পুরো বিশ্বকাপে ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট। ৩৯ বছর বয়সেও একের পর এক ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। তাই টুর্নামেন্ট শেষে গোল্ডেন বলের নাম ঘোষণা হওয়ার পর অনেকেরই প্রশ্ন ছিলো, মেসি নন কেন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে এমন এক ফুটবলারের খেলায়, যিনি গোল করেন কম, আলোচনায়ও থাকেন কম, কিন্তু পুরো দলের ছন্দটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি স্পেনের মিডফিল্ডার রদ্রি।
স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে রদ্রি শুধু মাঝমাঠ সামলাননি, পুরো টুর্নামেন্টে দলের খেলার গতি, বলের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনাল এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে তার প্রভাব ছিলো অসাধারণ। তাই শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বল উঠেছে তার হাতেই।
মাত্র কয়েক মাস আগেও এমন গল্প কল্পনা করা কঠিন ছিলো।
১৫ মাসের দুঃস্বপ্ন থেকে বিশ্বসেরা
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাঁটুর এসিএল চোটে পড়েছিলেন রদ্রি। প্রায় ১৫ মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। অনেকেই মনে করেছিলেন, আগের সেই রদ্রি আর হয়তো ফিরবেন না।
কিন্তু ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা তখনই বলেছিলেন, “বিশ্বকাপে দেখা যাবে সেরা রদ্রিকে।”
শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হলো।
জানুয়ারিতে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নিয়মিত খেলা শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে ছন্দ ফিরে পান। আর বিশ্বকাপে এসে যেন নিজের সেরা সংস্করণটাই হাজির করেন।
যেটা চোখে পড়ে না, সেটাই রদ্রির সবচেয়ে বড় শক্তি
রদ্রির খেলা বুঝতে শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখলে হবে না।
তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি বল নিজের কাছে রেখে পুরো দলের গতি ঠিক করেন। কখন আক্রমণ হবে, কখন ধীর গতিতে খেলতে হবে, কখন প্রতিপক্ষের চাপ ভাঙতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় তিনিই নেন।
প্রতিপক্ষ বল হারানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রদ্রি চাপ সৃষ্টি করে আবার বল ফিরিয়ে আনেন। এই কাজটাই স্পেনকে পুরো টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
ফাইনালে মেসিকে কেন দেখা যায়নি?
আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি।
এটি শুধু স্পেনের ডিফেন্সের কৃতিত্ব নয়। এর বড় কারণ ছিলো রদ্রির অবস্থান নির্বাচন, বল দখল ধরে রাখা এবং আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই সেটি থামিয়ে দেওয়া।
মাঝমাঠে তিনি এমনভাবে জায়গা নিয়েছেন, যাতে মেসির কাছে নিয়মিত বল পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
সংখ্যাও রদ্রির পক্ষেই কথা বলে
পুরো বিশ্বকাপে রদ্রি প্রায় প্রতিটি ম্যাচে খেলেছেন।
এই আসরে তিনি বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ ৭৫৬টি সফল পাসের নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
অন্য যে কোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি দূরত্ব বল বহন করেছেন।
কাউন্টার প্রেসিং থেকে সবচেয়ে বেশি বার বল পুনরুদ্ধার করেছেন।
স্পেনের প্রতিটি আক্রমণ গড়ে তোলার মূল সংযোগ ছিলেন।
সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন স্পেনের ইঞ্জিন।
গোল্ডেন বল শুধু গোলের পুরস্কার নয়
অনেকেই মনে করেন, সবচেয়ে বেশি গোল করলেই গোল্ডেন বল পাওয়া উচিত।
কিন্তু এই পুরস্কার দেওয়া হয় পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারকে।
মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রাণ। কিন্তু রদ্রি ছিলেন স্পেনের পুরো খেলার কেন্দ্র।
তিনি রক্ষণকে আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট করেছেন, বলের দখল ধরে রেখেছেন এবং পুরো দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
পেপের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলো
রদ্রি যখন চোটে ভুগছিলেন, তখনও পেপ গার্দিওলা বিশ্বাস করেছিলেন, বিশ্বকাপে দেখা যাবে তার সেরা রূপ।
অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন, ১৫ মাস মাঠের বাইরে থাকার পর আগের সেই রদ্রি আর ফিরবেন না।
কিন্তু বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আর কোনো সন্দেহ নেই।
স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছে। আর পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার হিসেবে গোল্ডেন বল উঠেছে রদ্রির হাতে।
মেসির ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন এমন একজন, যার অবদান সব সময় স্কোরশিটে ধরা পড়ে না। সেই নাম রদ্রি।
বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলজয়ীরা
১৯৭৮: মারিও কেম্পেস (আর্জেন্টিনা)
১৯৮২: পাওলো রোসি (ইতালি)
১৯৮৬: দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা)
১৯৯০: সালভাতোরে স্কিলাচি (ইতালি)
১৯৯৪: রোমারিও (ব্রাজিল)
১৯৯৮: রোনালদো (ব্রাজিল)
২০০২: অলিভার কান (জার্মানি)
২০০৬: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)
২০১০: দিয়েগো ফোরলান (উরুগুয়ে)
২০১৪: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
২০১৮: লুকা মদরিচ (ক্রোয়েশিয়া)
২০২২: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
২০২৬: রদ্রি (স্পেন)



