‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’, দিয়েগো ম্যারাডোনা একই ম্যাচে গোল করেছিলেন দুটি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই দুটি গোলই যেন তার পুরো জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। উত্থান–পতন, আনন্দ–বেদনার কাব্যের এই গল্প বিষাদের চূড়া ছুঁয়েছিলো ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। ম্যারাডোনাকে যখন বিশ্বকাপ থেকেই সরে দাঁড়াতে হয়েছিলো ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঠিক কী ঘটেছিলো ও আর্জেন্টিনার সেই মহাবিপর্যয়ের গভীরতা কতটা ছিলো, তা বুঝতে হলে তার আগের চরম দুর্দশার চিত্রটি জানা জরুরি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিলো এক কথায় শোচনীয়। বুয়েনস আইরেসে কলম্বিয়ার কাছে ৫–০ গোলের লজ্জাজনক হারের পর গোটা দেশ যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। দলটি হয়ে পড়েছিলো সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন।
এমন এক পরিস্থিতিতে মরিয়া হয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তাদের ‘নির্বাসিত রাজা’র কাছে ফিরে আসার আকুতি জানায়। দেশের টানে দিয়েগো ম্যারাডোনাও সেই ডাকে সাড়া দেন।
এক খামারবাড়িতে ব্যক্তিগত ট্রেনার ড্যানিয়েল চেরিনির কঠোর তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তার ফিরে আসার লড়াই। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ম্যারাডোনার শরীরে এক অবিশ্বাস্য রূপান্তর ঘটে; ঝরিয়ে ফেলেন প্রায় ১২ কেজি ওজন।

মাঝমাঠে ম্যারাডোনার জাদুকরী পাস, আর দুই প্রান্তে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও ক্লাউডিও ক্যানিজিয়ার গতি— সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠেছিলো অপ্রতিরোধ্য এক শক্তি। প্রথম ম্যাচে গ্রিসকে ৪–০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও ২–১ গোলের দুর্দান্ত এক জয় পায়। ম্যারাডোনার রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে তখন মুগ্ধ পুরো দুনিয়াই।
কিন্তু নাটকীয়তার তখনও বাকি ছিলো। নাইজেরিয়া ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার ঠিক পরপরই মাঠে প্রবেশ করেন সু কার্পেন্টার নামের সাদা পোশাক পরিহিত এক প্লাম্প নার্স। হাসিমুখে ম্যারাডোনার হাত ধরে ডোপ টেস্টের জন্য টানেলের দিকে নিয়ে যান তিনি। ম্যারাডোনাও হাসিমুখে গ্যালারির দিকে হাত নাড়তে নাড়তে মাঠ ছাড়েন। কেই-বা তখন জানতো, ওটাই শেষবার!
৮ জুন ফুটবল বিশ্ব থমকেই যায় কয়েক মুহূর্তের জন্য। ম্যারাডোনার নমুনায় নিষিদ্ধ উদ্দীপক ‘এফেড্রিন’-এর পাঁচটি ভ্যারিয়েন্ট পজিটিভ আসে। ম্যারাডোনার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এটা ছিলো অনিচ্ছাকৃত ভুল। জানা যায়, ট্রেইনার চেরিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘রিপড ফুয়েল’ নামক একটি ওজন কমানোর ওষুধ কিনেছিলেন। তিনি জানতেন না যে আর্জেন্টিনার সংস্করণে এফেড্রিন না থাকলেও, মার্কিন সংস্করণে এটা মেশানো ছিলো।
কিন্তু ফিফা তখন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তাদের প্রথম বিশ্বকাপকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে ও মার্কিন বাজারে ফুটবলের বাণিজ্যিক প্রসার নিশ্চিত করতে মরিয়া ছিলো। তারা কোনোরকম সহানুভূতি দেখানোর পক্ষে ছিলো না। পুরো দল বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হতে পারে, এমন আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে পর্দার আড়ালে সমঝোতায় পৌঁছায় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও। ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগেই এএফএ নিজেই ম্যারাডোনাকে দল থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
অধিনায়কের এই আকস্মিক বিদায় আর্জেন্টিনা দলের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ম্যারাডোনা কেবল তাদের অধিনায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো দলের ঢাল, মানসিক শক্তির উৎস ও ট্যাকটিক্যাল চালিকাশক্তি। তৎকালীন কোচ আলফিও বাসিল পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, ‘দিয়েগো ছিলো আমাদের অক্সিজেন।’ সেই অক্সিজেন কেড়ে নেওয়ার পর আলবিসেলেস্তেরা যেন মাঠেই শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করে।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২–০ গোলে আত্মসমর্পণ করে। এরপর শেষ ষোলোতে গিওর্গি হাজির দুর্দান্ত রোমানিয়ার বিরুদ্ধে তারা প্রাণপণ লড়াই করলেও মানসিকভাবে দলটি ততক্ষণে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। ৩–২ গোলের হারের পর বিদায় ঘটে আর্জেন্টিনার। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে একটি সোনালী স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
অভিশপ্ত সেই সময় পেরিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনা পরলোকে চলে গেছেন তারও আগে। কিন্তু এখন ৩২ বছর পর যখন আরও একটা বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে— তখনও আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের বুকে হয়তো দগদগে সেই ক্ষত।



