চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয় খুলনার বড় মাঠে। তবে অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় গত বছরের জানুয়ারিতে বলে সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএমআপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আমানত সাবির সংগঠনে পরিচিত উস্তাদ সাবির নামে।
নিজেদের দাবি, তারা ‘বিশ্বের প্রথম মিউজিকমুক্ত ও শরিয়াভিত্তিক মার্শাল আর্ট’ সংগঠন। আর এই ‘খাঁটি তাওহীদবাদী’ সাজার আড়ালেই চলছিলো ডাকাতি আর উগ্রপন্থার চর্চা।
একটি ইজিবাইক ছিনতাইয়ের সূত্র ধরে তদন্তে বেরিয়ে এলো এক নব্য ‘উগ্রপন্থি’ সংগঠন ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)। মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতার নামে তহবিল সংগ্রহ করা এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই অভিযুক্ত হয়েছেন ছিনতাইয়ের অভিযোগে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে এফসিএস-এর আদ্যোপান্ত।
সম্প্রতি পাঁচ সহযোগীসহ ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের প্রধান শাহ আমানত সাবির।
বুধবার আদালত সাবির ও তার সহযোগী হোসাইন তানিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর দিয়েছেন। বাকি চারজনকে পাঠিয়েছেন কারাগারে।
আগামী ১২ই জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয় খুলনার বড় মাঠে। তবে এর অনানুষ্ঠানিক যাত্রা গত বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয় বলে সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা আলাপ-কে নিশ্চিত করেছেন।
তহবিল সংগ্রহের জন্য যশোরের মধুগ্রামে এফসিএস’র প্রতিষ্ঠাতা শাহ আমানত সাবির ও তার কর্মীরা ডাকাতি করেছেন বলেও জানতে পেরেছে সিটিটিসি।
সংগঠনটির প্রধান কার্যালয় খুলনার ময়লাপোতা এলাকার ৯ ফারাজী পাড়া লেন। খুলনা ও যশোর সদর শাখা, অভয়নগর, সিদ্ধিরপাশা, সুতারখালী ও চাঁদপুর হলো এফসিএস’র প্রতিষ্ঠাকালীন শাখা।
ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার আগে সাবির, যিনি সংগঠনে পরিচিত উস্তাদ সাবির নামে, খুলনার সোনাডাঙ্গায় আরও একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ঢাকায় গ্রেপ্তার হবার পর প্রথম দফায় তিনদিনের রিমান্ড শেষে বুধবার সাবিরসহ ৬ জনকে আদালতে হাজির করে ফের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ।
তহবিল সংগ্রহে ছিনতাই
গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে যশোরের কোতয়ালী থানার নওয়াপাড়া ইউয়িনের মধুগ্রাম এলাকা থেকে কমল বিশ্বাস নামে এক ইজিবাইক চালকের নগদ ১০ হাজার ৩০০ টাকা এবং পৌনে ৩ লাখ টাকা দামের ইজিবাইক ছিনিয়ে নেন সাবির ও তার সঙ্গীরা।
সেসময় সাবিরের পরিচয় জানতেন না কমল। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে রাশেদ নামে একজনকে সন্দেহ করেছিলেন তিনি। তবে রাশেদের ভাই ফয়সাল হুমকি দেওয়ায় থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার সাহস করেননি।
পরে ওই বছরেরই ১০ই নভেম্বর এ বিষয়ে যশোরের কোতয়ালী থানায় জিডি করেন।
কমল বিশ্বাস জানান, এই বছরের ৫ই জুলাই সাবির ও তার সঙ্গীরা ঢাকায় গ্রেপ্তার হলে পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে সাবিরকে চিনতে পারেন তিনি। এর মধ্যে পুলিশও তার সাথে যোগাযোগ করে।
সাতই জুলাই কমল বিশ্বাস যশোরের কোতয়ালী থানায় এ বিষয়ে একটি মামলাও করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাবির ও তার সঙ্গীরা নগদ টাকা ও ইজিবাইক ছিনিয়ে নেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন।
কমলের দায়ের করা মামলায় সাবিরসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের পরিচয় অজ্ঞাত। অন্যরা হলেন, আবু উসামা ওরফে ফয়সাল, ওয়ালিদ ওরফে আবুল বাশার, সুমান্না ওরফে তাসিফ ও মাসুদ।
আসামিদের মধ্যে সাবিরের স্থায়ী ঠিকানা খুলনার ডুমুরিয়া থানার চেচুড়ী গ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফয়সালের ঠিকানা যশোরের কোতয়ালী থানার বাহাদুপুর গ্রাম উল্লেখ করা হলেও অন্য তিনজনের ঠিকানায় শুধু যশোর উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবিরের বিরুদ্ধে আরও এক মামলা
পুলিশের সাথে ‘মারমুখি’ আচরণের অভিযোগে ২০২৫ সালের ৯ই মার্চ খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার শিববাড়ির মোড় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাবির। এ সময় সাব্বির আহমেদ সাকিব নামে এফসিএস’র এক কর্মীও গ্রেফতার হন।
সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া ওই মামলায় পরদিন (১০ই মার্চ) সাবির ও সাকিবকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে যান তারা।
এফসিএস’র কর্মকাণ্ড
‘তাওহিদবাদি’ বা ‘ইসলামিক রিয়েলিস্টিক সেল্ফ ডিফেন্স সিস্টেম’ অনুসরণ করে সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এফসিএস’র দাবি তারাই বিশ্বের প্রথম সংগঠন, যারা ‘শিরক, কুফর ও মিউজিকমুক্ত এবং শরিয়াভিত্তিক, রিয়েলিস্টিক, ইফেক্টিভ ও তাওহীদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম উম্মাহর মার্শাল আর্টস স্টাইলে’ পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান একাধিকবার সংগঠনটি নিয়ে লিখেছেন ফেইসবুকে। সংগঠনটির উগ্রপন্থি কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে তার লেখায়।
তিনিই প্রথম সামাজিক মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে এফসিএস’র প্রচারণা তুলে ধরেন। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের শিরোনামও হয় এফসিএস। সে সময় থেকেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলো সংগঠনটি।
চলতি বছরের ২৪এ মে খুলনার হেলাতলা এলাকার একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে জুলকারনাইন সায়ের ও ভারতীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন এফসিএস প্রধান সাবির।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভারতের বিজেপি সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমালোচনা করে তারা।
বলা হয়, “ইন্ডিয়া থেকে বলা হয়েছে যদি খুলনা ও যশোরের হিন্দুরা সহযোগিতা করে তাহলে ইন্ডিয়া খুলনা বিভাগ দখল করে নেবে। আমরা নাকি টিটিপি অর্থাৎ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, লস্কর–ই–তাইয়েবা (এলইটি), জইশ-ই মোহাম্মদের (জেএম)এবং ফিলিস্তিনের হামাসসহ পরিচালিত হচ্ছি, মাশাআল্লাহ।”
পুলিশ জানিয়েছে, এফসিএস ঢাকা শাখার কর্মকাণ্ড শুরু হয় ৪ঠা জুলাই। এর আগে থেকেই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন ৬টি শাখার বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া শুরু করে বলে নিশ্চিত করেছেন সিটিটিসি'র একাধিক কর্মকর্তা।
আইএস’র রণসংগীতে বোমা ফাটানোর ভিডিও
শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
ভিডিওতে দেখা যায়, গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় সাবির ও তার সহযোগীরা একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে আর নেপথ্যে বাজছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রকাশ করা একটি রণসংগীত।
বিস্ফোরণের পর সাবির ক্যামেরার দিকে ধারালো দা উঁচিয়ে ‘‘হে কুফফাররা’’ বলে হুমকি দেয় এবং ইউনূস নামে কাউকে প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। এছাড়া ভিডিওর অন্য অংশে সাবির ও তার সহযোগীদের কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতে দেখা যায়।
নজরদারিতে যা উঠে এলো
বেশ কয়েক মাস ধরেই এফসিএস নিয়ে তদন্ত করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে সংগঠনটির বিস্তারিত কার্যক্রম।
৩১এ মে সংগঠনটির ঢাকা শাখায় ভর্তি নেওয়া কথা হচ্ছে জানিয়ে শাহ আমানত সাবিরের ফেইসবুক পেইজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
৭ই জুন প্রতিযোগিতা আয়োজনের নামে তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয় এফসিএস। তহবিল গঠনের উদ্যোগের অংশ হিসাবে একটি বিকাশ নম্বরসহ ৫টি মোবাইল ফোন নাম্বার দেওয়া হয়।
১৭ই জুন সাবির তার ফেইসবুক পেইজে সংগঠনের ঢাকা শাখা গঠনের মতামত চেয়ে পোস্ট দেন।
২১এ জুন রংপুর শাখা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
২৭এ জুন এফসিএস’র ঢাকা শাখার কর্মীদের জানানো হয়, ৪ই জুলাই সকাল সোয়া ৬টায় রমনা পার্কে ঢাকা শাখার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হবে।
৩রা জুলাই কর্মীদের ঢাকা শাখার কর্মসূচি উদ্বোধনের তারিখ আবারও মনে করিয়ে দেন সাবির।
৪ঠা জুলাই সকালে শাহ আমানত সাবির তার ফেইসবুক পেইজে চারটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে সংগঠনের ঢাকা শাখার কর্মীদের রমনা পার্কে না যাওয়ার আহবান জানানো হয়। ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, আইনগত বাধার কারণে রমনা পার্কে প্রশিক্ষণ পরিচালনা সম্ভব নয়। কর্মীদের বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মেইন গেট এলাকায় উপস্থিত হতে বলেন সাবির। সেখানে ‘মাশওয়ারা’ (মতবিনিময়) অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি। ‘মাশওয়ারা’ শেষে ওই দিনই যাত্রাবাড়ী থানার বালুর মাঠে ঢাকা শাখার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন হয়।
সিটিটিসি'র একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এফসিএস’র রংপুর শাখা গঠনের উদ্যোগ কতোটা এগিয়েছে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
কে এই শাহ আমানত সাবির
২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল স্কুল অফ বুত্থান মার্শাল আর্টস এর খুলনা শাখা পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন সাবির। এটি বাংলাদেশ বুত্থান অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদিত সংগঠন।
প্রশিক্ষণের নিয়ম-নীতি নিয়ে মতবিরোধ হওয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে পদত্যাগ করেন সাবির।
সাবিরের গ্রামের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া থানার চেচুড়ী গ্রামে। খুলনা সদরে গল্লামারি দারোগা রোডে এক ব্যক্তির বাসায় ভাড়া থাকতেন। এছাড়া ঢাকার বাড্ডার আরও একটি ঠিকানা ব্যবহার করেন সাবির।
সহযোগী এনসিপি নেতা
পাঁচই জুলাই সাবিরের সাথে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সহযোগীর একজন ছিলেন আতাউল্লাহ শাহ। যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তবে গ্রেপ্তারের পর তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে তার দল। মঙ্গলবার এনসিপি'র দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত নোটিসে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম: মার্শাল আর্টের আড়ালে ‘উগ্রপন্থা’, তহবিল সংগ্রহে ডাকাতি
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয় খুলনার বড় মাঠে। তবে অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় গত বছরের জানুয়ারিতে বলে সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
নিজেদের দাবি, তারা ‘বিশ্বের প্রথম মিউজিকমুক্ত ও শরিয়াভিত্তিক মার্শাল আর্ট’ সংগঠন। আর এই ‘খাঁটি তাওহীদবাদী’ সাজার আড়ালেই চলছিলো ডাকাতি আর উগ্রপন্থার চর্চা।
একটি ইজিবাইক ছিনতাইয়ের সূত্র ধরে তদন্তে বেরিয়ে এলো এক নব্য ‘উগ্রপন্থি’ সংগঠন ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)। মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতার নামে তহবিল সংগ্রহ করা এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই অভিযুক্ত হয়েছেন ছিনতাইয়ের অভিযোগে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে এফসিএস-এর আদ্যোপান্ত।
সম্প্রতি পাঁচ সহযোগীসহ ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের প্রধান শাহ আমানত সাবির।
বুধবার আদালত সাবির ও তার সহযোগী হোসাইন তানিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর দিয়েছেন। বাকি চারজনকে পাঠিয়েছেন কারাগারে।
আগামী ১২ই জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম।
সিটিটিসি ছাড়াও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের কর্মকাণ্ড।
যেভাবে শুরু
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হয় খুলনার বড় মাঠে। তবে এর অনানুষ্ঠানিক যাত্রা গত বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয় বলে সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা আলাপ-কে নিশ্চিত করেছেন।
তহবিল সংগ্রহের জন্য যশোরের মধুগ্রামে এফসিএস’র প্রতিষ্ঠাতা শাহ আমানত সাবির ও তার কর্মীরা ডাকাতি করেছেন বলেও জানতে পেরেছে সিটিটিসি।
সংগঠনটির প্রধান কার্যালয় খুলনার ময়লাপোতা এলাকার ৯ ফারাজী পাড়া লেন। খুলনা ও যশোর সদর শাখা, অভয়নগর, সিদ্ধিরপাশা, সুতারখালী ও চাঁদপুর হলো এফসিএস’র প্রতিষ্ঠাকালীন শাখা।
ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার আগে সাবির, যিনি সংগঠনে পরিচিত উস্তাদ সাবির নামে, খুলনার সোনাডাঙ্গায় আরও একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ঢাকায় গ্রেপ্তার হবার পর প্রথম দফায় তিনদিনের রিমান্ড শেষে বুধবার সাবিরসহ ৬ জনকে আদালতে হাজির করে ফের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ।
তহবিল সংগ্রহে ছিনতাই
গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে যশোরের কোতয়ালী থানার নওয়াপাড়া ইউয়িনের মধুগ্রাম এলাকা থেকে কমল বিশ্বাস নামে এক ইজিবাইক চালকের নগদ ১০ হাজার ৩০০ টাকা এবং পৌনে ৩ লাখ টাকা দামের ইজিবাইক ছিনিয়ে নেন সাবির ও তার সঙ্গীরা।
সেসময় সাবিরের পরিচয় জানতেন না কমল। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে রাশেদ নামে একজনকে সন্দেহ করেছিলেন তিনি। তবে রাশেদের ভাই ফয়সাল হুমকি দেওয়ায় থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার সাহস করেননি।
পরে ওই বছরেরই ১০ই নভেম্বর এ বিষয়ে যশোরের কোতয়ালী থানায় জিডি করেন।
কমল বিশ্বাস জানান, এই বছরের ৫ই জুলাই সাবির ও তার সঙ্গীরা ঢাকায় গ্রেপ্তার হলে পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে সাবিরকে চিনতে পারেন তিনি। এর মধ্যে পুলিশও তার সাথে যোগাযোগ করে।
সাতই জুলাই কমল বিশ্বাস যশোরের কোতয়ালী থানায় এ বিষয়ে একটি মামলাও করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাবির ও তার সঙ্গীরা নগদ টাকা ও ইজিবাইক ছিনিয়ে নেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন।
কমলের দায়ের করা মামলায় সাবিরসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের পরিচয় অজ্ঞাত। অন্যরা হলেন, আবু উসামা ওরফে ফয়সাল, ওয়ালিদ ওরফে আবুল বাশার, সুমান্না ওরফে তাসিফ ও মাসুদ।
আসামিদের মধ্যে সাবিরের স্থায়ী ঠিকানা খুলনার ডুমুরিয়া থানার চেচুড়ী গ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফয়সালের ঠিকানা যশোরের কোতয়ালী থানার বাহাদুপুর গ্রাম উল্লেখ করা হলেও অন্য তিনজনের ঠিকানায় শুধু যশোর উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবিরের বিরুদ্ধে আরও এক মামলা
পুলিশের সাথে ‘মারমুখি’ আচরণের অভিযোগে ২০২৫ সালের ৯ই মার্চ খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার শিববাড়ির মোড় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাবির। এ সময় সাব্বির আহমেদ সাকিব নামে এফসিএস’র এক কর্মীও গ্রেফতার হন।
সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া ওই মামলায় পরদিন (১০ই মার্চ) সাবির ও সাকিবকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে যান তারা।
এফসিএস’র কর্মকাণ্ড
‘তাওহিদবাদি’ বা ‘ইসলামিক রিয়েলিস্টিক সেল্ফ ডিফেন্স সিস্টেম’ অনুসরণ করে সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এফসিএস’র দাবি তারাই বিশ্বের প্রথম সংগঠন, যারা ‘শিরক, কুফর ও মিউজিকমুক্ত এবং শরিয়াভিত্তিক, রিয়েলিস্টিক, ইফেক্টিভ ও তাওহীদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম উম্মাহর মার্শাল আর্টস স্টাইলে’ পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান একাধিকবার সংগঠনটি নিয়ে লিখেছেন ফেইসবুকে। সংগঠনটির উগ্রপন্থি কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে তার লেখায়।
তিনিই প্রথম সামাজিক মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে এফসিএস’র প্রচারণা তুলে ধরেন। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের শিরোনামও হয় এফসিএস। সে সময় থেকেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলো সংগঠনটি।
চলতি বছরের ২৪এ মে খুলনার হেলাতলা এলাকার একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে জুলকারনাইন সায়ের ও ভারতীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন এফসিএস প্রধান সাবির।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভারতের বিজেপি সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমালোচনা করে তারা।
বলা হয়, “ইন্ডিয়া থেকে বলা হয়েছে যদি খুলনা ও যশোরের হিন্দুরা সহযোগিতা করে তাহলে ইন্ডিয়া খুলনা বিভাগ দখল করে নেবে। আমরা নাকি টিটিপি অর্থাৎ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, লস্কর–ই–তাইয়েবা (এলইটি), জইশ-ই মোহাম্মদের (জেএম)এবং ফিলিস্তিনের হামাসসহ পরিচালিত হচ্ছি, মাশাআল্লাহ।”
পুলিশ জানিয়েছে, এফসিএস ঢাকা শাখার কর্মকাণ্ড শুরু হয় ৪ঠা জুলাই। এর আগে থেকেই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন ৬টি শাখার বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া শুরু করে বলে নিশ্চিত করেছেন সিটিটিসি'র একাধিক কর্মকর্তা।
আইএস’র রণসংগীতে বোমা ফাটানোর ভিডিও
শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
ভিডিওতে দেখা যায়, গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় সাবির ও তার সহযোগীরা একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে আর নেপথ্যে বাজছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রকাশ করা একটি রণসংগীত।
বিস্ফোরণের পর সাবির ক্যামেরার দিকে ধারালো দা উঁচিয়ে ‘‘হে কুফফাররা’’ বলে হুমকি দেয় এবং ইউনূস নামে কাউকে প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। এছাড়া ভিডিওর অন্য অংশে সাবির ও তার সহযোগীদের কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতে দেখা যায়।
নজরদারিতে যা উঠে এলো
বেশ কয়েক মাস ধরেই এফসিএস নিয়ে তদন্ত করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে সংগঠনটির বিস্তারিত কার্যক্রম।
সিটিটিসি'র একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এফসিএস’র রংপুর শাখা গঠনের উদ্যোগ কতোটা এগিয়েছে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
কে এই শাহ আমানত সাবির
২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল স্কুল অফ বুত্থান মার্শাল আর্টস এর খুলনা শাখা পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন সাবির। এটি বাংলাদেশ বুত্থান অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদিত সংগঠন।
প্রশিক্ষণের নিয়ম-নীতি নিয়ে মতবিরোধ হওয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে পদত্যাগ করেন সাবির।
সাবিরের গ্রামের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া থানার চেচুড়ী গ্রামে। খুলনা সদরে গল্লামারি দারোগা রোডে এক ব্যক্তির বাসায় ভাড়া থাকতেন। এছাড়া ঢাকার বাড্ডার আরও একটি ঠিকানা ব্যবহার করেন সাবির।
সহযোগী এনসিপি নেতা
পাঁচই জুলাই সাবিরের সাথে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সহযোগীর একজন ছিলেন আতাউল্লাহ শাহ। যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তবে গ্রেপ্তারের পর তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে তার দল। মঙ্গলবার এনসিপি'র দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত নোটিসে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।