‘জাস্ট অ্যানাদার ম্যাচ’ খেলেই বিদায় আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির

ফুটবল মাঠে বল পায়ে ঐ ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটার ছুটে যাওয়ার চেয়ে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে! এই সুন্দর দৃশ্যটা আর কখনোই আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেখা যাবে না।

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

“আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা— একজন মানুষের জীবনে ঘটে যেতে পারে এমন সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলোর একটি।“ আর সব সুন্দরের শেষ আছে ইংরেজিতে নিশ্চয়ই ঠিকই বলে “অল গুড থিংস মাস্ট কাম টু অ্যান এন্ড!”

নিজের শেষ বিদায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে বরাবরের মতো স্প্যানিশ ভাষায় কথা বললেও এই ভাবার্থটা তো আর অজানা নয় লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। ফুটবল মাঠে বল পায়ে ঐ ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটার ছুটে যাওয়ার চেয়ে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে! এই সুন্দর দৃশ্যটা আর কখনোই আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেখা যাবে না।

Messi on last match

বুয়েন্স আয়ার্সের স্টাডিও মনুমেন্টালে বেনিনের সঙ্গে ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে বাংলা সিনেমার শেষটার মতো ‘সমাপ্ত’ লেখা হয়ে গেলো। শেষ…আর্জেন্টিনার হয়ে ঐ মায়াবী আকাশী-সাদা জার্সিতে আর কখনোই খেলতে দেখা যাবে না প্রতিনিয়ত নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সর্বকালের সেরাদের অন্যতম এই ফুটবলারকে।

কিন্তু কারো শেষটা এত সুন্দর, এত পারফেক্ট হয় কী করে? আর্জেন্টিনা ম্যাচ জিতেছে ৩-০ ব্যবধানে। মেসি একটা গোল করেছেন, দুইটা করিয়েছেন! মানে দলের মোট তিনটা গোলেই তার অবদান, যেটা মেসির জন্য অবশ্য একেবারেই রুটিন ওয়ার্ক, শুধুমাত্র আরেকটা ম্যাচ মাত্র।

কিন্তু হাউজফুল স্টেডিয়ামে উপস্থিত হওয়া ৮৫ হাজারের উপর দর্শক, স্ক্রিনে লেগে থাকা আরও কোটি কোটি চোখের জন্য এটা আজীবনের এক অমূল্য সম্পদ, যক্ষের ধনের মতো করে আগলে রাখার স্মৃতি।

ম্যাচটা আন্তর্জাতিক প্রীতি, র‍্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সাথে কখনো বিশ্বকাপ মঞ্চে সুযোগ না পাওয়া ফিফা র‍্যাংকিংয়ের ৮৯ নম্বর দল আফ্রিকার অখ্যাত বেনিন। মাঠে বাইশ জন ফুটবলার খেলেছে বটে, কিন্তু সবারই জানা এই মঞ্চটা আসলে শুধু একজনের জন্যই। এত আতশবাজি, ড্রোন শোয়ের আয়োজন, মিউজিক, হাসি, কান্না, করতালি শুধু ঐ একজনকে লক্ষ্য করেই।

ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিট ও আগের পরের আরও প্রায় ৯০ মিনিট দর্শকরা ওই একটি নামই জপে গেলো মেসি…মেসি…! আবেগ ধরে রাখার চেষ্টা কম করেননি মেসি, কিন্তু যখন খোদ কোচের চোখে জল, স্ত্রী – সন্তানদের মুখ ভার, মাঠে উপস্থিত হাজারো দর্শক কাঁদছেন, একটি করে মূহুর্ত ফুরিয়ে আসছে আর তিনি অনুভব করছেন এই শেষ বার, তখন সামলান কী করে নিজেকে?

মেসির-বিদায়ী-ম্যাচ-2.jpg

জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন ঠিক বিশ্বকাপ ফাইনালের দুদিনের মাথায়। এর কিছুদিনের মধ্যে প্রিয় বাবাকে হারিয়ে বসলে সেই সিদ্ধান্তটা আরও পোক্ত হয় তার। চিঠি লিখে পুরো দুনিয়াকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মাসখানেক আগে। ঘোষণা দেন “সময় হল সারা”, যে ঘোষণায় সাড়া পড়ে যায় পুরো ফুটবল দুনিয়ায়, শোকের ছায়া নামে আর্জেন্টিনায়, তাদের ইতিহাসের সেরা ফুটবলার ঈশ্বরতুল্য ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে জায়গা দেওয়া লিওকে তারা শেষ বিদায় আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবেন না তা কি হয়?

তাই তো নানা সমালোচনা মাথায় নিয়েই লিওনেল মেসির বিদায় ম্যাচ আয়োজন করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, এএফএ।

কী ছিল না এই আয়োজনে! মেসির সঙ্গে ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডের বাকি সদস্যদেরও হাজির করা হয় মাঠে, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর মেসির সাথেই অবসর নেয়া ওটামেন্ডিকেও নামানো হয় এই ম্যাচে, প্রত্যেকে হাজির পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, মেসির পাশে স্ত্রী রোকুজ্জো এবং তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও সিরো।

আকাশে আতশবাজির খেলা, মাঠজুড়ে নেমে এলে বিশাল এক নাম্বার টেন জার্সি, যেখানে শুধু একটা শব্দই লেখা ‘গ্রাসিয়াস’, যার অর্থ ধন্যবাদ! যাকে ধন্যবাদ তার উদ্দেশে পুরো গ্যালারি মাতোয়ারা আর্জেন্টিনার প্রিয় ফুটবল সংগীত ‘মুচাচোস’ দিয়ে।

lionel messi last match

আর এ সমস্ত আনুষ্ঠানিকতায় ম্যাচ শুরুর নির্ধারিত সময়ের আধাঘন্টা ততক্ষণে পার। কিন্তু তাতে কী যায় আসে, এই সময়টা তো পারলে অনন্তকালের জন্য আটকে দেন লিও ভক্তরা।

এই ম্যাচটি যে আবেগের হবে তা জানাই ছিল। আর সেই আবেগের চূড়ান্ত রূপ জাতীয় সংগীত। যেখানে সবার আগে সবচেয়ে বেশি আবেগাক্রান্ত আরেক লিওনেল, কোচ স্কালোনি। ক্যামেরার ক্লোজ শট তার চোখের পানি থেকে সরে মেসির উপর পড়লো, প্রথমবারের মত বড় সন্তানকে পাশে নিয়ে খেলা শুরুর মূহুর্তে তিনি। আগেও বহুবার কেঁদেছেন, কাঁদিয়েছেন, তবে আজ তখনো পর্যন্ত প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন চোখের পানি আটকাবার। জাতীয় সংগীত শেষ হতেই দর্শকের চিৎকারের সঙ্গে রিভার প্লেটের এই স্টেডিয়াম ফেটে পরতেই সেটি আর পারলেন কই।

এই ম্যাচ ঘিরে স্পন্সর অ্যাডিডাস বিশেষ জার্সি আগেই বানিয়েছে, সেটা পরে যখন শেষবারের মতো অধিনায়কের আর্মব্যান্ড লাগিয়ে গেলেন টস করতে, তখন যথাযথ সম্মাননা পেলেন প্রতিপক্ষ অধিনায়কের কাছ থেকেও। আফ্রিকার দেশটি মেসিকে তুলে দিল বিশেষ উপহার।

৪-৩-৩ ফরমেশনে নিচে ওটামেন্ডি আর উপরে মেসির সাথে আলভারেজ ও লাউতারো দুজনই থাকলেন। কিন্তু ওই যে আগেই তো জানা যে আজকের দিনটা আসলে শুধু একজনের, বাকিরা এই গ্র্যান্ড উপলক্ষের অংশ মাত্র। তাই মেসির পায়ে বল যাওয়ার সাথে সাথেই কমেন্টেটরের চিৎকার চাপা পড়ে যাচ্ছে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকারে।

ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় ‘এলএমটেন’-এর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটা সারপ্রাইজ। খেলা বন্ধ রেখে দর্শকদের করতালি আর আতশবাজি চললো কিছুক্ষণ।

কিন্তু ঐ যে তার কাছে তো এটা ‘জাস্ট অ্যানাদার ম্যাচ’। তাই খেলার বাইরে বাড়তি আয়োজন খুব একটা তার ভালো লাগার কথা নয়, যেমনটা হয়তো ভালো লাগছিল না বারবার সতীর্থরা বল নিয়ে ছুটে প্রতিপক্ষের ডি বক্সের কাছে গিয়ে তাকেই খুঁজে খুঁজে বল পাঠানোটা।

কারণ তার তো এটা চেনা মঞ্চ, যিনি ২১ বছর ধরে যে দলকে টেনে নিয়ে চলেছেন, ১২৫ বার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছেন, তাকে কি আর আলাদা করে খুঁজে নিতে হয়! প্রথমার্ধেই গোলের দেখা পেয়ে যেতে পারতেন মেসি। কয়েকবার গোল করা ও করানোর খুব কাছকাছিও গিয়েছেন। তবে বেনিনকে কৃতিত্ব দিতেই হবে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনাকে গোলশূন্যতে আটকে রাখার জন্য।

অথচ ৪৫ মিনিট পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোলের দিকে শট (৪) ও প্রতিপক্ষের ডি বক্সে সবচেয়ে বেশি টাচ (৬) তারই। দ্বিতীয়ার্ধের পুরোটা মেসিময় হয়ে উঠতে সময় লাগলো মাত্র দুমিনিট।

ব্যাপারটা জমে ক্ষীর হলো মেসির সাথে ওটামেন্ডির যুগল রসায়নে। আটচল্লিশ মিনিটের মাথায় মেসির কর্ণার আর ওটামেন্ডির ফিনিশ, দুজনের বিদায়ী ম্যাচে এর চেয়ে ভালো ট্রিবিউট আর কী হতে পারতো! মেসির ৬৮তম অ্যাসিস্ট, ওটামেন্ডির নবম গোল। মেসির পর আর্জেন্টিনার হাল ধরবে কারা? নাম্বার টেন জার্সি যাবে কার কাছে? এমন নানা প্রশ্ন গত বিশ্বকাপ থেকেই আছে। এসবের উত্তর হয়ে যারা উঠে আসছে তাদের অন্যতম নিকো পাজ নামলেন, এবং মেসি যেন ব্যাটনটা তার হাতে তুলে দিলেন। আর এখানেও সময়ের ব্যবধানটা মাত্র দু মিনিট। ৫৮ মিনিটে নেমে ৬০ মিনিটের মাথায় ডি বক্সের বাইরে থেকে শট তরুণ পাজের, ম্যাচের স্কোর ২-০, মেসির  অ্যাসিস্ট নাম্বার ৬৯!

তাহলে গোল করা আর বাকি থাকে কেন? সে কাজে খানিক সাহায্যই করলো বেনিন। টানা আক্রমণে দিশেহারা দলটা নিজেদের ডি বক্সে একটা বাজে ট্যাকল করে বসলো, পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। শটটা কে নেবেন? এটা কি বলতে হয়! বল বগলে নিয়ে এগিয়ে এলেন দেশের হয়ে ২০৮তম ম্যাচ খেলতে নামা লিও।

lionel messi last match

সেই চিরচেনা বা পায়ের শট চলে গেল জালে, মেসির গোল নাম্বার ১২৬, রোনালদোর পর কোন জাতীয় দলের হয়ে যা সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। রেকর্ড কিংবা পরিসংখ্যানের তো আর শেষ নেই। বরং ছয়টা বিশ্বকাপ খেলে তিনটার ফাইনালে যাওয়া মেসি একটা বিশ্বকাপ ট্রফি, দুইটা কোপা, ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপে ২১ গোল, এ সমস্ত হিসাব নিকাশের অনেক উর্ধ্বে নিয়ে গেছেন তার ক্যারিয়ারকে।

যে ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ঠিক ২১ বছর আগে ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে লাল কার্ড পেয়ে; সেই ক্যারিয়ার তিনি শেষ করছেন পুরো পৃথিবীটাকে একরকম জয় করে। যখন আর কিছু প্রমাণের থাকে না, তখন ম্যাচ শেষের নম্বর মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়ের ঘোষণায় স্টেডিয়ামে শোনা যায় লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আর মাত্র তিন মিনিট বাকি আছে।

ম্যাচ শেষে এত উদযাপন, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, মিউজিক, অথচ সবার চোখে অশ্রু। সবার হৃদয় বিদায়ের  বেদনায় নীল।

মাইক হাতে নিয়ে তিনি বললেন, “সত্যি বলতে, আমি আজ আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি যেতে চাই না। আমি মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। আমি শুধু আপনাদের বলতে চাই— আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আমি আপনাদের ভীষণ মিস করবো। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।“

প্রিয় লিও, ধন্যবাদ তো আপনাকে। আপনার জন্যই না ফুটবলটা এত সুন্দর  মনে হয়ে এসেছে। গ্রাসিয়াস।