বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে গত দুই দশক ধরে ইউরোপীয় ফুটবলে আধিপত্য দেখানো স্পেন।
কাগজে কলমে এটি দুটি দেশের লড়াই। কিন্তু গল্পটি শুধু এখানেই শেষ নয়।
এই ম্যাচের আড়ালে আছে আরও একটি গল্প। যে গল্পের শুরু বার্সেলোনার একটি পুরোনো খামারবাড়ি থেকে।
সেই খামারবাড়ির নাম লা মাসিয়া।
বিশ্ব ফুটবলে এমন অনেক একাডেমি আছে, যেখানে খেলোয়াড় তৈরি হয়। কিন্তু লা মাসিয়া শুধু খেলোয়াড় তৈরি করে না। এটি একটি দর্শন শেখায়। একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলে। বল পায়ে রেখে কীভাবে ফুটবল খেলতে হয়, কীভাবে দল হিসেবে ভাবতে হয়, কীভাবে প্রতিভাকে শৃঙ্খলার সঙ্গে বড় করতে হয়, সেই শিক্ষা শুরু হয় এখানেই।
অনেকে বলেন, টিকি টাকার জন্ম যেখানেই হোক, তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই লা মাসিয়াতেই।
১৭০২ সালে নির্মিত একটি পুরোনো খামারবাড়ি। ১৯৭৯ সালে সেটিকেই নিজেদের যুব একাডেমিতে রূপ দেয় বার্সেলোনা। দূর দূরান্ত থেকে আসা কিশোর ফুটবলাররা থাকতো সেখানে। পড়াশোনা করত, অনুশীলন করত, একসঙ্গে খেত, একসঙ্গে বড় হতো।
২০১১ সালে একাডেমিটি আধুনিক ভবনে স্থানান্তর করা হয়। এখন এটি বার্সেলোনার সিউতাত এসপোর্তিভা জোয়ান গাম্পার ক্রীড়া কমপ্লেক্সের অংশ। কিন্তু নামটি বদলায়নি। আজও সবাই সেটিকে লা মাসিয়াই বলে।
এই একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন পেপ গার্দিওলা, কার্লেস পুয়োল, জেরার্ড পিকে, সার্জিও বুসকেতস, ভিক্টর ভালদেস, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজ, সেস ফ্যাব্রেগাস এবং অবশ্যই লিওনেল মেসি।
এই ফুটবলারদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাব দল। পরে সেই দর্শন ছড়িয়ে পড়ে স্পেন জাতীয় দলেও। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পেছনেও ছিল লা মাসিয়ার সেই ফুটবল দর্শনের বড় প্রভাব।
লা মাসিয়ার ভিত্তি আরও শক্ত করেন ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ। বার্সেলোনার ফুটবল পরিচয়, ছোট ছোট পাস, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণভিত্তিক খেলার যে ধারা আজ পরিচিত, তার স্থপতি ছিলেন তিনি।
এই ফাইনালে সবচেয়ে বড় গল্পটি অবশ্য দুই প্রজন্মকে ঘিরে।
২০০০ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহর থেকে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর লা মাসিয়ায় যোগ দিয়েছিল। সেই কিশোরের নাম লিওনেল মেসি।
লা মাসিয়ার মাঠে বেড়ে ওঠা সেই ছেলেটিই পরে হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। বার্সেলোনার ইতিহাস বদলে দেন। ফুটবলের ইতিহাসও।
আর মেসি যখন একের পর এক ব্যালন ডি অর জিতছেন, তখন ২০১৪ সালে মাত্র সাত বছর বয়সী আরেকটি ছেলে যোগ দেয় একই একাডেমিতে।
তার নাম লামিন ইয়ামাল।
অদ্ভুত এক কাকতালীয় ঘটনা এই দুই প্রজন্মকে আরও কাছাকাছি এনে দেয়।
২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ফটোশুটে শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়েছিলেন তরুণ মেসি। তখন কেউ জানত না, সেই শিশুই একদিন স্পেনের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে দাঁড়িয়ে মেসির প্রতিপক্ষ হবে।
ছবিটি অনেক বছর পর প্রকাশ্যে আসে। ইউরো ২০২৪ চলাকালে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে ছবিটি যেন ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার পর ক্লাবে তার ১০ নম্বর জার্সির উত্তরাধিকার নিয়েও শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ইয়ামালকে দেখা হয় সেই ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে।
তবে স্পেন দলে লা মাসিয়ার প্রতিনিধি শুধু ইয়ামাল নন। গাভি, পাও কুবারসি, দানি ওলমোসহ আরও কয়েকজন এই একাডেমির পথ ধরে উঠে এসেছেন। তাদের অনেকের শৈশবের নায়ক ছিলেন মেসি। টেলিভিশনের পর্দায় যাকে দেখে বড় হয়েছেন, এবার সেই মানুষটির বিপক্ষেই খেলবেন বিশ্বকাপের ফাইনাল।
লা মাসিয়ার গল্প অবশ্য সব সময় সহজ ছিল না।
একসময় বার্সেলোনার প্রথম দলে জায়গা পাওয়া ছিল একাডেমির খেলোয়াড়দের জন্য স্বপ্নের মতো। ২০১২ সালে লেভান্তের বিপক্ষে একটি ম্যাচে বার্সেলোনার হয়ে মাঠে নেমেছিলেন ১১ জন নিজেদের একাডেমিতে গড়ে ওঠা ফুটবলার। সেটি ছিল এক অনন্য মুহূর্ত।
কিন্তু পরে বিশ্বের সেরা তারকাদের ভিড়ে নতুনদের সুযোগ কমে যায়। অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার অন্য ক্লাবে চলে যেতে বাধ্য হন। সেস্ক ফ্যাব্রেগাস মাত্র ১৬ বছর বয়সে আর্সেনালে যোগ দেন। পরে তিনি বলেছিলেন, সামনে এত বড় বড় তারকা থাকায় বার্সেলোনায় সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল।
তবু লা মাসিয়া থেমে থাকেনি।
প্রজন্ম বদলেছে। মুখ বদলেছে। কিন্তু দর্শন বদলায়নি।
আজ বিশ্বকাপের ফাইনালে একদিকে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। অন্যদিকে লামিন ইয়ামালদের নতুন প্রজন্ম।
একজন লা মাসিয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। অন্যজন সেই আকাশের নতুন আলো।
ফাইনালে ট্রফি জিতবে হয় আর্জেন্টিনা, নয়তো স্পেন।
কিন্তু ফল যাই হোক, এই ম্যাচের শেষে আরেকটি নামও বিজয়ীর মতো উচ্চারিত হবে।
সেটি লা মাসিয়া।
কারণ মাঠে দুটি দেশের পতাকা উড়লেও, ফুটবলের এই অসাধারণ গল্পটির জন্ম হয়েছিল বার্সেলোনার সেই পুরোনো খামারবাড়িতেই।


স্যার গ্যারি সোবার্সকে কেন ক্রিকেটবিশ্ব মনে রাখবে
