ফুটবলের ভিএআর আসলে কী, কীভাবে কাজ করে, রেফারির সিদ্ধান্ত কি বদলাতে পারে
প্রযুক্তি একজন খেলোয়াড় কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তা হয়তো দেখতে পারে কিন্তু কখনো মানুষের ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘মনস্তত্ত্ব’ বিচার করতে পারে না। যেমন, হ্যান্ডবলটি কি ইচ্ছাকৃত ছিল? শারীরিক সংস্পর্শ কি পেনাল্টি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল? ডিফেন্ডার কি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন?
শিহাব আহসান খান
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ পিএমআপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
বাঁশিটা বাজানোর সঙ্গে রেফারি সংকেত দিলেন পেনাল্টিরও। প্রতিবাদে তাকে ঘিরে ধরেন খেলোয়াড়রা। এরপরই চেনা সেই দৃশ্য, রেফারি কানের ইয়ারপিসে হাত দেন। কিছুক্ষণ পর বাতাসে একটা চতুর্ভুজ আকৃতি আঁকলেন। স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে এল পিনপতন নীরবতা।
টেলিভিশনের সামনে বসা কোটি কোটি দর্শকও অপেক্ষায়। মাঠের কোলাহল থেকে দূরে, পর্দায় ঘেরা একটা কক্ষে একদল রেফারি ততক্ষণে প্রতিটি কোণ থেকে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছেন। এসব দৃশ্য এখন ফুটবল ম্যাচের সময় দেখা যায় নিয়মিতই।
এটাই আসলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি, যা ফুটবল বিশ্বে ‘ভিএআর’ নামেই বেশি পরিচিত। মাঠের ‘স্পষ্ট ও গুরুতর’ ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার লক্ষ্যে চালু হওয়া ভিএআর আধুনিক ফুটবলকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপের সময়ই ভিএআর নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিতর্কও। ভিএআর আসলে কী, কীভাবে কাজ করে সেটি বোঝা যাক।
ভিএআর কী?
ভিএআর হলো ‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি’ কথাটার সংক্ষিপ্ত রূপ। অভিজ্ঞ ম্যাচ অফিশিয়ালদের একটা দল, যাঁরা একটি নির্দিষ্ট ভিডিও অপারেশন রুম (ভিওআর) থেকে অসংখ্য ক্যামেরার সাহায্যে পুরো ম্যাচের ওপর নজর রাখেন।
তাদের কাজও খুব সুনির্দিষ্ট। রেফারিকে কোনো স্পষ্ট ও গুরুতর ভুল এড়াতে অথবা তার চোখ এড়িয়ে যাওয়া কোনো বড় ঘটনা চিহ্নিত করতে সাহায্য করা। তবে ভিএআরের নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় রেফারিই নেবেন।’
তাদের ব্যাখ্যাটা সহজ, ভিএআরের কাজ রেফারিকে সহায়তা করা, তার জায়গা নেওয়া নয়।
ফুটবল খেলার পরিস্থিতি বদলে ফেলতে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট হয়ে যায় কখনো কখনো। বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, রেফারির নজর এড়িয়ে কোনো হ্যান্ডবল হয়েছে কি না, কিংবা অফসাইডের মতো সূক্ষ্ম বিষয়ে মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিতে গেলে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু দশকের পর দশক ধরে এই ধরনের ভুলগুলোই বিভিন্ন চ্যাম্পিয়নশিপ, দলগুলোর রেলিগেশন, এমনকি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসের ভাগ্যও বদলে দিয়েছে। খেলার গতিতে যতটা সম্ভব কম বাধা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো শতভাগ নির্ভুল করার লক্ষ্যেই তাই ফিফা এবং আইএফএবি ভিএআর প্রযুক্তি চালু করে।
কীভাবে কাজ করে ভিএআর?
কোনো সিদ্ধান্তের পর দর্শকরা মাঠে শুধু রেফারির অপেক্ষার দৃশ্যটুকুই দেখেন, তবে এর পেছনে বড় একটা টিম কাজ করে। ভিডিও অপারেশন রুমের ভেতর থাকেন একজন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি, এক বা একাধিক সহকারী ভিএআর, যারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিটি ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল সরবরাহ করবেন এমন কয়েকজন রিপ্লে অপারেটর।
পুরো ম্যাচজুড়ে প্রতিটি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন তারা। যখনই কোনো বিতর্কিত বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তারা সঙ্গে সঙ্গে তা খতিয়ে দেখা শুরু করে। সবকিছু ঠিক থাকলে তারা রেফারিকে জানান ‘চেক কমপ্লিট।‘ সেক্ষেত্রে কোনো বিরতি ছাড়াই খেলা চলতে থাকে। আর যদি তারা মনে করেন মাঠের রেফারি কোনো বড় ভুল করেছেন, তবে তারা রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন।
কোন কোন সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে পারে ভিএআর?
ভিএআর কিন্তু মাঠের প্রতিটি ফাউল বা রেফারির সব সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখে না। ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, কেবল চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারে তারা। সেগুলো হলো, গোল, পেনাল্টি, সরসারি লাল কার্ড আর লাল কার্ডের ক্ষেত্রে ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ।
গোলের ঠিক আগে কোনো অফসাইড, হ্যান্ডবল, ফাউল বা নিয়মবহির্ভূত কিছু হয়েছিল কি না তা দেখা ও সেই অনুযায়ী রেফারিকে পরামর্শ দিতে পারে ভিএআর। পেনাল্টি দেওয়া উচিত হয়েছে কি না, কিংবা পেনাল্টি পাওয়ার মতো ঘটনা হাতছাড়া হলো কি না তাও জানাতে পারে। কেবল সরাসরি লাল কার্ডের ক্ষেত্রেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে মাঠ ছাড়ার ঘটনা এর আওতায় পড়বে না। এছাড়া রেফারি যদি ভুল করে অন্য কোনো খেলোয়াড়কে কার্ড দেখান, তাহলেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই ৪টি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে ভিএআরের ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।
ভিএআর কি রেফারির সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারে?
এক কথায় উত্তর হলো না। ভিএআরকে নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি এটি। ভিএআর নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না। কেবল রেফারিকে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিতে পারে। এরপর রেফারির সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। ভিএআর থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি মেনে নেওয়া অথবা মাঠের পাশে থাকা ‘রেফারি রিভিউ এরিয়া’র মনিটরে নিজে গিয়ে ঘটনাটি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। দুটি ক্ষেত্রেই রেফারিই মাঠের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।
মাঝে মাঝে দেখা যায় রেফারি মাঠের পাশে রাখা একটি মনিটরের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। একেই বলা হয় ‘অন-ফিল্ড রিভিউ’ । রেফারি সেখানে বিভিন্ন কোণ থেকে নেওয়া রিপ্লেগুলো দেখেন এবং আগের সিদ্ধান্তেই বহাল থাকবেন নাকি তা পরিবর্তন করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেন। তবে অফসাইডের মতো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রেফারিকে সাধারণত মনিটর দেখতে হয় না, কারণ তা প্রযুক্তির নিখুঁত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়।
ভিএআর কি প্রতিটা ঘটনাই পরীক্ষা করে?
হ্যাঁ করে। তবে প্রতিটি পরীক্ষার জন্য খেলা থামাতে হয় না। প্রতিটি গোল, পেনাল্টির আবেদন, লাল কার্ডের ঘটনা ও ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নীরবে সবসময়ই পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যায়। বেশিরভাগ রিভিউ মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। ভিএআর দল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে ফেলায় দর্শকরা অনেক সময় তা টেরই পান না।
অফসাইডের সিদ্ধান্ত এত নিখুঁত হয় কেন?
আধুনিক টুর্নামেন্টগুলোতে ভিএআরের পাশাপাশি ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হয়। একাধিক ট্র্যাকিং ক্যামেরা প্রতিটি খেলোয়াড়ের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে ও বলের ভেতরের সেন্সর নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে যে বলটিতে ঠিক কোন মুহূর্তে কিক করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তি একটা থ্রিডি মডেল তৈরি করে নির্ধারণ করে যে আক্রমণকারী খেলোয়াড়টি রক্ষণভাগের শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন কি না। এরপরও ভিএআর অফিশিয়ালরা সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করার পরই তা রেফারিকে জানান।
প্রযুক্তি থাকার পরও বিতর্ক কেন রয়ে গেছে?
প্রযুক্তি একজন খেলোয়াড় কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তা হয়তো দেখতে পারে কিন্তু কখনো মানুষের ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘মনস্তত্ত্ব’ বিচার করতে পারে না। যেমন, হ্যান্ডবলটি কি ইচ্ছাকৃত ছিল? শারীরিক সংস্পর্শ কি পেনাল্টি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল? ডিফেন্ডার কি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। ফিফার সাবেক কিংবদন্তি রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা বারবার বলেছেন, ভিএআর বস্তুগত ভুলগুলো দূর করে ঠিকই, কিন্তু ফুটবলে মানুষের বিচারবুদ্ধির প্রয়োজন সবসময়ই থাকবে। কারণ সব পরিস্থিতিকে কেবল প্রযুক্তির ফ্রেমে বাঁধা সম্ভব নয়।
ফুটবলের ভিএআর আসলে কী, কীভাবে কাজ করে, রেফারির সিদ্ধান্ত কি বদলাতে পারে
প্রযুক্তি একজন খেলোয়াড় কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তা হয়তো দেখতে পারে কিন্তু কখনো মানুষের ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘মনস্তত্ত্ব’ বিচার করতে পারে না। যেমন, হ্যান্ডবলটি কি ইচ্ছাকৃত ছিল? শারীরিক সংস্পর্শ কি পেনাল্টি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল? ডিফেন্ডার কি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন?
বাঁশিটা বাজানোর সঙ্গে রেফারি সংকেত দিলেন পেনাল্টিরও। প্রতিবাদে তাকে ঘিরে ধরেন খেলোয়াড়রা। এরপরই চেনা সেই দৃশ্য, রেফারি কানের ইয়ারপিসে হাত দেন। কিছুক্ষণ পর বাতাসে একটা চতুর্ভুজ আকৃতি আঁকলেন। স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে এল পিনপতন নীরবতা।
টেলিভিশনের সামনে বসা কোটি কোটি দর্শকও অপেক্ষায়। মাঠের কোলাহল থেকে দূরে, পর্দায় ঘেরা একটা কক্ষে একদল রেফারি ততক্ষণে প্রতিটি কোণ থেকে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছেন। এসব দৃশ্য এখন ফুটবল ম্যাচের সময় দেখা যায় নিয়মিতই।
এটাই আসলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি, যা ফুটবল বিশ্বে ‘ভিএআর’ নামেই বেশি পরিচিত। মাঠের ‘স্পষ্ট ও গুরুতর’ ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার লক্ষ্যে চালু হওয়া ভিএআর আধুনিক ফুটবলকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপের সময়ই ভিএআর নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিতর্কও। ভিএআর আসলে কী, কীভাবে কাজ করে সেটি বোঝা যাক।
ভিএআর কী?
ভিএআর হলো ‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি’ কথাটার সংক্ষিপ্ত রূপ। অভিজ্ঞ ম্যাচ অফিশিয়ালদের একটা দল, যাঁরা একটি নির্দিষ্ট ভিডিও অপারেশন রুম (ভিওআর) থেকে অসংখ্য ক্যামেরার সাহায্যে পুরো ম্যাচের ওপর নজর রাখেন।
তাদের কাজও খুব সুনির্দিষ্ট। রেফারিকে কোনো স্পষ্ট ও গুরুতর ভুল এড়াতে অথবা তার চোখ এড়িয়ে যাওয়া কোনো বড় ঘটনা চিহ্নিত করতে সাহায্য করা। তবে ভিএআরের নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় রেফারিই নেবেন।’
তাদের ব্যাখ্যাটা সহজ, ভিএআরের কাজ রেফারিকে সহায়তা করা, তার জায়গা নেওয়া নয়।
কেন চালু করা হয়েছিল ভিএআর?
ফুটবল খেলার পরিস্থিতি বদলে ফেলতে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট হয়ে যায় কখনো কখনো। বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, রেফারির নজর এড়িয়ে কোনো হ্যান্ডবল হয়েছে কি না, কিংবা অফসাইডের মতো সূক্ষ্ম বিষয়ে মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিতে গেলে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু দশকের পর দশক ধরে এই ধরনের ভুলগুলোই বিভিন্ন চ্যাম্পিয়নশিপ, দলগুলোর রেলিগেশন, এমনকি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসের ভাগ্যও বদলে দিয়েছে। খেলার গতিতে যতটা সম্ভব কম বাধা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো শতভাগ নির্ভুল করার লক্ষ্যেই তাই ফিফা এবং আইএফএবি ভিএআর প্রযুক্তি চালু করে।
কীভাবে কাজ করে ভিএআর?
কোনো সিদ্ধান্তের পর দর্শকরা মাঠে শুধু রেফারির অপেক্ষার দৃশ্যটুকুই দেখেন, তবে এর পেছনে বড় একটা টিম কাজ করে। ভিডিও অপারেশন রুমের ভেতর থাকেন একজন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি, এক বা একাধিক সহকারী ভিএআর, যারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিটি ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল সরবরাহ করবেন এমন কয়েকজন রিপ্লে অপারেটর।
পুরো ম্যাচজুড়ে প্রতিটি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন তারা। যখনই কোনো বিতর্কিত বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তারা সঙ্গে সঙ্গে তা খতিয়ে দেখা শুরু করে। সবকিছু ঠিক থাকলে তারা রেফারিকে জানান ‘চেক কমপ্লিট।‘ সেক্ষেত্রে কোনো বিরতি ছাড়াই খেলা চলতে থাকে। আর যদি তারা মনে করেন মাঠের রেফারি কোনো বড় ভুল করেছেন, তবে তারা রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন।
কোন কোন সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে পারে ভিএআর?
ভিএআর কিন্তু মাঠের প্রতিটি ফাউল বা রেফারির সব সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখে না। ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, কেবল চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারে তারা। সেগুলো হলো, গোল, পেনাল্টি, সরসারি লাল কার্ড আর লাল কার্ডের ক্ষেত্রে ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ।
গোলের ঠিক আগে কোনো অফসাইড, হ্যান্ডবল, ফাউল বা নিয়মবহির্ভূত কিছু হয়েছিল কি না তা দেখা ও সেই অনুযায়ী রেফারিকে পরামর্শ দিতে পারে ভিএআর। পেনাল্টি দেওয়া উচিত হয়েছে কি না, কিংবা পেনাল্টি পাওয়ার মতো ঘটনা হাতছাড়া হলো কি না তাও জানাতে পারে। কেবল সরাসরি লাল কার্ডের ক্ষেত্রেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে মাঠ ছাড়ার ঘটনা এর আওতায় পড়বে না। এছাড়া রেফারি যদি ভুল করে অন্য কোনো খেলোয়াড়কে কার্ড দেখান, তাহলেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই ৪টি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে ভিএআরের ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।
ভিএআর কি রেফারির সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারে?
এক কথায় উত্তর হলো না। ভিএআরকে নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি এটি। ভিএআর নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না। কেবল রেফারিকে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিতে পারে। এরপর রেফারির সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। ভিএআর থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি মেনে নেওয়া অথবা মাঠের পাশে থাকা ‘রেফারি রিভিউ এরিয়া’র মনিটরে নিজে গিয়ে ঘটনাটি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। দুটি ক্ষেত্রেই রেফারিই মাঠের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।
‘অন-ফিল্ড রিভিউ’ কী?
মাঝে মাঝে দেখা যায় রেফারি মাঠের পাশে রাখা একটি মনিটরের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। একেই বলা হয় ‘অন-ফিল্ড রিভিউ’ । রেফারি সেখানে বিভিন্ন কোণ থেকে নেওয়া রিপ্লেগুলো দেখেন এবং আগের সিদ্ধান্তেই বহাল থাকবেন নাকি তা পরিবর্তন করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেন। তবে অফসাইডের মতো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রেফারিকে সাধারণত মনিটর দেখতে হয় না, কারণ তা প্রযুক্তির নিখুঁত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়।
ভিএআর কি প্রতিটা ঘটনাই পরীক্ষা করে?
হ্যাঁ করে। তবে প্রতিটি পরীক্ষার জন্য খেলা থামাতে হয় না। প্রতিটি গোল, পেনাল্টির আবেদন, লাল কার্ডের ঘটনা ও ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নীরবে সবসময়ই পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যায়। বেশিরভাগ রিভিউ মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। ভিএআর দল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে ফেলায় দর্শকরা অনেক সময় তা টেরই পান না।
অফসাইডের সিদ্ধান্ত এত নিখুঁত হয় কেন?
আধুনিক টুর্নামেন্টগুলোতে ভিএআরের পাশাপাশি ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হয়। একাধিক ট্র্যাকিং ক্যামেরা প্রতিটি খেলোয়াড়ের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে ও বলের ভেতরের সেন্সর নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে যে বলটিতে ঠিক কোন মুহূর্তে কিক করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তি একটা থ্রিডি মডেল তৈরি করে নির্ধারণ করে যে আক্রমণকারী খেলোয়াড়টি রক্ষণভাগের শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন কি না। এরপরও ভিএআর অফিশিয়ালরা সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করার পরই তা রেফারিকে জানান।
প্রযুক্তি থাকার পরও বিতর্ক কেন রয়ে গেছে?
প্রযুক্তি একজন খেলোয়াড় কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তা হয়তো দেখতে পারে কিন্তু কখনো মানুষের ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘মনস্তত্ত্ব’ বিচার করতে পারে না। যেমন, হ্যান্ডবলটি কি ইচ্ছাকৃত ছিল? শারীরিক সংস্পর্শ কি পেনাল্টি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল? ডিফেন্ডার কি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। ফিফার সাবেক কিংবদন্তি রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা বারবার বলেছেন, ভিএআর বস্তুগত ভুলগুলো দূর করে ঠিকই, কিন্তু ফুটবলে মানুষের বিচারবুদ্ধির প্রয়োজন সবসময়ই থাকবে। কারণ সব পরিস্থিতিকে কেবল প্রযুক্তির ফ্রেমে বাঁধা সম্ভব নয়।