‘তুরাগ হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে ক‍্যাম্পেইন 'ভিত্তিহীন’- পুলিশ

আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে সাতজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে হত‍্যা করেছে এমন একটি ক‍্যাম্পেইনে সোশ‍্যাল মিডিয়া সয়লাব হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম

গত তিনদিন ধরে সোশ‍্যাল মিডিয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল একদল ব‍্যবহারকারী ‘তুরাগ হত্যাকাণ্ড’ নামের একটি ব‍্যাপক ক্যাম্পেইন প্রচার করার পর পুলিশ এই প্রচারণায় করা দাবিকে 'ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ওই প্রচারণায় দাবি করা হচ্ছিল, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে একটি মিছিল থেকে পুলিশ সাত ব‍্যক্তিকে তুলে নিয়ে হত‍্যা করেছে এবং দেহ তুরাগ নদীতে ফেলে দিয়েছে।

তুরাগ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা প্রচার হচ্ছে

কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ভ্যারিফাইড ফেইসবুক পেইজ, ছাত্রলীগের পেইজসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত কিছু ব‍্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত ফেইসবুক প্রফাইল থেকে দাবি করছে, দলটির তিনজন কর্মীকে হত্যা করে তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে এখনও নিখোঁজ আছেন আরও চারজন। তাদের দাবি ঘটনাটি ঘটেছে ২২এ জুন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও ২৭এ জুন তার ফেইসবুকে দাবি করেন, “গোপন সূত্রমতে, তুরাগ নদীতে ফেলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ডিজিএফআইয়ের একটি টিম আজ সারাদিন থেকে এখন অবধি তুরাগ থানায় অবস্থান করছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, তিনজন কর্মীর লাশ পাওয়া গেছে এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে থানায় অপমৃত্যুর মামলার জন্য।  

অন্যদিকে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল তার ফেসবুকে দাবি করেন, “তুরাগ নদী আজ ছাত্রলীগের কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত। কিন্তু সারা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এবং দেশ-সমাজ নিয়ে কথা বলা লোকগুলো এখনো নিশ্চুপ। পুলিশ একের পর এক লাশ তুলছে তুরাগ নদী থেকে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে দলের তৃণমূল কর্মীরা নিজ উদ্যোগে মিছিল করেছে, মিটিং করেছে।  

যেখানে বিএনপির সন্ত্রাসীরা ঝাঁপিয়ে পড়লে তাদের ৭ জন কর্মী নিখোঁজ হন এবং পরে তুরাগ নদীতে ৩ জনের অর্ধগলিত লাশ ভেসে ওঠে।

আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজ থেকেও বলা হয়, “ গত ২২ ও ২৩ জুন মাত্র দুটি দিনে, দেশের দুই প্রান্তে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল থেকে সাতজন তরুণ আর ঘরে ফেরেননি এবং তাঁদের মধ্যে তিনজনের অর্ধগলিত মরদেহ তুলে আনতে হয়েছে নদীর তলদেশ থেকে, বাকি চারজন এখনো নিখোঁজ।”

তারা এটিকে পরিকল্পিত, ঠাণ্ডা মাথার গণহত্যা হিসেবেও নিজেদের পোস্টে দাবি করে।

এক সুমনকে ঘিরেই ঘুরপাক যে ক্যাম্পেইন

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায় ২৫এ জুন ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় তুরাগ নদ থেকে মো. সুমন (১৭) নামে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে আশুলিয়া বাজার এলাকায় তুরাগে ভাসমান অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ২৬এ জুন আশুলিয়া থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। মৃত সুমন ঢাকার তুরাগ থানাধীন স্থানীয় একটি আড়তে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে পুলিশ গণমাধ্যমে উল্লেখ করে।

এ ঘটনায় ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট তথ্য যাচাই করে দেখে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, আশুলিয়া ও তুরাগ থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, “২২ জুন তুরাগ নদীতে পুলিশ এবং বিএনপির যৌথ হামলার পর আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে নদীতে ফেলে দেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।”

তবে সুমন নামে একজন তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে যিনি ‘বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়ে ট্রলার থেকে পড়ে মারা গিয়ে থাকতে পারেন’ বলেও ডিসেন্টকে জানায় পুলিশ।

তবে আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “মিছিল করার চেষ্টার সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজনকে ২২ ‍জুন বিকাল ৩টার দিকে আশুলিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ অনলাইন ক্যাম্পেইনে সুমনকে তাদের কর্মী বলে দাবি করেছে।

দ্য ডিসেন্ট সুমনের ফেসবুক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখেছে তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে অনলাইনে লেখালেখি করতেন। এমনকি তার প্রোফাইলে নিজের পোস্ট করা একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে সম্প্রতি আওয়ামী লীগ/ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিলে তিনি অংশ নিয়েছেন।

এসব মিছিলে অংশ নেওয়া তার একাধিক সহযোগীকে ট্রলারে দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়ার ভিডিওতেও দেখা গেছে। এই শপথের ভিডিও– যেটি ২১ জুন দিনে বা ২২ জুন দুপুরের আগে ধারণ করা।

দ্য ডিসেন্ট বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পেয়েছে ১৯এ জুন থেকে ২২এ জুন পর্যন্ত সময়ে একাধিকবার সুমন ট্রলারে অবস্থান করেছেন।

“এরপর ২২ জুন আশুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের কাছের ঘাটে ট্রলার ভেড়ানোর পর পুলিশের ভয়ে সেখান থেকে পালানো এবং কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী নদীতে লাফিয়ে পড়ার (যাদের সাতজনই পরে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হোন) ৪ দিন পর ওই ঘাট এলাকা থেকেই সুমনের লাশ উদ্ধার করা হয়”, প্রতিবেদনে উল্লেখ করে দ্য ডিসেন্ট।  

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অ্যাকটিভিস্ট এবং কর্মীদের পেইজ থেকেও সুমন ছাড়া আর কারও তথ্য নিশ্চিত করতে দেখা যায়নি। যদিও তারা কয়েকটি নাম উল্লেখ করছে।

দ্য ডিসেন্ট এ বিষয়ে কথা বলেছে শেখ হাসিনা সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকতার সঙ্গেও। ওই কর্মকর্তা ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, “ঘটনা সত্য। এখনো ৪ জন নিখোঁজ। কোথায় আছে কেউ জানে না। তবে যাদের লাশ পাওয়া গেছে। তাদের বাড়িতে বাড়িতে সরকারের লোকজন গেছে। মুখ না খোলার জন্য হুমকি দিয়ে আসছে। এইসব কথা স্থানীয় (সূত্র) থেকে আমার শোনা। সত্য কিনা আমি নিজেও জানি না।”

পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স যা বললো

২৭এ জুন পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, তুরাগ নদীতে ভাসছে আওয়ামী লীগ- ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তারা বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করে, এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। একইসঙ্গে যারা এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও কথা জানায় তারা।

অন্যদিকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের অংশ দ্য ডিসেন্ট প্রকাশ করেছে তাদের প্রতিবেদনে। যেখানে সুমন ও আরিফ নামে দুইজন আওয়ামী লীগ কর্মীর ওই দিন পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।