প্রিমিয়ার লিগ কমিশনের রায় প্রকাশের পরই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। এক বিবৃতিতে ক্লাবটি বলেছে, কমিশনের মতামতে তারা ‘হতাশ ও বিস্মিত’। শুধু তাই নয়, সিটির দাবি, প্রিমিয়ার লিগের আনা অভিযোগে তারা নির্দোষ এবং নিজেদের অবস্থানের পক্ষে তাদের কাছে রয়েছে ‘অখণ্ডনীয় প্রমাণ’।
এখানেই শেষ নয়। আট বছর ধরে চলা এই প্রক্রিয়ার পরও লড়াই থামছে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ক্লাবটি। সিটির ভাষ্য, কমিশনের মতামতে তাই সামনে থাকা আপিলের সুযোগ কাজে লাগানোর ঘোষণা দিয়েছিল তারা। পরে ১লা অক্টোবর রাতে সেই ঘোষণা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল দাখিল করে সিটি। এমনকি প্রিমিয়ার লিগের বোর্ড ও নির্বাহীদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিটি। ক্লাবটির দাবি, আট বছর ধরে তারা এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছে এই প্রত্যাশায় যে প্রিমিয়ার লিগ একটি ‘স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ন্যায্য’ নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করবে, যা কোনো পক্ষের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। অর্থাৎ ম্যানচেস্টার সিটির অবস্থান পরিষ্কার যে রায় এলেও তারা সেটিকে চূড়ান্ত বলে মানছে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বড় এই মামলা আসলে কী নিয়ে? কীভাবে আট বছর ধরে চলা তদন্ত ১১৫টি অভিযোগে গড়ালো? ১১৪টিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সিটির সামনে এখন কী অপেক্ষা করছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন একটি ফুটবল ক্লাবের আর্থিক অনিয়মের মামলা এখন ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে আবুধাবি ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের সঙ্গেও আলোচনায় আসছে?
শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে
ম্যানচেস্টার সিটির বর্তমান সংকটের শুরু ২০২৩ সালে নয়, তারও প্রায় পাঁচ বছর আগে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের স্পিগেল ম্যানচেস্টার সিটির অভ্যন্তরীণ ই-মেইল ও নথির ওপর ভিত্তি করে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব নথি ফাঁস হয়েছিল ফুটবল লিকস-এর মাধ্যমে। সেই প্রকাশনার পর সিটির আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়।
অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলো যে ক্লাবটি তার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে সঠিক তথ্য দিয়েছে কি না, স্পনসরশিপ থেকে আসা অর্থ কীভাবে দেখিয়েছে, খেলোয়াড় ও কোচদের কিছু অর্থপ্রদান কীভাবে হিসাব করেছে এবং উয়েফা ও প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম মেনেছে কি না।
এরপর উয়েফা তদন্ত শুরু করে। ২০২০ সালে উয়েফা ম্যানচেস্টার সিটিকে দুই বছরের জন্য ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করেছিল এবং ৩০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করেছিল। অভিযোগ ছিল, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ক্লাবটি আর্থিক ন্যায্যতা বা ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে-এর গুরুতর নিয়ম ভেঙেছে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকেনি।
কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট বা সিএএস আপিলে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয়। সিএএস বলেছিল, সিটির বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বা সময়সীমার কারণে আর বিচারযোগ্য ছিলো না। তবে উয়েফার তদন্তে সহযোগিতা না করার জন্য সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা বহাল রাখা হয়। অর্থাৎ, সিটি এর আগেও একটি বড় আর্থিক-নিয়মের মামলায় আপিল করে শাস্তির বড় অংশ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের মামলাটি ছিলো আরও বড়।
১১৫ অভিযোগের মামলা
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় চার বছর ধরে চলা তদন্তের পর ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ১১৫টি অভিযোগ আনে প্রিমিয়ার লিগ। অভিযোগগুলোর সময়কাল ছিলো ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত। এর মধ্যে ছিলো আর্থিক তথ্য সঠিকভাবে না দেওয়া, স্পনসরশিপ আয়ের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন, খেলোয়াড় ও কোচদের পারিশ্রমিকের হিসাব, উয়েফা ও প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম এবং তদন্তের সঙ্গে সহযোগিতা না করার অভিযোগ।

প্রিমিয়ার লিগের অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো যে সিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে স্পনসরশিপের অর্থ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো এবং কিছু অর্থপ্রদান ‘অফ দ্য বুকস’ রাখা হয়েছিল। স্বাধীন কমিশনের দীর্ঘ শুনানি শেষে এখন সেই মামলার বড় অংশের রায় এসেছে।
দ্য অ্যাথলেটিক ও পরবর্তী একাধিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে সিটি, এর মধ্যে আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগগুলোতে পুরোপুরি এবং তদন্তে সহযোগিতা না করার চার অভিযোগের তিনটিতে দায়ী করা হয়েছে ক্লাবটিকে। তবে পুরো কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি এবং শাস্তিও নির্ধারণ করা হয়নি। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে যে ‘দোষী সাব্যস্ত’ হওয়া আর ‘শাস্তি পাওয়া’ দুটি একই বিষয় নয়। সিটির বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তি ঘোষণা হয়নি। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিষয়টি আর সম্ভাবনা নয় কারণ ম্যানচেস্টার সিটি ইতোমধ্যে ১লা অক্টোবর রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল দাখিল করেছে। প্রিমিয়ার লিগও ২রা অক্টোবর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ফলে মামলাটি এখন কমিশনের রায় থেকে আপিল প্রক্রিয়ায় ঢুকেছে।
আগেও হয়েছে, কিন্তু সিটির মতো নয়
প্রিমিয়ার লিগে আর্থিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগে শাস্তি এটা একেবারে নতুন কিছু নয়। এভারটন ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের মতো ক্লাব পয়েন্ট হারিয়েছে। এভারটনকে প্রথমে ১০ পয়েন্ট কাটা হয়েছিল, পরে আপিলে তা ৬ পয়েন্টে নেমে আসে। নটিংহ্যাম ফরেস্টের ক্ষেত্রে কাটা হয় ৪ পয়েন্ট।
এমনকি ম্যানচেস্টার সিটির নিজের ইতিহাসেও এর নজির আছে। ১৯০৬ সালে বেতনসীমা এড়িয়ে খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগে বড় শাস্তির মুখে পড়েছিল ক্লাবটি। তদন্তে গেট মানির একটি অংশ ব্যক্তিগত হিসাবে সরিয়ে নিয়ে সেখান থেকে খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পর ১৭ জন খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ করা হয়, চার পরিচালককে ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ক্লাবকেও শাস্তি দেওয়া হয়।
কিন্তু ম্যানচেস্টার সিটির বর্তমান ঘটনা সেখানেই আলাদা।
এভারটন ও ফরেস্টের মামলাগুলো ছিলো মূলত নির্দিষ্ট সময়ের প্রফিটেবিলিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রুলস বা পিএসআর ভাঙা নিয়ে। ১৯০৬ সালের ঘটনাটিও ছিলো সেই সময়কার বেতনসীমা ও অর্থপ্রদানের নিয়ম ঘিরে। কিন্তু সিটির বর্তমান মামলার পরিধি অনেক বড়, ২০০৯/১০ থেকে ২০১৭/১৮ পর্যন্ত নয় মৌসুমের আর্থিক হিসাব, বাণিজ্যিক চুক্তি, খেলোয়াড় ও কোচদের পারিশ্রমিক, উয়েফার আর্থিক নিয়ম এবং তদন্তে সহযোগিতা, সব মিলিয়ে বিস্তৃত অভিযোগ।
প্রিমিয়ার লিগের স্বাধীন কমিশন এখন সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগগুলো এবং তদন্তে সহযোগিতা না করার বেশিরভাগ অভিযোগে রায় দিয়েছে। নিয়ম ভাঙা, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ কিংবা বড় শাস্তি এগুলোর নজির ফুটবলে আছে, এমনকি সিটির ইতিহাসেও আছে। কিন্তু প্রায় এক দশকজুড়ে এত বিস্তৃত অভিযোগ নিয়ে এমন রায় প্রিমিয়ার লিগের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন মাত্রার। আর এখানেই শাস্তির পরিধিতে আসে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
এভারটন বা ফরেস্টের ক্ষেত্রে মূল আলোচনাই ছিলো পয়েন্ট কাটা নিয়ে। ১৯০৬ সালে সিটির ক্ষেত্রে শাস্তি নেমে এসেছিল খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ওপর। কিন্তু এবার সিটির সামনে আলোচনায় আছে বড় অংকের জরিমানা, পয়েন্ট কাটা, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তিও। তবে এখনো কোনো শাস্তি ঘোষণা হয়নি এবং সিটি ইতোমধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
তাই তুলনাটা এমন হতে পারে যে আগেও নিয়ম ভাঙার মামলা হয়েছে, শাস্তিও হয়েছে এমনকি সিটির নিজের ইতিহাসেও এর নজির আছে। কিন্তু বর্তমান মামলার বিস্তৃতি, সময়কাল এবং সম্ভাব্য পরিণতি তিনটিই একসঙ্গে এত বড় মাত্রায় আগে দেখা যায়নি।
কী ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে সিটি?
এখন সামনে অন্তত চারটি সম্ভাব্য পথ।
১. পয়েন্ট কাটা হতে পারে
প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে পয়েন্ট কাটা একটি সম্ভাব্য শাস্তি। কত পয়েন্ট কাটা হবে, তা এখনো জানা নেই। এমনকি শাস্তি চলতি মৌসুমেই কার্যকর হবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। আগের কয়েকটি আর্থিক মামলায় এভারটন ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের মতো ক্লাব পয়েন্ট হারিয়েছে। তবে সিটির মামলার ব্যাপ্তি অনেক বড় হওয়ায় আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি জটিলতা।
যদি শাস্তি চলতি মৌসুমে কার্যকর হয়, তাহলে আপিল চলাকালে লিগ টেবিলের প্রতিযোগিতার ওপর তার প্রভাব কী হবে সেটিও বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে সিটি যদি তখন শিরোপার লড়াইয়ে থাকে, তাহলে শাস্তি কখন কার্যকর হবে সেটি শুধু সিটির নয়, পুরো লিগের প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
২. শাস্তি আরও বড় হতে পারে
পয়েন্ট কাটা ছাড়াও বড় অংকের জরিমানা, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি শুধু ‘কত পয়েন্ট কাটা হবে’ এত সহজ নয়। চরম শাস্তি হলে সিটির প্রিমিয়ার লিগে অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে শাস্তি যাই হোক, সেটিকে আনুপাতিক হতে হবে। আর সিটি যদি মনে করে শাস্তি নিয়মের তুলনায় অতিরিক্ত, তাহলে সেটিও আপিলের বিষয় হতে পারে।
আরেকটি প্রশ্ন হলো যে আগের মৌসুমগুলোর অর্জন নিয়ে কী হবে? সিটি যদি শেষ পর্যন্ত গুরুতর আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের দায়ে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে অতীতের শিরোপা বা ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এখনই কোনো শিরোপা কেড়ে নেওয়া হবে এমন সিদ্ধান্ত হয়নি।
৩. আপিলের কারণে লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে
সিটি শুধু লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি, ইতোমধ্যে কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপিল দাখিল করেছে। ক্লাবের দাবি, কমিশনের মতামতে আইন, নীতি ও তথ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুল রয়েছে এবং সিদ্ধান্তটি ‘নিরাপদ নয়’। আপিলটি শুনবে তিন সদস্যের একটি স্বাধীন আপিল বোর্ড। শুনানি হবে গোপনে, এবং আপিলের ফল প্রকাশের আগে পুরো প্রক্রিয়া প্রকাশ্য হবে না। সিটির প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানোও ক্লাব নির্বাহীদের এক বৈঠকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই লড়াই শেষ হতে আরও অনেক সময় লাগতে পারে। ২০২৩ সালে অভিযোগ আনার পর যে আইনি লড়াই শুরু হয়েছিল, সেটির শেষ রায় পেতেও আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সিটির জন্য এই লড়াইয়ের গুরুত্বও অনেক। কারণ ২০২০ সালে উয়েফার মামলায় আপিল করে তারা দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করাতে পেরেছিল। তবে এবার পার্থক্য হচ্ছে এটি উয়েফার মামলা নয় এটি প্রিমিয়ার লিগের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মামলা। ফলে ২০২০ সালের সিএএস সিদ্ধান্তকে এবার সরাসরি একইভাবে প্রয়োগ করা যাবে না।
৪. ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে অন্য ক্লাবগুলো
আরেকটি বড় ঝুঁকি মাঠের বাইরে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব সিটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ দাবির বিষয়ে আইনি পরামর্শ নিচ্ছে। তাদের যুক্তি হতে পারে যে সিটি যদি সত্যিই এমন আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে যা নিয়ম অনুযায়ী পাওয়ার কথা ছিলো না, তাহলে সেই সুবিধার কারণে অন্য ক্লাবগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় জায়গা পাওয়া, প্রাইজমানি, বাণিজ্যিক আয় কিংবা কোনো ক্লাবের লিগে টিকে থাকা। অর্থাৎ, সিটির বিরুদ্ধে মামলার চূড়ান্ত শাস্তি ঘোষণার পরেও নতুন মামলা শুরু হতে পারে। তখন প্রশ্ন হবে শুধু ‘সিটিকে কী শাস্তি দেওয়া হবে?’ না বরং প্রশ্ন হবে যে ‘সিটির কর্মকাণ্ডে অন্যরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?’
মামলা এখানেই শেষ হচ্ছে না
কারণ সিটির বিরুদ্ধে রায়ের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সামনে এসেছে ইতিহাদ এয়ারওয়েজ। ম্যানচেস্টার সিটির প্রধান স্পনসরদের একটি ইতিহাদ এয়ারওয়েজ। রায়ের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিমান সংস্থা জানিয়েছে, তারা প্রিমিয়ার লিগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
ইতিহাদ বলেছে, তাদের নাম প্রকাশিত নথিতে সরাসরি না থাকলেও কমিশনের সিদ্ধান্ত ও সেটি প্রকাশের পদ্ধতি তাদের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এয়ারলাইনটি আরও বলেছে, তদন্তের সময় তাদের নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এবং তারা স্পষ্টভাবে কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করেছে।
এখন বিষয়টি শুধু ম্যানচেস্টার সিটি বনাম প্রিমিয়ার লিগ নয়। একদিকে সিটি আপিল করছে। অন্যদিকে অন্য ক্লাবগুলো ক্ষতিপূরণের কথা ভাবছে। আর সিটির প্রধান স্পনসর ইতিহাদও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এখান থেকেই মামলা আরও বড় হয়ে যায়। কারণ ইতিহাদ যেমন একটি সাধারণ বেসরকারি স্পনসর নয়, তেমন ম্যানচেস্টার সিটির মালিকানাও সাধারণ কোনো ফুটবল মালিকানার গল্প নয়।
ম্যানচেস্টার সিটির পেছনে আসলে কারা?
২০০৮ সালে আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ ম্যানচেস্টার সিটি কিনে নেওয়ার পর ক্লাবটির ইতিহাসই বদলে যায়। এরপর প্রায় দুই দশকে সিটি ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম সফল ক্লাবে পরিণত হয়েছে।

শেখ মনসুরের মালিকানার সময় সিটি আটবার প্রিমিয়ার লিগ, চারবার এফএ কাপ, সাতবার লিগ কাপ এবং একবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে। শুধু মাঠেই নয়, ক্লাবের আশপাশের এলাকাতেও বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। ইতিহাদ স্টেডিয়ামের আশপাশে অবকাঠামো, আবাসন, অফিস, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বিনোদন অবকাঠামো গড়ে তুলতে সিটি ফুটবল গ্রুপ এক বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করেছে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছে।
তার মানে ম্যানচেস্টার সিটি শুধু একটি সফল ফুটবল ক্লাব হয়ে ওঠেনি। ক্লাবটির মালিকানা ম্যানচেস্টার শহরের অর্থনৈতিক পরিসরেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই মালিকানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর শীর্ষ ব্যক্তিরা।
শেখ মনসুর শুধু একজন ক্লাব মালিক নন
শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ম্যানচেস্টার সিটির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত একজন ধনী ব্যক্তি এটুকু বললে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটাই বাদ পড়ে যায়। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল কোর্টের চেয়ারম্যানও। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভাই।
ম্যানচেস্টার সিটির বর্তমান করপোরেট তথ্য অনুযায়ী, ক্লাবটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রয়েছে নিউটন ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এলএলসি-এর হাতে, যা পুরোপুরি শেখ মনসুরের মালিকানাধীন। মানে এখানে ‘ইউএই ওউন্স ম্যানচেস্টার সিটি’ বলা ঠিক হবে না কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে ক্লাবটির চূড়ান্ত মালিক দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের একজন সদস্য।
আরও আছে মুবালাদা। শেখ মনসুর মুবালাদা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি এর চেয়ারম্যান। এটি আবুধাবি সরকারের মালিকানাধীন একটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। আর মুবারাদালার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও গ্রুপ সিইও হলেন খালদুন আল মুবারক। আর এখানেই পরের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটির প্রবেশ।
খালদুন আল মুবারক, সিটির চেয়ারম্যান আবার আবুধাবিরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি
ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ারম্যান হিসেবে খালদুন আল মুবারক কে ফুটবল সমর্থকেরা বহু বছর ধরে চেনেন।কিন্তু ফুটবলের বাইরে তার পরিচয় আরও বড়। তিনি মুবারাদালার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং গ্রুপ সিইও। মুবারাদালার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ইউএই সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক দূত। তিনি আবুধাবির এক্সিকিউটিভ অ্যাফেয়ার্স অথরিটির চেয়ারম্যান এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা এডিএনওসির বোর্ডেও আছেন। অর্থাৎ, সিটির চেয়ারম্যান এমন একজন ব্যক্তি যিনি একই সঙ্গে একটি বিশ্বখ্যাত ফুটবল ক্লাবের নেতৃত্ব দেন এবং আবুধাবির রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও রয়েছেন।
এখানেই ম্যানচেস্টার সিটির গল্পটি অন্য অনেক বড় ফুটবল ক্লাবের মালিকানার গল্প থেকে আলাদা হয়ে যায়। কারণ মালিক এবং চেয়ারম্যান দুজনের অবস্থানই শুধু ফুটবল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী। অন্যজন আবুধাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি।
আর যুক্তরাজ্য?
এখন আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। এই সবকিছুর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক কোথায়? কারণ আবুধাবি এবং ব্রিটেনের সম্পর্ক শুধু ম্যানচেস্টার সিটিকে ঘিরে নয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্য ও ইউএই একটি নতুন ফ্রেমওয়ার্ক ফর এনহ্যান্সড কো-অপারেশনে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি রূপান্তর, বিচারিক সহযোগিতা এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ মোকাবিলা। তাই দুই দেশের সম্পর্কের পরিধি ফুটবলের চেয়ে অনেক বড় আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল বিনিয়োগ।
২০২১ সালে ইউকে-ইউএই সোভারেইন ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ শুরু হওয়ার পর ব্রিটেনে ইউএইর প্রায় ৩০ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে। সেই অংশীদারিত্বে মুবারাদালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে খালদুন আল মুবারকের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি একই সঙ্গে ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ারম্যান এবং মুবারাদালার সিইও। ফলে সিটির বিরুদ্ধে কোনো বড় সিদ্ধান্তকে ঘিরে আবুধাবিতে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে এখানেই সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো শাস্তি ঘোষণার অর্থ এই নয় যে ইউকে-ইউএই সম্পর্ক অবধারিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং প্রশ্ন হলো যে দুই দেশের এত গভীর সম্পর্কের মধ্যে একটি বড় ফুটবল-আইনি বিরোধকে কীভাবে আলাদা রাখা হবে।
কূটনীতি ঢুকে পড়ছে
এখানে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ কারন সিটির বিরুদ্ধে রায়ের আগে এবং পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইউকে-ইউএই সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে যে আবুধাবিতে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, ম্যানচেস্টার সিটিকে অন্যায্যভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি সত্যিই গুরুতর নিয়মভঙ্গ প্রমাণিত হয়ে থাকে, তাহলে পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা কঠিন হবে।
তবে রায়ের পর বিষয়টি শুধু আশঙ্কার পর্যায়ে আছে এমনও নয়। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে রায়ের পর যুক্তরাজ্যে বড় বিনিয়োগের কিছু পরিকল্পনা থামিয়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রতিবেদনে সম্ভাব্যভাবে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগের কথাও এসেছে। যদিও এটিকে ইউকে-ইউএই সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সংকট বলা এখনই ঠিক হবে না, ঘটনাটি যে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, সেটি আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট।
এই দ্বৈততাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে দুটি আলাদা বিষয়কে এক করে ফেলা উচিত নয়। প্রথমটি হলো যে ম্যানচেস্টার সিটি আর্থিক নিয়ম ভেঙেছে কি না। এটি একটি ফুটবল ও আইনি প্রশ্ন। দ্বিতীয়টি হলো, সেই রায়ের কারণে ইউএইর সঙ্গে ব্রিটেনের ব্রডার রিলেশনশিপের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি না। এটি একটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। দুটির উত্তর একই নয়।
খালদুনের কূটনৈতিক অবস্থানও কেন আলোচনায়
এই মামলার আরেকটি অস্বাভাবিক দিক সামনে এসেছে খালদুন আল মুবারককে ঘিরে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ইউএই সরকারের ভূমিকার কারণে ২০২০ সাল থেকে ব্রিটেনে খালদুনের ডিপ্লোম্যাটিক ইমিউনিটি রয়েছে। এর অর্থ হলো, তার সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আইনে তার বিরুদ্ধে কিছু ধরনের দেওয়ানি বা ফৌজদারি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা থাকতে পারে। কিন্তু এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি যে খালদুন আল মুবারকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অন্যায়ের অভিযোগ আনা হয়নি। আলোচনাটি হচ্ছে যে ভবিষ্যতে সিটির মামলাকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যক্তিগত আইনি পদক্ষেপ তৈরি হলে তার সরকারি মর্যাদা ও ডিপ্লোম্যাটিক ইমিউনিটি কী প্রভাব ফেলতে পারে। এটি তাই আলাদা একটি আইনি প্রশ্ন, সিটির বিরুদ্ধে কমিশনের রায়ের অংশ নয়।
কেন এত বড় বিষয় হয়ে উঠছে ম্যানচেস্টার সিটি
এখানে আবার ফুটবলে ফিরে আসা যাক। ২০০৮ সালের আগে ম্যানচেস্টার সিটি ছিল ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী বড় ক্লাবগুলোর একটি হলেও তখনকার অবস্থান আজকের মতো ছিল না। আবুধাবি ওনারশিপের পর ক্লাবটিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়। খেলোয়াড় কেনা, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, স্টেডিয়াম এলাকা এবং সিটি ফুটবল গ্রুপের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ সব মিলিয়ে সিটি একটি বৈশ্বিক ফুটবল ব্যবসায় পরিণত হয়। ক্লাবটির সাফল্যও আসে দ্রুত। আটটি প্রিমিয়ার লিগ টাইটেল, চারটি এফএ কাপ, সাতটি লিগ কাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এই সবই এই ওনারশিপ পিরিয়ডের মধ্যে।
তাই বর্তমান মামলার গুরুত্ব শুধু একটি ভবিষ্যৎ পয়েন্ট ডিডাকশন নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠছে যে সময়টাকে ম্যানচেস্টার সিটির আধুনিক সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়, সেই সময়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাই যদি শেষ পর্যন্ত গুরুতর নিয়মভঙ্গ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই সাফল্যের উত্তরাধিকার কীভাবে দেখা হবে? তবে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। কারণ আপিল বাকি।
আর এখানেই জোনাথন লিউয়ের বড় প্রশ্ন
দ্য গার্ডিয়ান এর কলামিস্ট জোনাথন লিউ এই ঘটনাকে শুধু ম্যানচেস্টার সিটি বা প্রিমিয়ার লিগের মামলা হিসেবে দেখেননি। তার যুক্তি হলো, ফুটবলে রাষ্ট্রীয় অর্থ, ব্যক্তিগত সম্পদ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবেশের ফলে ক্রীড়া-নিয়ন্ত্রণ এবং বৃহত্তর ক্ষমতার রাজনীতি একে অন্যের কাছাকাছি চলে এসেছে।
তিনি সিটির অতীতের লিকড কমিউনিকেশনের কথাও তুলে ধরেছেন যেখানে ইউইএফএর বিরুদ্ধে আগ্রাসী আইনি লড়াইয়ের ভাষা পাওয়া গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। লিউয়ের দৃষ্টিতে, তাই সিটি কেস আসলে ‘পাওয়ার’ এর বড় গল্পের অংশ। তবে তার এই ব্যাখ্যা একটি মতামত।
এটি কমিশনের রায় নয়, প্রিমিয়ার লিগের অবস্থানও নয়। আর সেই পার্থক্যটাই এই গল্পে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিটি নিজেই বলছে, তারা নির্দোষ এবং তাদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তে আইন, নীতি ও তথ্যের ভুল রয়েছে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার লিগের কমিশন বিপুল সংখ্যক অভিযোগে ক্লাবটিকে দায়ী করেছে।
শেষ পর্যন্ত কোন ব্যাখ্যাটি টিকে থাকবে, সেটি নির্ধারণ করবে আপিল ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া।
তাহলে কি ফুটবল আর কূটনীতি এক হয়ে যাচ্ছে
এখানে উত্তরটা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয় কারন ম্যানচেস্টার সিটি এখনও একটি ফুটবল ক্লাব। তার বিরুদ্ধে মামলাটিও একটি ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর্থিক নিয়মের মামলা। শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব স্বাধীন কমিশনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে সেই ক্লাবের মালিক ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী। চেয়ারম্যান একই সঙ্গে আবুধাবির রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের প্রধান। প্রধান স্পনসর ইউএইর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি বিমান সংস্থা। আর ইউএই ও ইউকের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কূটনৈতিক সহযোগিতার বিস্তৃত সম্পর্ক। তাই বিষয়টি যে শুধু এতিহাদ স্টেডিয়ামের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকবে না এটা বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে প্রিমিয়ার লিগের সিদ্ধান্ত ইউএই-ইউকে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বরং আসল পরীক্ষা হবে অন্য জায়গায়। দুই পক্ষ কি একটি ফুটবল নিয়ন্ত্রক মামলাকে তার নিজস্ব আইনি কাঠামোর মধ্যে রাখতে পারবে, যখন সেই মামলার এক পাশে রয়েছে ইউরোপের অন্যতম বড় ক্লাব এবং অন্য পাশে এমন একটি মালিকানা কাঠামো, যার সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সরাসরি যুক্ত?
শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্নটা এখানেই
ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার খবর নিঃসন্দেহে ইংলিশ ফুটবলের জন্য বড় ঘটনা। কিন্তু গল্পের শেষ এখনো হয়নি। শাস্তি কী হবে, কখন হবে, কতটা হবে সেই সবই সামনে।
সিটি ইতোমধ্যে আপিল করেছে। সেই আপিলের ফলের অপেক্ষায় এখন শাস্তির বিষয়টিও ঝুলে আছে। একই সময়ে অন্য ক্লাবগুলো ক্ষতিপূরণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে পারে। এতিহাদ এয়ারওয়েজ আইনি পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। আর সিটির মালিকানা ও নেতৃত্বের সঙ্গে আবুধাবির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীর সম্পর্কের কারণে ঘটনাটি ইতিমধ্যেই ফুটবলের বাইরের আলোচনায় চলে এসেছে।
এখন তাই ম্যানচেস্টার সিটি কেস-এর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো শুধু ‘সিটির কী শাস্তি হবে?’ তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে যখন একটি ফুটবল ক্লাবের মালিকানা এমন ব্যক্তিদের হাতে থাকে, যারা একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তখন ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সীমারেখা ঠিক কোথায় টানা হবে?
ম্যানচেস্টার সিটির আপিল সেই প্রশ্নের আইনি উত্তর খুঁজবে। কিন্তু তার উত্তর শুধু ফুটবলেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না সেটিই এখন দেখার বিষয়।



