স্পেন–আর্জেন্টিনা: ফাইনালটা ফাইনালের চেয়েও বেশি কিছু
স্পেনের ফুটবল ‘টিকি-টাকা’র জন্য পরিচিত। তবে বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে তারা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও গতিময় ফুটবল খেলছে। আরেকদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই আবেগ, নাটকীয়তা আর টানটান উত্তেজনা।
শিহাব আহসান খান
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ পিএমআপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
স্পেন–আর্জেন্টিনা: ফাইনালটা ফাইনালের চেয়েও বেশি কিছু
লুই দে লা ফুয়েন্তের কোচিং কোর্সের ছাত্র ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। কিন্তু এর বাইরেও তার সঙ্গে ছিল একটা আলাদা সখ্যতা। লা ফুয়েন্তেও এখনও তা লালন করেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালের পর তো তিনি বলেই দিয়েছিলেন, ফাইনালে চান আর্জেন্টিনাকে।
আরও একটা ছবিও সম্প্রতি প্রায়ই ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একটা ছোট্ট বাথটাবে বসে আছে একটা শিশু, মেসি তাকে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন। একটা চ্যারাটি ক্যালেন্ডারের জন্য তোলা ছবিটি এখন আলোচিত পুরো বিশ্বজুড়ে। কারণ বাথটাবে বসে থাকা ছেলেটির নাম যে লামিন ইয়ামাল!
ছোট্ট বয়সে কাতালুনিয়ায় পাড়ি জমানো লিওনেল মেসি নিজেকে গড়ে তুলেছেন লা মাসিয়া ও বার্সেলোনায়। সেখানেই গড়ে উঠেছেন স্পেনের নতুন স্বপ্নসারথী লামিন ইয়ামালও। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের দ্বৈরথটা তাই একটু বাড়তি কিছুই…
দুই দলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
ফুটবল ইতিহাসে দুই দেশের পথচলা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একসময় স্পেনের দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় থাকলেও বড় মঞ্চে তারা সফল হতে পারত না। তবে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের ‘সোনালী প্রজন্মে’র হাত ধরে সেই খরা কাটে। ২০১০ বিশ্বকাপও জেতে তারা।
স্পেনের ফুটবল ঐতিহাসিকভাবে ‘টিকি-টাকা’ (ছোট ছোট পাসে বল দখলে রাখা)-র জন্য পরিচিত। তবে বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে তারা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও গতিময় ফুটবল খেলছে। মাঝমাঠে রদ্রির নিখুঁত পাসিংয়ের পাশাপাশি দুই উইংয়ে তরুণ ইয়ামাল–নিকো উইলিয়ামসদের গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
আরেকদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই আবেগ, নাটকীয়তা আর টানটান উত্তেজনা। তিনবারের বিশ্বজয়ীরা মাঠে নামে কোটি ভক্তের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে। কোচ লিওনেল স্কালোনি দলে এমন এক কৌশল তৈরি করেছেন যেখানে বাকি খেলোয়াড়রা জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করে লিওনেল মেসির জন্য। আর মেসি সেখানে তার জাদুকরী ফুটবল শৈলী ফুটিয়ে তোলেন।
ফাইনালের পথ
চলতি বিশ্বকাপে দুই দলই তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই গোলশূন্য ড্র হওয়া পর প্রায় পুরো টুর্নামেন্টে তারা নিখুঁত ফুটবল খেলেছে। পুরো টুর্নামেন্টে গোল হজম করেছে মাত্র একটি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা নিজেদের রক্ষণ ও আক্রমণের অবিশ্বাস্য ভারসাম্য দেখিয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স ওই ম্যাচে তেমন সুযোগই তৈরি করতে পারেনি!
আর্জেন্টিনার ফাইনালের পথটা ছিল কঠিন ও নাটকীয়। কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে ম্যাচ জিততে হয়েছে তাদের, মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও একটা সময় দুই গোলে পিছিয়ে ছিল তারা। সেমিফাইনালেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও মেসির জাদুকরী অ্যাসিস্টে ২–১ গোলের দারুণ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। গোল হজমের পর ৩০ মিনিট দুর্দান্ত ফুটবল খেলে তারা।
মাঠের মূল লড়াই ও কৌশল
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই মহালড়াইয়ে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করতে পারে মূলত তিনটি মূল দ্বৈরথ।
রদ্রি বনাম ডি পল: স্পেনের মাঝমাঠের চালিকাশক্তি রদ্রিকে থামানোই হবে আর্জেন্টিনার মূল লক্ষ্য। রদ্রিকে বোতলবন্দী করার জন্য আর্জেন্টিনার রদ্রিগো ডি পলকে শুরু থেকেই কড়া প্রেসিং করতে হবে। তাঁর বদলে শেষ ম্যাচে খেলতে নামা জিউলিয়ানি সিমিওনে যদি ফাইনালেও শুরুর একাদশে থাকেন তাহলে তাঁরও দায়িত্বটা একই থাকবে।
উইংয়ের যুদ্ধ: স্পেনের ডান প্রান্তে ১৯ বছরের লামিন ইয়ামালের গতি সামলানো আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের জন্য বড় পরীক্ষা। ইয়ামালকে থামাতে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
মেসিকে থামাবেন কে: মেসি এখন আর আগের মতো গতি দিয়ে খেলেন না, বরং ফাঁকা জায়গা তৈরি করে নিখুঁত পাস দিতে ভালোবাসেন। স্পেনের রক্ষণভাগের লাপোর্তে ও লে নরম্যানকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে যেন মেসি কোনো সুযোগ না পান। অবশ্য তাতেও কাজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এই বিশ্বকাপে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে ফেলা মেসি আছেন দুর্দান্ত ফর্মে।
ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়
দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস খুবই সমানে-সমান। বিশ্বকাপে এর আগে তারা মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল, ১৯৬৬ সালে সেবার আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২–১ ব্যবধানে।
রোববার লিওনেল মেসি কি আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে তাঁর ক্যারিয়ারের রূপকথার মতো সমাপ্তি টানবেন? নাকি স্পেনের একঝাঁক তরুণ বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক সাম্রাজ্যের সূচনা করবে? নিউ জার্সির মাঠে ফুটবল ইতিহাসের এক অমর অধ্যায় দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব।
বিশ্বকাপ ফাইনাল প্রিভিউ
স্পেন–আর্জেন্টিনা: ফাইনালটা ফাইনালের চেয়েও বেশি কিছু
স্পেনের ফুটবল ‘টিকি-টাকা’র জন্য পরিচিত। তবে বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে তারা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও গতিময় ফুটবল খেলছে। আরেকদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই আবেগ, নাটকীয়তা আর টানটান উত্তেজনা।
লুই দে লা ফুয়েন্তের কোচিং কোর্সের ছাত্র ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। কিন্তু এর বাইরেও তার সঙ্গে ছিল একটা আলাদা সখ্যতা। লা ফুয়েন্তেও এখনও তা লালন করেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালের পর তো তিনি বলেই দিয়েছিলেন, ফাইনালে চান আর্জেন্টিনাকে।
আরও একটা ছবিও সম্প্রতি প্রায়ই ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একটা ছোট্ট বাথটাবে বসে আছে একটা শিশু, মেসি তাকে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন। একটা চ্যারাটি ক্যালেন্ডারের জন্য তোলা ছবিটি এখন আলোচিত পুরো বিশ্বজুড়ে। কারণ বাথটাবে বসে থাকা ছেলেটির নাম যে লামিন ইয়ামাল!
ছোট্ট বয়সে কাতালুনিয়ায় পাড়ি জমানো লিওনেল মেসি নিজেকে গড়ে তুলেছেন লা মাসিয়া ও বার্সেলোনায়। সেখানেই গড়ে উঠেছেন স্পেনের নতুন স্বপ্নসারথী লামিন ইয়ামালও। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের দ্বৈরথটা তাই একটু বাড়তি কিছুই…
দুই দলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
ফুটবল ইতিহাসে দুই দেশের পথচলা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একসময় স্পেনের দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় থাকলেও বড় মঞ্চে তারা সফল হতে পারত না। তবে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের ‘সোনালী প্রজন্মে’র হাত ধরে সেই খরা কাটে। ২০১০ বিশ্বকাপও জেতে তারা।
স্পেনের ফুটবল ঐতিহাসিকভাবে ‘টিকি-টাকা’ (ছোট ছোট পাসে বল দখলে রাখা)-র জন্য পরিচিত। তবে বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে তারা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও গতিময় ফুটবল খেলছে। মাঝমাঠে রদ্রির নিখুঁত পাসিংয়ের পাশাপাশি দুই উইংয়ে তরুণ ইয়ামাল–নিকো উইলিয়ামসদের গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
আরেকদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই আবেগ, নাটকীয়তা আর টানটান উত্তেজনা। তিনবারের বিশ্বজয়ীরা মাঠে নামে কোটি ভক্তের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে। কোচ লিওনেল স্কালোনি দলে এমন এক কৌশল তৈরি করেছেন যেখানে বাকি খেলোয়াড়রা জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করে লিওনেল মেসির জন্য। আর মেসি সেখানে তার জাদুকরী ফুটবল শৈলী ফুটিয়ে তোলেন।
ফাইনালের পথ
চলতি বিশ্বকাপে দুই দলই তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই গোলশূন্য ড্র হওয়া পর প্রায় পুরো টুর্নামেন্টে তারা নিখুঁত ফুটবল খেলেছে। পুরো টুর্নামেন্টে গোল হজম করেছে মাত্র একটি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা নিজেদের রক্ষণ ও আক্রমণের অবিশ্বাস্য ভারসাম্য দেখিয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স ওই ম্যাচে তেমন সুযোগই তৈরি করতে পারেনি!
আর্জেন্টিনার ফাইনালের পথটা ছিল কঠিন ও নাটকীয়। কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে ম্যাচ জিততে হয়েছে তাদের, মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও একটা সময় দুই গোলে পিছিয়ে ছিল তারা। সেমিফাইনালেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও মেসির জাদুকরী অ্যাসিস্টে ২–১ গোলের দারুণ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। গোল হজমের পর ৩০ মিনিট দুর্দান্ত ফুটবল খেলে তারা।
মাঠের মূল লড়াই ও কৌশল
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই মহালড়াইয়ে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করতে পারে মূলত তিনটি মূল দ্বৈরথ।
রদ্রি বনাম ডি পল: স্পেনের মাঝমাঠের চালিকাশক্তি রদ্রিকে থামানোই হবে আর্জেন্টিনার মূল লক্ষ্য। রদ্রিকে বোতলবন্দী করার জন্য আর্জেন্টিনার রদ্রিগো ডি পলকে শুরু থেকেই কড়া প্রেসিং করতে হবে। তাঁর বদলে শেষ ম্যাচে খেলতে নামা জিউলিয়ানি সিমিওনে যদি ফাইনালেও শুরুর একাদশে থাকেন তাহলে তাঁরও দায়িত্বটা একই থাকবে।
উইংয়ের যুদ্ধ: স্পেনের ডান প্রান্তে ১৯ বছরের লামিন ইয়ামালের গতি সামলানো আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের জন্য বড় পরীক্ষা। ইয়ামালকে থামাতে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
মেসিকে থামাবেন কে: মেসি এখন আর আগের মতো গতি দিয়ে খেলেন না, বরং ফাঁকা জায়গা তৈরি করে নিখুঁত পাস দিতে ভালোবাসেন। স্পেনের রক্ষণভাগের লাপোর্তে ও লে নরম্যানকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে যেন মেসি কোনো সুযোগ না পান। অবশ্য তাতেও কাজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এই বিশ্বকাপে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে ফেলা মেসি আছেন দুর্দান্ত ফর্মে।
ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়
দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস খুবই সমানে-সমান। বিশ্বকাপে এর আগে তারা মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল, ১৯৬৬ সালে সেবার আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২–১ ব্যবধানে।
রোববার লিওনেল মেসি কি আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে তাঁর ক্যারিয়ারের রূপকথার মতো সমাপ্তি টানবেন? নাকি স্পেনের একঝাঁক তরুণ বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক সাম্রাজ্যের সূচনা করবে? নিউ জার্সির মাঠে ফুটবল ইতিহাসের এক অমর অধ্যায় দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব।
বিষয়: