১০ গোলের ম্যাচ, গোল্ডেন বুটে এমবাপ্পের চোখ, মেসির কোর্টে বল

একটি বিশেষ তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন এমবাপ্পে। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইতিহাসে মাত্র আটজন ফুটবলার এক আসরের বিশ্বকাপে আট বা তার বেশি গোল করেছিলেন।

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:১০ এএম

যে ম্যাচ খেলতেই চায়নি দুই দল, শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠলো বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর লড়াই। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। ১০ গোলের এই ম্যাচে ছিলো আক্রমণ, নাটকীয়তা, একের পর এক রেকর্ড এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর পুরুষদের বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা ফল পেল ইংল্যান্ড। দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত কোনো বিশ্বকাপে এটিই তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য।

এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল হওয়া তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। এর আগে ১৯৫৮ সালে ফ্রান্স ৬-৩ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়েছিলো।

বুধবার সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হতাশাজনক হারের কোনো প্রভাবই দেখা যায়নি ইংল্যান্ডের খেলায়। ম্যাচের প্রথমার্ধেই চার গোল করে কার্যত জয় নিশ্চিত করে ফেলে তারা।

তৃতীয় মিনিটে মাঝমাঠে দেজিরে দুয়ের ভুল পাস কেটে বল দখলে নেন অধিনায়কত্ব করা ডেকলান রাইস। এরপর একাই এগিয়ে গিয়ে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে গোল করেন তিনি।

২০ মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান দ্বিগুণ করে ইংল্যান্ড। রাইসের কর্নার থেকে হেডে গোল করেন এজরি কনসা।

এরপর শুরু হয় বুকায়ো সাকার ঝলক। দ্রুত পাল্টা আক্রমণে প্রথম সুযোগটি গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁ ঠেকালেও ফিরতি বলে গোল করেন তিনি।

যোগ করা সময়ে ক্লাব সতীর্থ এবেরেচি এজের পাস থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে নিজের দ্বিতীয় গোলও করেন সাকা।

প্রথমার্ধ শেষে ৪-০ গোলে পিছিয়ে ছিলো ফ্রান্স। ১৯৩০ সালের পর কোনো ম্যাচে বিরতির সময় এত বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েনি তারা।

তবে বিরতির পর পাল্টা লড়াই শুরু করে ফরাসিরা। ৪৮ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে প্রথম গোলটি শোধ করেন। ছয় মিনিট পর ব্যবধান আরও কমান ব্র্যাডলি বারকোলা। এরপর দারুণ এক দলগত আক্রমণ থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এমবাপ্পে।

ফ্রান্স এরপর সমতায় ফেরার একাধিক সুযোগ পেলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। ৮৭ মিনিটে জেড স্পেন্সকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। সেখান থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সাকা।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের হয়ে হ্যাটট্রিক করা মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হলেন তিনি। এর আগে ১৯৬৬ সালের ফাইনালে এই কীর্তি গড়েছিলেন স্যার জিওফ হার্স্ট। আর বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র অন্য ফুটবলার ব্রাজিলের পেলে, ১৯৫৮ সালে।

যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে ওসমান দেম্বেলে আবারও ব্যবধান কমান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাঝমাঠ থেকে একক প্রচেষ্টায় ফরাসি রক্ষণ ভেঙে গোল করেন জুড বেলিংহ্যাম। সেটিই নিশ্চিত করে ইংল্যান্ডের ৬-৪ গোলের জয়।

বিশ্বকাপে এর আগে কোনো ম্যাচে ছয় গোল হজম করেনি ফ্রান্স। শুধু বিশ্বকাপ নয়, গত ৬৬ বছরের মধ্যে কোনো ম্যাচেই এত গোল খেতে হয়নি তাদের।

অন্যদিকে সাত গোল করে নিজের বিশ্বকাপ শেষ করেছেন বেলিংহ্যাম। এক আসরের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কোনো পুরুষ ফুটবলারের এটিই সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।

তবে এই ম্যাচে হেরেও বড় একাধিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ২২-এ নিয়ে গেছেন তিনি। এই তালিকায় এখন তার ঠিক পেছনেই আছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, যার গোল ২১।

এবারের বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০। একবিংশ শতাব্দীতে এক আসরের বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ গোল। সর্বশেষ ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার এক বিশ্বকাপে ১০ গোল করেছিলেন।

আরও একটি বিশেষ তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন এমবাপ্পে। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইতিহাসে মাত্র আটজন ফুটবলার এক আসরের বিশ্বকাপে আট বা তার বেশি গোল করেছিলেন।

সেই তালিকায় ছিলেন গার্ড মুলার, জুস্ত ফন্তেইন, শান্দর কচিশ, আদেমির, ইউসেবিও, গিয়ের্মো স্টাবিলে, রোনালদো এবং এমবাপ্পে। এবার নিজের রেকর্ডকে আরও সমৃদ্ধ করলেন তিনি।

এবার গোল্ডেন বুটের লড়াইও গড়িয়েছে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দুটি গোল করার পর এমবাপ্পে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসির চেয়ে দুই গোল এগিয়ে গেছেন।

মেসির সামনে এখনও একটি সুযোগ রয়েছে। রোববার স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে যদি ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন দুটি গোল করেন, তাহলে এমবাপ্পের সমান গোল হবে তার। সে ক্ষেত্রে বেশি অ্যাসিস্ট থাকার কারণে গোল্ডেন বুট জিতবেন মেসিই।

কিন্তু মেসি যদি দুটি গোলের কম করেন, তাহলে দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতবেন ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে দুইবার এই পুরস্কার জেতা প্রথম ফুটবলারও হবেন তিনি।

গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন জুড বেলিংহ্যাম। ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে তার গোলসংখ্যা হয়েছে সাত, যা এক আসরের বিশ্বকাপে কোনো ইংলিশ ফুটবলারের সর্বোচ্চ।

অ্যাসিস্টে এগিয়ে থাকায় তিনি নরওয়ের এরলিং হাল্যান্ডকে পেছনে ফেলেছেন। আর ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলের গোলসংখ্যা ছয়।

অর্থাৎ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ শেষ হলেও বিশ্বকাপের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত লড়াই এখনও বাকি। এমবাপ্পে নিজের কাজ শেষ করে অপেক্ষায়। এখন বল মেসির কোর্টে।