ম্যানহাটনের কোলাহলপূর্ণ এক স্পোর্টস পাব। চারপাশে বেশ কিছু পর্দায় ভেসে উঠছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। গ্লাস হাতে আমার পাশে বসা মরক্কোর এক সমর্থক, নাম তার ইউসুফ। খেলা দেখতে দেখতে দুজনের মধ্যে জমাট বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। দু’জন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছি মিশর-ইরান ম্যাচের দিকে। শেষের কয়েক মিনিটের টানটান উত্তেজনা, শ্বাসরুদ্ধকর ড্রামা! ইরানের নাটকীয় গোলে পাবের ভেতর উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়ে গেলো। পাবের ভেতর ইরানিয়ান ভক্তের সংখ্যা বেশি, এমনটা নয়!
ফুটবলের শেষ মুহূর্তের এসব নাটকে ছোট দলের প্রতি সাপোর্ট যেন এমনিতেই চলে যায়। তার ওপর দলটার নাম ইরান, অনেক আমেরিকানও তাদের পক্ষেই বিশ্বকাপে ঝান্ডা উড়াচ্ছে।
ইরানের শেষ ৩২ এ যাওয়ার মঞ্চ প্রস্তুত। আনন্দের রেশ না কাটতেই এলো সেই ধাক্কা—ভিএআর প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে গোল বাতিল। মাঠে দমবন্ধ এক অবস্থা, পাবে-ও তাই। খেলা আবার শুরু হতেই ইরানের হেড মিশরের পোস্টে চুমু দিয়ে চলে গেলো। রেফারির শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে চারিদিকে যেন হতাশার চাদর নেমে গেলো। ড্র করেও নানা হিসেব নিকেশের বেড়াজালে ইরানের শেষ ৩২-এ খেলার স্বপ্ন এখন বেশ ধূসর। বেলজিয়াম ও মিশরকে আটকে দিয়েও গ্রুপের তৃতীয় দল ইরান। মাঝে মাঝে ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে ফুটবলও হেরে যায়। এত সব প্রযুক্তির ব্যবহার ফিকে লাগে। এই মিলিমিটারের পার্থক্যে অফসাইডে ইরানের লেখা হলো না ইতিহাস।
ইউসুফের চোখের দিকে তাকালাম; সেখানে গভীর অতৃপ্তি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “ভিএআর খেলাটিকে আরও নিখুঁত করবে ভেবেছিলাম, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আবেগটাই কেড়ে নিচ্ছে। ইরানের মতো দলগুলোর শেষ মুহূর্তের গোল যদি এভাবে বাতিল হয়ে যায়, তখন ফুটবল আর সুন্দর থাকে না।"
কঠিন ব্যাখ্যা। আমি আবার আলোচনাটাকে উসকে দিলাম, "ঠিক আছে। ধরে নিলাম সিদ্ধান্ত ইরানের পক্ষেই গেলো। তাতে মিশরের প্রতি কি অন্যায় হতো না?"
ইউসুফ আমার কথা পাত্তা দিলো না। তার গ্লাসের কালো রংয়ের পানি এক চুমুকে শেষ করলো। বললো, "সাংবাদিক মানুষ তুমি। ফুটবল আমার থেকে ভালো বুঝবে। কোনো জ্ঞান তোমাকে দিতে চাই না। শুধু এটুকুই বলবো, মহাবিশ্বের সব কিছু হিসেব মেনে হয় না। ইরানের এই জয় প্রাপ্য ছিলো।"
কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটলো। ইউসুফ আরেক রাউন্ড অর্ডার করলো। বললো, "ইটস অন মি। এসব মন খারাপের রাতে বেশি বেশি পানীয় খেতে হয়।"
নিউ ইয়র্কে ঘুরতে আসা ইউসুফের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে ঘণ্টা দুয়েক। অথচ ফুটবল দু’জনকে এমন এক সমীকরণে বেধে ফেলেছে, মনে হচ্ছে কতো দিনেরই না সাথি মোরা।
মেসি-রোনালদো, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা এই বিষয়গুলো তুলে খুব বেশি সুবিধা করতে পারলাম না। ইউসুফ মরক্কান, ওদের ফুটবল নিয়েই সে কথা বলতে চায়। সে একজন কৌশলী ফুটবলপ্রেমী। হিসেব-নিকেশ কষে দর্শন জানাচ্ছে। মরক্কো-ব্রাজিলের ম্যাচ মাঠে বসে দেখেছে। রাউন্ড অব ৩২-এ মরক্কোর ম্যাচ নিউ ইয়র্কের ফ্যান জোনে দেখে সে দেশে ফিরবে।
ল্যাতিন ফুটবল নিয়েও ওর দর্শন চমকে দেওয়ার মতো। এবারের বিশ্বকাপে আনচেলত্তি আর স্কালোনি ডুয়েল নিয়ে ইউসুফ খুব চিন্তিত। হাসতে হাসতে বললো, "ভাবো সেমিতে আনচেলত্তি আর স্কালোনির দেখা হলো, কে জিতবে?"
আমি বললাম, "আনচেলত্তি।"
ইউসুফ বললো, "তুমি রিয়াল মাদ্রিদ ভক্ত নও তো?"
আমি বললাম, "রিয়াল, ব্রাজিল, আনচেলত্তি – তিনটারই ভক্ত আমি।"
ইউসুফ হো হো করে হেসে ফেললো, “ব্রাজিলের ফুটবলে যে শৈল্পিক ছন্দ, আর আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের যে লড়াকু মানসিকতা—তা না থাকলে বিশ্বকাপ পূর্ণতা পায় না।" সে মনে করে, ফুটবল এখন আর ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই, মরক্কো থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্কের পাব পর্যন্ত সবাই এক অমোঘ সুতোয় বাঁধা।
পাবের বাইরে তখন ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তা, কিন্তু আমাদের পৃথিবীটা তখন কেবল ওই ফুটবল মাঠের ঘাসে ঢাকা। মরক্কোর রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচটি নিয়ে ইউসুফ আশাবাদী, কিন্তু ইরানকে ঘিরে তার মনের কোণে জমে থাকা সেই বিষাদ আর প্রযুক্তি নিয়ে আক্ষেপটা যেন কিছুতেই কাটছে না। তবে ফুটবলের সৌন্দর্য তো এখানেই—কিছু জয়, কিছু বিতর্ক আর অগণিত মানুষের আবেগ মিলে যে গল্প তৈরি হয়, তার নামই বিশ্বকাপ।



