মতামত

মক্কা চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন

মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখার তেমন সুযোগ নেই। বরং এটাকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ধরনের বাস্তববাদী চিন্তার অংশ বলেই মনে হয়। এই চুক্তি অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। 

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ৭ই অগাস্ট মক্কায়।  এই ঘটনাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিতে যে তিনটি দেশ একসঙ্গে এসেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা গুরুত্ব আছে। এর একটি দেশ আরব বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। আরেকটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র। এবং তৃতীয়টি ন্যাটোর সদস্য। তিন দেশের শক্তি এক ধরনের নয়। কিন্তু সামরিক ও কূটনৈতিক, দুই দিক থেকেই প্রত্যেকেরই নিজস্ব সক্ষমতা আছে। এই দেশগুলো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মতো একমত হয়েছে যে তাদের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

একদল বলছেন এই চুক্তি একটি ইরানবিরোধী জোট। এই ব্যাখ্যা অতিরিক্ত সরল। মক্কা চুক্তি নিয়ে রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে ‘Royal United Services Institute’-এর গবেষক বুরচু ওজচেলিক যুক্তি দেন, এই কাঠামো একদিকে ইরানের শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে চায়। এটিকে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

আরেকদল বলছেন এই চুক্তি পোস্ট-আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করছে। এই যুক্তির মূল কথা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব কিছুটা কমছে, আর সেই জায়গায় নতুন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হতে পারে। এই যুক্তির মধ্যে কিছু সত্য আছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে চলে যাচ্ছে না। পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তান ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়নি, আর তেমন সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই। তুরস্ক এখনো ন্যাটোর সদস্য। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর। পাকিস্তানেরও ওয়াশিংটনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই এককভাবে বলা যায় না যে এই চুক্তি পোস্ট-আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। আমার কাছে পরিবর্তনের আসল জায়গাটি একটু ভিন্ন বলেই মনে হয়। আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে এখন একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে যে শুধু আমেরিকার ওপর ভরসা করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর যথেষ্ট নয়। আমেরিকার পাশাপাশি তাদের নিজেদেরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।

তাই মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখার তেমন সুযোগ নেই। বরং এটাকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ধরনের বাস্তববাদী চিন্তার অংশ বলেই মনে হয়। এই চুক্তি অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। একে ‘সিকিউরিটি ডাইভারসিফিকেশন’ বলে।

সৌদি আরব এবং অন্যান্য আঞ্চলিক রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবও চাইছে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও কিছু বিকল্প সম্পর্ক ও সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে। ওয়াশিংটন এই ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু নিরাপত্তার সব হিসাব শুধু আমেরিকাকে কেন্দ্র করেই হবে, সম্ভবত সেই সময়টা বদলাচ্ছে।

এই পরিবর্তন কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ২০২৩ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে ধারাবাহিক সংঘাত তৈরি হয়েছে, ও ২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে যে অভূতপূর্ব উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, তা এই প্রবণতাকে অনেক দ্রুত করেছে। বর্তমান ইরান সংকটকে বাদ দিয়ে মক্কা চুক্তির আসল গুরুত্ব বোঝা কঠিন হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কৌশলগত মিত্রতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গভীর হতে শুরু করে। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের সঙ্গে ‘USS Quincy’ জাহাজে বৈঠক করেন। সে সময়ের মার্কিন সরকারি নথিতেও আরবের তেলকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই সময় থেকেই আমেরিকা সৌদি আরবকে অর্থনৈতিক সহায়তা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নির্মাণে সাহায্য করে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৭৯ সালে। এই সময়ে ইরানি বিপ্লব ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তার ভূমিকায় চলে আসে। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলেন। এই অঞ্চলে যেকোনো আক্রমণ আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে হিসেবে আমেরিকা বিবেচনা করতে থাকে। সেই প্রেক্ষিতে আমেরিকা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি পরবর্তীকালে ‘কার্টার ডকট্রিন’ নামে পরিচিত হয়। এক দশক পর এর বাস্তব রূপ আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৯০ সালের অগাস্টে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে। আমেরিকা সাহায্যে এগিয়ে আসে। সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তার জন্য দেশটিতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েনে রাজি হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে উৎখাত করে।

এরপর যে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা ছিলো অত্যন্ত অসম। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর বিপুল আর্থিক সামর্থ্য ছিলো এবং তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনতো, কিন্তু চূড়ান্ত নিরাপত্তার ভরসা ছিলো মার্কিন সামরিক শক্তি। এই সময়ের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিলো বেশ সহজ। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখবে। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যেন কোনো বৈরী আঞ্চলিক শক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। পরবর্তী দশকগুলোতে এই নীতি টিকে ছিলো।

এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে। আবকাইক ও খুরাইসে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলায় সৌদি আরবের দৈনিক প্রায় ৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ওয়াশিংটন হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে। তেহরান তা অস্বীকার করে। পাশাপাশি এই হামলা দেখিয়ে দেয় কম দামের ড্রোন কেমন করে ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভয়ংকর ক্ষতিকর হামলা করতে পারে। সৌদি নেতৃত্বের জন্য এই ঘটনাটি বড় ধরনের একটি সতর্কবার্তা ছিলো। তারা উপলব্ধি করে যে কোনো মহাশক্তির কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনা আর সেই মহাশক্তির কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাওয়া এক বিষয় নয়। এরপর থেকেই সৌদি নীতিতে এক ধরনের কৌশলগত বীমার চিন্তা আরও স্পষ্ট হতে থাকে।

কূটনৈতিক অঙ্গনে কয়েকটি ঘটনা পরপর ঘটে। ২০২৩ সালের মার্চে সাত বছরের বিরতির পর সৌদি আরব ও ইরান বেইজিংয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়। চীনের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হওয়াটাই ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি-ইরান সমঝোতা দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে বন্ধুতে পরিণত করেনি। এতে আসলে বোঝা যায়, সৌদি আরব তার পুরোনো কৌশলের কিছু জায়গায় পরিবর্তন আনছে। সহজ করে বললে, রিয়াদ এখন শুধু প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে চায় না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খোলা রাখতে চায়, যাতে ঝুঁকি কিছুটা কমিয়ে রাখা যায়।

তুরস্কের সঙ্গে সৌদি সম্পর্কেও একই যুক্তি দেখা যায়। একসময় এই সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিলো। ধীরে ধীরে সেই জায়গা থেকে দুই দেশ সহযোগিতার দিকে এসেছে। বাস্তবতা হলো সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক সবসময় সহযোগিতামূলক ছিলো না। আরব বসন্ত-পরবর্তী দশকে আঙ্কারা ও রিয়াদ প্রায়ই আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিপরীত শিবিরে অবস্থান করেছে। তারা কখনো মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৭ সালে কাতার অবরোধের সময় তুরস্ক দোহার পাশে দাঁড়ায়। ওই সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর কাতারকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছিল। কাতারের সামনে তোলা দাবিগুলোর একটি ছিলো দেশটিতে তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা। আর একটি ঘটনার কথা বলা যায়। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার ঘটনা ঘটে। এর পরে সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।

তবে ২০২২ সালের মধ্যে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উদ্যোগে রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন শুরু হয়। রাজনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বাড়ে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরব তুরস্কের ড্রোন কেনার একটি বড় চুক্তি করে। এই ঘটনাটি দেখায় যে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে আটকে থাকেনি।

বিগত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির একটি পরিবর্তন হয়েছে। ২০১০-এর দশকের মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইসলাম, মুসলিম ব্রাদারহুড, কাতার, আরব বসন্ত এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সামনে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। যেমন, রাষ্ট্রের টিকে থাকা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং প্রতিরোধক্ষমতা।

অন্যদিকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সম্পর্ক বহু দশকের পুরোনো। এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক। পাকিস্তানি সামরিক সদস্যরা বহু বছর ধরে সৌদি আরবে প্রশিক্ষণ ও সহায়ক কাজ করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করে। সেখানে বলা হয়, এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই চুক্তির পর পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা কোনোভাবে সৌদি প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হতে পারে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে প্রকাশিত চুক্তিতে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিলো না এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারাও এমন ব্যাখ্যাকে সমর্থন দেয়নি। তাই ২০২৬ সালের মক্কা চুক্তিকে একেবারে নতুন করে তৈরি সৌদি-পাকিস্তান নিরাপত্তা কাঠামো বলা ঠিক হবে না। বরং আগের যে ব্যবস্থা ছিলো, সেটিকেই আরও বড় করা হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিষয় হলো তুরস্কের এই ব্যবস্থায় যোগ দেওয়া। এই কারণেই চুক্তিটি শুধু একটা কূটনৈতিক প্রদর্শন মনে হয় না। বরং এটাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি হিসেবেও দেখা যায়।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস হামলা করে। ইসরায়েল পরবর্তীতে গাজা যুদ্ধ শুরু করে। ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালায়। ইরানের ওপর আক্রমণ করে। ২০২৬ সালের মধ্যে যে যুদ্ধগুলো একসময় ‘প্রক্সি সংঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো, সেগুলোর কিছু ক্রমেই সরাসরি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতে রূপ নেয়। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এরপর ইরান অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়। এই সংঘাতগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা আছে। সেখান থেকে তৈরি হয় অর্থনীতি নিয়ে ভয় ও শংকা।

যেমন, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক মডেল স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন, নতুন অবকাঠামো, বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্প এবং সৌদি ভূখণ্ড আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকবে, এমন আস্থা প্রয়োজন। এমন এক মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগর অতিক্রম করে, হরমুজে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয় এবং লোহিত সাগর অনিরাপদ হয়ে পড়ে, সেই উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে মৌলিকভাবে অসঙ্গত। তাই রিয়াদের কাছে নিরাপত্তা এখন শুধু সামরিক বিষয় নয়, তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সিরিয়া ও ইরাকের অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাধা এবং লোহিত সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সামুদ্রিক অনিরাপত্তা সরাসরি তুর্কি স্বার্থকে প্রভাবিত করে। পাকিস্তানের হিসাবটা এখানে একটু আলাদা। সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক প্রভাব, উপসাগরীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূমিকা দেয়। ঐতিহাসিকভাবে যার কৌশলগত মনোযোগ প্রধানত দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিলো, সেই পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিম দিকে বিস্তৃত হয়। তিন দেশের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের স্বার্থ ও হিসাব এখন একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

[মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব]