীয়তা, কুমিল্লা হয়ে চাঁদপুর, আবার কলকাতা, তারপর শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আবার কুমিল্লায় অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান—এই যে একটানা ছুটে চলা, এরই মাঝে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তালতলা লেনের বাড়িতে জন্ম নিলো তার সিগনেচার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই স্থান-কাল-পাত্রের বুনিয়াদেই নজরুল হয়ে উঠলেন উপমহাদেশের শোষিত-নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

সীতাকুণ্ড ঝর্ণায় নজরুল

১৯২২-২৩ সালের গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম, অনশন— সবকিছুর ভেতর দিয়েও তার কলম ছিল সক্রিয়। জেল থেকে বেরিয়ে প্রমীলার সঙ্গে সংসার, হুগলিতে বসবাস, পুত্র আজাদের জন্ম ও অকালমৃত্যু— ব্যক্তিগত জীবনের এসব দহনও ফুটে উঠেছে লেখায়। অথচ একই সময়ে তিনি ফরিদপুর, বাঁকুড়া, কৃষ্ণনগর, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, খুলনা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন, কৃষক-শ্রমিক-মৎস্যজীবীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কৃষ্ণনগরে বসবাস করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ছুটে যাচ্ছেন। রংপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, বনগাঁ, মধুপুর— বাংলার এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে তিনি ‘হৈ হৈ’ করে উপস্থিত হননি। এই যে ছুটে বেড়ানো ক্ষ্যাপা নজরুল, সৃজনমুখর নজরুল— তার রচনাপাঠের চর্চা বাড়িয়ে, তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই তো আমাদের ভবিষ্যতের কাণ্ডারি ‘আয় নবীন, শক্তি আয়’দের উদ্ধার করতে হবে। কারণ, ‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল’ —আজও আমাদের সমাজ সেই দুরবস্থায়; অন্যায়-অনাচার-বঞ্চনা আর লাঞ্ছিতের বুকে সুবিচারের আনন্দ ফেরাতে হতে হবে জাগ্রত।

নজরুলের গুরুত্ব কিংবা প্রাসঙ্গিকতা তাই সাহিত্যপাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় জীবনের প্রতিটি সংকটে— তার গানে আমরা সুর খুঁজে পাই, কবিতায় শক্তি পাই, আর তার জীবন থেকে শিখি— একজন মানুষ কতটা বিস্তীর্ণ হৃদয় নিয়ে সমগ্র জাতির কথা বলতে পারেন। ১৯৪২ সালের পর মধুপুরে বায়ু পরিবর্তন করতে গিয়ে যখন অসুস্থতার চূড়ান্ত সূত্রপাত, তখনো তিনি থেমে যাননি; কলকাতায় ফিরে এসেছেন, ১৯৫২ সালে রাঁচি মানসিক হাসপাতালে চার মাস, তারপর লন্ডন-ভিয়েনা, সব ব্যর্থ— শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের ধানমন্ডিতে কবিভবনে তার শেষ স্থিতি। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, কিন্তু তার সৃষ্টি রয়ে গেলো চিরজাগরূক।

আজও একজন পাঠক যখন নজরুল-রচনাবলি খোলেন, তিনি খুঁজে পান চুরুলিয়ার শৈশব, রানীগঞ্জের স্কুল, লাহোরের সেনানিবাস, তালতলা লেনের উত্তাল রাত, কুমিল্লার প্রেম, কৃষ্ণনগরের সাহিত্যসাধনা—সব মিলিয়ে এক অনন্য সাহিত্য-ভূগোল, যা বাংলা ভাষাভাষী মাত্রকেই নিজের ঘর বলে মনে করায়। সে কারণেই তার গান শুনে আমরা মুগ্ধ হই, কবিতা পড়ে উদ্বেলিত হই, এবং আজও ‘লাথি মার ভাঙরে তালা, যত সব বন্দিশালা!’— এই পঙ্‌ক্তি উচ্চারণ করলে রক্ত গরম হয়ে ওঠে।

অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে জাতি এমন একজন কবিকে পেয়েছে, তারা তার উত্তরাধিকার রক্ষায় কতটা উদাসীন! নজরুল ইনস্টিটিউট বা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে বটে, কিন্তু কাজের বেলায় রয়েছি নিষ্ক্রিয়— ঠনঠনাঠন। নজরুল-গানের সুর-সংকলনের মতো মৌলিক একটি কাজ নজরুল ইনস্টিটিউটে আটকে আছে দুই দশকের বেশি, শিল্পীদের অন্তঃকোন্দল আর রাষ্ট্রীয় অবহেলায়। 

নজরুল রচনাবলিরও কোনো সুলভ বৈদ্যুতিন সংস্করণ দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তৈরি হয়নি, যেখানে বিশ্বভারতী পাশাপাশি রবীন্দ্র-নজরুল উভয়ের রচনাবলি ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। এরচেয়ে দুঃখজনক বিস্মৃতি আর কী হতে পারে?

নজরুল আমাদের জাতীয় সাহিত্যের প্রাণপুরুষ। তার জীবন আর সাহিত্যের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কীভাবে এই বাংলার ধুলো-কাদা-জল-হাওয়া একজন স্রষ্টাকে এমন সর্বজনীন করে তুলতে পারে। পাঠক আজও বুঁদ হয়ে থাকে তার গীতে ও রচনায়, কারণ সেখানে আছে একই সঙ্গে দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিকতার টানাপড়েন আর মানবতার জয়গান। আমাদের কাজ হলো সেই সুরকে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, মর্মে ধারণ করে গেয়ে ওঠা: ‘লাথি মার ভাঙরে তালা’? 

নজরুল-সাহিত্যের গুরুত্ব এখানেই— তা কেবল অতীতের গৌরবগাথা নয়, ভবিষ্যতের পথ দেখানো এক চিরন্তন শক্তি, মহাকালের ধ্রুবতারা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক