জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আপত্তিকর মন্তব্য’ ও ‘অপপ্রচারের’ অভিযোগে সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার ক্রাইম ইউনিট।
এ বিষয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী ডিবির সাইবার ইউনিটের তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শুক্রবার ও শনিবার ঢাকার শাহবাগ থানায় ওই ৯ জনের বিরুদ্ধে দু’টি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে ওই অভিযোগ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসাবে গ্রহণ করে পুলিশ।
যাদের বিরুদ্ধে জিডি হয়েছে তাদের একজন সাংবাদিক আনিস আলমগীর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আলাপ-কে বলেন, ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে জিডি করা হয়েছে। কোন বক্তব্য নিয়ে আপত্তি উঠেছে তা-ও আমার জানা নেই। জুলাই ত্যাগ ও তিতিক্ষার ফসল। জুলাই নিয়ে কদর্য ভাষায় পক্ষে-বিপক্ষে যারা বক্তব্য দিচ্ছেন তার বিরোধিতা সবসময়ই করে আসছি।’
আনিস আলমগীর আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় কোনো ভুঁইফোঁড় সংগঠন প্রচার পাওয়ার জন্য এই জিডি করেছে।’
জিডিতে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান সঞ্চালক সোমা ইসলামের নামও আছে। সহকর্মী সোমার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া জিডির বিষয়ে জানতে চাইলে চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ জানান, তিনি বেশ ক’দিন ধরে অসুস্থ। সোমার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া জিডির বিষয়টি জানা নেই তার।
রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নামে জিডি দায়ের
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রথম জিডি দায়ের হয় শুক্রবার বিকালে। ওই জিডিতে ৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্তরা হলেন- মেহের আফরোজ শাওন, মাহিয়া মাহি ও শান্তা ফারজানা।
রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের পক্ষে জিডি দায়ের করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আ ন ম আয়াস, মুখ্য সংগঠক মুহাম্মদ শাহ্ আলম বাদশা ও সংগঠক তুহিন ফরাজী।
মনিরুজ্জামান জানান, দ্বিতীয় জিডি দায়ের হয় শনিবার। জিডিতে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের তিন সদস্য।
দ্বিতীয় জিডিতে ৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। তারা হলেন- আনিস আলমগীর, সোমা ইসলাম, শামীমা তুষ্টি, মারিয়া কিসপট্টা, জান্নাতুল পিয়া, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোমিন মেহেদী ও তার স্ত্রী শান্তা ফারজানা।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরও জানান, দু’টি জিডিতেই শান্তা ফারজানার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব অভিযোগে জিডি
জিডিতে অভিযোগ করা হয়, জান্নাতুল পিয়া সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সুমনের সহযোগী হিসেবে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তি ও সংগঠনকে কটাক্ষ করেছেন।
আনিস আলমগীর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রেপ্তার হন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজস করে জুলাই আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
জিডিতে অভিযোগ করা হয়েছে, উপস্থাপিকা সোমা ইসলাম টকশোতে জুলাই আন্দোলনকে ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য’ করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোমিন মেহেদী শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
মারিয়া কিসপট্টা জুলাই আন্দোলনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সন্ত্রাসী আন্দোলন’ হিসেবে প্রচার করছেন।
শামীমা তুষ্টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলনকে ‘প্রতারণার মাস’ আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
শান্তা ফারজানা জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপের ভিডিও প্রচার করে গণঅভ্যুত্থানের অবমাননা করেছেন।
মেহের আফরোজ শাওন জুলাই আন্দোলনকে পরিকল্পিত ও সাজানো ঘটনা হিসাবে উল্লেখ করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। মাহিয়া মাহি জুলাই আন্দোলনকে অভিনয়ের সাথে তুলনা করেছেন।
জিডিতে নেই সংগঠনের কার্যালয়ের ঠিকানা
শাহবাগ থানার একজন কর্মকর্তা জানান, শনিবার দায়ের হওয়া জিডিতে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্য মিল্লাত হোসেনের সাংগঠনিক পরিচয়ের পাশাপাশি ঢাকা ও গ্রামের বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হলেও সংগঠনের কার্যালয়ের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি।
যোগাযোগের জন্য টেলিফোন নাম্বারও দেওয়া হয়নি।
শুক্রবার দায়ের হওয়া জিডিতে সংগঠনের তিন নেতা আয়াস, বাদশা ও তুহিনের সাংগঠনিক পরিচয়ের বাইরে আর কোনো তথ্য নেই। রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের কারও মুঠোফোন নাম্বার বা ঠিকানা জানাতে পারেনি পুলিশ।
তবে সংগঠনের ফেইসবুক পেইজে সংগঠনের ঠিকানা শাহবাগ চত্বর উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিকানার বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আ ন ম আয়াস বলেন, ‘এখন কোনো অফিস নেই। হাতিরপুল এলাকায় অফিস নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
জিডিতে মুঠোফোন নাম্বার না দেওয়ার কারণ হিসাবে বলেন, ‘জিডির কপি পাবলিক হয়ে গেলে হুমকি আসে। অতীতে এরকম হয়েছে। এ কারণেই মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করা হয়নি।’



