২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টা। ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল ফটক। আগে থেকেই সেখানে ওঁত পেতে আছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সঙ্গে সাদা ও ধূসর রঙের দুটো মাইক্রোবাস এবং আরও দুটো সাদা ডাবলকেবিন পিকআপ।
গাড়ির ভেতরে ও বাইরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ২৪ জন সদস্য বিশেষ ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিয়ে গিয়েছেন সেখানে। পুরো টিমের দায়িত্বে ছিলেন ডিবির তখনকার পরিদর্শক ফজলুর রহমান, যাকে প্রভাবশালী একজন কর্মকর্তা হিসেবে মনে করা হতো।
সেদিনের ‘বিশেষ’ ওই ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ সফলভাবে সম্পন্ন করার পুরস্কার হিসাবে ফজলুর রহমান ২০১৭ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পদোন্নতি পান বলে অন্তত দুজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
কী ছিলো সেদিনের অভিযান, যে অভিযান পরিচালনার জন্য পুরস্কৃত হন ফজলুর রহমান।
জামায়াতে ইসলামীর নেতা প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সাক্ষী ছিলেন সুখরঞ্জন বালী। ঘটনার দিন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আইনজীবীর সঙ্গে গাড়িতে করে ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকের সামনে যান তিনি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিবির বিশেষ ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ ছিলো বালীকে হেফাজতে নেওয়া। তাকে ও তার সঙ্গে থাকা আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকে পৌঁছালে ঘিরে ধরে ফজলুর রহমানের টিম। বালীকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সাদা ডাবলকেবিন পিকআপে করে মিন্টু রোডে ডিবির প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
কে এই ফজলুর রহমান
১৯৮৯ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসাবে পুলিশে যোগ দেন ফজলুর রহমান। পরে পরিদর্শক ও এএসপি হিসাবে পদোন্নতি পান।
ফজলুর রহমানের সর্বশেষ কর্মস্থল ছিলো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অবসরে যান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
গ্রামের বাড়ি মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়। ছাত্রজীবনে ফজলুর রহমান জড়িত ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরবন্দিতে ছিলেন ফজলুর রহমান। গত ২রা জুলাই রাত ১০টার দিকে ঢাকার বাড্ডায় নিজের বাসা থেকে ফজলুরকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সুখরঞ্জন বালীকে ‘অপহরণ ও গুমের ঘটনায়’ ফজলুরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ৩রা জুলাই আদালতে হাজির করা হয় তাকে। একইসঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম। আদালত ফজলুরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
নেপথ্যে ছিলেন যারা
গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুখরঞ্জন বালীর ‘অপহরণ’ ডিবি কার্যালয় থেকে তদারকি করেছিলেন ডিবির তখনকার প্রধান যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। পরে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান হন ওই কর্মকর্তা।
২০২৪ সালের ১৩ অগাস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ অধিশাখা-১ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাকে অবসর দেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তাকে আর বাংলাদেশে দেখা যায়নি।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চব্বিশের ৫ই অগাস্টের পর সড়কপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান মনিরুল ইসলাম। পরে সেখান থেকে যান ইউরোপে।
মনিরুল ইসলাম দিল্লি ও লন্ডন থেকে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার পক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক বছর পর ২০২৫ সালের ২১এ অগাস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী। অভিযোগে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করেন। ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে রয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন।
যা ঘটেছিল
সুখরঞ্জন বালীর অভিযোগ, ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর সাক্ষী দিতে গেলে ট্রাইব্যুনালের ফটক থেকে পুলিশ তার চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে জানালাবিহীন একটি কক্ষে প্রায় দুই মাস এবং অন্য একটি স্থানে আরও দুই মাস আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।
পরে চোখ বেঁধে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিজিবির মাধ্যমে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার স্বরূপনগর থানার বৈকারী এলাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাকে আটক করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। পাঠানো হয় বশিরহাট হয়ে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে।
এদিকে সুখরঞ্জনের অবস্থান জানতে পেরে তার ছেলে অপূর্ব ভারতে যান। সেখানে বালীর জামিনের ব্যবস্থা করেন। পরে তিনি দেশে ফেরেন।


জামিন পেলেও মুক্তি নেই: শ্যোন অ্যারেস্ট কি রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠছে? 
