একপেশে ফাইনাল শেষে অপ্রতিরোধ‍্য স্পেনের হাতে বিশ্বকাপ

স্পেনের সাফল্যের নায়ক ফেরান তোরেস। পুরো টুর্নামেন্টে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন না তিনি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনিই হয়ে উঠলেন পার্থক্য গড়ে দেওয়া ফুটবলার। অতিরিক্ত সময়ে তার নিখুঁত ফিনিশিং বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিল স্পেনকে।

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

এ কোন আর্জেন্টিনা, এ কোন অচেনা লিওনেল মেসি।

বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর দুই পরাশক্তির সমানতালে লড়াই। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই প্রত্যাশার খুব কমই দেখা মিললো। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। আর গতবারেরর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যেন পুরো সময়ে শুধু প্রতিরোধ গড়েই কাটিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় স্পেন। এর মধ্য দিয়েই দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল স্প্যানিশরা। অন্যদিকে লিওনেল মেসির বিদায়ী বিশ্বকাপ শেষ হলো হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যানটি ছিল আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের অসহায় চিত্র। পুরো ম্যাচে স্পেন যেখানে ২০টি শট নিয়েছে, সেখানে আর্জেন্টিনা নিতে পেরেছে মাত্র একটি শট। সেটিও লক্ষ্যে ছিল না। প্রথম ১১৭ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা কোনো শটই নিতে পারেনি। ম্যাচের শেষ দিকে হতাশা থেকে নেওয়া মেসির একটি প্রচেষ্টা স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনোর গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে। সেটিই ছিল আর্জেন্টিনার একমাত্র শট।

ম্যাচের পুরো সময় বলের দখল, আক্রমণ তৈরি এবং সুযোগ সৃষ্টি সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল স্পেন। একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে ব্যস্ত ছিলেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। তিনি একাই ১১টি সেভ করে নতুন বিশ্বকাপ ফাইনালের রেকর্ড গড়েন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের জোরালো শটে তিনিও পরাস্ত হন।

এই গোলটি আসার আগেই বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ দিকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। ফলে অতিরিক্ত সময়ের পুরোটা ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে।

তবে বাস্তবতা হলো, লাল কার্ডের আগেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি স্পেনের হাতেই। অনেকের কাছেই মনে হয়েছে, আর্জেন্টিনা যেন শুরু থেকেই একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে খেলছিল।

বিশ্বকাপজুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি করেছিলেন আটটি গোল, সঙ্গে ছিল চারটি অ্যাসিস্ট। টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার পথেও ছিল তার অসাধারণ অবদান। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে রাখে স্পেনের রক্ষণভাগ। বল পেলেই দ্রুত চাপ, কড়া মার্কিং এবং প্রয়োজন হলে ফাউল করে মেসিকে খেলার বাইরে রাখার কৌশল নেয় স্পেন। ফলে পুরো ১২০ মিনিটে তিনি কার্যত কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেননি।

অনেকের কাছেই এই ম্যাচটি মনে করিয়ে দিয়েছে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালকে। সেবারও জার্মানির বিপক্ষে মেসি নিজের ছাপ রাখতে পারেননি এবং অতিরিক্ত সময়ে ১-০ ব্যবধানে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ২০২৬ সালের ফাইনালেও একই ব্যবধানে, একই রকম অসহায় অবস্থায় শেষ হলো তার বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়।

অন্যদিকে স্পেনের সাফল্যের নায়ক ফেরান তোরেস। পুরো টুর্নামেন্টে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন না তিনি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনিই হয়ে উঠলেন পার্থক্য গড়ে দেওয়া ফুটবলার। অতিরিক্ত সময়ে তার নিখুঁত ফিনিশিং বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিল স্পেনকে।

১০৩ ম্যাচের দীর্ঘ আয়োজন শেষে যে ফাইনালকে ঘিরে ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনা, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো একপেশে লড়াইয়ে। আর্জেন্টিনা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পায়নি, আর স্পেন দেখিয়েছে কেন তারা এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল।

মেসির শেষ বিশ্বকাপের গল্প তাই শেষ হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের হাসি দিয়ে নয়, বরং স্পেনের আধিপত্যের সামনে অসহায় এক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। ২০২২ সালে স্বপ্ন পূরণ করা কিংবদন্তির ঝুলিতে বিশ্বকাপ ট্রফি একটি থাকলই, কিন্তু বিদায়ের মঞ্চে শেষ হাসিটা হাসল স্পেন।