ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি বাড়ছে, বন্যার কবলে একাধিক জেলা 

বন্যার পানিতে দুই শিশুসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে, পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ। নদীর পানি বাড়তে থাকায় আরও কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী কয়েক দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণকক্ষ, বাড়ানো হয়েছে ত্রাণ ও উদ্ধার প্রস্তুতি। তবে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নদীসংলগ্ন ও পাহাড়ি এলাকার মানুষের ঝুঁকি এখনও কাটেনি।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে পানিবন্দি সাড়ে সাত লাখ মানুষ

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলায় অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এ ছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীর বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে রয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

বন্যার পানিতে ডুবে কক্সবাজারে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াকিম। একই দিন মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে মারা যায় তিন বছর বয়সী পুষ্প।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, নিহত দুই শিশুর পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বাড়ছে নদীর পানি, কয়েক জেলায় বন্যার শংকা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী তিন দিনে এসব নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম, ফেনী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইতোমধ্যে বান্দরবানের সাঙ্গু নদী এবং কক্সবাজারের লামায় মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভূগাই নদীর পানিও বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে রংপুর বিভাগেও বাড়ছে নদীর পানি। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, আগামী তিন দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর প্রভাবে দেশের নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বর্তমানে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় থাকা সুস্পষ্ট লঘুচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে মধ্য উত্তরপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। তবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।

আগামী ১১ জুলাইও দেশের একই বিভাগগুলোতে বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।

এ দিকে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। 

উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের প্রস্তুতি

ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের যে-সব জেলায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখানকার জেলা প্রশাসনকে সতর্ক করার পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। 

তিন পার্বত্য জেলায় ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজনে মোঙ্গল চন্দ্র পাল, উপসচিব (মোবাইল: ০১৭১২-৮৪০৮৩৭) এবং মো. আজিজুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (মোবাইল: ০১৭২৬-০০৭৬৯৩)এর যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বন্যা কবলিত জেলাগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, পানি নেমে যাওয়ার পরপরই ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামত ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু করবে সরকার।

বৃষ্টি ও বন্যায় বাড়ছে পাহাড়ধসের শংকাও

অধিবেশনে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পার্বত্য তিন জেলায় এক হাজার ৩০০ মেট্রিক টন চাল এবং রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ২০ লাখ টাকা করে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনকে দৃঢ়ভাবে জনগণের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গতদের কাছে আড়াই হাজার মেট্রিক টন চাল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।

শুক্রবার দুপুরে ঢাকার মিরপুরে সরকারি বাঙলা কলেজের এক অনুষ্ঠানে মাহদী আমিন বলেন, সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সব ধরনের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকতে প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীদেরও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

মাহদী আমিন বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অনুষঙ্গ সাহায্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে।