কেপ ভার্দে রূপকথা, ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস ও ‘মামা সে’ ফুটবল
তায়িব অনন্ত, নিউ ইয়র্ক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১২:০৫ পিএমআপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০২:২৫ পিএম
নিউইয়র্কে বসে কেপ ভার্দে-উরুগুয়ের ম্যাচটা দেখছিলাম। স্নায়ুক্ষয়ী প্রায় পৌনে ২ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে যখন নরওয়েজিয়ান রেফারি এসপেন এসকাস লম্বা বাঁশি দিলেন, বিশ্বাস করুন মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে থাকা গুটি কয়েক ভার্দেবাসী চিৎকার যেন আমি কান নয়, মন দিয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম। স্পেনের সাথে ড্র করে বিস্ময়ের জন্ম দেওয়া কেপ ভার্দে এবার লাতিন জায়ান্ট উরুগুয়ের জালে দুটো গোল দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পয়েন্টও বাগিয়ে নিয়েছে একটা। শেষ ম্যাচে সৌদি আরব প্রতিপক্ষ বলে এখন রাউন্ড অব থার্টি টু-এর স্বপ্নটাও আর অমূলক নয় কেপ ভার্দের।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে টানা দুটো রূপকথার জন্ম দেওয়া দেশটির নাম কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ প্যাকেজ। গ্রুপ এইচ-এ বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাশক্তি স্পেন ও উরুগুয়ের মতো প্রতাপশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং চোখ ধাঁধানো ফুটবল বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের মন জয় করে নিয়েছে। ফুটবল বোদ্ধারা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন, এই টুর্নামেন্টে ‘ব্লু শার্কস’ খ্যাত দলটি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ‘অরা’ (আভা) নিয়ে হাজির হয়েছে।
কেপ ভার্দে ফুটবল দলের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগর তাদের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, যিনি ফুটবল বিশ্বে ‘বুবিস্তার’ নামে পরিচিত। কেপ ভার্দেই জন্ম নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী এই দেশীয় কোচ নিজের খেলোয়াড়দের মানসিকতা এবং শক্তি খুব ভালো করে চেনেন। বিশ্বকাপে বাজেট ও তারকা খেলোয়াড়ের সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি যেভাবে প্রতিটি ম্যাচের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মাস্টারপ্ল্যান সাজাচ্ছেন, তা আধুনিক ফুটবল কৌশলের অনন্য উদাহরণ।
স্পেনের মতো শক্তিশালী ও বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দে যে ফুটবল উপহার দিয়েছিল, তা এক কথায় রক্ষণাত্মক ফুটবলের ব্যাকরণ বই। স্প্যানিশ পরাশক্তিদের রুখে দিতে কোচ বুবিস্তার দল বেছে নিয়েছিল একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও নিশ্ছিদ্র ‘লো ব্লক’ ডিফেন্স কৌশল। বুবিস্তার সাজানো সেই দুর্ভেদ্য ডিফেন্সের মূল ভরসা ছিলেন দলের অভিজ্ঞ ৩৯ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা এবং ভিয়ারিয়ালে খেলা তরুণ প্রতিভাবান ডিফেন্ডার লোগান কস্তা। স্পেনের লামিন ইয়ামাল কিংবা পেদ্রিদের মুহূর্মুহু আক্রমণগুলো কেপ ভার্দে ডিফেন্সের দেয়ালে এসে আছড়ে পড়েছে। ২০১০-এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের পুরো ম্যাচ জুড়ে বোতলবন্দি করে রেখে ঐতিহাসিক ০-০ ড্র আদায় করে নেয় তারা। কেপ ভার্দে সেদিন বিশ্বকে দেখিয়েছিল, রক্ষণভাগকেও কীভাবে মাঠের এক টুকরো শিল্পে রূপ দেওয়া যায়।
তবে দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে ফুটবল বিশ্ব সম্পূর্ণ অন্য এক কেপ ভার্দেকে আবিষ্কার করে। সেখানে তারা শুধু রক্ষণের খোলসে বন্দি থাকেনি, বরং আক্রমণাত্মক ফুটবল কাকে বলে তা বুক চিতিয়ে দেখিয়েছে। লাতিন পরাশক্তি উরুগুয়ের হাই-প্রেসিং ফুটবলের জবাব কেপ ভার্দে দিয়েছে আরও বিধ্বংসী ‘ফ্রি অ্যাটাকিং’ বা অল-আউট আক্রমণাত্মক কাউন্টার-প্রেসিং দিয়ে। মাঝমাঠে ডেরয় দুয়ার্তে এবং ল্যারোস দুয়ার্তে, এই দুই ভাইয়ের চমৎকার বোঝাপড়ার ওপর ভর করে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করে নেয় বুবিস্তার শিষ্যরা। উইং দিয়ে অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেসের গতি এবং আক্রমণভাগে কেভিন পিনা ও হেলিও ভ্যারেলার ভয়ডরহীন ফুটবল উরুগুয়ের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেয়। ভ্যারেলা ও পিনার পা থেকে আসা দুটি জাদুকরী গোল ম্যাচটিকে ২-২ ব্যবধানের এক রোমাঞ্চকর ড্রয়ে রূপ দেয়।
মেট্রো প্যাটার্নের ট্যাকটিক্যাল বা কৌশলগত বিশ্লেষণে এই দলের একটি দারুণ সমীকরণ উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেপ ভার্দে যেন ফুটবলীয় ব্যাকরণের সব চেনা ছক বদলে দিচ্ছে। এই ফুটবলকে স্থানীয় ভাষায় অনেকে ‘মামা সে ফুটবল’ বা এক ধরনের জাদুকরী, আবেগঘন ও খাঁটি ফুটবল বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছেন—যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কেবলই আছে অদম্য সাহস আর দেশের জন্য জানপ্রাণ বিলিয়ে দেওয়ার তাড়না।
স্পেনের বিপক্ষে অতি-রক্ষণাত্মক অথচ উরুগুয়ের বিপক্ষে ভয়ডরহীন স্বাধীন ফুটবল—এই দ্বিমুখী রণকৌশলই কেপ ভার্দেকে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোচ বুবিস্তার সুশৃঙ্খল কৌশল আর মেন্ডেস-ভোজিনহাদের মাঠের জাদুতে উথাল-পাথাল রূপকথা নক-আউট পর্বে আরও কতদূর চোখ রাঙায়, এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব নিশ্বাস বন্ধ করে সেটাই দেখছে। এমনকি নিউইয়র্ক প্রবাসী বাঙালিরাও বলছেন, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচগুলো তো আছেই, কেপ ভার্দের খেলাও তারা দুধ-চায়ের সাথে মিস করতে চান না। চায়ের আড্ডা আর কেপ ভার্দের বীরত্ব, প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেনো বিদেশ বিভুঁইয়ে ওই কেপ ভার্দের কাছ থেকেই বেঁচে থাকার রসটা আহরণ করছেন!
কেপ ভার্দে রূপকথা, ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস ও ‘মামা সে’ ফুটবল
নিউইয়র্কে বসে কেপ ভার্দে-উরুগুয়ের ম্যাচটা দেখছিলাম। স্নায়ুক্ষয়ী প্রায় পৌনে ২ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে যখন নরওয়েজিয়ান রেফারি এসপেন এসকাস লম্বা বাঁশি দিলেন, বিশ্বাস করুন মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে থাকা গুটি কয়েক ভার্দেবাসী চিৎকার যেন আমি কান নয়, মন দিয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম। স্পেনের সাথে ড্র করে বিস্ময়ের জন্ম দেওয়া কেপ ভার্দে এবার লাতিন জায়ান্ট উরুগুয়ের জালে দুটো গোল দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পয়েন্টও বাগিয়ে নিয়েছে একটা। শেষ ম্যাচে সৌদি আরব প্রতিপক্ষ বলে এখন রাউন্ড অব থার্টি টু-এর স্বপ্নটাও আর অমূলক নয় কেপ ভার্দের।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে টানা দুটো রূপকথার জন্ম দেওয়া দেশটির নাম কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ প্যাকেজ। গ্রুপ এইচ-এ বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাশক্তি স্পেন ও উরুগুয়ের মতো প্রতাপশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং চোখ ধাঁধানো ফুটবল বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের মন জয় করে নিয়েছে। ফুটবল বোদ্ধারা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন, এই টুর্নামেন্টে ‘ব্লু শার্কস’ খ্যাত দলটি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ‘অরা’ (আভা) নিয়ে হাজির হয়েছে।
কেপ ভার্দে ফুটবল দলের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগর তাদের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, যিনি ফুটবল বিশ্বে ‘বুবিস্তার’ নামে পরিচিত। কেপ ভার্দেই জন্ম নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী এই দেশীয় কোচ নিজের খেলোয়াড়দের মানসিকতা এবং শক্তি খুব ভালো করে চেনেন। বিশ্বকাপে বাজেট ও তারকা খেলোয়াড়ের সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি যেভাবে প্রতিটি ম্যাচের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মাস্টারপ্ল্যান সাজাচ্ছেন, তা আধুনিক ফুটবল কৌশলের অনন্য উদাহরণ।
স্পেনের মতো শক্তিশালী ও বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দে যে ফুটবল উপহার দিয়েছিল, তা এক কথায় রক্ষণাত্মক ফুটবলের ব্যাকরণ বই। স্প্যানিশ পরাশক্তিদের রুখে দিতে কোচ বুবিস্তার দল বেছে নিয়েছিল একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও নিশ্ছিদ্র ‘লো ব্লক’ ডিফেন্স কৌশল। বুবিস্তার সাজানো সেই দুর্ভেদ্য ডিফেন্সের মূল ভরসা ছিলেন দলের অভিজ্ঞ ৩৯ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা এবং ভিয়ারিয়ালে খেলা তরুণ প্রতিভাবান ডিফেন্ডার লোগান কস্তা। স্পেনের লামিন ইয়ামাল কিংবা পেদ্রিদের মুহূর্মুহু আক্রমণগুলো কেপ ভার্দে ডিফেন্সের দেয়ালে এসে আছড়ে পড়েছে। ২০১০-এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের পুরো ম্যাচ জুড়ে বোতলবন্দি করে রেখে ঐতিহাসিক ০-০ ড্র আদায় করে নেয় তারা। কেপ ভার্দে সেদিন বিশ্বকে দেখিয়েছিল, রক্ষণভাগকেও কীভাবে মাঠের এক টুকরো শিল্পে রূপ দেওয়া যায়।
তবে দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে ফুটবল বিশ্ব সম্পূর্ণ অন্য এক কেপ ভার্দেকে আবিষ্কার করে। সেখানে তারা শুধু রক্ষণের খোলসে বন্দি থাকেনি, বরং আক্রমণাত্মক ফুটবল কাকে বলে তা বুক চিতিয়ে দেখিয়েছে। লাতিন পরাশক্তি উরুগুয়ের হাই-প্রেসিং ফুটবলের জবাব কেপ ভার্দে দিয়েছে আরও বিধ্বংসী ‘ফ্রি অ্যাটাকিং’ বা অল-আউট আক্রমণাত্মক কাউন্টার-প্রেসিং দিয়ে। মাঝমাঠে ডেরয় দুয়ার্তে এবং ল্যারোস দুয়ার্তে, এই দুই ভাইয়ের চমৎকার বোঝাপড়ার ওপর ভর করে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করে নেয় বুবিস্তার শিষ্যরা। উইং দিয়ে অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেসের গতি এবং আক্রমণভাগে কেভিন পিনা ও হেলিও ভ্যারেলার ভয়ডরহীন ফুটবল উরুগুয়ের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেয়। ভ্যারেলা ও পিনার পা থেকে আসা দুটি জাদুকরী গোল ম্যাচটিকে ২-২ ব্যবধানের এক রোমাঞ্চকর ড্রয়ে রূপ দেয়।
মেট্রো প্যাটার্নের ট্যাকটিক্যাল বা কৌশলগত বিশ্লেষণে এই দলের একটি দারুণ সমীকরণ উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেপ ভার্দে যেন ফুটবলীয় ব্যাকরণের সব চেনা ছক বদলে দিচ্ছে। এই ফুটবলকে স্থানীয় ভাষায় অনেকে ‘মামা সে ফুটবল’ বা এক ধরনের জাদুকরী, আবেগঘন ও খাঁটি ফুটবল বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছেন—যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কেবলই আছে অদম্য সাহস আর দেশের জন্য জানপ্রাণ বিলিয়ে দেওয়ার তাড়না।
স্পেনের বিপক্ষে অতি-রক্ষণাত্মক অথচ উরুগুয়ের বিপক্ষে ভয়ডরহীন স্বাধীন ফুটবল—এই দ্বিমুখী রণকৌশলই কেপ ভার্দেকে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোচ বুবিস্তার সুশৃঙ্খল কৌশল আর মেন্ডেস-ভোজিনহাদের মাঠের জাদুতে উথাল-পাথাল রূপকথা নক-আউট পর্বে আরও কতদূর চোখ রাঙায়, এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব নিশ্বাস বন্ধ করে সেটাই দেখছে। এমনকি নিউইয়র্ক প্রবাসী বাঙালিরাও বলছেন, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচগুলো তো আছেই, কেপ ভার্দের খেলাও তারা দুধ-চায়ের সাথে মিস করতে চান না। চায়ের আড্ডা আর কেপ ভার্দের বীরত্ব, প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেনো বিদেশ বিভুঁইয়ে ওই কেপ ভার্দের কাছ থেকেই বেঁচে থাকার রসটা আহরণ করছেন!
বিষয়: