ঢাকার উত্তরাতে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলো আদনান কবীর। ২০১৭ সালের ৬ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কে আদনানকে মারধর ও কুপিয়ে জখম করে তারই বন্ধু-সহপাঠীরা। আশপাশের লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার একদিন পর গণমাধ্যমকে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, উত্তরা থেকে তুরাগ ও টঙ্গী পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু কিশোর-তরুণ ‘নাইন স্টার’ ও ‘ডিসকো’ গ্রুপের সদস্য।
দুই গ্রুপের নেতারা পড়াশোনা না করলেও সদস্যরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। কিছুদিন আগে ডিসকো গ্রুপের কয়েকজন নাইন স্টার গ্রুপের এক সদস্যকে মারধর করে। এর বদলা হিসেবে তুরাগে ডিসকো গ্রুপের তিন সদস্যের ওপর হামলা চালায় নাইন স্টার। এ সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন তাদের একজন সদস্য। এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আদনানদের দল।
নাইন স্টারের গ্রুপের ওপর হামলা করার জন্য উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে উপস্থিত হয় আদনানসহ আরও তিনজন। দলের সদস্যরা সেখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছানোর কথা। কিন্তু তার আগেই প্রতিপক্ষ তাদের তিনজনের ওপর আক্রমণ চালায়। দুজন দ্রুত পালিয়ে গেলেও আদনানকে তারা আটকে ফেলে। সেখানে বেধড়ক মারধর এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয় আদনানকে। পরে তার মৃত্যু হয়।
আদনান হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়েই বাংলাদেশে ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার উন্মোচিত হয়। এরপর সময়ের সাথে সাথে রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে ভয়ংকর ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
কাগজে-কলমে অলিখিত থাকলেও ২০০১ সালে রাজধানীর উত্তরায় ‘ক্র্যাব’ বা ‘কাঁকড়া গ্রুপ’ তৈরির মাধ্যমে প্রথম ‘গ্যাং কালচার’ প্রথা সাধারণ মানুষের নজরে আসে।
র্যাব সদর দপ্তরের তথ্যে জানা যায়, দেশজুড়ে ২৫০টি কিশোর গ্যাংয়ের ৫ হাজার সদস্য এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
আলোচনায় ‘ভইরা দে’ গ্রুপ
মিরপুরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবার তিন সন্তান। নিরাপত্তার স্বার্থে তার ছোট ছেলের নাম প্রকাশ করতে চাননি। স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার পরিচয় হয় কিশোর গ্যাং নেতা আশিক ওরফে ভাগিনা আশিকের সঙ্গে। এই আশিকই নিয়ন্ত্রণ করে ‘ভইরা দে’ গ্রুপ।
দীর্ঘ আলাপে ছেলেটি জানায় আশিক তাকে একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে যুক্ত করে। সেখান থেকেই জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতে। নির্দেশনা মেনে যাকে-তাকে কুপিয়ে জখম করা, চাঁদা আদায়, টার্গেট করা ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া কিংবা মারামারি করা, সব কিছুতেই অংশ নিয়েছে সে।
দুইবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আসে। কয়েকদিন বিরতির পর আবারও আশিকের ডাকে সাড়া দিয়ে চালাতো অপরাধ কর্মকাণ্ড।
ছেলেটি আলাপ-কে জানায়, ৫ই অগাস্ট পট পরিবর্তনের পর মিরপুর বিহারি ক্যাম্প থেকে তারা বাসা বদল করে অন্য এলাকায় চলে যায়। তারপরও ছাড়া পায়নি, এখনও আশিকের ছত্রছায়ায় চলছে নানা অপরাধমূলক কাজ।
'ভইরা দে' গ্রুপের আরেক সদস্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) আলাপ-কে জানায়, বিদেশ থেকে কোনো এক 'বড় ভাই' এই নেটওয়ার্কের কলকাঠি নাড়ছে। তার ইশারাতেই চলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম। সে নিজেও মনে করে কোনো একদিন হয়তো প্রতিপক্ষের হাতেই তার মৃত্যু হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আশিক একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও নিয়ন্ত্রণ করে ভইরা দে গ্রুপ।
পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা আরও জানান, স্থানীয়ভাবে এই গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন মামুন আর মিঠু নামের দু’জন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে, আশিক বা ‘ভইরা দে’ গ্রুপে পঁচিশ জনের বেশি সদস্য সক্রিয় আছে। ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে আতংক তৈরি, জমি দখল, মাদকের লেনদেনসহ সব ধরনের অপরাধে জড়িত এই গ্রুপের সদস্যরা।
মিরপুরের প্যারিস রোড, বিহারি ক্যাম্প, কালশীসহ আশপাশের এলাকায় এদের অপরাধের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত।
এই গ্রুপের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে টুন্ডা হাসান, রজ্জব, টান আকাশ, আসু, আলফাজ, শিশির, শাহপরান।
চলতি বছরে জুন ও জুলাইয়ের শুরুতে টানা অভিযানে এই গ্রুপের ১০ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তবে গ্যাং প্রধান আশিক এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, গত ২৬এ এপ্রিল দুপুরে পল্লবী এলাকায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে আশিকের নেতৃত্বে ইব্রাহিম, ইমন এবং পারভেজ ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে। এসময় তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেন তিনি। তারপরও আতংকের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
এদিকে ২৬এ জুন সন্ধ্যায় হারুন নামে একজনকে কুপিয়ে আহত করে ভইরা দে গ্রুপের কয়েকজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই গ্রুপের তাণ্ডবে আতংকিত তারা।
ক্যাম্প বা একটু সরু এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে পল্লবী থানা পুলিশ অনেক সময় ঢুকতেও সাহস পায় না।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে ইভটিজিংয়ের শিকার একজন নারী আলাপ-কে জানান, সন্ধ্যার পর পুলিশ এসব এলাকায় নানা বাহানায় আসতে চায় না।
অদ্ভুত সব নামে কিশোর গ্যাং
ঢাকা মহানগর পুলিশের ৮টি অপরাধ বিভাগের ৫০টি থানা এলাকায় আছে একাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ।
কোনো কোনো থানায় ডজনখানেক গ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদপুর, আদাবর, হাতিরঝিল, আগারগাঁও, মিরপুর, দারুসসালাম, পল্লবী, ভাসানটেক, উত্তরা, বাড্ডা-রামপুরা, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ি এলাকায় তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতায় আতংকিত সাধারণ মানুষ।
কব্জি কাটা গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, চিল গ্রুপ, পটেটো গ্রুপ, রক্তচোষা জনি গ্রুপ, পায়তারা গ্রুপ, কাটিং গ্রুপসহ অসংখ্য গ্যাং অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন বা অফলাইন দুই প্ল্যাটফর্মেও চলে তাদের নানান কার্যক্রম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের ভয়ংকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভিডিও বা ছবি নিজেরাই ছড়িয়ে দেয় নেট দুনিয়ায়। এলাকাভিত্তিক শীর্ষ সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ হাত ধরেই শুরু হয় এদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ।
শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাং নেটওয়ার্ক
সন্ত্রাসের জনপদ হিসাবে এখন আলোচনায় মোহাম্মদপুর। সেখানে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের রাজত্ব।
দিন কিংবা রাত যখন যেভাবে চাচ্ছে তারা দিচ্ছে সশস্ত্র মহড়া। চাঁদার দাবিতে বা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ অনেক।
পাটালী গ্রুপ, ভাইস্তা বিল্লাল গ্রুপ, মাউরা সোহেল গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপসহ ২৫টি কিশোর অপরাধ গ্রুপ। যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে কমপক্ষে ১৫ জন ‘বড় ভাই’।
সম্প্রতি এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ।
কব্জি কাটা গ্রুপের আনোয়ার এখন কারাবন্দী। যদিও পুলিশের টানা অভিযানে অনেকে এখন এলাকা ছাড়া।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি আলাপ-কে জানিয়েছেন, এই অপরাধী চক্রের অনেকে মাঝে মাঝে এলাকায় ঢুকে অপরাধ করছে। এরপর আবার কিছু সময়ের জন্য গা ঢাকা দেয়।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেছেন, প্রতি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ২০-৩০ এর মধ্যে হলেও কোনো মিশনে অংশ নেওয়ার সময় পাড়া-মহল্লায় তাদের সেই সংখ্যা বেড়ে শতাধিক হয়ে যায়। এদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে যাচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণকারীরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটনপুলিশের মিডিয়া বিভাগের এডিসি নিয়াজ মেহেদী আলাপ-কে বলেছেন, “এসব কিশোর অপরাধীদের কার্যক্রম নজরদারিতে আছে। তারা যেমন অপরাধের কৌশল পরিবর্তন করে, তেমনি পুলিশও সেই কৌশল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
র্যাবের তথ্যে কিশোর গ্যাং
র্যাবের তালিকায় শুধু মিরপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় রয়েছে ৩২টির মতো কিশোর গ্যাং গ্রুপ।
ঢাকার ৪টি ব্যাটালিয়ন এলাকায় কাগজে-কলমে সদস্য সংখ্যা ২৩৩। যদিও বাস্তবে এর সংখ্যা আরো বেশি।
র্যাবের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছর ৩১ মে পর্যন্ত ৩২৪টি অভিযানে সারাদেশে ১৯২ গ্রুপের ১ হাজার ৭৯৩ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৪৪ জন কিশোরকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী আলাপ-কে বলেছেন, “স্থানীয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব, অশোভন শব্দচয়ন আর নিজেদের ভয়ংকর প্রমাণ করতে অদ্ভুত সব নাম দিয়ে নিজেদের অপরাধ কার্যক্রম চালায় কিশোর গ্যাংগুলো।“
ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমেও তারা নিজেদের বিষয়ে প্রচারণা চালায় বলে জানান তিনি।
এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও বলেন, “র্যাবের ধারাবাহিক অভিযানে কিশোর অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে কিছু অপরাধী আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।“
তাদের বিষয়েও র্যাব খোঁজখবর রাখছে বলেও জানান তিনি।
জামিনে বেরিয়ে আবারো জড়িয়ে পড়ে অপরাধে
তালিকাভুক্ত এসব অপরাধীদের অনেকে কয়েক দফা গ্রেপ্তার হলেও খুব দ্রুতই তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়।
এ বিষয়ে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলাপ-কে বলেন, “অনেক সময় মামলার আইনগত ভিত্তি দুর্বল থাকা, বয়স ১৮ বা তার কম হওয়ায় জামিন পাচ্ছে তারা।“
তিনি মনে করেন কিশোরদের বয়স যদি ১৫ বছর করে আইন করা যায় তাহলে বয়স কম দেখিয়ে জামিন নেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আলাপ-কে বলেন, “গ্যাংগুলো নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমরা যথাযথভাবে কারণগুলো সমাধান করতে পারছি না। তাই প্রান্তিক পর্যায়ের কিশোরদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে অবৈধ অর্থনীতির সুযোগ নিচ্ছে প্রভাবশালীরা।”
ড. তৌহিদুলের মতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এসব অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। এদের বিচার হলেই কিশোর গ্যাং কালচার অনেকটা নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব।



