তিন বলে তিন রকম শিকার, ইতিহাসে হাসান মাহমুদের নাম

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

আম্পায়ারের আঙুল ওঠেনি। কিন্তু বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আবেদন থামেনি। এগারোজন ফিল্ডারই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন, বলটি কি লেগ স্টাম্পে লাগত না? আম্পায়ারের ধারণা, বল হয়তো স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে যেত। সন্দেহ ছিল বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মনেও। তাই রিভিউ নেওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে চলল আলোচনা। শেষ পর্যন্ত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ছয় সেকেন্ড আগে সিদ্ধান্ত নিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন।

তারপর পর্দায় ভেসে উঠল সেই উত্তর, যার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। বলটি স্টাম্পে আঘাত করত, আর আঘাতের উচ্চতা ও অবস্থানও আউট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রিভিউ সফল। ফিরতে হলো জিয়াউর রহমানকে। আর তাতেই পূর্ণ হলো হাসান মাহমুদের হ্যাটট্রিক।

বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম হ্যাটট্রিকের মালিক এখন হাসান।

আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই হ্যাটট্রিকের দিনটি হাসানের জন্য আরও বিশেষ হয়ে থাকছে। প্রথম ইনিংসে ৫৫ রান দিয়ে তিনি নিয়েছেন পাঁচ উইকেট। দিনের শুরুতে আফগানিস্তানের স্কোর ছিল চার উইকেটে ২১১। সেখান থেকে শেষ ছয় উইকেট হারাতে দলটির প্রয়োজন হয়েছে মাত্র ২৯ রান। বাংলাদেশের সামনে প্রথম ইনিংসে লিড দাঁড়িয়েছে ১০৬ রানের।

তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও হাসানের এই অর্জনের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে হ্যাটট্রিক খুব নিয়মিত কোনো ঘটনা নয়। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের ১৬২তম টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। এর আগে ১৬১ টেস্টে বাংলাদেশি বোলারদের হ্যাটট্রিক ছিল মাত্র দুটি।

প্রথমটি এসেছিল ২০০৩ সালে, পেশোয়ারে পাকিস্তানের বিপক্ষে। সেই কীর্তি গড়েছিলেন লেগ স্পিনার অলক কাপালি। দ্বিতীয়টির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও দশ বছর। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন অফ স্পিনার সোহাগ গাজী। বাংলাদেশের স্পিনাররা তখন পর্যন্ত টেস্টে এই বিশেষ কীর্তির মালিক হলেও পেসারদের অপেক্ষা ফুরাচ্ছিল না।

সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন হাসান।

আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসে ৮৩তম ওভারের তৃতীয় বলে শুরু হয় তাঁর হ্যাটট্রিকের যাত্রা। ব্যাক অব আ লেংথের বলটি নিচু হয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। ইসমত আলম ব্যাট নামানোর আগেই বল আঘাত করে স্টাম্পে। বোল্ড হয়ে ফিরতে হয় তাকে।

পরের বলে নতুন ব্যাটসম্যান কায়েস। এবার হাসানের বলে ব্যাটের কানায় লেগে বল ছুটে যাচ্ছিল স্লিপের দিকে। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নিলেন উইকেটকিপার লিটন দাস। দ্বিতীয় উইকেটটিতে তাই হাসানের সঙ্গে কৃতিত্ব ভাগ করে নিতে হয় লিটনকেও।

এরপর জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জোরালো আবেদন সত্ত্বেও আম্পায়ার আউট দেননি। কিন্তু অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের নেওয়া রিভিউ বদলে দিল সিদ্ধান্ত। এলবিডব্লু হয়ে ফিরলেন জিয়াউর। হাসানের হ্যাটট্রিক পূর্ণ হলো।

তিনটি বলে তিন ধরনের আউট। প্রথম ব্যাটসম্যান বোল্ড, দ্বিতীয়জন ক্যাচ, তৃতীয়জন এলবিডব্লু। একই হ্যাটট্রিকে এমন বৈচিত্র্য হাসানের কীর্তিকে দিয়েছে বাড়তি মাত্রা।
টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড় শ বছরের ইতিহাসে এটি ৫০তম হ্যাটট্রিক। ২০২৬ সালে প্রথম। এর আগে সর্বশেষ হ্যাটট্রিকটি এসেছিল ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই, কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সেটি করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার পেসার স্কট বোল্যান্ড।

হাসানের সামনে অবশ্য শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়, বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ও লেখা হলো। এত দিন টেস্টে বাংলাদেশের হ্যাটট্রিকের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল স্পিনারদের নামের সঙ্গে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো একজন পেসারের নাম।

আর সেই ইতিহাসের শুরুটা হলো এমন এক মুহূর্তে, যখন আম্পায়ারের আঙুল ওঠেনি। সিদ্ধান্ত নিতে বাকি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। অধিনায়ক রিভিউ নিয়েছিলেন, আর তাতেই নিশ্চিত হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন এক মাইলফলক।